প্রাপ্তি (দ্বিতীয় অধ্যায়) — পর্ব ২১
লেখক: বিনতে ফিরোজ · পর্ব ২১ · ২৫ পর্বের মধ্যে ২১
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে মাহিবা। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে নিজেকে। একবার কপাল সমান হচ্ছে তো একবার ভাঁজ। পাশে খাতা কলম হাতে দাঁড়িয়ে আছে আয়িশা। মাহিবা বলল, "চোয়াল হারিয়ে গেছে।"
আয়িশা নয় নাম্বার দিয়ে লিখলো, ৯.চোয়াল হারিয়ে গেছে।"
"ভাবিমণি এবার মুখ থেকে নিচে আসো। সারাদিন তো মুখেই কাঁটিয়ে দিলে।"
"আয়িশু রে! আমার মুখের মানচিত্রই পাল্টে গেছে। দুইদিন পর দেখবি তোর দাদাভাই আর আমাকে চিনছে না।"
"না চিনে উপায় নেই। বাচ্চা কাচ্চা কি দাদাভাই মানুষ করতে পারবে?"
"সেটাও ঠিক। এই একটা আশার কথা।"
আয়িশার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজের দেহের দিকে তাকালো মাহিবা। তৎক্ষণাৎ কপাল কুঁচকে বলল, "আয়িশু! তোর কি মনে হচ্ছে না আমার পেটটা বেশি বড় হয়ে গেছে?"
"আমি আসলে বুঝতে পারছি না। তুমি তো মোটা হয়ে যাচ্ছো তাই পেটও মোটা হচ্ছে।"
"না না। এই মোটা সেই মোটা না। দৌঁড়ে মাকে ডেকে আন তো।"
সালেহা বেগম ঘুমাচ্ছিলেন। আয়িশা তাকে টেনেটুনে নিয়ে এলো। বেজায় বিরক্ত হলেন সালেহা বেগম।
"কি শুরু করেছিস তোরা? তোদের জ্বা-লা-য় কি আমার একটু ঘুমানোর উপায় নেই?"
"ঘুম টুম বাদ দিন। এই দিকে আমার যে পেট ওয়া বড় হয়ে যাচ্ছে আপনি কি সেটা খেয়াল করেছেন?"
সালেহা বেগম ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, "চোখে শুধু ঘুম দেখছি। দাঁড়া মুখ ধুয়ে আসি।"
চোখেমুখে পানি দিয়ে এলেন সালেহা বেগম। মাহিবাকে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে বললেন, "তোর চার মাস চলছে না?"
"আমিও তো তাই হিসাব করেছিলাম।"
"পেট তো চার মাসের মতো লাগছে না। মনে হচ্ছে ছয় সাত মাস। ব্যাপার কি?"
"কেমন দাদী হচ্ছেন আপনি? নাতি নাতনীর খবর জানেন না।"
"আবোল তাবোল বকিস না তো। আমি কি ডাক্তার?"
"আপনি হলেন দাদী।"
"তোর কি পেটে ব্যাথা ট্যাথা হয় নাকি?"
"না।"
সালেহা বেগম ভাবুক হয়ে গেলেন। বললেন, "আহমাদ আসুক। আজকে একবার ডাক্তার দেখিয়ে আসিস।"
•
আহমাদ চিন্তিত মুখে বসে আছে।
"আপনার বউয়ের পেট ফুলে ঢোল হয়ে যাচ্ছে আপনি একটু চোখেও দেখছেন না। তা দেখবেন কেনো? চোখে তো ভাসছে সেই রাইটওয়ালি!"
"রাইটওয়ালি আবার কি?"
"কেনো আপনার পার্সোনাল অ্যাসিসটেন্ট! ফোন ধরে বলে কি না এই ফোন ধরার রাইট আমার আছে! কত্ত বড় সাহস। আমার সাথে রাইট দেখায়। সামনে পেলে ওর থোতা মুখ আমি ভোঁতা করে দিতাম।"
আহমাদ চারপাশে তাকালো। নাহ কেউ তাদের কথা শুনছে না। মানুষজন সব দূরে দূরে।
"আস্তে কথা বলো!"
"আস্তেই তো বলবো। আপনি আগে বলুন মেয়েমানুষকে নিজের পার্সোনাল অ্যাসিসটেন্ট বানিয়েছেন কেনো?"
"একজন পিএ দরকার ছিল।"
"তো কোনো ছেলেকে নিয়োগ দেওয়া যায়নি! ঐ মেয়ে নিশ্চয়ই পর্দা করে আপনার সাথে কাজ করতে আসেনি!"
আহমাদ বিরক্ত বোধ করলো। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। মাহিবা সেটা খেয়াল করে বলল, "মুখ ঘোরাচ্ছেন কেনো? বাইরের এসব মোমবাতি দেখলে ঘরের চাঁদ আর ভালো লাগব না। তখন চাঁদের কলঙ্কই চোখে ভাসবে। আল্লাহ দুটো চোখ দিয়েছেন। সেই চোখের নজর যদি অন্যের জিনিসের বেশি যায় তাহলে নিজে জিনিস যে আর ভালো লাগবে না সেটা আপনিও জানেন। যাক আপনি বিরক্ত হচ্ছেন। আর বলছি না।"
আহমাদ চুপ থাকলেও তার ভাবনারা থামলো না। একসাথে কাজ করতে গেলে চোখের গতিরোধ করা কষ্টের। প্রথম কয়েকবার তাহমিনার দিকে চোখ গেলে সাথে সাথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছে সে। কিন্তু কিছুদিন যেতেই সতর্কতা ঢিল হয়ে গেছে। তাহমিনার দিকে চোখ তুলে তাকানোটা আর বিশেষ কিছু মনে হয়নি। তারপর থেকে মাঝে মাঝেই যে বাইরে দেখা পরিপাটি মেয়েদের সাথে কাহিল, অগোছালো মাহিবার তুলনা আসেনি সেটা কি সে অস্বীকার করতে পারবে?
মাহিবার সিরিয়াল এলে ওয়েটিং রুম থেকে উঠে গেলো দুজনে। স্ত্রীর হাত ধরতে চাইলেও মাহিবা অবলম্বন হিসেবে দেয়াল আঁকড়ে ধরলো। আহমাদ নীরবে সেটা পর্যবেক্ষণ করলো।
আল্ট্রা রিপোর্ট দেখে ডাক্তার বললেন, "আপনারা আগের টেস্ট কোথায় করিয়েছিলেন?"
"এখানেই তো!"
"সেই রিপোর্ট আছে?"
আগের রিপোর্ট বের করে দিলো আহমাদ। ভদ্রমহিলা গম্ভীর হয়ে বললেন, "ম্যাম ছুটিতে আছেন। কিন্তু কথা সেটা না। কথা হলো এক মাস আগের রিপোর্ট আর এখনকার রিপোর্টে বিস্তর ফারাক।"
"কোনো সমস্যা ম্যাম?"
আহমাদের উদ্বিগ্ন কণ্ঠ ভেসে এলো।
"সমস্যা আসলে না। হয়েছে কি শুনুন। ম্যামের রিপোর্টে দেখাচ্ছে ফিটাস একটা। তার ডিটেইলস আছে। অল ওকে। কিন্তু আমি মাত্র যেই আল্ট্রা করলাম সেখানে দেখলাম বেবী তিনটা।"
"হ্যাঁ!"
মাহিবা চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে আছে। পেটে হাত রেখে সে বিরবিরিয়ে বলল, "আমার পেটে তিনটা বাবু!"
"রিপোর্ট তো তাই বলছে। এতে কিন্তু আপনার কাজ বেড়ে গেলো। ওয়াইফকে এখন বেশি বেশি যত্ন করতে হবে। বুঝতেই পারছেন। থ্রি ইন ওয়ান। তবে চিন্তার কিছু নেই। বেবীরা সবাই সুস্থ আছে। গ্রোথ ঠিকঠাক। এখন আপনারা শুধু রুটিন মেনে চলুন। বাকিটা আল্লাহ ভরসা।"
খবর শুনে সালেহা বেগম উথাল পাথাল শুরু করে দিলেন। মালা বেগমকে ফোন দিয়ে বললেন, "আপা বাচ্চা তো একটা না। তিন তিনটা! এতো বাচ্চা সামলাবো কিভাবে!"
আয়িশা চিন্তায় পড়ে গেছে। আফিয়া এসে তার কানে কানে বলল, "এবার আমার সাথে সাথে তোকেও বিয়ে দিয়ে দেবে। তারপর একটা বাচ্চা তোকে পাল্টে দিয়ে বাড়িতে ছয়জন রাখবে। ইকুয়াল ইকুয়াল।
আয়িশা তৎক্ষণাৎ কান্না শুরু করলো।
"আমি বিয়ে করব না। আমি বাবু রাখতে পারি না।"
°
কলিং বেল বাজলে আফিয়া এগিয়ে গেলো। এক মধ্যবয়সী মহিলা দাঁড়িয়ে আছে।
"জি কাকে চান?"
"তোমার মা, বাবা কেউ বাড়িতে আছে মা? তাদের সাথে একটু কথা বলা যাবে?"
"একটু দাঁড়ান।"
আফিয়া সালেহা বেগমকে ডেকে নিয়ে গেলো।
"জি বলুন।"
সালেহা বেগম লক্ষ্য করলেন মহিলার কনুই এবং হাঁটু থেকে র-ক্ত পড়ছে। সাদা শাড়ির নিচে জমাট বেঁধে আছে।
"আপনার হাঁটু থেকে তো র-ক্ত পড়ছে! কনুই ও দেখি ছিলে গেছে। কি হয়েছে আপনার?"
বিকেলের এই সময়টা আহমাদ ফ্যাক্টরিতে যায়। তবে আজ মাহিবাকে ডাক্তার দেখিয়ে আর যায়নি। আফিয়ার ডাকে নিচে এলো সে। মহিলাকে দেখতে থাকলো তীক্ষ্ম চোখে।
মহিলা মানুষের বাড়িতে বাড়িতে কাজ করেন। কিন্তু বয়সের ভারে নুয়ে পড়ার কারণে কাজে তেমন গতি আসে না। ফলে একটার পর একটা কাজ হারিয়ে বর্তমানে কাজশূন্য হয়ে পড়েছেন। লোকমুখে "মায়াবাড়ি"র কথা শুনেছেন। আসপাসের মানুষের কাছে শুনে "মায়াবাড়ি"র মালিকের কাছে একটা কাজের খোঁজে এসেছেন।
"আপনার ছেলেমেয়ে নেই?"
"একটা ছেলে আছে বাবা। এতিমখানায় থাকে। আমি নিজেই থাকতাম মানুষের বাড়িতে। তাই ওকে এতিমখানায় দিয়েছি।"
"আগে কোথায় কাজ করতেন?"
মহিলা ঠিকানাসহ নাম্বারও দিয়ে দিলেন। আহমাদ খোঁজ নিলো। মহিলার প্রতিটা কথাই সত্য। ইফাদের সাথে যোগাযোগ করলে সে বলল, "দোস্ত কোম্পানি তো এখন লসের ভিতরে আছে। নতুন মানুষ রাখাটা কষ্টের। এসেই যখন পড়ছে কি আর করার। তুই পাঠায় দে।"
আহমাদ মহিলাকে "মায়াবাড়ি" পাঠিয়ে দিতে চাইলে সালেহ বেগম তাকে আটকালেন। একপাশে টেনে এনে ফিসফিসিয়ে বললেন, "দাঁড়া। দুটো দিন এখানেই থাক। দেখি কেমন মানুষ। তেমন হলে আমাদের এখানেই রেখে দেবো। মাহি তো এখন নিজের কাজই করতে পারবে না। আমাদের একট মানুষ হলে ভালোই হয়।"
প্রস্তাবটা সম্ভবত আহমাদের মনে ধরলো। সালেহা বেগম মহিলাকে বললেন, "আপনি আমাদের বাড়িতে থাকবেন? আমার একটা মানুষ হলে সুবিধা হয়।"
"থাকবো আপা। আপনার থেকে আমারই বেশি সুবিধা হয়।"
"আপনার নাম কি?"
"হেমা।"
"ও মা! হেমা মালিনী নাকি!"
আফিয়া বলে উঠলো। মহিলা সম্ভবত লজ্জা পেলেন। আফিয়া অবাক হলো, "হেমা মালিনীকে আপনি চেনেন নাকি?"
"নাম শুনছি। মানুষ আমার নাম শুনলেই তার নাম বলে।"
"আচ্ছা যাক। আপনি বিশ্রাম নিন। আফিয়া রান্নাঘরের পাশের ঘরে উনাকে দিয়ে আয়।"
"আপা আপনি আমারে তুমি বইলেন। আপনি শুনতে ভালো লাগে না। আর আমি বয়সেও আপনার চেয়ে ছোটই হবো।"
"আচ্ছা বলবো। যাও যাও।"
সেই সন্ধ্যায় মাহিবার চিৎকারে সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ল।
চলমান।