প্রাপ্তি (দ্বিতীয় অধ্যায়) — পর্ব ১৬

লেখক: বিনতে ফিরোজ · পর্ব ১৬ · ২৫ পর্বের মধ্যে ১৬

"গত কয়েকদিন ধরে আফতাব আমার ফোন ধরছে না ভাবি।"

"তার সাথে তোমার নিয়মিত কথা হয়?"

মাথা নাড়লো আফিয়া। হতাশ নিশ্বাস ছাড়লো মাহিবা। ঠিক এই ভয়টাই সে পাচ্ছিলো।

"ফোন কেনো ধরছে না?"

"জানি না ভাবি। কিছু বলেনি। সেদিনও স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলছিলো। ভাইয়ার কথাও বলেছিলাম। কিন্তু তারপরের দিন থেকে হঠাৎ কল,মেসেজ সবকিছু বন্ধ। এমনকি আমাকে সব জায়গা থেকে ব্লক করে দিয়েছে।"

হু হু করে কেঁদে উঠলো আফিয়া। মাহিবা বললো,"তুমি বললে তোমার ভাইয়ের সাথে কথা বলি।"

"না না! এই অবস্থায় ভাইয়াকে এসব জানালে টেনশন করবে।"

"তাহলে আমি কি করবো বলো? সে যদি তোমার স্বামী হতো তাহলে আমি তাদের পরিবারের প্রত্যেকটা মানুষের কাছে জবাবদিহি চাইতে পারতাম। এখন আমি তাদের প্রশ্ন করবো কিসের ভিত্তিতে?"

আফিয়া বুঝলো তার এতদিনের সাজানো স্বপ্ন হাওয়ায় ভাসা পালক। যার কোনো ভিত নেই। ফলে উত্তর দেয়ার মতো কিছুই সে খুঁজে পেলো না।

রাত বাড়লে সকলে চলে গেলো। মাহিদ জোর করে থেকে গেলো। হঠাৎ কিছুর দরকার হলে যেনো সে সাহায্য করতে পারে। নিজের জন্য বেছে নিলো কেবিনের বাইরের দুটো চেয়ার। বেশ ভালোমতোই ওখানে ঘুমানো যাবে। বোনকে আশ্বস্ত করলো সে।

নিজের হাতে আহমাদকে খাইয়ে দিলো মাহিবা।

"কথা বলছো না কেনো?"

"কি বলবো?"

"যা মন চায়।"

"কিছুই মন চাইছে না।"

"আমার সাথে বলার মতো এখন কোনো কথাও খুঁজে পাচ্ছো না তুমি?"

আহমাদের হতাশ কণ্ঠ শোনা গেলো। মাহিবা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,"প্রেগনেন্সির খবর পাওয়ার প্রথম দিনেই আমি আপনাকে বলেছিলাম এই সময়টা খুবই সেনসিটিভ। ছোটো থেকে ছোটো কথাগুলোও আমার সারাজীবন মনে থাকবে। আপনি ঠিক এই সময়টাই বেছে নিলেন আমাকে আঘাত করার জন্য। কথার আঘাত, নীরবতার আঘাত, অবহেলার দৃষ্টির আঘাত, দৃষ্টি না পাওয়ার আঘাত। প্রত্যেকটা এই কয়েকদিনে আমি আপনার কাছে পেয়ে গেছি। আমি আপনার উপর হয়তো রাগ করে থাকতে পারবো না। কিন্তু কি জানেন? যেই ক্ষতগুলো হয়েছে না? সেগুলোর দাগ আজীবন থেকে যাবে। থেকে থেকে মনে পড়বে এই কষ্টগুলোর কথা। আমি কখনোই আপনার বিরুদ্ধে মনে কষ্ট জমিয়ে রাখতে চাইনি।"

আহমাদ আর খেতে পারলো না। সাফাই দেওয়ার জন্য মুখটাও খুলতে পারলো না। মাহিবার ভগ্ন কণ্ঠ তার বুকে তীরের মতো বিধছে।

মাহিবা নামাজ পড়তে পড়তে সিজদায়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। মশার কামড়ে টিকতে না পেরে ঘুম ভেঙে গেলো। উঠতে যেয়ে ঘাড়ে টান খেলো মাহিবা। অনেকক্ষণ একভাবে শুয়ে থেকে ঘাড় ব্যাথা হয়ে গেছে। দ্রুত উঠে বসলো সে। তাকে মশা কামড়াচ্ছে। তাহলে আহমাদের কি অবস্থা। উঠে যেয়ে দেখলো ইতোমধ্যেই মশার দল আহমাদকে ঘিরে ফেলেছে। আহমাদ কপালে বাম হাত রেখে শুয়ে ছিলো। বাম হাত মশার দল আপ্যায়ন করে ফুলিয়ে ফেলেছে। ঘাড়ের খোলা অংশও বাদ যায়নি। মাহিবা হাত দিয়ে মশা তাড়িয়ে দিলো।

"হুশ হুশ! কত্তো বড় সাহস! আমার একটা মাত্র বর তাও এক্সিডেন্ট করে অর্ধেক হয়ে গেছে আর সেই মানুষটাকে এরা ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছে। দুনিয়া থেকে মানবতা বিলুপ্ত হয়ে গেলো.. না মশার জন্য কি হবে? মশকবতা?"

একা একা কথা বলতে বলতেই সব জানালা বন্ধ করে কয়েল জ্বালিয়ে দিলো মাহিবা। কিন্তু মাথা থেকে প্রশ্নটা গেলো না। মানুষের জন্য মানবতা হলে মশার জন্য কথাটা কি হবে?

আহমাদের শিয়রে এসে বসলো মাহিবা। তিন কুল, সুরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়ে আহমাদের পুরো শরীরে ফু দিলো। কপাল থেকে আহমাদের হাতটা সরাতেই দেখলো চোখের কোনায় শুকনো জল। থমকে গেলো মাহিবা। আহমাদ কাঁদছিলো? কেনো? তার শরীর তো এতো অসুস্থ নয় যে ব্যাথার চোটে কান্নাকাটি করবে। তাহলে? স্বামীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো মাহিবা। খুব নিকটে যেয়ে ফিসফিসিয়ে বললো,"আমাদের একটা পোস্ট অফিস আছে জানেন? সেই পোস্ট অফিসে মনের সব কথা রেখে আসা যায়। একেবারে সব কথা। আপনি যদি কথা বলতেও না পারেন তাহলে যেয়ে শুধু দাঁড়াবেন। মনটা প্রাপকের দিকে ঘুরিয়ে দেবেন। বাকি কাজ তাঁর। তিনি নিজ দায়িত্বে আপনার মনের সব কথা, সব ব্যাথা ধুয়ে মুছে নিয়ে যাবেন।"

একটু থামলো মাহিবা। আহমাদের চেহারায় কিছু একটা দেখে হাসলো। ফের বললো,"আমরা সবাই আল্লাহর। সবকিছুই আল্লাহর জন্য। সেই আল্লাহ নিজে বান্দার অনুতাপের বিপরীতে তার গুনাহ মুছে দেন। ধুয়ে মুছে সাফ করে দেন। সেখানে আমরা কোন ছাড় বলুন? নিজেকে আল্লাহর জন্য বদলান। দেখবেন বাকি সবটা তিনি আপনার জন্য বদলে দেবেন। সবটা! সব ক্ষত মুছে দেবেন। সব দাগ দুর করে দেবেন।"

শেষটুকু আরো আস্তে বললো মাহিবা। আর কিছুর জন্য অপেক্ষা করলো না। উঠে সরাসরি বাইরে চলে গেলো। মাহিদ কি করছে একটু দেখা দরকার।

মাহিবা চলে যেতেই চোখ খুললো আহমাদ। চোখের পাতা আলাদা হতেই তাদের বিভক্তি খাদের মাঝ থেকে বেরিয়ে এলো এক ফোঁটা অশ্রু। অশ্রুর রং হয় না। নয়তো বোঝা যেতো এটা কিসের অশ্রু। দুঃখের নাকি আনন্দের।

মাহিদকে ধাক্কা দিতেই ধড়মড় করে উঠে বসলো সে। প্রথমটায় কিছুই বুঝতে পারলো না। ঘুম কাঁটতেই বললো,"তোর বর ভেতরে অজ্ঞান হয়ে আছে তুই কেনো আমাকে খোচাচ্ছিস?" মাহিদের মুখে বিরক্তির ছাপ।

"চুপ! অজ্ঞান হয়ে আছে আবার কি কথা? ঘুমিয়ে আছে।"

"একই হলো। কতো সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখছিলাম! শেষ করতে দিলি তুই!"

"কি স্বপ্ন দেখছিলি?"

মাহিবাকে কৌতূহলী দেখালো। আড়চোখে একবার বোনের দিকে তাকিয়ে মাহিদ বললো,"বিয়ে করছিলাম। বউটার মুখ দেখার আগেই ঘুম ভাঙিয়ে দিলি। তুই তো এখন থেকেই বিশ্রী ননদ হওয়ার চর্চা শুরু করে দিয়েছিস। ছিঃ! এই তোর বাবা মায়ের শিক্ষা!"

"নির্লজ্জ! বড় বোনের সামনে বিয়ের কথা বলতে লজ্জা লাগে না?"

"লাগে না। তুই আমার সামনে বিয়ে করে বর নিয়ে শ্বশুরবাড়ি চলে গিয়েছিস। আমি একটা টু শব্দও করেছি? কেউ বলতে পারবে?"

"কি অসভ্য!"

"কোথায় যেনো পড়েছিলাম, ভালোবাসায় অসভ্য হতে হয়। এখন থেকে প্র্যাকটিসে রাখছি।"

"তোমার গাল চড়িয়ে আমি অসভ্যগিরি বের করছি। চল ভেতরে চল।"

মাহিদের পিঠে থাপ্পড় দিয়ে তাকে টেনে ধরে দাঁড় করালো মাহিবা। মাহিদ আহত স্বরে বললো,"কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস আমাকে?"

মাহিবা চোখ রাঙিয়ে বললো,"চড়াতে।"

চলমান।