নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ০৮
লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ০৮ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ৮
এরপরও আরও কিছুক্ষণ কথা চলল। দীপ্তি দেবীর কণ্ঠ যেন অতীতের পাখির মতো ডানায় ভর করে উড়ে গেল স্মৃতির বাগানে। ছোটবেলার কত কথা…বাড়ি, আঙিনার কচি আম গাছ, স্কুলের পথে হেঁটে যাওয়া, কলেজের প্রথম দিন, সবই একে একে ভেসে উঠল তার কণ্ঠস্রোতে। মাঝে মাঝে তিনি থেমে যান, মনে করেন কিছু, আবার ভুলেও গেছেন অনেক কিছু। আবার হেসে উঠেন, “আহা, এই বয়সে সব মনে রাখা যায় নাকি!”
তিনি বললেন প্রকৃতির কথা। কেমন করে প্রকৃতি ছিল স্কুলের সেরা ছাত্রী, কেমন একরোখা মেয়েটি ছিল সে। বললেন, “প্রকৃতি শুধু পড়াশোনাতেই নয়, গান, কবিতা, নাটকে… সে যেন আলো হয়ে থাকত। ওর মধ্যে ছিল একধরনের দুরন্ত স্বাধীনতা, যেন কোনো শিকলই তাকে বাঁধতে পারবে না।”
বহু অজানা গল্প শুনল তূর্য আর হিয়া। দীপ্তি দেবীর চোখে চোখে জ্বলছিল সেই ফেলে আসা দিনের আলো। বললেন তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা, ক্লাসের কড়া অধ্যাপক, ক্যাম্পাসের জলবদলের গল্প, আড্ডার চায়ের দোকান, সাহিত্যসভা, রাজনীতি, ভালোবাসা… সেই সব দিন, যেগুলো আর ফিরবে না, তবু হৃদয়ের কোষে গেঁথে আছে চিরকাল।
ঘরের বাতাসে যেন ছড়িয়ে পড়ল নষ্টালজির এক কোমল ঘ্রাণ। ঘড়ির কাঁটা সরে সরে পৌঁছে গেল দুপুর দুইটার ঘরে। খাওয়ার টেবিল সাজানো হলো সরল অথচ স্নেহভরা এক খাবারের সারিতে। দীপ্তি দেবী জোর করে তাদের খাওয়ালেন।
তূর্য আর হিয়া ধীরে ধীরে প্রতিটি গ্রাসে যেন দীপ্তি দেবীর একাকীত্বকে ছুঁয়ে দেখল। এরপর সময় শেষ। তারা বেরিয়ে পড়ল তখন। বাড়ির পুরনো ফটক পার হতে গিয়ে হঠাৎ তূর্য একবার পেছনে তাকাল। দীপ্তি দেবী বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন, চোখে এক অমোঘ শূন্যতা আর অম্লান হাসি। যেন একসঙ্গে অনেক কথা বলা হলো, তবু কত কথা রয়ে গেল না-বলা।
রোদের আঁচ দুপুরকে জড়িয়ে ধরে ধীরে ধীরে পশ্চিমে হেলে যাচ্ছিল। গলির শেষ প্রান্তে পৌঁছে হিয়া আস্তে বলল, “কী আশ্চর্য… কতটা গল্প জমে থাকে একেকটা মানুষে…!”
তূর্য মৃদু হাসলো। “হিয়া জানিস তো, বাস্তবতা সবসময় বাধ্যতামূলক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আসে। মেনে নিলেই টিকে থাকা যায়, না মানলে ছুঁড়ে ফেলে অনেক দূরে।”
এরপর চুপ আবার তারা। তূর্য হিয়া যে বাস্তবতার সন্ধান খুঁজতে বেরিয়েছিল তার সন্ধান মেলেনি। তবে যা পকেটে নিয়ে ফিরছে তাও কম নয়। কিছু সত্য হয়তো গোপন সুন্দর। তাকে খুঁড়ে বাইরে এনে আদৌও কারো কোন লাভ হয় না। তারপর ও মানুষ লাভ ক্ষতির হিসেব ছেড়ে ছুটে বেড়ায় গভীরে।
তূর্য আস্তে করে হাত ঘড়িতে চোখ রাখল। “বাহ, তিনটা বেজে গেছে? বল, কোথাও ঘুরতে যাবি? নাকি এখনি ফিরবি?
যদি তুই চাস তাহলে তোকে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে পারি। এখানে বেশ কয়েকটা জায়গা আছে দেখার মতো। কিন্তু সব জায়গায় যাওয়ার সময় নেই। যে কোন একটা জায়গায় যাওয়া সম্ভব। যদি যেতে চাস তাহলে বল। এরপর সন্ধ্যা ছয়টার গাড়ি ধরবো।”
হিয়ার চোখ জ্বলে উঠল উত্তেজনায়। “চলো! কোথায় নিয়ে যাবে?”
তূর্য হাসল। “তুই তো নদীর দেশের লোক। আর নদী দেখতে ভালো লাগবে তোর?”
হিয়া বাঁকা চোখে তাকিয়ে বললো, "খুব লাগবে।"
তূর্য একটা রিক্সা ডাকলো। রিক্সা ছুটলো চাঁদপুরের তিন নদীর মোহনায়। যেখানে পদ্মা, মেঘনা আর ডাকাতিয়া এসে মিশেছে বিনা নিমন্ত্রণে।
বিকেলের নরম রোদে নদীর জল চিকচিক করে উঠছে, যেন সূর্যের স্বর্ণালি আঁচল ধীরে ধীরে নীল জলের ওপর মেখে দিচ্ছে আলোর মায়া। দূর থেকে ভেসে আসছে ছোট ছোট ট্রলারের দুলুনি, নদীর বুকে যেন শৈশবের দোলনার মতো নৌকাগুলো ধীরে দুলছে, স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝের এক অলিখিত সুরে।
চারপাশে এক গভীর, নির্জন শান্তি। নদীর ওপারে বালুচর ধূসর আলোয় নিথর হয়ে আছে, মাঝে মাঝে কোনো জেলে নৌকা ভিড়ে, জীবনের পুরনো আখ্যান নিয়ে।
হিয়া থমকে দাঁড়িয়ে চোখ বড় করে দেখল সেই অপার জলরাশি। “এতো সুন্দর! আমি ভাবতেও পারিনি এত সুন্দর একটা জায়গা হবে!”
তূর্য পাশে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, “নদীগুলো এমনই… কখনও শান্ত, কখনও উদ্দাম… কিন্তু সর্বদা প্রবহমান। আলাদা আলাদা নদী আলাদা আলাদা জলের গল্প বলে।”
তূর্য ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে নদীর ধার থেকে একটু দূরের এক ছায়াঘেরা গাছের গোড়ায় গিয়ে বসলো। সেই গাছের নিচে ঘন ছায়া পড়েছে, বাতাসে তার পাতাগুলো নরম সুরে কাঁপছে। চারপাশে এক অপার্থিব নিস্তব্ধতা, যেন প্রকৃতি নিজেই গভীর এক নিস্তব্ধ সঙ্গীত গাইছে।
রোদ ঝলমল করছে দূরের নদীর জলে, আলো চিকচিক করে প্রতিফলিত হচ্ছে, যেন কেউ সোনার ধুলা ছিটিয়ে দিয়েছে পানির বুক জুড়ে। দূরের ট্রলারগুলো ছোট ছোট বিন্দুর মতো ভেসে আছে, বাতাসে তাদের চলার শব্দ মৃদু মৃদু ভেসে আসছে। আকাশটা বিশাল নীল, তাতে তুলোর মতো সাদা মেঘ ভাসছে ধীরে ধীরে, কখনো মেঘের ফাঁক দিয়ে এক টুকরো সূর্য আলতো করে ঝুঁকে পড়ছে নদীর উপর।
কিছু পাখি উড়ে যাচ্ছে নদীর দিক থেকে, তাদের ডানায় লেগে থাকা হাওয়া যেন বয়ে আনছে কোনো অচেনা দেশের গল্প। গাছের ডালে বসে থাকা একটি পাখি ডাকছে একটানা, সেই ডাকের মধ্যে একাকীত্ব আর আনন্দের মিশ্র সুর। হঠাৎ হিয়া তূর্যের পাশে এসে বসে পড়ল। দুইজন চুপচাপ, কথা নেই, শুধু প্রকৃতির সেই অজানা গান শোনা।
হিয়া চোখ বন্ধ করে বলল, “তূর্য ভাই, এখানে বসে থাকলে মনে হয়… সব দুঃখ, কষ্ট, জড়তা সব যেন মিলিয়ে যায়। শুধু একটা শান্তি, একটা গভীর প্রশান্তি ছড়িয়ে থাকে চারপাশে।”
তূর্য মৃদু হাসল। "এইসব কিছু ভুলে থাকতেই মানুষ এত ঘুরে বেড়ায়। পাহাড়ে-পাহাড়ে, সমুদ্র-সমুদ্রে, নদী থেকে নদীতে।"
একটা ছোট নৌকা ধীরে ধীরে পাড় ঘেঁষে এগিয়ে গেল। তার শরীর ছুঁয়ে তৈরি হলো ছোট ছোট ঢেউ, যা তীরে এসে মৃদু আলিঙ্গন করল। বাতাসে ভেসে এলো কোনো অজানা ফুলের গন্ধ, মাটির সোঁদা ঘ্রাণের সাথে মিশে একধরনের মায়াবী পরিবেশ তৈরি করল।
আকাশে দূরের সিঁদুরে মেঘগুলোর দিকে তাকিয়ে হিয়া ধীরে বলল, কণ্ঠে এক স্বপ্নালু সুর, "বৃষ্টিভেজা নদী হয়তো অন্যরকম রূপ দেখায়, তাই না?"
তূর্য হালকা হাসল, চোখে দূরদৃষ্টি নিয়ে।
“বৃষ্টিভেজা নদী, সমুদ্র… এরা সবাই অন্য এক জগতের। এক কথায় বলা যায় ভয়ংকর সুন্দর। "
হিয়া চোখ মেলে তাকাল তার দিকে। কণ্ঠে নিঃসঙ্গ স্বীকারোক্তি, যেন এক শূন্যতা, “আমি কখনো সমুদ্র দেখিনি…”
তূর্য মৃদু হাসি নিয়ে বলল, “তাহলে তো তোর চোখ এখনো অপার সৌন্দর্যের ছোঁয়া পায়নি, হিয়া। তোর হৃদয় এক বিশাল বিস্তারের ঋণী রয়ে গেল।”
তারপর… নেমে এলো নিঃশব্দ এক বিরতি। কথারা থেমে গিয়ে যেন বাতাসে ছড়িয়ে গেল এক অনুচ্চারিত স্বপ্নের মতো। মেঘেরা ধীরে আরও লাল হয়ে উঠল, আর সেই আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে দু’জনের মাঝের দূরত্বটুকু জায়গা করে নিল অজানা, অমলিন এক আকাঙ্ক্ষা।
হিয়া এবার একরাশ আবদার নিয়ে তূর্যের দিকে তাকিয়ে বলল, “তূর্য ভাই, আমাকে কিছু ছবি তুলে দেবে? জায়গাটা অসম্ভব সুন্দর… একেবারে স্বপ্নের মতো!”
তূর্য হেসে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। পকেট থেকে ফোন বের করে ক্যামেরা অন করল। হিয়াকে একবার নদীর পাড়ে, একবার আকাশের নিচে, একবার ছোট ট্রলারের পেছনে দাঁড় করিয়ে ছবি তুলতে লাগল। হিয়া চুপচাপ পোজ দিচ্ছিল, চোখে কৌতূহল আর আনন্দের দীপ্তি।
ছবি তোলার পর হিয়া তাড়াহুড়ো করে তূর্যের পাশে গিয়ে ফোনটা নিজের হাতে নিয়ে ছবিগুলো দেখতে লাগল। প্রথম ছবিটা দেখে থমকে গেল। দ্বিতীয়টায় এসে চমকে উঠল। তৃতীয়টায় চোখ কপালে তুলল।
“তুমি… তুমি তো অসাধারণ ছবি তুলেছো!” হিয়া অবাক কণ্ঠে বলে উঠল। “এটা কি তোমার ফোনের গুণ, নাকি অন্য কিছু?”
তূর্য মৃদু হাসল, ঠোঁটের কোণে এক চিলতে গর্বের রেখা। “তুই কখনও আমার ফেসবুক প্রোফাইল চেক করিসনি, তাই তো?”
হিয়া অবাক হয়ে মাথা নাড়াল। “না… কেন?”
তূর্য চোখ সরিয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে বলল, “না… কিছু না। সখের বসে মাঝেমধ্যে ছবি তুলি… ভালো লাগে।”
হিয়া হঠাৎ একচিলতে দুষ্টু হাসি নিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “ওহ্! তুমি তাহলে ক্যামেরাম্যান!”
তূর্য কপালে হাত দিয়ে মাথা নিচু করল। তারপর ধীরে ধীরে চোখ তুলল, চোখে একরাশ কৌতুকমিশ্রিত রাগ। “ওইটা ফটোগ্রাফার হয়, হিয়া। ক্যামেরাম্যান নয়।”
হিয়া তূর্যের ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে আরও এক ধাপ এগিয়ে বলল, “আরে! একই তো! ফটোগ্রাফারের বাংলা নামই তো ক্যামেরাম্যান!”
তূর্য এবার রাগে দাঁতে দাঁত চেপে ফোনটা হিয়ার হাত থেকে আলতো করে কেড়ে নিল। “আর না… আর তোর ছবি তুলছি না। যেগুলো আছে, ওগুলো পাঠিয়ে দিব।”
হিয়া কষ্ট করে নিজের হাসি চাপার চেষ্টা করল, কিন্তু তার চোখের দুষ্টু ঝিলিক লুকিয়ে রইল না। তূর্য ফোনটা পকেটে রেখে চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকল। নদীর হাওয়া তার চুল উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল দূরে কোথাও।
কয়েক মুহূর্ত পরে তূর্য আবার ফোনটা বের করল। এবার সে নিঃশব্দে প্রকৃতির কিছু ছবি জামাতে থাকলো। ছবি তোলার ফাঁকে ধপ করেই মাটিতে বসে পড়ল। চোখের সামনে নদী বয়ে চলছিল, অথচ মনে হচ্ছিল নদীর সঙ্গে সঙ্গে তার ভেতরের কোন স্রোতও নীরবে বয়ে যাচ্ছে।
পাশে বসা হিয়া একবার তূর্যের দিকে তাকাল, একবার নদীর দিকে। মনে হলো, এই মুহূর্ত, এই নীরবতা, এই হাসি, এই রাগ, এই নদী, এই বিকেল সব এক অমলিন কবিতা।
আকাশ তখন রঙ পাল্টাতে শুরু করেছে। নীলের গায়ে মিশছে লালচে রঙ, সূর্য ধীরে ধীরে পশ্চিমের দিকে ঢলে পড়ছে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সেই আলো এসে পড়ছে তূর্য আর হিয়ার মুখে শেষ বিকেলের আদুরে ছোঁয়া দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে।
তূর্য মাটিতে শুয়ে পড়ল, চোখ রেখে দিল ওপরে, সেই বিশাল আকাশের দিকে। "আমারা কতো রহস্য খুঁজতে ছুটে চলি প্রতিনিয়ত। কিন্তু আকাশটাকে দেখ, সব রহস্য জেনেও চুপচাপ রঙ ছড়াচ্ছে। যেন কিছুই জানে না। কিন্তু সব দেখে যায়, হিসেব রেখে যায় প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত।”
হিয়া তূর্যের দিকে তাকিয়ে হাসল। “তূর্য ভাই। আপনাকে দেখে কখনো মনে হয়নি এতো তীক্ষ্ণ কল্প খেয়ালী মানুষ আপনি।”
চারপাশে তখনো বাতাসের কানে বাজছে নদীর জলের হালকা ছলাৎছল, দূরের পাখিদের উড়ে যাওয়া… আর নিঃশব্দে এক অপরূপ, অপূর্ব বিকেলকে ছুঁয়ে থাকার অনুভূতি।
তূর্য শুয়ে থাকা অবস্থায় হাতে বাঁধা ঘড়ির দিকে তাকাল। সূর্যের আলো ঘড়ির কাঁচে প্রতিফলিত হয়ে এক সোনালি রেখা এঁকে দিল। সময় অনেক গড়িয়ে গেছে। তূর্য উঠে বসল, পাশে বসে থাকা হিয়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
নরম কণ্ঠে বলল তূর্য, “ফেরার সময় হয়ে গেছে, হিয়া।”
হিয়া কিছুক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে রইল, যেন এই অপার সৌন্দর্যকে হৃদয়ের ভেতর একেবারে আটকে রাখতে চাইছে। তারপর আস্তে করে মাথা নাড়ল। দুইজন ধীরে ধীরে গাছের ছায়া থেকে বেরিয়ে পড়ল। নৌকার দোল, নদীর কোলাহল, পাখিদের ডানা ঝাপটানোর শব্দ পেছনে ফেলে তারা হেঁটে চলল নদীর ধার থেকে সরে গিয়ে শহরের দিকে।
রাস্তার ধুলো উড়িয়ে রিকশা এগিয়ে চলল বাসস্ট্যান্ডের দিকে। বিকেলের আলো তখন গোধূলির ছায়ায় মিশছে। চারপাশের দোকানগুলো একে একে জ্বালিয়ে ফেলছে তাদের টিমটিমে আলো, রাস্তার ধারে কিছু চায়ের দোকান থেকে ভেসে আসছে চায়ের গন্ধ আর মৃদু কথার আওয়াজ।
বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে টিকিট কাটল, তারপর ধীরে ধীরে বাসে উঠে আসন খুঁজে বসল। জানলার ধারে বসে হিয়া বাইরে তাকিয়ে রইল। শহরের আলো, অচেনা মুখ, দোকানের সাইনবোর্ড, মানুষের ব্যস্ততা, সব যেন এক নিস্তব্ধ চলন্ত দৃশ্যের মতো দ্রুত বদলে যেতে লাগল।
বাস তখন শহরের আলোকে অতিক্রম করে, অন্ধকার রাতের বুক চিরে ছুটে চলেছে ঢাকার দিকে। পেছনে ফেলে যাচ্ছে নদীর দেশ, শূন্যতার গল্প, স্মৃতির ভাঁজ, আর এক অমোঘ শান্তির দুপুর। হিয়ার ভাবনারা ওকে ছুঁয়ে নিচ্ছে। কি এক অসাধারণ যাত্রা। হিয়া নিজের সাথেই কথোপকথন চালায়, খুব গোপনে। –“যা খুঁজতে বেরিয়েছিলাম, সেটি পেয়েছি কিনা জানিনা। তবে যেটা পেয়েছি সেটা তো খোঁজার তো কথা ছিল না।”
গল্পের নাও যেন হাওয়ার আগেই ছুটছে। এ গল্পটা আসলে কার?
রাত প্রায় ন’টা। ঢাকার ব্যস্ত রাস্তাগুলোকে পেছনে ফেলে তূর্য, হিয়া আর মিম শেষে পৌঁছাল তাদের গন্তব্যে। তূর্য বাড়ির বাইরে থেকে আগে হিয়া আর মিমকে বাড়িতে যেতে বললো। হিয়ার চোখে ক্লান্তি আর তৃপ্তির মিশেল। মিম পাশে হাঁটছে চুপচাপ, মনে হয় সেও দিনের অভিজ্ঞতাগুলো ভেতরে ভেতরে গুছিয়ে নিচ্ছে।
বাড়ির গেট খুলে ভেতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে যেন এক অদৃশ্য বিস্ফোরণ ঘটল। ঘরের ভেতর বাতাসে টানটান উত্তেজনা, একরকম দৃশ্যমান অশান্তি। বসার ঘরে সারি সারি মুখ, আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের গম্ভীর দৃষ্টি, মিনু রহমানের উদ্বিগ্ন মুখ, পিউয়ের অস্বস্তিকর চাহনি, আর আলিফের চাপা কৌতূহল। সবাই যেন কোনো এক অজানা শঙ্কার গ্রাসে নীরবে অপেক্ষা করছিলেন, সেই প্রতীক্ষার অবশেষে উপস্থিতি হিয়া আর মিম।
হিয়া ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এল, হাতের মুঠোয় ধরা ফোনের দিকে তাকিয়ে নিলো একবার। ফোনটি বিকেল থেকেই প্রাণহীন, চার্জের অভাবে নিস্তব্ধ। অথচ সেই নিস্তব্ধ ফোন যেন এখন সবচেয়ে বড় সাক্ষী। পাশে মিম, তার মুখেও একরকম কুণ্ঠা। মিমের ফোনও নীরব, ইচ্ছে করেই বন্ধ করে রেখেছিলো, মিনু রহমানের ক্রমাগত আসা ফোনকলের ভয়ে। দুজনের চোখ একবারের জন্য ছুঁয়ে গেল; যেন বোঝাপড়ার এক নিরব সেতু গড়ে উঠল তাদের মধ্যে।
কিন্তু সেই সেতু ভেঙে চুরমার হলো ঘরের ভেতরের একঝাঁক প্রশ্ন, ধমক আর উদ্বিগ্ন স্বরে। ঘরে ঢুকতেই বয়ে গেলো ঝড়।
ঘণ্টাখানেক চলল সেই তুলকালাম। সবাই পালা করে তাদের বকলো, কেউ ভালোবাসার ভর্ৎসনা দিয়ে, কেউ রাগের ঝড় তুলে, কেউ আবার নীরব অভিমানে চোখ ফিরিয়ে। অথচ হিয়া আর মিম চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল, মাথা নিচু, চোখে অপরাধবোধের ছায়া। বাইরে তখনও মৃদু বাতাস বয়ে যাচ্ছিল, ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল ধমকের প্রতিধ্বনি, যেন দুই জগতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তারা।
আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ এক দীর্ঘ, ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। সেই নিঃশ্বাসে যেন বহু বছরের অভিজ্ঞতা, দায়িত্ববোধ আর না বলা কথার ভার মিশে ছিল। তিনি বরাবরই দায়িত্বশীল, কঠোর শাসকের মতো দৃঢ়, আবার নিঃশর্ত আশ্রয়ের মতো কোমল। হিয়া তারই ছায়ায়, তারই স্নেহের আড়ালেই বড় হয়েছে। তাই যখন শাসনের সময় আসে, তিনি তা এড়িয়ে যান না; আবার সেই শাসনের পর বুকের মধ্যে আগলে রাখারও কোনো কমতি রাখেন না।
মিনু রহমান তখন পাশে বসে আছেন, চোখেমুখে একরকম শান্তি ফিরে এসেছে, যদিও সেই শান্তি আসলে এক প্রকার ক্লান্তি। উত্তেজনার ঢেউ ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়েছে ঘরে। পিউ নিজের জায়গায় চুপচাপ বসে, আলিফ জানালার দিকে তাকিয়ে আছে, মিম আর হিয়া নীরবে দাঁড়িয়ে আছে তাদের সবার সামনে, যেন নিজের অপরাধের বিচার নিজেই চুপচাপ মেনে নিচ্ছে।
সবকিছু শেষে ঘরে নেমে এলো নিস্তব্ধতা। শাসনের ঝড়, অভিমান, উদ্বেগের হাওয়া মিলিয়ে গিয়ে ঘর যেন এক অবসন্ন নিঃশ্বাসে ভরে উঠল। ক্লান্ত শরীরে মিম আর হিয়া ধীরে ধীরে নিজেদের ঘরে ছুটে গেল। দুজনের চোখেমুখে তৃষিত আর শান্তির মিশ্র ছায়া, যেন এক দীর্ঘ যুদ্ধ শেষে অবশেষে শয্যা খুঁজে পাওয়া।
হিয়া ঘরে ঢুকেই দড়াম করে দরজা বন্ধ করে ফেলল। কাঁধের ব্যাগটা এক কোণে ছুঁড়ে রেখে হাঁপাতে হাঁপাতে বিছানায় বসে পড়ল। তারপর গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে মিমের দিকে তাকিয়ে সব খুলে বলতে শুরু করল। ছোট ছোট বাক্যে, আবেগে ভরা কণ্ঠে, কিছুটা গুছিয়ে, কিছুটা এলোমেলোভাবে সে বর্ণনা করে গেল দিনের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি অনিশ্চয়তা। মিম মন দিয়ে শুনছিল, মাঝে মাঝে চোখ বড় করে, কখনো শ্বাস রুদ্ধ করে।
পাশের বিছানায় বসে পিউ সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়েই রইলো দুজনের দিকে। তার চোখে একরকম প্রশ্ন, একরকম ক্ষীণ ক্ষোভ। সে বুঝতে পারছিল না পুরো ঘটনার জটিলতা। কিন্তু বুঝতে পেরেছে একটাই, যে তার জায়গা হয়নি তাদের গোপনীয়তায়। তাই সে চুপ করে মুখ ফুলিয়ে বসে রইল, চোখ সরিয়ে নিল ওদের দিক থেকে। অভিমানের মেঘ তার ছোট্ট হৃদয়ে গাঢ় হতে থাকল, একটুখানি না-নেওয়া দাওয়াতের ক্ষত নিয়ে।
রাতের শহর তখন জানালার ওপারে ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হচ্ছিল। চারপাশের আলো একে একে নিভে যাচ্ছিল। হিয়ার বুকের ভেতর সেই প্রশ্নগুলো যেন গুনগুন করে ডাকতে থাকল। জানালার কাঁচে মুখ ঠেকিয়ে সে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন রাতের কোনো অদৃশ্য সুতোর টানে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছে।
বাইরে তখন কৃষ্ণচূড়ার ছায়া হাওয়ায় দুলছিল, আর জোনাকির আলো টিমটিম করে। কিন্তু সেই আলোই যেন হঠাৎ এক রহস্যের গহ্বরকে স্পর্শ করল। একের পর এক প্রশ্ন ভেসে উঠল মনে। তবে প্রশ্ন গুলো এবার ভয়ংকর তীক্ষ্ণ। প্রকৃতি যে ডায়রি লিখতো এ কথা যদি আব্দুর রুশান মোহাম্মদ জানতেন তাহলে অস্বীকার কেন করলেন? আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ কেন বলেন নি যে তিনি আর তার বাবা প্রকৃতির সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন? কেনোই বা বলেননি তার বাবা সব মেনে নিয়েছিল? নাকি সব বলেছিলেন? আব্দুর রুশান মোহাম্মদই বিষয়কে আড়ালে ফেলতে চান নি তো? এই গল্পের খলনায়ক আসলে কে? কার জন্য নির্বাসিত হল কৃষ্ণচূড়া?
হিয়ার কাছে ছিল শুধু প্রশ্ন। একের পর এক ধাঁধার মতো জটিল, অসমাপ্ত প্রশ্ন। প্রতিটি প্রশ্ন যেন অন্য নতুন প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়, অথচ কোনো উত্তর তার জানা নেই। সে যেন এক রহস্যময় গোলকধাঁধার ভেতর হাঁটছে। প্রতি মোড়ে নতুন দ্বিধা, নতুন কৌতূহল, নতুন বিভ্রান্তি।
কিন্তু তূর্যর কাছে এই একই যাত্রা ভিন্ন। তার কাছে এটা নতুন দরজা, নতুন খোলা জানালা, যা তাকে এক অজানা পথে আহ্বান করছিল। সে প্রশ্নে আটকে থাকেনি, বরং সেই প্রশ্নগুলোর মধ্যে থেকে খুঁজে নিচ্ছিল পথের চিহ্ন। প্রতিটি ইঙ্গিত, প্রতিটি দৃষ্টান্ত তাকে একধরনের দিশা দিচ্ছিল। যেন সে নিজের ভেতরের কোনো অজানা সত্যের দিকে এগিয়ে চলেছে। তার মনে হচ্ছিল, প্রতিটি রহস্য তাকে কোথাও নিয়ে যাবে, কোনো অর্থবহ সমাপ্তির দিকে। সেই রহস্যগুলো তার কাছে ভয়ের নয়, বরং আহ্বানের মতো, এক অনিবার্য যাত্রার অনুরণন।
বাহিরে তখন রাতের নিস্তব্ধতার মধ্যে জোনাকির আলো আরও স্পষ্ট হচ্ছিল। কেউ প্রশ্নে, কেউ উত্তর খুঁজে, আবার কেউ পথের দিকে পা বাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল।
তবে এক প্রশ্নে দুজনই বাধা। এই গল্পের খলনায়ক আসলে কে? কার জন্য নির্বাসিত হল কৃষ্ণচূড়া?
___________
চলবে...... ♥️