প্রাপ্তি (দ্বিতীয় অধ্যায়) — পর্ব ০৯

লেখক: বিনতে ফিরোজ · পর্ব ০৯ · ২৫ পর্বের মধ্যে ৯

মাহিবার আর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে আহমাদ নিশ্চিত একটু আগে মেয়েটা কাঁদছিলো। ঘুমের ভেতরেই নাকি? আহমাদ শঙ্কিত হলো। মাহিবার কি বেশি খারাপ লাগছে। হাতে ধাক্কা দিয়ে হালকা আওয়াজে ডাকলো আহমাদ। "মাহি!এই!"

মাহিবা উঠলো না। তার বুকের ওঠানামা বেশ ধীরগতিতে হচ্ছে। মাহিবার গালে হাত দিয়ে ডাকতে থাকলো আহমাদ। "মাহি? তোমার কি বেশি খারাপ লাগছে? এই! ওঠো না!"

মাহিবার নীরবতা আহমাদকে আরো ভয় পাইয়ে দিলো। তবে সে-ও পণ করেছে। ওকে উঠিয়েই ছাড়বে। ঘাড়ের নিচে হাত দিয়ে মাহিবাকে শোয়া থেকে ওঠালো। কিছুটা পিছিয়ে গেলো মাহিবা। সেই ক্ষণে আহমাদের নজরে পড়ল বিছানার চাদরে। র-ক্তে-র অস্তিত্ব টের পেতেই তার হৃদস্পন্দন হু হু করে বেড়ে গেলো। হঠাৎ পাওয়া ধাক্কার চমকে মাহিবা তার হাত থেকে পড়েই যাচ্ছিল। তাকে বুকে চেপে ধরলো আহমাদ। কম্পিত কণ্ঠ বলল,"মাহি!"

দিশেহারা বোধ করলো আহমাদ। কি করবে এখন সে? কোনরকমে মাহিবাকে শুইয়ে দিয়ে সালেহা বেগমের দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করলো। ইশিকা আজকাল বেশ দেরি করে ঘুমায়। সালেহা বেগমের ঘুমটা তখনও কাঁচা। প্রথম ধাক্কাতেই ঠিক পেলেন তিনি। কিন্তু বিরতিহীন ধাক্কার শব্দ তাকে শঙ্কিত করে তুলল। ইশিকাকে একবার দেখে দ্রুত দরজা খুললেন তিনি। আহমাদ চোখে মুখে ভয় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভয়টা সালেহা বেগমের কাছে চেনা লাগলো। আরো একদিন,সেই বৃষ্টির দিনে আহমাদ ভয় পেয়েছিল। এভাবেই কি?

"কি হয়েছে?"

"আসো!"

ঘটে যাওয়া ঘটনা বর্ণনা করার মতো প্রয়োজনীয় শব্দ আহমাদের ভান্ডারে নেই। মা-কে একরকম টেনে নিয়ে গেলো সে। বিছানার দিকে চোখ যেতেই সালেহা বেগম ভয় পেলেন। মেয়েটার মাত্র তিন মাস পার হলো। ছুটে যেয়ে মাহিবার গালে মুখে হাত রাখলেন তিনি।

"মাহি! এই মাহি! ও তো অজ্ঞান হয়ে গেছে।"শেষটুকু ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন সালেহা বেগম। আহমাদ বলল,"এখন কি করব?"

"এখন কি কোনো ডাক্তার পাওয়া যাবে?"

"শিহাবের কাছে ফোন দিয়ে শুনি।"

শিহাব আজকাল প্র্যাকটিস শুরু করেছে। আহমাদ সময়জ্ঞানকে মাথায় নিলো না। তার মাথায় এখন শুধু বিছানায় পরে থাকা এক পাংশু মুখের নারীর চিন্তা ঘুরছে।

"হ্যালো শিহাব!"

"বল আহমাদ। এতো রাতে! কোনো সমস্যা?"

"শিহাব এখন কি কোনো গাইনি পাওয়া যাবে? মাহির হঠাৎ ব্লিডিং শুরু হয়েছে।"

"গাইনি আছে। তুই এখনই ভাবিকে নিয়ে আয়।"

আহমাদ আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে। ভাগ্যিস শিহাবের ডিউটি আজ রাতে ছিলো!

সালেহা বেগম আফিয়াকে ডেকে বলে যান। আহমাদ আগে আগে হাঁটছে। তার কোলে মাহিবার জ্ঞানহীন দেহ।

আহমাদের চিন্তিত মুখ সালেহা বেগমের দৃষ্টিগোচর হয়নি। কিন্তু যে নিজেকে স্বান্তনা দিতে পারছে না সে আরেকজনকে কিভাবে স্বান্তনা দেবে? কেবিনের দিকে দৃষ্টি তাক করলেন তিনি। এতক্ষণ সময় লাগছে কেন?

ডাক্তার মহিলা বের হতেই আহমাদ এগিয়ে গেলো। তার চোখেমুখে প্রশ্নের পাহাড়। তবে মুখে উচ্চারণে সে অপারগ। মহিলা সম্ভবত অভিজ্ঞ ডাক্তার। তাকে ভেঙেচুরে প্রশ্ন করতে হলো না। মাঝরাতে রোগীর পরিবারের উৎকণ্ঠা বোঝার মত বুদ্ধি তার আছে।

"পেশেন্টের অবস্থা নরমাল। এমন ব্লিডিং আসলে ভয়ের কিছু না। একেকজনের প্রেগনেন্সিতে একেক ধরনের সমস্যা দেখা যায়। এটা তেমনই। বেবিও ঠিকঠাক আছে। তবে পেশেন্টের ব্লাড প্রেশার বেশ লো। সম্ভবত ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া হচ্ছে না। এদিকটা একটু খেয়াল রাখবেন। আর দুই একটা ওষুধ দিচ্ছি। সেগুলো খেলেই আশা করি সব নরমাল থাকবে।"

"ওকে বাসায় নিয়ে যেতে পারবো?"

"মাঝরাতে এই দৌড়াদৌড়ি ঝামেলা হতে পারে। তবে আপনারা চাইলে নিতে পারেন।"

ভদ্র মহিলা চলে গেলেন। আহমাদ প্রেসক্রিপশন হাতে দম ছাড়লো। বুকে যেনো সেটা দলা পাকিয়ে বসে ছিল। না পারছিলো নিঃশ্বাস নিতে না পারছিলো ছাড়তে। কেবিনের দরজায় দাঁড়িয়ে উকি দিলো সে। সালেহা বেগম হুড়মুড়িয়ে ঢুকে গেলেন। মাহিবার শিয়রে দাঁড়িয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। চোখ খুলে তাকালো মাহিবা।

"অনেক কষ্ট দিলাম মা।"

সালেহা বেগম এর উত্তর দিলেন না। কান্না মাখা গলায় বললেন,"খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম মাহি।"

মাহিবা দরজার দিক তাকালো। আহমাদ এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ বন্ধ করলো মাহিবা। তার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে।

"আপনি বোধহয় আপনার ভাবিকে অনেক ভালোবাসেন?"

আফতাবের প্রশ্নে ভাবুক হলো আফিয়া।

"যে মানুষটা চোখে আঙুল দিয়ে আমার লাভ ক্ষতি চিনিয়ে দিয়েছে, নিঃস্বার্থ ভাবে আমাকে ভালোবেসেছে তার বিপরীতে আসলে তাকে ভালো না বেসে থাকা যায় না।"

আজকাল প্রায়ই আফতাব আর আফিয়ার যোগাযোগ হয়। মুঠোর ভেতর ছোট্ট জিনিসটা আছে কেনো? সেই সুবাদেই মাহিবার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যাওয়ার কথাটা আফতাবকে জানালো আফিয়া।

"আন্টি কেমন আছেন?"

"ভালো। পরশু আমাদের ফ্লাইট।"

আফিয়া চুপ করে গেলো। তার নীরবতা টের পেয়ে আফতাব আর সাক্ষাতের প্রস্তাব রাখতে পারল না। নয়তো তার মনে এই ইচ্ছা উঁকি দিচ্ছিল একবার আফিয়ার সাথে দেখা করার। আফিয়া বলল,"সাবধানে যাবেন।"

"যাবো। আপনি নিজের যত্ন নেবেন প্লিজ।"

শেষটুকু যেনো সৌজন্য বার্তা নয়,রীতিমত অনুরোধ। আফিয়ার অন্তঃস্থলে যেয়ে অনুরোধটুকু আঘাত করলো। ছোট্ট করে সে বলল,"নেবো।"

কথারা শেষ হতেই কল কেঁটে গেলো। দুই প্রান্ত থেকে দুইজন অপেক্ষার প্রহর গুনতে শুরু করলো। বাধাহীন সাক্ষাতের এক অপেক্ষা।

মাহিবা এখন কিছুটা সুস্থ। আগের মত দুর্বলতা দেহে ভর করে না। ইশিকাকে কোলে নিয়েই বেশ হাঁটতে পারে। ইশিকাকে খাবার খাওয়াচ্ছিল মাহিবা। মুখে সুজি নিয়ে মাহিবার পেটের দিকে ইশারা করে ইশিকা বলল,"আম্মা বাবু।"

কথাটা বুঝতে মাহিবার সময় লাগলো। বলা ভালো এই কথাটা ইশিকার মুখ থেকে শুনে সে বিষয়টা সাথে সাথেই ধরতে পারেনি। বুঝে উঠতেই বলল,"কি বললি?"

মাহিবা বড় চোখের দিকে তাকিয়ে ইশিকা হেসে ফেলল। মাহিবা যখনই চোখ বড় করে তার ভীষণ মজা লাগে। হেসে বলল,"বাবু।"

নিচের দিকে দুটো দাঁত উঠেছে। উপরে দুটো। খালি মুখে এই চারটা দাঁত যেনো রাজত্ব করছে। ফোঁকলা দাঁতের হাসিটা কি সুন্দর লাগে মাহিবার কাছে! কিন্তু ইশিকার খোঁচা খেয়ে মুগ্ধতা ভাঙতে বাধ্য হয়। মেয়েটা পেটে খোঁচাচ্ছে।

"কে বলেছে এখানে বাবু?"

"আব্বা।"

আবার হাসি। এতক্ষণে মাহিবা রহস্য ভেদ করলো। সে ঘুমালে প্রায় সময়ই আহমাদ ইশিকার সাথে গল্প করে। তাদের গল্প দেখলে মনে হবে তারা পুতিন অথবা বাইডেনের সহকারী। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইশিকার ফোঁকলা দাঁতের অবদান কি গুরুতর এটা সবাই বুঝবে কিভাবে!

"এসব শিখছো তুমি তাই না! বিশাল এক ওস্তাদ পেয়েছে। এহ! আব্বা!"

মুখ ভেংচি দিলো মাহিবা। আব্বাকে নিয়ে এমন টিটকারী ইশিকার পছন্দ হলো না। ঠোঁট ফুলিয়ে,ভুরু কুঁচকে সে বলল,"আম্মা! আব্বা বালো!"

"ভালো তো হবেই! হবে না! মেয়ে মানুষ তার ফোন ধরে,এখন তিনি বাড়িতে খাওয়ার কেনো একটা ফোন দেয়ারই সময় পান না। কি বিশাল ব্যবসায়ী হয়েছেন আপনার আব্বা! তিনি ভালো হবে না তো কে হবে!"

কিছুটা উচ্চস্বরে বলল মাহিবা। ইশিকা এবার কেঁদে ফেলল। সেই কান্না শুনে সালেহা বেগম ছুটে এলেন। মাহিবাকে রাগে ফোঁসফোঁস করতে দেখে ভাবলেন ইশিকা বোধহয় তাকে বিরক্ত করে রাগিয়ে দিয়েছে। কোনো কথা না বলে বাচ্চাটাকে নিয়ে গেলেন। হাতের বাটি শব্দ করে রাখলো মাহিবা। বাচ্চাদের মত কন্ঠ করে,মুখ ভেংচি দিয়ে বলল,"আব্বা বালো!"

ঘরের বাইরেই পুতুল নিয়ে খেলা করছিল আয়িশা। সবই শুনেছে সে। গম্ভীর কণ্ঠে মেয়েটা বলল,"শান্তি! শান্তি!"

আহমাদ ল্যাপটপ নিয়ে বসেছে। একটু পরপর কফিতে চুমুক দিচ্ছে। আরেকবার চুমুক দিতেই চোখ ঘুরিয়ে ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে কফির কাপে আনতে হলো। কফি শেষ। এই নিয়ে তিন কাপ হলো। আর চাওয়া যাবে না। নয়তো মাহিবা এবার তাকেই কফি মেকারে গুলে দেবে। স্ক্রিনে আবার মন দিতেই আয়িশা ঘরে এলো। তার কোলে ইশিকা। গম্ভীর কণ্ঠে সে বলল,"দাদাভাই! ইশিকার নাক দিয়ে মেয়োনিজ পড়ছে।"

"কিহ!"

"ইশিকার নাক দিয়ে মেয়োনিজ পড়ছে।"

"এগুলো কোন ধরনের কথাবার্তা!"

"সত্য সবসময় তিতা হয় না। মিষ্টিও হতে পারে। তেমনই একটা মিষ্টি সত্য হচ্ছে ইশিকা আজকে ভাবিমণির সাথে ঝগড়া করেছে। এবং ঝগড়ার কারণ ছিলে তুমি।"

আহমাদ বিস্মিত,চমকিত।

"ইশিকা মাহিবার সাথে আমাকে নিয়ে ঝগড়া করেছে!"

"হ্যাঁ। ও বলেছে "আব্বা বালো"। তাই ভাবিমণি ওকে বকা দিয়েছে। বকা দিয়ে কি বলেছে এটা বলা যাবে না। তাহলে ঘরে শান্তি থাকবে না। অনেক কষ্টে শান্তিকে আটকে রেখেছি। যাই হোক। ইশিকা বকা খেয়ে কান্নাকাটি করে নাক দিয়ে মেয়োনিজ বের করেছে। এখন তোমার নৈতিক দায়িত্ব সেই মেয়োনিজ পরিষ্কার করা। নাও শুরু কর। আমি যাই শান্তি ভালো আছে নাকি দেখে আসি।"

ইশিকাকে কোলে নিয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো আহমাদ। ইশিকা বলল,"আব্বা বালো।"

আহমাদ বুঝলো না প্রশংসা বাক্য শুনে তার হাসা উচিত নাকি মেয়োনিজ পরিষ্কার করার দুঃখে কান্নাকাটি করে উচিত।

চলমান।