প্রাপ্তি (দ্বিতীয় অধ্যায়) — পর্ব ১০

লেখক: বিনতে ফিরোজ · পর্ব ১০ · ২৫ পর্বের মধ্যে ১০

আজকে আর একটা ক্লাইন্ট মিটিং আছে। আহমাদ সেখানে ছোট্ট একটা স্পিচ দেবে। সম্ভাব্য প্রজেক্টের উপর হালকা একটা আভাস। দারুন সাজে সেজে এসেছে তাহমিনা। তার মন বলছে এই ডিলটা হাতছাড়া হবে না। তেমন হলে দিনটা হবে আহমাদের জন্য আনন্দময়। আহমাদের আনন্দমুখর দিনে সে-ও শামিল হতে চায়। তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে স্পিচের হার্ড কপি প্রিন্ট করে আনতে। সেটা এনে আহমাদের কাছে অনুমতি চাইলো তাহমিনা। পেতেই ঘরে ঢুকে পড়ল। এক পলক আহমাদকে দেখতেই চোখ ফেরাতে ভুলে গেলো। লোকটাকে তার এতো ভালো লাগে কেনো!

"স্যার আপনার স্পিচ।"

কাগজটা নিতে যেয়ে তাহমিনার হাতের সাথে আহমাদের হাতের স্পর্শ লাগলো। প্রতিক্রিয়া দেখার আশায় আহমাদের দিকে তাকালো তাহমিনা। নাহ্! আবহাওয়া ঠান্ডাই আছে। প্রথম দিকে একটু স্পর্শ লাগলেই আহমাদ যেনো জ্ব-লে উঠতো। সেই জ্ব-লে ওঠা রূপ দেখে তাহমিনা ভয় পেতো,শঙ্কায় ভুগতো। এমন করলে তার ইচ্ছার বাস্তবায়ন হবে কীভাবে! তবে আজকাল আর আহমাদ তেমন করে না। সম্ভবত তাহমিনার স্পর্শ তার সয়ে গেছে।

"গুড জব। সুন্দর কাজ হয়েছে।"

তাহমিনা খুশি হলো। আহমাদ আরেকটু বলতে পারতো না? এই যেমন,"আপনাকে সুন্দর লাগছে"? থাক,যেটুকু প্রশংসা পেয়েছে সেটুকু দিয়েই চলবে। এক দৃষ্টিতে আহমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো তাহমিনা।

মিটিং শেষ হতেই খাবারের জন্য ক্যান্টিনে গেলো সকলে। খাবার কথা স্মরণে আসতেই মাহিবার মুখটা আহমাদের চোখে ভেসে উঠলো। পকেট হাতড়ে ফোন পেলো না। সম্ভবত কেবিনে রেখে এসেছে। কেবিনে যেতে চাইলেই একজন ক্লাইন্ট আটকে দিলো। তাহমিনাকে ডেকে আহমাদ বলল,"অফিসের টেলিফোন থেকে মাহিবাকে একটা ফোন দিন। বলে দিন আমি ফিরতে পারবো না,যেনো খেয়ে নেয়। নাম্বারটা নিন।"

মুখ কালো করে নাম্বার নিলো তাহমিনা। তার ইচ্ছের সরল পথটা মাহিবা নামক মেয়েটার কারণে বন্ধুর হয়ে গেছে। তবু মন মানতে চায় না।

টেলিফোন কানে তুলতেই যেনো সুললিতার কণ্ঠস্বর পাল্টে কর্কশতম হয়ে গেলো।

"কে বলছেন?"

সালামের উত্তর পায়নি মাহিবা। এই প্রশ্নেও ওপাশ নীরব।

"হ্যালো!"

"স্যার আপনাকে খেয়ে নিতে বলেছেন। তার ফিরতে দেরি হবে তাই।"

"ওও! আপনি সেই রাইটওয়ালা তাই না?"

দাঁত কটমট করলো তাহমিনা। মাহিবা টেনে টেনে বলল,"রাইটওয়ালা আপু ভালো আছেন? ভাত খেয়েছেন?"

বসের স্ত্রী। তাহমিনা মুখের ওপর কল কাটতেও পারছে না। সেদিন যে সে মাহিবার সাথেই আননোন নাম্বার ভেবে কথা বলেছিলো সেটাও এই ক্ষণে এসে বুঝতে পারলো।

"ভালো আছি। ফোন রেখে তারপর ভাত খাবো।"

"আচ্ছা শুধু ভাতই খাবেন ঠিকাছে? মানুষজনকে ভাতের সাথে গিলে নিয়েন না। কেমন? আচ্ছা রাখি।"

তাহমিনা দাঁতে দাঁত চেপে সবটা শুনলো। ফোন রেখে দম ছাড়লো মাহিবা। আহমাদ কি তার কথা বুঝবে? তার কি কথাগুলো বলা উচিত?

বাড়ি ফিরে ক্লান্ত চোখে মাহিবার দিকে তাকালো আহমাদ। আগে মুখে ক্লান্তি থাকলেও চোখে হাসি থাকতো। মাহিবা বুঝতে পারতো। আজকাল সেখানে হাসি থাকে না নাকি তার দেখার ভুল সে জানে না। তবে সুন্দর সেই হাসিটা আর তার নজরে আসে না। আহমাদের হাত থেকে ব্যাগটা নিলো মাহিবা। আহমাদ সোজা গোসল চলে গেলো। মাহিবা পেছন থেকে বলল,"একটু রেস্ট নিয়ে যান। গা তো পুরো ঘেমে আছে।"

আহমাদ শুনলো না,চলে গেলো। নিঃশ্বাস ছেড়ে মাহিবা শরবত বানাতে গেলো। হয়ে যেতে সেটা নিয়ে ঘরে এসে একটু চুমুক দিয়ে দেখলো। তাতেই বাঁধলো বিপত্তি। লেবুর গন্ধটা তার কাছে এতোই জঘন্য লাগলো যে তখনই বমি চলে এলো। দৌঁড়ে বাথরুমের সামনে গেলো সে। আহমাদও তখনই বের হলো। ভেতরে ঢোকা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারলো না মাহিবা। আহমাদের গায়েই বমি করে দিলো।

হতভম্ব আহমাদ ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। হঠাৎ ঘটে যাওয়ায় সে নিজেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে। মাহিবা মিনিট খানেকের মাঝেই নিজেকে সামলে নিয়েছে। তবে আহমাদের দিকে তাকিয়ে বুঝলো তাকে আবার গোসল করতে হবে। বলতে চাইলো,"সরি! আসলে আমি.."

তার কথা শেষ না হতেই আহমাদ ফের বাথরুমে ঢুকে গেলো। হতাশ নিঃশ্বাস ছাড়লো মাহিবা।

শোয়ার সময় আহমাদের কাছে যেয়ে তাকে ডাকলো মাহিবা।

"শুনছেন? ঘুমিয়ে গেছেন?"

আহমাদের সাড়াশব্দ পাওয়া গেলো না।

"এই!"

মাহিবা আবার ডাকলে আহমাদ বিরক্ত হয়ে বলল,"সারাদিন কাজ করে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছি মাহি। কোনো জরুরি দরকার?"

"না থাক। আপনি ঘুমান। মাথায় হাত বুলিয়ে দিবো?"

"লাগবে না। তুমি ঘুমাও।"

আহমাদ ঘুমিয়ে পড়ল। মাহিবার কাছে আহমাদকে আঁধার রাতের জোৎস্না মনে হলো। যাকে দেখা যায়,অনুভব করা যায় কিন্তু ছোঁয়া যায় না। কেমন এক অদ্ভুত দূরত্ব।

সকালে ঘুম থেকে উঠে মাহিবা দেখলো তার গালে ব্রণ হয়েছে। মুখটাও কেমন ফোলা ফোলা লাগছে। মুখটা তিতা তিতা লাগছে। পেটে ক্ষুধা কিন্তু খাওয়ার কোনো ইচ্ছে নেই। যার ফলে শরীর আরো দুর্বল হয়ে গেলো। আগে আহমাদকে সব জিনিস হাতে ধরে এগিয়ে দিলেও এখন সেটা পারে না। সব জিনিস বিছানায় গুছিয়ে সে একপাশে বসে থাকে। আজ সেটাও পারলো না। নামাজটা পড়েই ফের শুয়ে পড়ল। আহমাদ তাকে ডাকলো না। নিজের মতো গুছিয়ে অফিসে চলে গেলো। তবে নিত্যকার আরামে ব্যাঘাত ঘটায় একটু বিরক্ত হলো বৈ কি।

আয়িশার এক বান্ধবী তাকে একটা চকলেট দিয়েছে। সেটা এনে ইশিকাকে দিলো সে। মাহিবা বলল,"এটা কোথায় পেলে আয়িশু?"

"আমার এক বান্ধবীর আজকে জন্মদিন ছিলো। ও সবাইকে দিয়েছে।"

মাহিবার মুখটা সহসাই গম্ভীর হয়ে গেলো। তবে সেটা লুকিয়ে সে সহজ গলায় বলল,"একটা জিনিস ভেবেছো আয়িশু?"

"কি ভাবিমণি?"

আয়িশার খেয়াল ইশিকার দিকে।

"তোমার বান্ধবীর এক বছর বেড়ে গেলো তাই না?"

"হুঁ।"

"তার মানে ওর মৃ-ত্যু এক বছর এগিয়ে এসেছে।"

"মানে?"

এতক্ষণে আয়িশাকে মনোযোগী দেখালো। মাহিবা বলল,"আমাদের মৃ-ত্যু কখন হবে সেটা তো ফিক্স করা। সময় হয়ে গেলে একটুও আগে পিছে হবে না। কে কখন মা-রা যাবে আমরা তো জানিনা। তোমার বান্ধবীর বয়স কত?"

"এগারো হলো।"

আয়িশার কণ্ঠ কিছুটা ভারী শোনালো মাহিবার কাছে।

"ধরো তোমার বান্ধবী তার এগারো বছর চার মাস বয়সে মা-রা যাবে। তাহলে ওর মৃ-ত্যু এগিয়ে আসছে না?"

"হুঁ।"

"এই যে আজকে ওর জন্মদিন গেলো এটা ওকে সেই মৃত্যুর আরো কাছে এগিয়ে নিয়ে গেলো না? ওর সময় একটু একটু করে কমে আসছে না? তারপর যখন সেই ফিক্সড টাইম চলে আসবে আমরা সারা পৃথিবীর মানুষ মিলে চাইলেও ওকে বাঁচাতে পারবো না।"

আয়িশা খেলা বন্ধ করো দিয়েছে। একভাবে বসে আছে। নড়চড়হীন অবস্থায়। মাহিবা নরম কণ্ঠে বলল,"জন্ম হওয়ার সাথে সাথে আমরা দৌড় শুরু করি। এই যে আমি অপেক্ষা করছি ইশু কবে হাঁটতে শিখবে,কবে স্পষ্টভাবে কথা বলবে,কবে তোমার মত বড় হবে। তারপর অপেক্ষা করবো কবে আরো বড় হবে, ওর বিয়ে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলে আমরা সবাই মৃ-ত্যু-র জন্য অপেক্ষা করছি। কিন্তু কেউই সেটা ধরতে পারছি না। দেখো,আমাদের কারো অপেক্ষার শেষ নেই। চাওয়ার শেষ নেই। একটা চাহিদা পূরণ হতে না হতেই আরেকটা চাহিদা তৈরি হয়। এর শেষ হবে মৃ-ত্যু-তে। সেই মৃ-ত্যু-কে ভুলে আমরা বাকিসব নিয়ে চিন্তা করছি।"

বাচ্চাদের মন নরম হয়। কাদামাটির মত। সেখানে যেই চিন্তার ছাপ বসিয়ে দেয়া যাবে সেই চিন্তার চিহ্ন নিয়েই সে বেড়ে উঠবে। তাদের নরম মনে মৃ-ত্যু-র কথা একটা ভয় তৈরি করে। একটা অজানা শঙ্কা তৈরি করে। সেই শঙ্কার পালে আরেকটু হওয়া দিয়ে দুনিয়ার স্থায়ীত্ব বুঝিয়ে দেয়া বড়দের দায়িত্ব। মাহিবা সেটাই করলো। আয়িশা তখনও চুপ করে আছে। মাহিবা আবার বলল,"জানো মৃ-ত্যু-কে এভাবে ভুলে যেয়ে এমন বার্থডে সেলিব্রেট করা আল্লাহ পছন্দ করেন না।"

"আল্লাহ রাগ করে?"

এতক্ষণে আয়িশার মুখে কথা ফুটলো।

"হ্যাঁ।"

"তাহলে সবাই জন্মদিন পালন করে কেনো?"

"বেশিরভাগ মানুষ বোঝে না,জানে না। আর যারা জেনেও এমন করে তারা আসলে আল্লাহর ভালোবাসা চায় না। তুমি আল্লাহর ভালোবাসা চাও না?"

"চাই।"

আয়িশা মাথা নাড়লো। মাহিবা বলল,"তাহলে আল্লাহ পছন্দ করেন না এমন জিনিস না করার চেষ্টা করবে। কখনও ভুলে হয়ে গেলে সাথে সাথে আল্লাহকে সরি বলবে। ঠিকাছে?"

"ঠিকাছে।"

"এই চকলেটটা খেলে কি আল্লাহ রাগ করবে?"

আয়িশা প্রশ্ন করলো।

"আল্লাহর অপছন্দের আয়োজন থেকে উপহার পেয়েছো। সেটা কি আল্লাহর পছন্দ হবে? তুমিই বলো।"

"হবে না।"

বাকিটুকু আয়িশাকে বলে দিতে হলো না। নিজ উদ্যোগেই সেটা ডাস্টবিনে ফেলে দিলো সে। মনে মনে পণ করলো এমন উপহার আর কখনও সে নেবে না।

আহমাদ ফেরার সময় হলে নিজেকে একটু পরিপাটি করার চেষ্টায় থাকে মাহিবা। এটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ইদানিং শরীর সায় দিচ্ছে না। এর হাঁটলেই যেনো পা দুটো ভারী মনে হয়। চুলগুলো যে আঁচড়াবে সে শক্তিটুকুও পায় না। ফলে এখন তাকে এলোমেলো বেশেই থাকতে হয়।

আহমাদ ফিরে স্ত্রীর দিকে তাকালো। মাহিবার এলোমেলো রূপ যে তাকে বিরক্ত করলো এটা স্পষ্ট বুঝলো মাহিবা। ভাবলো আজ আহমাদের সাথে একটু গল্প করবে। তবে আহমাদ বোধহয় সেটা চাইলো না। খাওয়া শেষ করতেই ঘুমের দেশে পাড়ি জমালো। মাহিবা দেখলো নতুন অভিজ্ঞতার জগতে সে একা। একদম একা।

চলমান।