নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ১২
লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ১২ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ১২
হিয়া চুপটি করে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। সময় একটু বয়ে যায়। এরপর আস্তে মাথা নাড়িয়ে নিষেধ করে। "না থাক। আমি কিছু একটা নিয়ে নেবো তূর্য ভাইয়ের জন্য। তুই এটা দে তূর্য ভাই খুশি হবেন।"
দুজনেই তখন থমকে থাকে এক মুহূর্তের জন্য। ঘরের ভেতর মৃদু হাওয়ায় গোলাপি ফিতা একটু একটু দুলছে। বাইরের রোদটা নরম সোনালি আভা ছড়িয়ে ঘরের মেঝেতে পড়ছে। হিয়ার মুখে এক নিঃশব্দ দ্বিধা, চিন্তা আর সংকোচ।
হিয়া বেশ পেঁচিয়ে যাচ্ছে এসব ভাবনায় যে একটা ছেলে মানুষের জন্য উপহার কি হওয়া উচিত?
মিম এবার নিজের হাতের গিফট প্যাকেট টেবিলের উপর রেখে বললো, "তূর্য ভাই ঘড়ি বেশ পছন্দ করে। তাই তার জন্য ঘড়ি অর্ডার করেছিলাম। তুইও এমন কিছু দিতে পারিস।"
হিয়া নিজের চুল গুলো নিজের আঙুলে পেচাতে পেচাতে শুধু ভাবতে থাকলো। মিম আবার বলে উঠলো, "হিয়া, তুই কিন্তু ছবি তোলার বাহানা দিতে পারিস। মেঝ দাদাকে বলবি এদিকে ওদিকে ঘুরবি আর ছবি তুলতে যাবি।" একটু থেমে মিম এবার একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলল, "চাইলে তুই শাড়িও পড়তে পারিস। একদম তোর প্রকৃতির রুপে।"
মিম কথাটা মজায় বললেও হিয়ার অনুভবে যেন কথাটা অন্যভাবে আঘাত করলো। হিয়া চুপ করে গেল কিছুক্ষণ। জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখলো, বৃষ্টি নামেনি কিন্তু আকাশ যেন একটু ধূসর। ঢাকার দুপুরে এমন শান্ত ধূসরতা বিরল। মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকলো, শাড়ি পড়বো নাকি? একটু সাজবো? না কি স্বাভাবিক থাকবো, যেন কিছুই জানি না?”
হিয়া চুপ করে গেল কিছুক্ষণ। জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখলো, বৃষ্টি নামেনি কিন্তু আকাশ যেন একটু ধূসর। ঢাকার দুপুরে এমন শান্ত ধূসরতা বিরল। মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকলো, শাড়ি পড়বো নাকি? একটু সাজবো? না কি স্বাভাবিক থাকবো, যেন কিছুই জানি না?”
হিয়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। আকাশটা যেন ওর মনের মতোই ধোঁয়াটে আর দ্বিধাগ্রস্ত। হঠাৎ একরকম নীরব সংকল্প নিয়ে ফিরে দাঁড়ালো আয়নার সামনে। নিজের দিকে তাকিয়ে বললো মনে মনে, “না, আজকে শাড়ি পড়লে মন্দ হয় না।”
ও ধীরে ধীরে নিজের চুলের ক্লিপ খুলে ফেললো। ঢাল হয়ে নামা লম্বা চুলগুলো যেন ওর পিঠ বেয়ে নদীর মতো গড়িয়ে পড়লো। দু’হাত দিয়ে নিজের মাথার ত্বকে আস্তে আস্তে মালিশ করতে লাগলো, মনোযোগ দিয়ে, যত্ন নিয়ে, যেন নিজের সত্তাটাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে।
ওর মনে হঠাৎ একটা ছবি ভেসে উঠলো, সবুজ ঘাসে দাঁড়িয়ে থাকা সেই চির জীবন্ত ছবি, যার গায়ে হালকা রঙের শাড়ি, চোখে ধরা পড়ে না এমন এক অভিমানী মায়া, চুলে করা একটি একচেটিয়া বেনুনি, প্রকৃতি। হিয়ার ঠোঁট আউড়ালো, “যদি আমি আজ শাড়ি পরি, চুলে বেনুনী করি তবে প্রকৃতির মত লাগবে কি?"
প্রশ্নটা নিজের ভেতরে ধাক্কা খায়। আরেকটা প্রশ্ন আসে সাথে সাথে, “তূর্য ভাই যদি দেখে… তাহলে কি কিছু বলবে?”
আবার ভাবে, "কি বলবে! আমার মন চাইলে আমি কি শাড়িও পড়তে পারবো না! তবে এখন প্রশ্ন হলো শাড়ি কোথায় পাবো?? আমার তো শাড়িই নেই।"
হিয়া এবার মিমের দিকে তাকিয়ে বলে, "শাড়ি নাহয় পড়লাম। তবে শাড়িটা কোথায় পাবো? আমি তো কোন শাড়িই আনি নি।"
মিম চুপচাপ উঠে, ওয়ারড্রোব খুলে একটা হালকা সাদা-সবুজ শাড়ি বের করলো। যেটার রঙ মাঠের কচি ঘাসের মতো, ছুঁলেই শান্তি লাগে। তার পাশে একটা সাদামাটা হাতব্যাগ রাখলো, আর চুপচাপ বিছানায় ছোট্ট একটা কাজল রেখে দিলো। হিয়া চোখে পরে কি না পরে, সেটা ওর অনুভবের উপর ছেড়ে দিলো।
হিয়া বোকার মতো তাকিয়ে থাকলো শুধু। "তুই শাড়িও এনেছিস?"
মিম হেসে বলে, "ভেবেছিলাম পড়ে ফটোশুট করবো তবে সময় হয়নি। তুই পড়ে দেখ তোকে সুন্দর মানাবে।"
ঠিক তখনই দরজার বাইরে খট করে আওয়াজ হলো। কিছুক্ষণ পরই রুমে ঢুকলো পিউ। পিউকে কেউ কিছুই শেয়ার করতে চায় না কারণ, ও কিছু জানলে পুরো বাসায় সেটা ছড়াতে সময় নেয় না।
পিউ দরজায় ঢুকেই চোখ সরু করে বললো, “এই তো দেখি সাজগোজ চলছে! কি ব্যাপার? হঠাৎ শাড়ি শাড়ি খেলাটা কী?”
মিম আর হিয়া দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ। মিম প্রথমে একটু হেসে বললো, “আরে না না, সাজগোজ না রে, হিয়া তো বলছিল ছবি তোলার মুডে আছে। তাই আমি বললাম, আমার শাড়িটা পড়ে একটু ঘরের ভেতরেই ফটোশুট করে নিস।”
পিউ এক চোখে তাকালো, “ঘরের ভেতরে শাড়ি পরে ছবি? আপি, তোরা শুধু কথা লুকাস আমার থেকে!”
মিম এবার একটু বিরক্তি চেপে হেসে বললো, “তুই না সবকিছুতেই ডিটেকটিভ হয়ে যাস পিউ! একটা মেয়ের মুড হইতে পারে না? আর কোন কথা লুকিয়েছি আমরা?”
পিউ আবার বললো, “তাই বুঝি? তোরা দুজনে জানতি ডায়রি টা প্রকৃতির ছিল তাও বলিস নি। আমি কি ভুলে গেছি!"
মিম আর কিছু বলতে পারছিল না। ও বুঝলো, কথা আর এড়ানো যাবে না। তাই একরকম হাল ছেড়ে দিয়ে বললো, “ঠিক আছে, তোর যদি এত কৌতূহল, তাহলে শোন, রেডি হ। শাড়ি পরে তুই, আমি আর আলিফ তিনজনেই একটু ঘুরতে যাবো। একটা ছোট ট্যুরের মতো, খুব বড় কিছু না।”
হিয়া তৎক্ষণাৎ বললো, “না না, আমি যাবো না। আমার মাথা ধরে আছে, একটু রেস্ট নেবো।”
পিউ কৌতূহল মেটার বদলে আরও জ্বলে উঠলো, “মানে! তুই তো শাড়ি চুড়ি নিয়ে বসে আছিস আবার তুই-ই যাবি না? কিছু তো একটা আছে!”
মিম সাথে সাথেই হিয়ার কানে কানে ফিসফিসিয়ে বললো, “তুই মিনু দাদির কাছ থেকে শাড়ি নিয়ে আয়। ওনার কালেকশন দেখলেই প্রেমে পড়বি। আমি এখানে পিউকে সামলাই।”
তারপর পিউর দিকে ফিরে হেসে বললো, “আসলে হিয়া একটু কান্নাকাটি করছিল তুই আসার আগে। মনটা খারাপ ছিল। তাই ভাবলাম সাজলে মুড ভালো হবে। আর তোকে বলছি, এইসব না বুঝে কথা বলা একদম বাদ দে।”
কিন্তু মিম জানে, পিউর মতো মানুষকে শুধু কথায় থামানো যায় না। তাই ও নিজের ফোন থেকে আলিফকে মেসেজ করলো। যেহেতু হিয়া মিমের কাছে কম বেশি সব ঘটনাই শেয়ার করে তাই তূর্য আর হিয়াকে নিয়ে আরিফের মনে বাড়ন্ত মিথ্যে সন্দেহ কে যেন সত্যি ঘটনা বানিয়ে সাহায্য চেয়ে নিল। মেসেজে শুধু লিখলো, "তোর হেল্প লাগবে। তূর্য হিয়া ঘুরতে যাবে। পিউকে জানানো যাবে না এঘরে এসে সাহায্য কর।"
তখনই হঠাৎ দরজায় টোকা পড়লো, আলিফ এসে দাঁড়িয়ে। মিমের মুখে আলো ফিরে এলো। চোখে চোখ পড়তেই ইশারা করলো। আলিফ বুঝে গেল মিম কী চাইছে। আলিফ হালকা গম্ভীর মুখে বললো, “পিউ, আজকে তুই আর আমি আর আপি লালবাগ কেল্লায় যাবো চল। অনেক দিন ঘোরা হয়নি। তুই তো বলছিলি কেল্লার পুরান গেটের সামনে ছবি তুলবি, আজ সেই সুযোগ। তোকে লিচুর শরবত খাওয়াবো, আর হিরণ মিনারের পাশ দিয়ে হাঁটবো। চল?”
পিউর চোখ চকচক করে উঠলো। “সত্যি? তুই নিয়ে যাবি?”
আলিফ একটু হেসে বললো, “একশো ভাগ। শুধু একটু রেডি হয়ে নে, চল এবার। বাকিরা সামলাক ওদের মতো করে।”
পিউ একটু দ্বিধায় থাকলেও শেষমেশ রাজি হয়ে গেল। মিম হিয়ার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলো, “দেখলি, প্ল্যান কীভাবে কাজ করে?”
পিউ খুশিতে দুলতে দুলতে বললো, “আহা, আজ একদম ছবির মতো সাজবো! আগে ফ্রেশ হয়ে নিই।” বলে ও সোজা ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল।
পিউর পা ফেলে যাওয়ার সাথে সাথেই মিম যেন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। ঝটপট লাগেজ থেকে একটা বক্স টেনে বের করলো। তারপর ড্রয়ারের ভেতর থেকে নিজের একটা সাদা রঙের ব্লাউজ বের করলো, হিয়ার গায়ে মেপে দেখে বললো, “এইটা পড়লেই পারফেক্ট হবে। সাইজে ঠিকই আছে।”
মিম হিয়ার হাতে ব্লাউজটা দিয়ে বললো, “এই নে, দেরি করিস না। মিনু দাদির ঘরে গিয়ে সাজ। ঐ রুমে বিশাল আয়না আছে, বাতিও ভালো। সবকিছু ঠিকঠাক করে সাজিস। আমি পিউকে নিয়ে বেরিয়ে যাবো, ১০ মিনিটের মধ্যে।”
হিয়া একটু অবাক হয়ে বললো, “তোর মাথায় দেখি পরোতে পরোতে বুদ্ধি!”
মিম চোখ টিপে বললো, “সবচেয়ে সুন্দর মানুষগুলো চিংড়ি মাছের মত হয়। খেতে মজা কিন্তু মাথা ভর্তি গোবর। ঠিক তোর মতো, দেখতে সুন্দর কিন্তু বুদ্ধি নেই।
এখন যা, ব্লাউজটার সাথে দাদির শাড়িগুলো মিলিয়ে নিস, যেটা বেশি মানাবে ওটাই পড়বি। আর হ্যাঁ, ফোনটা সাথে রাখিস, আমারা বেরোলে যেন আমি মেসেজে করতে পারি।”
হিয়া হাসলো। সেই চেনা নরম হাসি, চোখে একটু কৃতজ্ঞতা, মুখে একটু শীতল স্বস্তি। যেন মনের ধোঁয়াটে আকাশে হঠাৎ সূর্যের রেখা পড়েছে।
ও চুপচাপ হাতে শাড়ি, ব্লাউজ, ব্যাগ আর কাজল নিয়ে মিনু দাদির ঘরের দিকে রওনা দিলো।
আর মিম, ওয়াশরুমের দরজার দিকে তাকিয়ে বললো, “পিউ, জলদি কর, সময় কিন্তু কম!”
হিয়া ধীরে ধীরে মিনু রহমানের ঘরের দরজায় গিয়ে হালকা করে টোকা দিলো। ভিতর থেকে ভেসে এলো এক আরামদায়ক কণ্ঠ, “কে রে?”
হেসে জবাব দিলো সে। “আমি হিয়া, দাদি।”
মিনু রহমান মায়া জড়ানো গলায় বললেন, “আরে আয় আয়। দরজা তো খোলাই আছে।”
হিয়া ভেতরে ঢুকতেই দেখে, মিনু রহমান খাটে হেলান দিয়ে বসে আছেন। চোখে পাতলা চশমা, হাতে একটা পুরোনো বই। পাশেই একটা ছোট্ট টেবিলে এক কাপ আধখাওয়া লেবু চা রাখা।
হিয়াকে দেখে মিনু রহমান হাসলেন, "এই ভরদুপুরে তুই এখানে।"
হিয়া একটু লজ্জা পেয়ে মাথা চুলকে বললো, “আসলে দাদি, আমরা একটু ছবি তুলতে আর ঘুরতে যাবো। সাজতে হবে তো... আপনার কাছে শুনেছি অনেক সুন্দর শাড়ি আছে। একটা দিতে পারেন? আমি পড়ে আবার ঠিকঠাক ভাঁজ করে দিয়ে যাবো।”
মিনু রহমান একটু চোখ সরু করে তাকিয়ে হাসলেন। তারপর আঙুল দিয়ে পাশের কাঠের আলমারির দিকে দেখিয়ে বললেন, “ওটাই খোল। বাঁ দিকের তলা থেকে দ্বিতীয় খোপে কিছু রঙিন শাড়ি আছে, তোর যা মনে ধরবে, নিয়ে নে। আর হ্যাঁ, খোপ ভাঁজ করে আবার যেমন ছিল তেমন করে রাখবি, বুঝলি?”
হিয়া মাথা নেড়ে বললো, “একদম ঠিকঠাক রাখবো দাদি, কথা দিচ্ছি!”
মিনু রহমান চোখ নামিয়ে আবার বইতে মন দিলেন, মুখে এক চিলতে হাসি।
হিয়া ধীরে ধীরে আলমারির কাছে গিয়ে দরজাটা খুললো। হালকা স্যান্ডেলউড গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো ঘরে। ভেতরে ঝকঝকে ভাঁজ করে রাখা শাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে ওর চোখ একেবারে জ্বলজ্বল করে উঠলো। যেন রঙ আর স্মৃতির এক মিশ্র আল্পনা!
হিয়া চুপচাপ শাড়ি গুলোকে ছুঁয়ে দেখতে লাগলো। সবগুলো শাড়িই যেন তার কাছে আকর্ষনীয় লাগছে। হিয়ার মনে হচ্ছে শাড়ি বাছাই করা হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিনতম কাজ। তাও বেশ চেষ্টার পর সে এ কাজের সফলতা পেয়ে গেল। হিয়ার চোখে আটকে গেল হালকা নীলাভ শাড়িটা।
তাও বেশ চেষ্টার পর সে এ কাজের সফলতা পেয়ে গেল। হিয়ার চোখে আটকে গেল হালকা নীলাভ শাড়িটা। হিয়া শাড়িটায় নিজেকে মুড়িয়ে একবার আয়নায় চোখে চোখ মেলালো মাত্র।
বরাবরই শাড়ি নিয়ে হিয়ার বেশ বাহানা আছে।
শাড়ি তার সাথে একদম জমে না। তার এই বাহানার চাপে পড়ে কোনদিন শাড়ি পড়ে উঠা ও হয়নি। তবে তার মন এখন শাড়ির ভাঁজে আটকে গেছে। তার মাথায় এই শাড়ি অসাধ্য সাধনের জীদ চেপে বসেছে।
হিয়া শাড়িটা হাতে নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। হালকা নীলাভ রঙটা যেন ওর গায়ের রঙের সঙ্গে মিশে একদম অন্যরকম এক শান্ত সৌন্দর্য তৈরি করলো। শাড়ির পাড়ে সূক্ষ্ম রুপালি কাজ। চোখে না পড়ার মতো নয়, আবার অতিরিক্ত ঝলকও না।
হিয়া একবার শাড়িটা নিজে গায়ে জড়ানোর চেষ্টা করলো। পিন খোঁজার আগেই আঁচল মাটিতে পড়ে গেল। আবার গুছিয়ে পরার চেষ্টা। এইবার কোমরে ঠিক রাখতেই আঁচল গোল হয়ে ঘুরে এসে গলায় জড়িয়ে পড়লো।
নিজেই হেসে ফেললো হিয়া, "আহ! এ যে একেবারে জাদু কাণ্ড!"
তবে সে দমবার পাত্রী নয়। কয়েকবার পেঁচিয়ে, সেফটিপিন দিয়ে আঁচল ঠিকঠাক করে চেষ্টা চালিয়ে গেল। কিন্তু যতই চেষ্টা করে, মনে হলো শাড়িটা যেন বিদ্রোহ করছে। এক জায়গায় ঠিক হলে আরেক জায়গা এলোমেলো।
পেছন থেকে হঠাৎ গলার স্বর এলো, “তোর অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে শাড়িটা তোকে না, তুই শাড়িটারে সামলানোর চেষ্টা করছিস!”
হিয়া ঘুরে দেখে মিনু রহমান দাঁড়িয়ে, মুখে মিষ্টি হাসি। হিয়া একটু লজ্জা পেয়ে বললো, “দাদি! আমি পারছিই না... কী কষ্টের কাজ শাড়ি পরা! আপনি কীভাবে এত সুন্দর করে পরেন বলুন তো?”
মিনু রহমান হেসে এসে বললেন, “শাড়ি পরা একধরনের ধৈর্যের কাজ, আর নিজেকে ভালোবাসারও। আয়, আমি পরিয়ে দেই।”
এবার তিনি বসে পড়লেন খাটে, হিয়াকে সামনে ডাকলেন। “শাড়িটা একটু টান, এবার কোমরে জড়িয়ে নে… হ্যাঁ, এভাবে। ঠিক আছে, এখন ভাঁজ করবো, একটা একটা করে। এই নে পিন, আঁচলটা এখন একটু কাঁধে রাখ…”
হিয়ার মনে হচ্ছিল যেন সে সময়ের ভেতর দিয়ে হাঁটছে। দাদির আঙুলের ছোঁয়া, পরিপাটি করে গুঁজে দেয়া শাড়ির ভাঁজ। সবকিছুতেই যেন এক অদ্ভুত মমতা। যেন মা তার মেয়েকে সাজিয়ে দিচ্ছেন প্রথমবারের মতো। শেষে আয়নায় নিজেকে দেখে হিয়া একদম থেমে গেল।
নিজেকে চিনতেই পারছিল না। যেন শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে তার আত্মবিশ্বাস, নারীত্ব, আর এক অদ্ভুত পরিপক্কতা এসে জমে উঠেছে।
মিনু রহমান বললেন, “বাহ্, এখন একেবারে রূপকথার রাজকন্যার মতো লাগছে তোকে!”
হিয়া ধীরে হেসে বললো, “আপনি না থাকলে এটা কোনোদিন হতো না দাদি... ধন্যবাদ, খুব খুব ধন্যবাদ।”
হিয়া শাড়ি পরে আয়না থেকে একটুও চোখ সরাতে পারছিল না। তবু মনে হলো কিছু একটা বাকি রয়ে গেছে। এবার একটু হালকা সাজে হাত দিলো।
টুকটাক করে একটা ছোট্ট ঝুমকা পরলো কানে, পাতলা কাজল টেনে দিল চোখে, ঠোঁটে হালকা গোলাপি রঙের একটা লিপগ্লস। সাজ এতটাই সূক্ষ্ম যে কেউ না বললে বুঝতেই পারবে না, হিয়া সাজগোজ করেছে।
তারপর আয়নার সামনে বসেই চুলে হাত চালিয়ে ভাবতে লাগলো, বেনুনি করবে কি না। চুলগুলো কোমর পর্যন্ত লম্বা, ঘন আর সোজা। খসখসে শব্দ তুলে বারবার আঙুলে জড়িয়ে আসছে। অনেক ভেবেচিন্তে একটা বেনুনি করলো হিয়া। কিন্তু আয়নাতে তাকিয়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে চোখ কুঁচকে উঠলো। কিছু একটা যেন ঠিক মিললো না। নিজের মনেই বললো হিয়া, "বেনুনি... মানাচ্ছে না একদম!"
চট করে খুলে দিলো বেনুনি। চুল ছড়িয়ে পড়লো পিঠজুড়ে, কাঁধ বেয়ে কোমর ছুঁয়ে গেলো নরম ঢেউয়ের মতো। এবার আয়নায় তাকাতেই হিয়া অবাক হয়ে গেলো। এই যেন অন্য কেউ, শান্ত, গম্ভীর, কিন্তু ভেতরে আগুন লুকানো কোনো গল্পের নায়িকা। পেছন থেকে মিনু রহমান চুপচাপ তাকিয়ে ছিলেন। চুল ছড়িয়ে পড়তেই তিনি যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ধীরে হেসে বললেন,
“এভাবে থাক, চুলে কিছু করিস না। তোকে এখন দেখে মনেই হচ্ছে... তুই বয়সের চেয়ে একটু বেশি সুন্দর।”
হিয়া একটু লাজুক হেসে চোখ নামিয়ে ফেললো। ঘরের বাতাস যেন কিছুটা ভারী হয়ে উঠলো। মিনু রহমানের চোখে তখন একরাশ প্রশ্রয়, একটুকরো ভালোবাসা আর অনেকটা আশীর্বাদ।
হিয়া মিনু রহমানের চোখ থেকে চোখ সরিয়ে আবার আয়নার দিকে তাকালো। নিজের ভেতরে যেন এক অদ্ভুত ধাক্কা অনুভব করছিল। নতুন আবিষ্কারের ধাক্কা, নিজের নতুন রূপ দেখে নিজেকেই চিনে নিতে চাওয়ার ধাক্কা।
ঠিক সেই সময় মোবাইলটা বেজে উঠলো। মিমের মেসেজ, "আমরা রেডি, আমরা বের হচ্ছি। তুই কি রেডি? আমারা বের হওয়ার পাঁচ দশ মিনিট পর বের হইস।"
হিয়া দ্রুত ফোনটা হাতে নিলো। চোখে মুখে একটু তড়িঘড়ি ভাব ফুটে উঠলো।
সে মিমকে একটা ছোট্ট রিপ্লাই দিলো:
"ঠিক আছে।"
মিম আবার মেসেজ করলো, "বের হয়ার আগে একবার চেক দিস। আর সেলফি দিস একটা।"
হিয়া মুচকি হাসল। আয়নায় আরেকবার দেখলো নিজেকে। এবার সে তূর্যকে মেসেজ পাঠালো, "তূর্য ভাই শহর দেখাবেন কখন। আমি কিন্তু বাহানা সহ নিজেকে তৈরি করে বসিয়ে রেখেছি।"
ওপাশ থেকে তূর্য লিখেছে, “আসছি। ২০ মিনিট লাগবে। একটু পরে মেসেজ করলেই বেরিয়ে আসিস।”
হিয়ার ঠোঁটে নিজের অজান্তেই একটা হাসি ফুটে উঠলো। চোখে ভরে উঠলো আলাদা এক আলো। মিনু রহমান খুব যত্নে চোখ রাখলো হিয়ার হাসি মুখ আর জ্বলে ওঠা চোখে। তিনিও হাসলেন। বয়স তো কম হয়নি এই অষ্টাদশীর অনুভূতি বোঝার মতো। এর মাঝেই আবার হিয়ার ফোনে তূর্যের মেসেজ, "অপেক্ষা করছি। তাড়াতাড়ি বের হ।"
এবার তাড়া পড়লো। ব্যাগটা হাতে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল হিয়া, তখনই থেমে গেলো। একটু দ্বিধা, একটু অস্থিরতা। একবার পিছে ফিরে মিনু রহমানের দিকে তাকালো হিয়া। মিনু রহমান তখনও চুপচাপ হিয়ার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তিনি হেসে বললেন, "যা, সময় নষ্ট করিস না। বিকেল পড়ে এল বলে।"
হিয়ার চোখে লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে এল। চুপচাপ মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।
একটা শেষবারের মতো আয়নায় তাকিয়ে চুলটা একটু পেছনে সরালো, আঁচলটা গুছিয়ে নিলো।
তারপর ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
তূর্যর কাছে আজকের দিনটা বেশ জটিল। তবে সে এই জটিলতার সমাধান চাইছে না। একটা নিঃস্বার্থ ঘুমন্ত গল্পের ঘুম ভাঙাতে সে প্রতিনিয়ত ছুটে চলেছে। তার ঝুড়িতে পড়ে আছে কিছু অতীত চরিত্রের নাম আর বর্ননা। তাছাড়া এদের কারো হদিসও নেই। আজকের মিশন ছিল, পুরান ঢাকার পুরনো চার্চ। যেখানে এ্যথিনা নামের এক বান্ধবী ছিল প্রকৃতির। যার সাথে মাঝে মাঝেই দেখা করতে যেতো সে। ঐ চার্চের সাথে মেশানো অনাথ আশ্রমেই থাকতেন তিনি। তবে বর্তমানে তিনি এমন ভাবেই নিরুদ্দেশ যার খোঁজ করাটাও যেন বাড়াবাড়ি।
__________
চলবে......❤️