প্রাপ্তি (দ্বিতীয় অধ্যায়) — পর্ব ০১
লেখক: বিনতে ফিরোজ · পর্ব ০১ · ২৫ পর্বের মধ্যে ১
"চন্দ্রমল্লিকায়" সকাল হয় একটু দেরিতে। আশপাশের বড় বড় গাছগুলোর কারণে সূর্যের সৈনিক রোদেরা ঠিক সুবিধে করে উঠতে পারে না। মানুষের চামড়া ঝলসে মেজাজ উত্তপ্ত করার আগেই গাছের পাতাদের সাথে রোদের এক চোট যু-দ্ধ হয়ে যায়। যার ফলে তারা সম্ভবত একটু শক্তি হারিয়ে ফেলে। কেননা "চন্দ্রমল্লিকার" পরিবেশ বরাবরই বেশ শান্ত এবং কোমল। জায়গাটা মাহিবার অসম্ভব পছন্দ। বিছানার সাথে লাগোয়া জানালা দিয়ে সে সময় পেলেই গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। অপলক চোখে মুগ্ধ হয়ে দেখে কচি পাতার আড়ালে পাখিদের কোলাহল। আহমাদ সেদিন ব্যঙ্গ করে বলেছিল,
"আমি মনে হচ্ছে জেনে শুনে সতীন জোগাড় করলাম। কি আশ্চর্য! সামনে জ্বলজ্যান্ত একটা বর থাকতে মানুষ কিভাবে সারাদিন গাছের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারে!"
মাহিবা কিছু বলেনি। বেশ মজা পেয়েছিলো সে। তবে মজাটুকু স্থায়ী হলো না। চৈত্রের ঝড়ো বাতাসের সব ঝাপটা এসে জানালায় লাগতে শুরু করে। মাঝে মাঝে থাই চুইয়ে পানি পড়ে বিছানায়। ফলস্বরূপ বিছানার জায়গা বদল করতে হলো। মাহিবার মন খারাপ দেখে আহমাদ সেদিন হেসেছিল। বলেছিলো,
"নাও এবার বেশি করে গাছ দেখো।"
"এই দিন দিন নয় আরো দিন আছে
এই দিন নিয়ে যাবে সেদিনেরও কাছে।"
বলেই মুখ ঘুরিয়ে চলে গিয়েছিল মাহিবা। নালিশ করেছিল সোজা সালেহা বেগমের কাছে। সালেহা বেগম ছেলেকে বকেছেন। কেনো সে মাহিবাকে খোঁচা দিয়ে কথা বলবে? কতো সাহস হয়েছে তার!
মাহিবার মন ভালো না। বলা উচিত শরীর ভালো না। শরীরের উত্তাপ মনে লেগে মনের মেজাজ গরম হয়ে গেছে। সকাল থেকেই জ্বর জ্বর ভাব হচ্ছিলো। এজন্যেই আজ কলেজে যায়নি মাহিবা। শেষমেষ সাড়ে এগারোটার দিকে শরীর কাঁপিয়ে জ্বর এলো। বিছানায় কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে পড়লো মাহিবা।
ইশিকা আজকাল সালেহা বেগমের কাছেই বেশি থাকে। তাকে কোনোমতে ঘুম পাড়িয়ে পুত্রবধূর কাছে এলেন সালেহা বেগম। কেমন এলোমেলো হয়ে শুয়ে আছে মাহিবা। তিনি ডাকলেন,
"এই মাহি! অসময়ে আবার ঘুমুচ্ছিস কেনো? রান্নাবান্না তো কিছুই হলো না।"
মাহিবার কোনো জবাব আসে না। মেয়েটার ঘুম তো এমন গাঢ় না। এগিয়ে যান তিনি।
"এই মাহি!"
হাতে হালকা ধাক্কা দিতেই শরীরের উত্তাপে তার চটক ভাঙ্গে। দ্রুত কপালে হাত রাখেন। অনুমান করেন পারদের ঘর একশো দুই অবশ্যই ছুঁয়েছে। একটা বাটিতে পানি এনে ছোটো রুমাল দিয়ে জলপট্টি দেন। মনে চিন্তারা হা-না দেয়। প্রায় দশ মিনিট পর রান্নাঘরে ছুটে যান। রাইস কুকারে চাল ধুয়ে তাতে পাঁচটা আলু অর্ধেক করে কেঁ-টে দেন। একটু ডাল রান্না করলেই দুপুরটা চলে যাবে। ইদানিং সময় নিয়ে কিছু রান্না করতে পারেন না সালেহা বেগম। শরীর সায় দেয় না। আবার ছুটে মাহিবার কাছে যান। কপালে হাত রাখেন। উহু! জ্বর কমার কোনো চিহ্ন নেই। জোর করে মাহিবাকে জাগিয়ে তোলেন।
"এই মাহি! ওঠ তো। একটু কিছু খা। একটা ওষুধ খাইয়ে দেই।"
আইগুই করে মাহিবা।
"ওষুধ খাবো না মা।"
"ওষুধ না খেলে জ্বর সারবে কিভাবে!"
ধমকে ওঠেন সালেহা বেগম। বালিশে মুখ গুঁজে মাহিবা হালকা স্বরে বলে,
"কালকেও এমন জ্বর এসেছিল। একাই সেরে গেছে। ওষুধ খাবো না।"
সালেহা বেগমের চিন্তা কমার বদলে বাড়ে। মেয়েটা কি রোগ বাঁধালো! উপায় না পেয়ে জলপট্টি দিতে থাকেন। এবার আর মাহিবার নিষেধ শোনেন না। এক ফাঁকে ইশিকাকে দেখে আসতে ভোলেন না।
ভাবিমণির জ্বর শুনে স্কুল থেকে এসেই মাহিবার শিয়রে যেয়ে বসেছে আয়িশা। থেকে থেকে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। সে কাউকে বলতে পারে না ভাবিমণির এমন মলিন মুখ দেখলে তার কতো খারাপ লাগে! এতো খারাপ তার দাদাভাইয়ের জন্যেও লাগে না। দাদাভাই শুনলে নিশ্চয়ই রাগ করবে! এজন্যই কাউকে বলে না আয়িশা। শুধু মোনাজাতে চুপি চুপি আল্লাহর কাছে বলে। তার খুব পছন্দের,খুব ভালোবাসার মানুষটির নাম ধরে দোয়া করে।
বেশ কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে তাকায় মাহিবা। তখন ঘড়ির কাঁটা একটার ঘর পেরিয়েছে। আস্তে ধীরে উঠে বসে। আয়িশা তখনও স্কুল ড্রেস খোলেনি।
"আয়িশু! আসো তো একটু আদর করি।"
পিঁপড়া যেমন অদৃশ্য আদেশে সবসময় সারি বেঁধে পিলপিল করে চলে ঠিক তেমন করেই মাহিবার কাছে গেলো আয়িশা।
"তোমার জ্বর কি কমেছে ভাবিমণি?"
"একটু কপালে হাত দিয়ে দেখো তো।"
আয়িশা কপালে হাত রাখলো। বলল,
"অল্প গরম। বেশি না।"
"তাহলে তো হলোই।"
হাসলো মাহিবা। আবার বলল,
"আমার আয়িশুর কি মন খারাপ?"
কেঁদে ফেললো আয়িশা। মাহিবা ভয় পেয়ে গেলো।
"কি হয়েছে সোনা? আল্লাহ! কাঁদে কেনো?"
আয়িশা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কান্না আটকানোর চেষ্টা করছে। পারছে না।
"ভাবিমণিকে বলবে না? কাঁদছো কেনো? এই দেখো। আমি কিন্তু ভয় পাচ্ছি!"
"তোমার কি হয়েছে ভাবিমণি?"
"কি হয়েছে? কই?"
মাথা নেড়ে আয়িশা বলল,
"কিছু হয়েছে। এই দেখো আজকে তোমার জ্বর এসেছে। কালকেও এসেছিল। তুমি কাউকে বলনি। কিন্তু আমি জানি।"
জোর করে হাসলো মাহিবা। কালকে যে জ্বর এসেছিল সেটা কাউকে বলেনি। অযথা সবাইকে চিন্তায় ফেলা। কিন্তু আজ জনে জনে সবাই জেনে যাচ্ছে।
"আরে পাগলি! ওয়েদার চেঞ্জ হচ্ছে না? এইজন্যে এমন জ্বর আসছে।"
"তুমি ডাক্তারের কাছে যাও। আমার ভালো লাগছে না।"
"আচ্ছা ঠিকাছে। সে দেখা যাবে। এবার চোখ মোছ।"
"ইং শা আল্লহ বলে বল যাবে।"
মাহিবা পড়লো বিপদে। ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা তার নেই। ইচ্ছা ছাড়া কোনো কিছুতে ইং শা আল্লহ বলা এক ধরণের মুনাফিকী। আয়িশা কি বুঝলো কে জানে। বলল,
"তুমি তো ঘেমে গেছো। গোসল করবে?"
"হুঁ।"
"আচ্ছা করো। আমি যাই।"
গোসল করে নামাজ পড়ে ছুটতে শুরু করলো মাহিবা। তাকে দেখে বোঝা মুশকিল একটু আগেই তার জ্বর ছিলো। তাও একশ দুই। রান্নাবান্নার ব্যবস্থা দেখে মাহিবা শাশুড়িকে বলল,
"কি তরকারি রান্না করবো মা?"
"যেটা ইচ্ছে সেটাই করো।"
সম্বোধন শুনে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন বোধ করলো মাহিবা। শাশুড়ি চটেছে। পাশে যেয়ে বসলো সে। সালেহা বেগমের এক হাত জড়িয়ে ধরে বলল,
"সত্যি কথা বলি মা? আমার এখন চিংড়ি মাছ খেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু ঘরে তো নেই।"
দুঃখী মুখ করে বললেও সালেহা বেগম স্বান্তনা দিলেন না। হাত ছাড়িয়ে ধমক দিয়ে বললেন,
"একদম ঢং করবি না আমার সাথে।"
"তাহলে কার সাথে করবো?"
"মাহি!"
"জি মা! শাশুড়ি মা।"
"আমি যে তোর শাশুড়ি নিজের মা আমাকে ভাবতে পারিস না সেটা তো বুঝিয়েই দিলি।"
"এমন করে বলছেন কেনো মা!"
এতক্ষণ মজা করলেও এবার মাহিবার কণ্ঠস্বর হতাশ মন হলো।
"কাল জ্বর বাঁধিয়ে পড়ে ছিলি। আমাকে একটু বললিও না। আজকে আমি বললাম একটা ওষুধ খেতে তাও খেলি না। ভালোই। আমি আবার কে? নিজের মা বললে তো ঠিকই খেয়ে নিতি।"
"ইয়ে মা! আম্মু বললেও খেতাম না। আসলে ওষুধে আমার অনেক এলার্জি।"
আমতা আমতা করে বলল মাহিবা। সালেহা বেগম চোখ রাঙিয়ে তাকালে তড়িঘড়ি বলল,
"এবার জ্বর আসলে আগে আপনাকে জানাবো তারপর বিছানায় যাবো ইং শা আল্লহ। প্রমিস। তাহলে মা রান্না করি। আচ্ছা?"
দাঁড়ালো না মাহিবা। চট করে চলে গেলো। মাহিবার কথায় সালেহা বেগম হাসলেও চিন্তা তাকে ছাড়লো না। মেয়েটার হঠাৎ কি হলো!
আহমাদ শুকনো খাবার খেতে পারে না। ভর্তা বেচারা খুব কষ্ট করে খায়। তার জন্যই বেশি করে ঝোল দিয়ে রান্না করতে হয়। রান্নাবান্না করে যেনো মাহিবা আরো সুস্থ হয়ে গেলো। আহমাদের ফেরার সময় হতেই একটা শাড়ি পড়ে তৈরি হয়ে গেলো। ঘরবাড়ি ঝাড় না দেয়ার ফলে বেশ ময়লা হয়ে গিয়েছিল। শাড়ি পড়ার পরই সেটা খেয়াল করলো। অগত্যা সেভাবেই ঝাড়ু দিতে শুরু করলো সে। শাড়ি সামলাতে বেশ বেগ পোহাতে হলো তাকে।
•
দরজা আয়িশা খুললে বেশ অবাক হলো আহমাদ। কাজটা সবসময় মাহিবা করে কি না! ইশারায় মাহিবার কথা শুনতেই আয়িশা বলল, "ভাবিমণি ঘুম।"
ভেতরে ঢুকলো আহমাদ। আজ আসতে বেশ দেরি হয়ে গেছে। রেস্টুরেন্টে একটা মিটিং করে সেখানেই দুপুরের খাবার খেয়ে তারপর বের হয়েছে। সালেহা বেগমের ঘরের দরজা ভেজিয়ে রাখা। তারমানে ইশিকা, সালেহা বেগম দুজনেই ঘুম। নিঃশব্দে নিজের ঘরে গেলো আহমাদ। মাহিবা উল্টো ঘুরে আছে। তাকে জাগালো না আহমাদ। গোসল করতে চলে গেলো। একটু ঘুরে মাহিবার সামনে গেলে দেখতে পেতো তার চোখের কোল বেয়ে একটা ছোট্ট অশ্রু নদী তৈরি হয়েছে।
চলমান।