প্রাপ্তি (দ্বিতীয় অধ্যায়) — পর্ব ০৩
লেখক: বিনতে ফিরোজ · পর্ব ০৩ · ২৫ পর্বের মধ্যে ৩
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলো মাহিবা। পাশে তাকিয়ে সালেহা বেগমকে কাঁদতে দেখে তার কান্না আরো বেড়ে যায়। এক পর্যায়ে শুরু হয় শ্বাসকষ্ট। বড় শ্বাস নেয়ার চেষ্টা এবং কান্না একই সাথে চলতে থাকে। সালেহা বেগম পিঠে হাত বুলিয়ে দেন।
"আহা মা কাঁদে না। থাক হয়েছে তো।"
মাহিবার কান্না থামে না। ওপাশের চেয়ারে বসে থাকা চিকিৎসক ভদ্র মহিলা সমানে হেসে যাচ্ছেন।
"আপনারা বাইরে যেয়ে বসুন। আপনার ছেলেকে তো ফোন দিয়েছেন। তিনি আসলে তার সাথে আমি কিছু কথা বলব।"
দুজনে বাইরে এসে বসলো। বেশ কিছু সময় পর আহমাদ এলো। তাকে দেখে মাহিবার মিইয়ে যাওয়া কান্না আবার উচ্চতার শিখরে পৌঁছানোর প্রতিযোগিতা শুরু করলো। প্রতযোগী সে একাই। আহমাদ বিচলিত হলো। এমনিতেই স্ত্রীর চিন্তায় সে অস্থির।
"কি হয়েছে মা? ও এমন কাঁদছে কেনো?"
"ডাক্তারের কাছ থেকে শুনে আয় যা।"
আহমাদের ভয় বাড়লো। মাহিবাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলো সে। চিকিৎসক মহিলা বললেন,
"দেখি! এবার আপনার রিয়্যাকশন দেখি।"
"মানে?"
আহমাদ বিভ্রান্ত।
"আপনার স্ত্রী এবং মায়ের এমন রিয়্যাকশন আমি আমার জীবনে প্রথম দেখলাম। পুত্রবধূ কান্না শুরু করেছে তাই দেখে তিনিও কাদছেন। তাকে দেখে আবার আপনার স্ত্রীর কান্না আরো বেড়ে যাচ্ছে।"
"ওর আসলে হয়েছে কি?"
"এখনও হয়নি। আশা করা যাচ্ছে আর পাঁচ ছয় মাসের মাঝে হয়ে যাবে। ফিটাসের বয়স পনেরো সপ্তাহ প্লাস।"
মহিলা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আহমাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কথাটা মাথায় ঢোকাতে আহমাদের ঠিক দুই মিনিট নয় সেকেন্ড লাগলো। চিকিৎসক মহিলা এর মাঝেই একবার ঘড়ি দেখে ফেলেছেন। তার কপালে ভাঁজ পড়তে পড়তেই মিলিয়ে গেলো। যাক সবারই একই কাহিনী। তিনি লেখালিখিতে মন দিলেন। আহমাদের চোখে পানি আসতে চাইছে কিন্তু সে আসতে দিতে নারাজ। সন্তর্পনে মাহিবার কাঁধে হাত রাখলো সে। একটু কাঁদতে পারলে ভালো লাগতো। ঘন ঘন পলক ঝাপটালো আহমাদ। এখানে কোনোভাবেই কান্নাকাটি করা যাবে না। মাহিবা তখনও ফুঁপিয়ে চলেছে। স্ত্রীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো আহমাদ। তার চোখের দৃষ্টিতে একরাশ মায়া কাজ করছে। বুকের ভেতর যে কি হচ্ছে সে কিভাবে কাউকে বোঝাবে!
হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফেরার পুরোটা পথ সবাই চুপ করে থাকলো। মৌনতা অবলম্বনের নীরব চুক্তি। সালেহা বেগম একটু পর পর চোখ মুছছেন। মাহিবা ঘুমিয়ে গেছে। আহমাদ স্ত্রীর হাত শক্ত করে ধরে বসে আছে। সালেহা বেগম একবার ছেলের দিকে তাকালেন। এমন সাইলেন্ট মুডে চলে গেলো কেনো? নিজের অতীতের কথা স্মরণে এলো। তার স্বামীও এমন সাইলেন্ট মুডে চলে গিয়েছিলেন। তাহলে তার ছেলে ব্যতিক্রম হবে কেনো? হতাশ নিশ্বাস ফেললেন তিনি।
সবার চেহারা দেখে আফিয়ার মনে খটকা লাগলো। আবহাওয়া কেমন ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না সে। না রোদ না বৃষ্টি। সব কুয়াশা। কিছুই বোঝা যায় না। মায়ের দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞাসা করলো। সালেহা বেগম কেঁদে দিলেন। তিনি কাঁদতেই মাহিবাও কান্না শুরু করলো। হকচকিয়ে গেলো আফিয়া। ঘর থেকে আয়িশা ছুটে এলো। আহমাদ নিজের ঘরে চলে গেলো।
"কি হয়েছে মা?"
মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিলেন সালেহা বেগম। সাথে সাথেই আবার ছেড়ে দিলেন।
"না তোকে না তোকে না। মাহিকে নেবো। আয় মা!"
মাহিবা শাশুড়ির কাছে গেলো। আফিয়া বিভ্রান্ত।
"হয়েছে কি?"
"হয়নি এখনও। হবে ইং শা আল্লহ। তোর বাপের নাতি নাতনী কিছু একটা।"
আফিয়ার চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। বোনের হাত ঝাঁকিয়ে আয়িশা বলল,
"আপু! বাবার নাতি নাতনী আবার কিভাবে হবে? বাবাই তো নেই!"
আয়িশার দিকে তাকালো আফিয়া। আয়িশার চেহারায় এক ঝাঁক প্রশ্ন।
"ভাবির বাবু হবে?"
আফিয়ার নিম্নকণ্ঠের প্রশ্নে অবাক হলো আয়িশা। মায়ের কাছে যেয়ে বলল,
"সত্যি? সত্যিই বাবু হবে তো? মজা করছো না তো?"
সালেহা বেগম হেসে ফেললেন।
•
থমথমে মুখে ঘরে ঢুকলো মাহিবা। আহমাদ কপালে হাত দিয়ে শুয়ে আছে। বিছানার একপাশে বসলো মাহিবা। তার উপস্থিতি বুঝতে পারল আহমাদ। চোখ থেকে হাত না সরিয়েই বলল,
"আসো দুই রাকাআত নামাজ পড়ি।"
বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিলো মাহিবা। দীর্ঘ সময় ধরে নামাজ পড়লো আহমাদ। মাহিবা মনে করতে পারল না কবে আহমাদকে এত সময় নিয়ে নামাজ পড়তে দেখেছে। যতোটা সময় নিয়ে নামাজ পড়লো তার চেয়েও বেশি সময় নিয়ে মুনাজাত করলো আহমাদ। তবে একটা বাক্যও উচ্চারণ করলো না। দুই হাতের আজলায় মুখ নিয়ে বসে রইলো দীর্ঘক্ষণ। মাহিবাও একইভাবে বসে ছিলো। তাল হারানোয় চটক ভাঙলো। একপাশে হেলে পড়েছে সে। বাঁধা পড়েছে আহমাদের উষ্ণ আলিঙ্গনে। কিছুক্ষণ পর মাহিবা বলল,
"আপনি তখন চুপ করে ছিলেন কেনো?"
"কখন?"
"যখন ডাক্তার ঐ কথা বলল।"
চুপ করে গেলো আহমাদ। ইতস্তত করে বলল,
"ইয়ে ফিটাস মানে ভুলে গিয়েছিলাম।"
মাহিবা শব্দ করে হেসে ফেলল। খুব চেষ্টা করলো শব্দ না করার জন্য। পারলো না।
•
আয়িশা থমথমে মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার ভাবিমণি এমন একটা কাজ করেছে সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না। শেষমেষ না পেরে মাহিবার কাছে গেলো সে।
"ভাবিমণি!"
মাহিবা শুয়ে বই পড়ছিল। হঠাৎ আওয়াজে চমকে ওঠায় বইটা ঠাস করে তার মুখে পড়ল। মাহিবার মনে হলো নাকের হাড়টা হয়তো ভেঙেই গেছে। কিন্তু হাত দিয়ে দেখলো না ঠিকই আছে।
"তুমি এই কাজটা কিভাবে করলে?"
"কি কাজ?"
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আয়িশা বলল,
"একটা নিষ্পাপ বাচ্চাকে খেয়ে ফেলতে তোমার মায়া লাগলো না?"
মাহিবা নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করলো। এমন গুরুগম্ভীর প্রশ্নের বিপরীতে হাসা যায় না।
চলমান।