প্রাপ্তি (দ্বিতীয় অধ্যায়) — পর্ব ০৪
লেখক: বিনতে ফিরোজ · পর্ব ০৪ · ২৫ পর্বের মধ্যে ৪
আত্মীয় মহলে মাহিবার খবর পৌঁছে গেছে। পৌঁছানোর কাজটা সালেহা বেগম সানন্দে করেছেন। কাছে পিঠে যারা আছে তারা অনেকে এসে দেখাও করো গেছে। এরই মাঝে একদিন শেফালী বেগম এলেন হেনাকে নিয়ে।
মাহিবা তখন মেঝেতে বসে ঝিমুচ্ছে। সালেহা বেগম খুব যত্ন করে পুত্রবধূর মাথায় তেল দিয়ে দিচ্ছেন। মাথায় কেউ হাত বুলিয়ে দিলেই মাহিবার ঘুম পায়। কলিং বেলের আওয়াজে একবার চোখ খুলে তাকালো। সালেহা বেগম আফিয়াকে ডাকলেন,"আফি! দেখ তো কে।"
আবার চোখ বন্ধ করলো মাহিবা। তার প্রচুর ঘুম পাচ্ছে। কে এলো দেখতে উঠে গেলেন সালেহা বেগম। মাহিবা বিছানায় মাথা রাখলো। একটু ঘুমিয়ে নেয়া যাক।
কিছুক্ষণ পর মাথায় স্নেহের স্পর্শ পেলো মাহিবা। ঘুম ঘুম আবেশে,জড়ানো গলায় বলল,"মা! একটু ঘুমাই।"
স্পর্শের প্রগাঢ়তা বাড়লো। স্বপ্ন স্বপ্ন আবহে ঢুকে গেলো মাহিবা। সেই ক্ষণে কেউ যেনো চিৎকার করে উঠল।
"উঠে এসে একটু সালাম তো দিতে পারো। নাকি সেটাও এখন তোমার ঘরে এসে নিতে হবে?"
চোখ খুললো মাহিবা। তবে শোনা কথার কিছুই তার মাথায় ঢুকলো না। ধীরে ধীরে বুঝতে পারলো তার খালা শাশুড়ি এসেছে। বিছানায় বসে আছে হেনা। সালাম দিলো সে।
"কেমন আছেন খালামণি?"
"আছি। ভালোই আছি। তোমার শরীর কেমন?"
"আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।"
টুকটাক কথা বলে শেফালী বেগম চলে গেলেন। হেনার দিকে তাকিয়ে মাহিবা বলল,"আপনার কি মন খারাপ ভাবি?"
হেনা মলিন হাসলো।
"না তো। মন খারাপ হবে কেনো?"
মাথা নাড়ল মাহিবা।
"মন তো অনেক কারণেই খারাপ হতে পারে। কিন্তু আমাকে সেটা বলা যাবে নাকি তাই বলুন।"
হেনার মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলো। তার চোখে দুঃখের মেঘ। সেদিকে তাকিয়ে মাহিবার মনে হলো এক্ষুনি বোধহয় ওখান থেকে ঝরঝরিয়ে বৃষ্টি নামবে। তবে এমন কিছুই হলো না। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে হেনা বলল,"কার জন্য মন খারাপ করবো মাহিবা? নিজের কাজের ফল পাচ্ছি। মাথা পেতে নেয়া ছাড়া আর কি করতে পারি?"
হেনার হাত ধরলো মাহিবা।
"সিরিয়াস কিছু ভাবি? আমাকে বলা যায়?"
মাহিবার কোমল স্পর্শটুকু হেনার জন্য বজ্রপাতের মতো কাজ করলো। যেই বজ্রপাতের সাথে সাথে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। হেনার চোখ ছাপিয়ে অশ্রুরা প্রতিযোগিতা শুরু করলো। কে আগে নামতে পারে। ভিজিয়ে দিতে পারে ঐ দুঃখ মাখা চেহারা। হেনার হাত চেপে ধরলো মাহিবা। তাকে সময় দিলো ধাতস্থ হওয়ার জন্য। প্রায় পাঁচ মিনিট পর কান্নার গতি শূন্যে নেমে এলো। চোখ মুছলো হেনা। মাহিবার দিকে না তাকিয়েই বলল,"আসলে আমরা নিজেদের জন্য সবকিছু গ্যারান্টেড ধরে নিই। যেনো কেউ আমাদের সব দিতে বাধ্য। কিন্তু গুরুত্ব না বুঝলে তো দূরত্ব বাড়বেই। আল্লাহ সেই দূরত্বই আমার জন্য তৈরি করে দিয়েছেন।"
মাহিবার ভুরু কুঁচকে এলো।
"বুঝলাম না ভাবি।"
"বিয়ের এক মাসের মাথায় আমি কনসিভ করেছিলাম। তোমার ভাইয়া ছাড়া আর কেউ জানে না। তখন আমরা কেউই বাচ্চা চাইনি। নিজেরা গিয়ে অ্যাবর্শন করে এসেছি। এক বছর পর আবার কনসিভ করি। সেবারও আনপ্ল্যানড ছিল। আমি তখনও তৈরি ছিলাম না। ভেবেছিলাম বাচ্চা হলেই একটা বাউন্ডারিতে আটকে যাবো। লাইফটা আর আগে মত এনজয় করতে পারবো না। আজ হোক কাল হোক বাচ্চা তো হবেই। তাই সেবারও অ্যাবর্শন করিয়ে ফেললাম।"
হু হু করে কেঁদে দিল হেনা। কান্নার সাথেই বলল,"আমার শাশুড়ি এসবের কিছুই জানেন না। কোনোদিন আমাকে বাচ্চার বিষয়ে তিনি কথাও শোনাননি। কিন্তু মা না জানলে কি হবে? যে দেয়ার মালিক সে তো জানেই আমি কি করেছি। আজ পাঁচটা বছর ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমার কোল এখনও খালি মাহিবা।"
কথার সারমর্ম উদ্ধার করতে মাহিবাকে বেগ পেতে হলো না। শক্ত হয়ে বসে রইলো সে। খু-ন। পরপর দুটো খু-ন।
"আমার কি আর কোনোদিন বাচ্চা হবে না মাহিবা?"
মাহিবার হাত ঝাঁকি দিয়ে বলল হেনা। যেনো নিজের করা কাজের বিপরীতে অক্ষম আক্রোশে ফেঁটে পড়ছে। মাহিবা দেখলো অশ্রুতে অনুতাপ আর আকুলতার মাখামাখি। যে ইতোমধ্যেই অনুতাপের আগুনে জ্ব-লেপু-ড়ে অঙ্গার হয়েছে তাকে কেনো আর নতুন করে জ্বা-লা-নো? সেদিকে গেলো না মাহিবা। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। এক পর্যায়ে হেনা বলল,"কারো বাচ্চা হবে শুনলে ভালো লাগে। অন্তত আমার মত বোকামি তো কেউ করছে না। আল্লাহ হাতে ধরে আমাকে দুইবার সুযোগ দিয়েছেন। দুইবারই আমি মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছি। আবার তিনি আমাকে সুযোগ দেবেন! এতই যদি সোজা হতো!"
মাহিবা চুপচাপ হেনার কথা শুনল। খোলা জানালা দিয়ে এক ফালি আকাশ দেখা যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে হেনা বলল,"তোমার ভাইয়া মনে হয় খুব বিপদে পড়বে মাহিবা। ওর অফিসে খুব ঝামেলা চলছে। চাকরি নিয়ে টানাটানি। আল্লাহই জানে কি হয়! পাপের ফল হাতেনাতে পাচ্ছি।" আর কোনো কথা বলল না হেনা। ঘরে বিরাজ করছে এক অদ্ভুত নীরবতা। অনুতাপ মাখা বাতাসেরা ছুটোছুটি করছে এক দেয়াল থেকে আরেক দেয়াল পর্যন্ত।
"আল্লাহ কখনোই বলেননি মানুষ ভুল করবে না। তিনি বারবার বলেছেন মানুষ ভুল করবে। ভুলে যাবে। এটাই মানুষে প্রকৃতি। কিন্তু জ্ঞান বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে ভুলকে যদি সারাজীবনেও ভুল বলে জানতে না পারে তাহলে মানব জন্ম বৃথা। আপনি ভুল করেছেন। তার মাত্রা কি সেটা আপনাকে বলে দিতে হবে না। কিন্তু কি জানেন ভাবি? আল্লাহর কাছে শিরকের গুনাহের জন্য ক্ষমা চাইলেও আল্লাহ তাকে ফিরিয়ে দেন না। তার সত্ত্বায় কেউ অংশীদার বানালে তারপরও যদি নিজের ভুল বুঝে তাঁর কাছে ফিরে যায় তাহলে সেই মানুষটাকে তিনি মায়ার চাদরে জড়িয়ে নেন। আপনি আপনার ভুল বুঝতে পেরেছেন। এবার বাকি কাজটুকু করুন। আল্লাহর কাছে শুদ্ধ মনে ক্ষমা চান। জীবনে কখনও আর এই ভুল না করার জন্য বদ্ধ পরিকল্পনা গ্রহণ করুন। আল্লাহ রহমতকে নিজের জন্য অবশ্য কর্তব্য হিসেবে নিয়েছেন। তিনি কি আপনাকে ক্ষমা করবেন না?"
আবার কাঁদতে শুরু করলো হেনা।"আমার কি আর কখনই বাচ্চা হবে না মাহিবা?"
"হবে না কেনো? আল্লাহ চাইলে নিশ্চয়ই হবে। আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।"
"কিভাবে দোয়া করবো? তুমি বলে দাও।"
হেনার মনটা নরম। আপাদমস্তক তাকে ভালো মানুষ বলতে পারে মাহিবা। সেই মানুষটাকে সঠিক পথের সন্ধান দেয়ার মোক্ষম একটা সুযোগ পেয়ে গেলো সে। সেই সুযোগ হাতছাড়া করার মতো বোকা মাহিবা নয়।
"সব হারাম কাজ ছেড়ে দেবেন ভাবি। কোনো রকম হারামের ভেতরে যাবেন না। শুদ্ধ নিয়তে তওবা করবেন। আযানের পর,ফরয নামাজের পর, তাহাজ্জুদের সময় যখন যখন দোয়া কবুল হয় সবসময় দোয়া করবেন। আপনি,ভাইয়া দুজনে মিলে করবেন। আল্লাহর কাছে একজন নেক সন্তান ভিক্ষা চাইবেন। আল্লাহর তো কোনকিছুর কমতি নেই। ইং শা আল্লহ তিনি আপনাদের ফেরাবেন না।"
দুই হাতে চোখ মুছলো হেনা। তার গতি দেখে মনে হলো ডুবন্ত মানব শুধু একটা খড়কুটো নয় পুরো একটা ভেলা পেয়ে গেছে। চোখে একটা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ঝিলিক দিচ্ছে। হেনার মুখটা দেখে মাহিবার ভালো লাগলো।
চলে যাওয়ার আগে শেফালী বেগম আরেকবার এলেন। নরম কণ্ঠে বললেন,"নিজের প্রতি খেয়াল রাখবে। আল্লাহ যেনো তোমার বাচ্চাকে সুস্থভাবে দুনিয়ায় নিয়ে আসেন।"
আপ্লুত হলো মাহিবা। কি সুন্দর দোয়া! হেনা চাপা কণ্ঠে বলল,"আমার জন্য দোয়া করো মাহিবা। করবে তো?"
মাহিবা অবশ্যই দোয়া করবে। কেউ তার রবের দিকে দুই পা এগিয়ে যেতে চাইছে। সে কেনো দোয়া করবে না?
চলমান।