প্রাপ্তি (দ্বিতীয় অধ্যায়) — পর্ব ০৭

লেখক: বিনতে ফিরোজ · পর্ব ০৭ · ২৫ পর্বের মধ্যে ৭

ইশিকাকে কোলে নিয়ে মন খারাপ করে বসে আছে মাহিবা। এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। ইশিকা ঘুমিয়ে ছিল। জেগে উঠে চারপাশে তাকালো। মাহিবাকে দেখেই তার কোলে থেকে উঠে গিয়ে বুকে পড়লো। গালে হাত রেখে ভাঙ্গা কণ্ঠে বলল,"আম্মা। আম্মা।"

ইশিকার দিকে তাকালো মাহিবা। হা করে ঘুমিয়ে ছিল মেয়েটা। ঠোঁট গড়িয়ে লালা পড়ে থুতনি ভিজে গেছে। ওড়না দিয়ে মুছে দিলো সেটা। ইশিকা যেনো খুব মজা পেলো। মাহিবার গালে জোরে থাবা দিয়ে বললো,"আম্মা! আম্মা!"

ডুকরে কেঁদে উঠলো মাহিবা। ইশিকা সম্ভবত ভয় পেলো। ভয় পেয়ে মাহিবার বুকে আরো একটু সিটিয়ে গেলো। আস্তে করে বলল,"আম্মা।"

ইশিকাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো মাহিবা। এই মেয়েটা তার নিজের নয়। আহমাদ তার নিজের বাবা নয়। বড় হলে তাকে আর নিজে কাছে রাখতে পারবে না মাহিবা। যে কারণে সে কোনো পুরুষের সামনে যায় না সেই একই কারণ তো ইশিকার জন্য আহমাদের ক্ষেত্রেও খাটে। আচ্ছা এই মেয়েটা তার নিজের হলে কি খুব ক্ষতি হতো? আগমনী দূরত্বের পূর্ব সংকেত তাকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। এই মেয়েটাকে ছাড়া সে কিভাবে থাকবে!

সালেহা বেগম মাহিবার কান্না শুনে ঘরে এলেন।

"কি রে! তুই কাঁদছিস কেনো? ও মা!"

মাহিবার কান্না বাড়লো। দুঃখের সময় স্নেহের স্পর্শগুলো যেনো চোখ থেকে আরো একটু অশ্রু ঝরানোর কাজ করে। সালেহা বেগম নরম কণ্ঠে বললেন,"আহমাদের কথা মনে করে খারাপ লাগছে? আরে ওর কথা ধরিস না। কি বলতে কি বলেছে। বাদ দে।"

আরো একটা দুঃখের কারণ যোগ হলো। মাহিবাকে সে কালকে বুঝিয়ে দিয়েছে সে এই বাড়ির কেউ নয়।

"আমি তো আপনাদের পরিবারের কেউ না মা। আজকে যদি আফিয়ার বড় বোন এই কথা বলত উনি কি এভাবে বলতে পারতেন? আসলে আমিই সেই জায়গাটা তৈরি করতে পারিনি।"

মাহিবার কণ্ঠে অভিমান প্রকাশ পেলো। সালেহা বেগম বললেন,"কি বলিস এসব! ও কি বলতে কি বলেছে আর তুই সেসব ধরে রাগ করে আছিস!"

"তার চেয়েও বড় কথা কাজটা ঠিক হয়নি মা। এভাবে ওদের দুজনকে গুনাহের ভেতর ঠেলে দেয়া হলো। পরিবার জানে এটা ওদের মাঝে আর কোনো ভয় রাখবে না। শয়তান তো এসব সুযোগই খোঁজে। শয়তানের উপর কি কোনো ভরসা আছে?"

নাক টানতে টানতে বলল মাহিবা। সালেহা বেগম চিন্তিত হয়ে বললেন,"এই কথাটা আমিও ভাবছিলাম। ছেলের মা বাবাকে কেমন যেন লাগলো। কিন্তু ছেলেটা ভালো। নাহলে কখনই না করে দিতাম। না-ও করতে পারছি না আবার হ্যাঁ-ও না। কি যে একটা দ্বিধার ভেতরে পড়েছি। এজন্য আহমাদকে কিছু বলতেও পারছি না।"

"এটা তো কোনো সমাধান হলো না মা। আপনারা বিচার বিবেচনা করুন। ওদের কথা বলার সুযোগ করে দিলে কি আফতাব ভাইয়ের বাবা মায়ের মানসিকতা পাল্টাবে? আমাদের মেয়েটাই বরং রিস্কে পড়ে গেলো। বিপদ কি বলে কয়ে আসে?"

একটু ভয় দেখানোর চেষ্টা করলো মাহিবা। সালেহা বেগম ভয় পেলেনও। বললেন,"এসব কেমন কথা? আল্লাহ! আমার তো ভয় লাগছে। আহমাদের চাচাও আবার সায় দিলো। কি যে একটা জ্বা-লা-র মধ্যে পড়েছি।"

সেই ক্ষণে আফিয়া এলো। ধীর কণ্ঠে সালেহা বেগমকে ডেকে বলল,"মা আমি একটু বাইরে যাচ্ছি।"

"এই বিকেলে আবার কোথায় যাচ্ছিস?"

"ইয়ে..উনি একটু ডেকেছিলেন। মানে একটু দেখা করতে বললেন আর কি।"

আমতা আমতা করে বলল আফিয়া। সালেহা বেগম সন্দেহী কণ্ঠে বললেন,"কে?আফতাব?"

"হুঁ। না করলেও কেমন দেখায়। আমি যাই কেমন?"

আফিয়া চলে গেলো। সালেহা বেগম মাহিবার দিকে তাকালেন। মাহিবা একটা ফিডার দিয়েছে ইশিকার মুখে। চুক চুক করে দুধ খাচ্ছে সে। সালেহা বেগমের মুখে চিন্তার ছাপ। ভাবলেন একবার আহমাদের সাথে কথা বলবেন।

"তুই কাঁদছিলি কেনো? আহমাদ ওসব বলেছে তাই?"

"না।"

মাথা নাড়লো মাহিবা।

"তাহলে?"

"ইশিকা বড় হয়ে গেলে ওকে আর আমার কাছে রাখতে পারবো না মা। ওকে ছাড়া আমি থাকবো কিভাবে?"

"কেনো? ওকে রাখতে পারবি না কেনো?"

"ও তো আমার নিজের মেয়ে না। যখন সাবালিকা হয়ে যাবে,পর্দার বিধান যখন ওর ওপর ফরজ হবে তখন তো ওকে আপনার ছেলের সাথে পর্দা করতে হবে। আমাদের সাথে থাকবে কিভাবে?"

"আহমাদ ওকে ছোট থেকে মানুষ করছে। নিজের মেয়ের মতো আদর করছে তাও পর্দা করতে হবে?"

সালেহা বেগমের মুখে বিস্ময় মাখা প্রশ্ন।

"করতে হবে মা। আল্লাহর বিধান তো বিধানই। ওকে পেলে পুষে বড় করলেও আপনার ছেলে ওর জন্য মাহরাম না।"

মাহিবার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে। এ কথার পর আর কি বলতে পারেন সালেহা বেগম। স্বান্তনা দেয়ার মত কোনো বাক্য তিনি খুঁজে পেলেন না। শুধু বলে গেলেন,"আল্লাহর ওপর ভরসা রাখ মা। তার পরিকল্পনার চেয়ে ভালো পরিকল্পনা আমরা করতে পারি না।"

ইশিকাকে জড়িয়ে ধরলো মাহিবা। ছোট্ট পুতুলটাকে বুকের ভেতর ঢুকিয়ে কেনো রাখা যায় না?

বিকেলের পরে আহমাদের কাছে ফোন দেয়ার কথা ভাবলো মাহিবা। কাল রাতে লোকটার সাথে আর কথা বলেনি সে। কিভাবে ওরকম একটা কথা বলতে পারলো? সে কি কারো খারাপ চায়? আহমাদ নিজেও কথা বলার চেষ্টা করেনি। দুপুরে মাঝে মাঝে খেতে বাসায় আসে আহমাদ। না আসলে অন্তত জানিয়ে দেয়। আজ খেতেও আসেনি,একটা ফোনও দেয়নি। দোনামনা করে অবশেষে ফোন দিয়েই দিলো সে। রিং বেজে বেজে কেঁটে গেলো। আবার ফোন দিলো মাহিবা। কেঁটে যাওয়ার আগ মুহূর্তে কেউ ফোন ধরলো। মাহিবা স্পষ্ট শুনলো একটা নারীকণ্ঠ বলছে,"হ্যালো! কে বলছেন?"

চলমান।