প্রাপ্তি (দ্বিতীয় অধ্যায়) — পর্ব ১৯

লেখক: বিনতে ফিরোজ · পর্ব ১৯ · ২৫ পর্বের মধ্যে ১৯

সকাল থেকে মাহিবা ছটফট করছে। ছটফট করার কারণ অবশ্য আছে। গত রাতে অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখেছে সে। খালি কোলের দিকে তাকিয়ে কাঁদছিলো মাহিবা। হঠাৎ আকাশ থেকে বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো। মাহিবার হাত ভর্তি হয়ে গেলো সেই পানিতে। সেই মুহূর্তে আহমাদ কোত্থেকে দৌঁড়ে এসে ইশিকাকে মাহিবার কোলে দিয়ে গেলো। মাহিবা স্বপ্নের ভেতরেই হাসতে থাকলো। তার ঘুম ভেঙেছে আহমাদের ধাক্কায়। চোখ খুলতেই আহমাদ জিজ্ঞেস করেছিল,"হাসছো কেনো?"

মাহিবা ভারী বিরক্ত হলো। এভাবে কেউ ঘুম থেকে ডেকে এমন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে? তবে মাহিবা বুঝতে পেরেছিল স্বপ্নের হাসি বাস্তবেও তার ঠোঁটে এসে জায়গা করে নিয়েছে। তারপর থেকেই তার অস্থির অস্থির লাগছে। কি যেনো হবে বলে মনে হচ্ছে। স্বপ্নটাও অমূলক মনে হচ্ছে না। কিন্তু এর ব্যাখ্যাই বা কি?

আহমাদ খাতা কলম নিয়ে বসেছে। তার কপালে স্পষ্ট তিনটা ভাঁজের চিহ্ন। মাহিবা বললো,"আপনার সমস্যা কি? এমন কপাল কুঁচকে বসে আছেন কেনো?"

"সমস্যা নতুন করে আবার কি হবে? আমার ফ্যাক্টরি তো পুড়ে ছাই হতে হতে বেঁচে গেছে। ভেতরে কত টাকার জিনিসের ক্ষতি হলো সেটাই হিসাব করছি।"

"এখন তো প্রোডাকশন বন্ধ না?"

"গতকাল পর্যন্ত ফ্যাক্টরি বন্ধ ছিল। আজকে সকালে খুলে দিয়েছে। জায়গাটা ঠিকঠাক করে লাগবে। কর্মীরা অবশ্য ছুটিতে আছে।"

"ও। আপনি কি আজকে বাইরে যাবেন?"

"জানিনা। কেনো?"

"আমার কেমন যেন লাগছে?"

"কেনো? কি হচ্ছে? পেটে সমস্যা? চলো ডাক্তারের কাছে যাই।"

"উফ! আগে শুনবেন তো!"

"বলো। অর্ধেক বলে তো আমাকে টেনশনে ফেলে দিলে।"

"রাতে একটা স্বপ্ন দেখেছি। তারপর থেকেই কেমন যেন লাগছে।"

আহমাদ উঠে দাঁড়িয়েছিল। এই কথা শুনে আবার বসে বললো,"স্বপ্ন তো স্বপ্নই। এ আর কি।"

"না। অনেক সময় স্বপ্নে অর্থ থাকে। স্বপ্ন মূলত তিন ধরনের হয়। একটা আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্থসম্পন্ন, একটা শয়তানের পক্ষ থেকে অমূলক বা আমাদের ভয় দেখানোর জন্য আর আরেকটা হলো আমাদের সারাদিনের চিন্তার কারণে। আমরা যেই বিষয় নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করি সেই বিষয়টা নিয়ে মস্তিষ্ক নাড়াচাড়া করে। এজন্য।"

"তা তুমি কি দেখেছো?"

ইতস্তত কণ্ঠে মুখ নিচু করে মাহিবা বললো,"দেখলাম আমি আমার খালি কোলের দিকে তাকিয়ে কাঁদছি। হঠাৎ আকাশ থেকে বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো। আমার হাত ভর্তি হয়ে গেলো সেই পানিতে। তখন আপনি কোত্থেকে দৌঁড়ে এসে ইশিকাকে আমার কোলে দিয়ে গেলেন। তারপর আমি ভেতরেই হাসতে থাকলাম। আপনি যে দেখলেন ঘুমের ভেতরে হাসছি ঐ জন্যেই হাসছিলাম।"

আহমাদ দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বললো,"তুমি ইশিকাকে নিয়ে ইদানিং খুব বেশি টেনশন করছো মাহি। এজন্যই এমন স্বপ্ন দেখেছ। এছাড়া আর কিছু না।"

মাহিবা কিছু বললো না। তার মন বলছে কিছু একটা হবে। সে বললো,"পুলিশ যে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলো কিছু পেয়েছে?"

"পেয়েছে। এক লোক কারো সুখ দেখতে পারে না। আমাকে দেখে তার মনে হয়েছে আমি খুব সুখে আছি। তাই মেশিনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।"

"কিহ!"

সমস্ত ঘটনা শুনে মাহিবা অবাক হলো। সম্ভবত আহমাদের থেকেও বেশি। কেননা এক মুহূর্তের জন্য সে তার ব্যাখ্যা না জানা স্বপ্নের কথা ভুলে গেলো।

কলেজের পাশেই আফিয়া টিউশনি করে। কলেজ থেকে বের হয়ে বেশ খানিকটা হেঁটে যেতে হয়। মোটামুটি দশ বারো মিনিট হাঁটলে ছাত্রীর বাড়ি এসে পৌঁছায় আফিয়া। আজ হাঁটার পথে ঝাপ করে বৃষ্টি নেমে পড়লো। আকাশ কালো ছিলো গতকাল থেকেই। তবে বৃষ্টি নামেনি। মাহিবা বারবার বললেও ছাতা নেয়নি আফিয়া। তার মনে হয়েছিল বৃষ্টি নামবে না। শুধু শুধু ছাতা নিয়ে ব্যাগ ভারী করার মানে হয় না। তবে বড় বড় ফোঁটার বৃষ্টি এক মুহূর্তেই তাকে অনেকখানি ভিজিয়ে দিলো। দ্রুত হেঁটে একটা দোকানের নিচে দাঁড়ালো আফিয়া। দোকানের সামনে টিনের কিছু অংশ বাড়িয়ে দেওয়া। ঢালু টিনের গা বেয়ে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ছে। রাস্তাঘাট মুহূর্তেই ফাঁকা হয়ে গেলো। মানুষজন দৌঁড়ে যাচ্ছে। খুঁজছে এক টুকরো আশ্রয়। আফিয়ার মনে হলো মানুষের জীবনটাই আসলে এমন। এদিক সেদিক যেখানেই যাক না কেনো মানুষ শুধু এক টুকরো আশ্রয় খোঁজে। যে হাজার রোদ, বৃষ্টি, ঝড় সামলে তাকে আগলে রাখবে। থেকে থেকে আসা দমকা হাওয়া বৃষ্টির ছাট এনে তার বোরখা ভিজিয়ে দিচ্ছে। আফিয়া তবুও পিছিয়ে গেলো না। চারদিকের গাছপালা গুলো যেনো খিলখিলিয়ে হাসতে শুরু করেছে। মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে হাসছে। টুপটাপ বৃষ্টির ফোঁটা পাতার উপরে পড়লে মনে হচ্ছে গাছগুলো যেনো পলক ফেলছে। ছোট্ট ছোট্ট করে। একপাশে কিছু ঝোপঝাড় দেখা যাচ্ছে। সেখানে কচুগাছের ছড়াছড়ি। তবে কচুর পাতার সাথে যেনো বৃষ্টির ফোঁটার প্রাচীনকাল থেকে শত্রুতা চলে আসছে। বৃষ্টির পানিকে তারা নিজেদের মাঝে রাখবে না। কিছু সময়ের জন্যও না।

বৃষ্টি দেখায় আফিয়া এতোই মগ্ন ছিলো যে তার পাশে একজন এসে দাঁড়িয়েছে সেটা সে খেয়ালই করেনি। একটু এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির পানি স্পর্শ করলো আফিয়া। গা যেনো শিউরে উঠলো। কি ঠান্ডা! তখনই কাছে কোথাও বিকট আওয়াজে বাজ পড়ল। চমকে উঠে এক পা পিছিয়ে এলো আফিয়া। কারো সাথে ধাক্কা খেয়ে পেছন ফিরলো সে। বিদ্যুৎ চমকের শব্দে এমনিতেই তার অন্তরাত্মা কাঁপছিল তারপর সামনের মানুষটাকে দেখে তার হৃদস্পন্দন আরো বৃদ্ধি পেলো। ভাগ্য যার সাথে সম্পর্ক রাখতে চায় না কেনো ঘুরেফিরে সেই মানুষটার সাথেই দেখা হচ্ছে তার?

আফতাব ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। রাস্তার ওপাশ থেকে দৌঁড়ে আসতে আসতেই পুরো শরীর ভিজে গেছে। একটুর জন্য মনে হয়েছিল বাজটা বোধহয় তার মাথায় পড়েছে। তার আগেই দোকানটা পেয়ে যাওয়ায় চট করে ঢুকে পড়েছে। তখনই কারো সাথে সবেগে ধাক্কা খেলো আফতাব। মানুষটা আর কেউ নয়। তার জীবনে হঠাৎ আসা দমকা হাওয়া আফিয়া।

আফিয়া এক দৃষ্টিতে আফতাবের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। আরেকবার বিদ্যুৎ চমকাতেই ঘন ঘন পলক ফেলে দোকান ত্যাগ করলো সে। মুষলধারে গড়িয়ে পড়া ঘন বৃষ্টির ফোঁটার মাঝে হারিয়ে গেলো অস্পর্শী মেয়েটা। আফতাবের মনে হলো আফিয়া তার অশ্রুর বৃষ্টি লুকোতে এই রূঢ় হাওয়া বইয়ে দেওয়া উগ্র বৃষ্টির মাঝে হারিয়ে গেলো। অদৃশ্য হয়ে গেলো তার চোখের সামনে থেকে। এক পলকেই।

ঘুম থেকে উঠে সেই যে কান্না শুরু করেছে মাহিবার সেই কান্না এখনও থামেনি। সালেহা বেগম বিরক্ত হয়ে বললেন,"তুই কি কান্না থামাবি নাকি আমার হাতের থাপ্পড় খাবি?" অথচ তার নিজের চোখেও পানি। ইশিকা থেকে থেকেই মাহিবাকে দেখছে। আম্মার কান্নার কারণ উদঘাটনে ছোট্ট মস্তিষ্ক ব্যর্থ। একবার শুধু অস্পষ্ট স্বরে "আম্মা" বললো। তাতে মাহিবার কান্নার রোল বাড়লো বই কমলো না। এবার ইশিকাও যোগ দিলো। সালেহা বেগম চোখে আঁচল চাপা দিয়ে বললেন,"আহমাদ শুধু মসজিদে বলে তুই বেঁচে গেলি। নয়তো ধমক একটাও মাটিতে পড়তো না।"

মিনিট সাতেক পর আহমাদ টুপি হাতে ঘরে ঢুকলো। আসরের এই সময়টা তার কাছে অদ্ভুত লাগে। কেমন যেনো দোটানায় মাখামাখি একটা রোদ শরীরটা ঘরে ধরে। আজ দুইদিন ধরে সেই রোদটাও নেই। মন কেমন করা মেঘ পুরো আকাশে দাপট দেখিয়ে বেড়াচ্ছে। সদর দরজায় পা দিতেই আহমাদ এক ধাক্কায় ভাবনার মনোরম রাজ্য থেকে বাস্তবে পতিত হলো। মাহিবা কাঁদছে। কেনো!

"কি হয়েছে?"

মাহিবা আরো জোরে কাঁদলো।

"কি আশ্চর্য! দুজন মিলে কান্নাকাটি শুরু করেছ কেনো? মেয়েটা তোমার জন্য ভয় পাচ্ছে দেখছো না!"

ইশিকাকে কোলে নিলো আহমাদ। মেয়েটা কাঁধে মাথা এলিয়ে শুয়ে পড়লো। থেকে থেকে ফুঁপিয়ে উঠছে সে। আহমাদের মায়া লাগলো। নরম সুরে বললো,"কাঁদে না আম্মা। থাক।"

মাহিবা চোখ মুছে বললো,"ওর বোধহয় ক্ষুধা লেগেছে। আমি ওকে একটু দুধ খাওয়াই?"

"আশ্চর্য! এখনও না খাইয়ে বসে আছো কেনো?"

"আপনার থেকে শুনে খাওয়াবো তাই।"

আহমাদ বিস্ময় হতবাক হয়ে রইলো।

"এটা কেমন কথা! আমার থেকে শুনে নিতে হবে কেনো?"

"যতই হোক আপনি বাবা। আপনার থেকে শুনে নিতে হবে না? মায়ের কাছেও শুনেছি।"

"আমি তোমার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না মাহি। তুমি আগে ওকে খাওয়াও তো। ধরো খাওয়াও।"

আহমাদ ইশিকাকে মাহিবার কোলে দিলো। বিস্ময় তার জন্য আরো বাকি ছিল। মাহিবা উঠলো না। রান্নাঘরে যেয়ে দুধ গরম করে আনলো না। ইশিকাকে বুকের সাথে চেপে ধরে দীর্ঘশ্বাস নিলো তারপর খাওয়াতে শুরু করলো। আহমাদ হতভম্বের মতো চেয়ে রইলো। মাহিবার গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। ইশিকা বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে। এমনভাবে খাওয়ার অভিজ্ঞতা তার ইহজনমে হয়নি। মাহিবা একবারও চোখ খুললো না। খুললে দেখতে পেতো ইশিকা এক আকাশ বিস্ময় নিয়ে তারদিকে তাকিয়ে আছে।

প্রায় পাঁচ মিনিট একভাবে খাওয়ার পর ইশিকা মুখ সরিয়ে নিলো। ডাকলো,"আম্মা।"

মাহিবা ডুকরে কেঁদে উঠলো। আহমাদ তখনও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। এই মেয়েটাকে তারা এনেছিলো সদ্য জন্মানো শিশু হিসেবে। দেখতে দেখতে আজ চৌদ্দটা মাস পেরিয়ে গেছে। ইশিকা মুখ ঘুরিয়ে তার দিকে তাকালো।

"আব্বা।"

আহমাদ এগিয়ে গেলো। ইশিকাকে কোলে নিয়ে কাঁদতে থাকা মাহিবাকে জড়িয়ে ধরে ফিসফিসিয়ে বললো,"তোমার স্বপ্ন সত্যি হয়েছে মাহি। আমাদের উপর বৃষ্টি পড়েছে। রহমতের বৃষ্টি।"

অর্ধাঙ্গের কাঁধে মাথা রাখলো মাহিবা। এই মুহূর্ত থেকে সে ইশিকার আম্মা হয়েছে। সত্যিকারের আম্মা।

চলমান।