প্রাপ্তি (দ্বিতীয় অধ্যায়) — পর্ব ২০

লেখক: বিনতে ফিরোজ · পর্ব ২০ · ২৫ পর্বের মধ্যে ২০

এই জীবনে আহমাদের থানায় আসার সুযোগ হয়নি। এবার সেটাও হলো। চারপাশের পরিবেশ দেখে সে ধন্দে পড়ে গেলো। থানা এমন হয়?

একটা বেঞ্চে কয়েকজন ছোকড়া বসে আছে। তাদের ছেলে বললে বাচ্চা মনে হয় লোক বললে বেশি বয়স্ক মনে হয়। ছোকড়া বললে বরং ঠিকঠাক বোঝানো যায়। আহমাদ আন্দাজ করলো এদের একজনেরও বয়স সতেরোর ওপরে হবে না। একেকজনের বেশভূষা দেখার মতো। একজনের প্যান্ট হাঁটুর কাছে ইয়া বড়ো ফাঁটা। চুল আবার পুরো মাথায় নেই। তালু বরাবর কিছু আছে। দুপাশে একদম ফাঁকা। এক কি কাটিং বলে? সম্ভবত ঘোড়া কাটিং হবে। আরেকজনের মাথার দুপাশে চুলে তিনটা করে আঁচড় দেওয়া। একজন ভুরুর কাছে কিছু একটা ফুঁটিয়ে রেখেছে।

হাবিলদার আহমাদকে ছেলেগুলোর দিকে এভাবে তাকাতে দেখে বললেন,"ভালো করে দেখেন ভাই। এগুলো হলো চিড়িয়া খানার জিনিস। ছাড়া পেয়ে তামাশা দেখাতে এসেছে।"

"ওদের অপরাধ কি ভাই?"

আহমাদ হাবিলদারকে প্রশ্ন করলো। লোকটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, "আর অপরাধ! এটা এখন সাধারণ ঘটনা হয়ে গেছে ভাই। এরা পুরো আটজনের একটা গ্রুপ নিয়ম করে প্রতি সন্ধ্যা সাতটা থেকে এলাকার মাঠে বসে গাঁজা খায়। লোকজনদের বিরক্ত করে। কালকে স্যার ভুলবশত ওদের ধরে ফেলেছে।"

"ভুলবশত বলছেন কেনো?"

"কারণ একটু পরেই একটা ফোন আসবে তারপর এদের গাড়িতে করে যার যার বাড়িতে পৌঁছে দিতে হবে। কোনো মানে হয় বলেন? ওদের গাড়িতে করে দিতে কাকে পাঠাবে জানেন? আমাকে। কি একটা অপমান! এসব ছেলেপেলেদের চামড়া ছাড়ায়ে ঝাল লবণ দিয়ে ডলতে পারলে আমার কলিজাটা শান্তি হতো। শুধু কি গাঁজা খায়? চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, মা-রা-মা-রি, মেয়ে মা-ম-লা সব আছে এদের। কিন্তু বিচার হবে না ভাই বিচার হবে না।"

বিচার কেনো হবে না এটা আহমাদকে বলে দিতে হলো না। আহমাদ জানে। আজকাল ফুলের বদলে আগাছা চাষ করা হয়। প্রকাশ্যে।

পুলিশের উপস্থিতিতে আহমাদ রশিদ মিয়ার সাথে কথা বলার সুযোগ পেলো।

"আসসালামু আলাইকুম ভাই। কেমন আছেন?"

রশিদ মিয়া উদাস গলায় বললেন, "জেলের ভেতরে কেমন আছি তাই শুনতে আসছেন আপনি? ভালো নাই ভাই। খাওয়ার সমস্যা, পানির সমস্যা, ঘুমের সমস্যা। সমস্যাই সমস্যা।"

পাশ থেকে পুলিশ লোকটা বলে উঠলেন, "দুনিয়ার সব সমস্যার নিষ্পত্তি করার জন্য সমস্যাওয়ালা লোক এখানে ধরে নিয়ে আসে। সমস্যা এখানে হবে না তো কি অন্য জায়গায় হবে?"

রশিদ মিয়া মাথা নাড়েন। "কথা সত্য।"

"ভাই আপনার সাথে একটু গল্প করতে আসছি।"

"গল্প আবার কিসের মিয়া? একটা ডায়েরি করে দেন আমার নামে। কিন্তু সশ্রম কারাদণ্ড দিলে চিন্তা। অনেক খাটা খাটনি করা লাগবে।"

"এসব আপনাকে করতে হবে না ভাই। আপনি আপনার জীবনের গল্প বলেন।"

"আমিও একটা মানুষ কাকও একটা পাখি। আমার আবার জীবনের গল্প কি?"

"আপনার বয়স তো কম হয়নি। এই বয়সে আপনি কেমন ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন, কোথায় কোথায় কি কি কাজ করেছেন এসবই বলেন।"

রশিদ মিয়া পলেস্তারা খসে যাওয়া দেয়ালের দিকে তাকালেন। জায়গাটা স্যাঁতস্যাঁতে। থাকতে তার বেশ অসুবিধা হচ্ছে। সেই অসুবিধা কাঁটাতে হলে তাকে গল্প বলতে হবে। তার জীবনের গল্প!

"শোনেন ভাই। আমার জীবনের আহামরি কোনো ঘটনা নাই। বয়স যখন চৌদ্দ হইলো একদিন আন্নার সাথে স্কুলে যাই। পরীক্ষার দিন আব্বা নিয়ে যাইতো। হঠাৎ রাস্তায় কিছু মানুষ আসলো। কোনো রকম কথা বার্তা ছাড়াই আমার আব্বারে কো-পা-নো শুরু করলো। ভিতরের খবর আমি জানতাম না। কি যে হইছিলো, কেনো কো-পা-ইলো কিছুই আমি জানিনা। আমার আব্বা ম-রে গেলো। আমি শুধু তাকায় তাকায় দেখলাম। জ-বা-ই করা গরুর মতো ছটফট করতে করতে আব্বা চলে গেলো। আমার আর পরীক্ষা দেওয়া হইলো না।

আব্বার বিশাল বড় সবজির আড়ত ছিলো। সেইটা এইটুক হয়ে গেলো। আমি আড়তে যাই। মাছি তাড়ায়ে আবার বাড়ি চলে আসি। সবজি টবজি কেউ কিনে না। কেনো জানি মনে হইলো সবাই আমাদের এক ঘরে করে দিতে চায়। দেখা গেলো তাই হইলো। কিন্তু কেনো যে হইলো আমি কিছুই জানিনা।

একদিন বাড়ি যেয়ে দেখি আম্মার মাথার চুল অর্ধেক নাই। ত্যাড়া ব্যাকা করে কাঁটা। ছোটো বোন বলল আম্মা নাকি চুরি করতে যেয়ে ধরা পড়ছে তাই মানুষ চুল কেঁটে দিছে। কথাটা বিশ্বাস করতে মন চাইলো না। কারণ তখন আমাদের ভাত না খাওয়ার নয় নাম্বার দিন চলে। মুড়ি টুরি যা খাইছি সেগুলোও শেষ হইসে আরো পাঁচ দিন আগে। এই কয়েকদিন কিভাবে থাকছি আমরা বলতে পারি না। আম্মা পাঁচ দিন আগেই চুরি করতে পারতো। তখন না করে এখন কেনো করলো বুঝলাম না। পাঁচ দিনে তো মানুষ ম-র ম-র হয়ে যায়। যদিও আমরা বেঁচে ছিলাম। তারপর একদিন চাল কিনতে পারলাম। চাল নিয়ে বাড়ি যেয়ে দেখি আম্মা গলায় দড়ি দিছে। তার আগে ত্যাড়া ব্যাকা চুল কেঁটে সোজা করছে।"

রশিদ মিয়া থামলেন। আহমাদ গভীর মনোযোগে তার কথা শুনছিল। সে খেয়াল করলো পুলিশ লোকটাও খুব মনোযোগ দিয়ে রশিদ মিয়ার কথা শুনছেন। রশিদ মিয়া কথা বলছে এমন ভঙ্গিতে যেনো তার এগুলো বলার কোনো ইচ্ছাই নেই। নিতান্ত অনিচ্ছায় পুরোনো কথাগুলো সে বলছে। তবে তাতে তার কোনরকম কষ্ট হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। আচ্ছা একটা কষ্ট মানুষ ঠিক কতদিন ধরে পেতে পারে?

রশিদ মিয়া আবার বলতে শুরু করলেন।

"ছোটো বোনরে নিয়ে গ্রাম ছাড়লাম। বাপ মা কেউ নাই। থেকে কি করবো? শহরে এক দুঃসম্পর্কের চাচার বাড়ি এসে উঠলাম। এইটা ছিলো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। বাপের ভিটা ফেলে রেখে গেছি। বাপরে যারা মা-র-ছে তারা বাড়ি দখল করে নিলো। শহরে যাওয়ার ছয় মাসের মাথায় সেই চাচা আমার বোনরে নিয়ে কোথায় দাওয়াত খাইতে গেলো। আমার বোন আজও দাওয়াত খেয়ে ফেরত আসে নাই।"

দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়লেন রশিদ মিয়া। চোখের পাতায় সম্ভবত ছোটো বোনের মুখচ্ছবি ভাসছে।

"পেটের দায়ে শোক নিয়ে বেশিদিন থাকতে পারলাম না। এদিক ওদিক কাজ খুঁজি। ভালো লোক জড়ো করতে পারতাম। একটা কাপড়ের দোকানে কাজ হয়ে গেলো। ভালোই কাজ টাজ করছিলাম। বয়স কম ছিল, কাজেও নতুন তাও অনেকের থেকে বেতন বেড়ে গেলো কাজের জন্য। চার মাসের মাথায় চুরির দায়ে দোকান ছাড়া হলাম। যেই কয়েক হাজার টাকা জমিয়েছিলাম তাও নিয়ে নিলো। আর খারাপ লাগে নাই। খারাপ লাগার জন্যে মন লাগে। আমার সম্ভবত মন নাই। টাকা লাগে আপনজনদের জন্যে। তারাও নাই।"

দীর্ঘ বক্তব্যের পর রশিদ মিয়া চুপ করলেন। আহমাদ বুঝলো ঘাত প্রতিঘাতে মানুষটা কঠিন হয়ে গেছে। তার আবেগ আর কাজ করে না। মাঝে মাঝে বিবেকও।

"এখন কি আমারে ছেড়ে দিবেন?"

"না। আপনাকে একজনের সাথে দেখা করাবো। সে যা বলবে আপনাকে তাই করতে হবে। তারপর আপনি ছাড়া পাবেন।"

"কি জ্বা-লা!"

দায়িত্বরত পুলিশকে ধন্যবাদ জানালো আহমাদ। এতোটা সাহায্য আজকাল কে করে?

"ভাবিমণি তোমার মেয়ে হবে নাকি ছেলে হবে?"

"জানি না। দেখতে পারবি।"

"আচ্ছা আসো আমরা নাম ঠিক করি। একটা ছেলের নাম একটা মেয়ের নাম। যেটা হবে সেটা রেখে দিবো।"

"রাখ তো। তুই রাখ। আমার ভাল্লাগছে না।"

আয়িশা অবাক চোখে মাহিবার দিকে তাকিয়ে চলে এলো। আহমাদের কাছে এসে বলল, "ভাবিমণির কি হয়েছে দাদাভাই?"

আহমাদ গম্ভীর গলায় বলল, "সেন্সরে ডিফেক্ট দেখা দিয়েছে।"

"কি বললেন আপনি! আমার সেন্সরে ডিফেক্ট! তাই না! ডিফেক্ট! কত্তো বড় কথা! মা! মা!"

সালেহা বেগমের কাছে গেলো মাহিবা। আহমাদ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো। এক্ষুনি না ঘরে ছিল? এখানে এলো কখন?

"মা! আপনার ছেলে বলে আমার সেন্সরে নাকি ডিফেক্ট। আপনি এর একটা বিচার করুন মা।"

সালেহা বেগম গম্ভীর গলায় বললেন, "কি সমস্যা? আবোল তাবোল বকছিস কেনো? ডাক্তার দেখাতে হবে?"

আহমাদ কিছু বলল না। তার অবস্থা ধরা পড়া চোরের মতো।

"নাম পেয়েছি। ছেলে হোক আর মেয়ে হোক নাম রাখবো ডিফেক্ট। আমার সেন্সরে তো এখন ঐটাই আছে। তারপর তোর পরাণের দাদাভাইকে সবাই ডিফেক্টের বাপ বলে ডাকবে। শুনে আমি কলিজা ঠান্ডা করবো।" আয়িশাকে বলল মাহিবা।

আফিয়া ইশিকাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার কোল থেকে ইশিকাকে নিয়ে মাহিবা গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "ডিফেক্টের বোন! খবর ভালো তো?"

চলমান।