প্রাপ্তি (দ্বিতীয় অধ্যায়) — পর্ব ১১
লেখক: বিনতে ফিরোজ · পর্ব ১১ · ২৫ পর্বের মধ্যে ১১
আহমাদ কথা কম বলে। বরাবরই সে এমন। তবে মাহিবার কখনও মনে হয়নি কম কথা বলা এই মানুষটার সাথে তার মনের দূরত্ব আছে। আজ যখন আহমাদ অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলো তখন মাহিবা বলল,"আমি আপনার স্ত্রী। আমার খোঁজ আপনি নেওয়ার সময় না পেলে অন্য কাউকে দিয়ে নেয়াবেন না প্লিজ। আমি আমাদের মাঝে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে কাউকে চাই না। কাউকে না।"
মাহিবার স্বর ক্লান্ত শোনালো। আহমাদ চুপ করে সেটা শুনলো। প্রতি উত্তরে কিছু না জানিয়েই চলে গেলো।
মাহিবা গুছিয়ে নিলো। আজ একবার কলেজে যাওয়া দরকার। সালেহা বেগম তাকে গোছাতে দেখে বললেন,"কোথায় যাচ্ছিস?"
"একটু কলেজে যাবো মা।"
"আহমাদকে বলতি। একা কেনো যাবি?"
"যে আমার দিকে তাকানোর সময় পায় না সে আমাকে নিয়ে কলেজ পর্যন্ত যাবে কিভাবে? সময়ের ক্রান্তিকাল চলছে মা। দেখি আফিয়া যায় নাকি।"
মাহিবা সম্পূর্ণ কথা শেষ করলো অন্যদিকে তাকিয়ে। সালেহা বেগম দেখলেন মাহিবার শান্ত মুখোশ্রীতে অভিমানের বিশাল এক পাহাড়।
আফিয়া যেতে পারলো না। তার আজকে পরীক্ষা আছে। মাহিবা একাই রওনা দিলো। সালেহা বেগম বললেন,"আমি যাই চল।"
"আপনাকে আর কষ্ট করতে হবে না মা। এমনিতেই এখন রান্নাবান্না আপনি করছেন। ইশুকেও আপনি দেখেন। আপনার নিজেরও তো একটু বিশ্রামের দরকার আছে। থাক আমি একাই যাই। পৃথিবীতে এসেছি একা, যাবো একা। কলেজ আর কিই বা হলো।"
মাহিবার মুখের মলিন হাসিটা সালেহা বেগমের বুক বড় বিধলো। মেয়েটা কি অনেক কষ্টে আছে?
অফিসের কাজ শেষ করে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরল আহমাদ। একটু পরে একবার ফ্যাক্টরিতে যাবে। সালেহা বেগম দরজা খুলে বেশ অবাক হলেন।
"কি রে! এত তারাতারি এলি যে?"
"মনে হচ্ছে খুশি হও নি।"
"না খুশি অখুশির কি আছে।"
আহমাদ ঘরে যেয়ে মাহিবাকে পেলো না। আশপাশে না দেখে সালেহা বেগমকে জিজ্ঞেস করলো।
"মাহি কই মা?"
"কলেজে গেছে।"
"একা?"
"হ্যাঁ।"
"এই অবস্থায় একা গেলো। আমাকে একবার বলে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করলো না?"
আহমাদের রোষপূর্ণ কথার বিপরীতে সালেহা বেগম শান্ত কণ্ঠে বললেন,"বলে যাওয়ার সুযোগটুকু তুই দিয়েছিস?"
মায়ের কণ্ঠের ধরণে আহমাদ চুপ করে গেলো। তার সাথে কি মাহিবার দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে?
সালেহা বেগম বললেন,"তুই এখন আছিস তো বাসায়?"
"হ্যাঁ। দুই এক ঘন্টা পর একটু ফ্যাক্টরিতে যাবো।"
"ততক্ষণ ইশিকাকে সামলা। আমি একটু রান্নাটা গুছিয়ে নেই। মাহি আজকাল কিছুই খেতে পারছে না। কাল তো রান্না করতে যেয়ে গন্ধে বমি করে ভাসিয়েছে।"
ইশিকাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো আহমাদ। সে এসবের কিছুই জানে না। কেনো? কেউ কেনো তাকে জানায়নি? নাকি সে নিজেই জানার চেষ্টা করেনি?
"আব্বা।"
ইশিকা ডাকলো। সেদিকে তাকালো আহমাদ। তার হাসি ছাড়া মুখ দেখে ইশিকা বলল,"আব্বা দুক্কু?"
আহমাদ হাসলো। ইশিকার গালে চুমু দিয়ে বলল,"না আম্মা।"
ইশিকা হাত তালি দিয়ে বলল,"আম্মা দুক্কু। আম্মা দুক্কু।"
আহমাদের কপালে ভাঁজ পড়ল। ঘরে যেতে যেতে বলল,"কি বলো মা?"
"আম্মা দুক্কু। আম্মা মানি।"
আহমাদের চোখে হাত দিয়ে বলল ইশিকা। আহমাদ বুঝলো। মাহিবা কেনো কান্নাকাটি করে?
পরের দুই ঘণ্টা যেনো আহমাদের উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেলো। ইশিকা একটুও ঘুমালো না। প্রথমে কাঁদতে শুরু করলে আহমাদ বুঝতে পারল না মেয়েটা আসলে কাঁদছে কেনো। সালেহা বেগম বললেন,"গাধার মত হা করে বসে না থেকে ওকে খাওয়া। দুইদিন পর বাচ্চার বাপ হবি। এমন গাধামি করলে বাচ্চা তোকে কোনোদিন বাপ ডাকবে ভেবেছিস? ইশুকে নেহায়েতই মাহি ডাকটা শিখিয়েছে।"
ইশিকার মুখে খাবার তুলে দিতেই শেষ কথাটুকু শুনে আহমাদ চমকে গেলো। মাহিবা ইশিকাকে এই ডাক শিখিয়েছে? চামচে সুজি নিয়ে থম মেরে গিয়েছিলো আহমাদ। ইশিকা ডাকলো। "আব্বা।"
ইশিকার দিকে তাকালে সেই দিনটার কথা আহমাদের স্পষ্ট মনে পড়লো।
"ও তোমাকে ডাকে। আমাকে কেনো ডাকে না?"
আহমাদ ভারাক্রান্ত মন বলেছিলো।
"জানিনা তো।"
"আম্মা আমাকে একবার ডাকো।"
নয় মাসের ইশিকাকে বুকে নিয়ে বললো আহমাদ। ইশিকা হাসিমুখে বলল,"আম্মা।"
আহমাদ হতাশ নিশ্বাস ছাড়লো। মাহিবা চুপ করে সেটা দেখলো।
সেই ঘটনার তিন দিনের মাথায় ইশিকা তাকে আব্বা ডাকতে শুরু করেছিল। আহমাদের খুশি দেখে সালেহা বেগম বলেছিলেন,"কি অবস্থা! এমন ঘোড়ার মত লাফাচ্ছিস কেনো? দেখি ইশুকে দে। ওকে তো ঠাস করে কখন ফেলে দিবি।"
আহমাদের তখন মনে হয়নি কেনো হুট করে ইশিকা তাকে ডাকতে শুরু করেছিল। এই ক্ষণে এসে সেটা পরিষ্কার হলো। ঐ তিনদিন মাহিবা তাকে ট্রেনিং দিয়েছে। আহমাদকে ডাকার ট্রেনিং।
ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে এসে আহমাদ দেখলো ইশিকা বিছানা ভিজিয়ে ফেলেছে। শুধু ভিজিয়েই ক্ষান্ত হয়নি। সেই বিশেষ পানি দুহাতে ছিটিয়ে জলকেলি করছে। আচ্ছা একে কি জলকেলি বলা যায়?
আহমাদ উত্তর উদ্ধারের সময় পেলো না। সুজি একপাশে সরিয়ে রেখে ইশিকাকে নিয়ে বাথরুমে চলে গেলো। তাড়াহুড়ো করে মেয়েটাকে সুন্দর করে না ধরার ফল হাতেনাতে পেলো। একেবারে তার বুকের ওপর সবটা খাবার বমি করে ঢেলে দিলো। আহমাদ হতাশ কণ্ঠে বলল,"কি করলে মা!"
ইশিকা আহমাদের ঘাড়ে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। আহমাদ বুঝলো তার খুব ক্লান্ত লাগছে। আচ্ছা গতকাল রাতে মাহিবারও কি এমন ক্লান্ত লাগছিলো?
ইশিকাকে গোছল করিয়ে নিজের শার্টটা খুলে বাথরুমে রেখে এলো আহমাদ। বিছানা পুরো এলোমেলো হয়ে আছে। বসার কোনো জায়গা নেই। আহমাদ বুঝলো না গোছানো বিছানা কোন ফাঁকে এমন এলোমেলো হয়ে গেলো। ইশিকাকে কোলে নিয়ে সোফায় বসলো। মেয়েটা কথা বলছে না।
"মা!"
"ইশু।"
ডাকটা শুনেই আর থাকতে পারলো না ইশিকা। ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,"আম্মা!"
আহমাদ বুঝলো ইশিকা মাহিবার কাছে যাওয়ার জন্য এমন করছে।
"আম্মা চলে আসবে তো। এইতো আরেকটু পরেই চলে আসবে। তুমি ঘুমাও। ঘুম থেকে উঠে দেখবে আম্মা চলে এসেছে।"
আহমাদের গলায় মুখ গুঁজে কাঁদছে ইশিকা। থেমে থেমে শুধু বলছে,"আম্মা! আম্মা!"
মেয়েকে বুকে নিয়ে আহমাদ হঠাৎই একটা দুয়া করলো।
"ইশুকে তুমি মাহির থেকে আলাদা করে দিও না আল্লাহ।"
কিছুক্ষণের মাঝেই ইশিকা ঘুমিয়ে গেলো। তাকে কোলে নিয়ে আহমাদের নিজেরও তন্দ্রা মতো এসেছিল। তবে সালেহা বেগমের কণ্ঠে ঘুম ঘুম ভাবটা কেঁটে গেলো।
"কি রে! ঘরে এতো বিশ্রী গন্ধ কেনো?"
বিছানার দিকে তাকাতেই বিষয়টা স্পষ্ট হলো।
"চাদরটা তুলে বাথরুমে রাখলেই তো আর এমন হয় না। মাহি কতো কষ্ট করে কাল পুরো ঘর গোছালো। ওকে তুই একটুও শান্তি দিস না আহমাদ। মাহিকে আমি আজই বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেবো।"
আহমাদ এক দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকলো। সালেহা বেগম চাদর উঠিয়ে আয়রন গরম করে বিছানার ভেজা অংশে রেখে দিলেন। সেখান থেকে ভাপ উঠছে। আহমাদের মাথায় ঘুরছে একটাই কথা।"ওকে তুই একটুও শান্তি দিস না আহমাদ।" সত্যিই কি তাই?
ইশিকাকে মায়ের ঘরে শুইয়ে আহমাদ গুছিয়ে নিলো। ফ্যাক্টরি থেকে ঘুরে আসা দরকার। আয়নার সামনে দাঁড়াতেই নিজের চেহারা দেখে তার নিজেরই মায়া লাগলো। দুই ঘণ্টা পুরো হয়নি ইশিকা তার কাছে আছে। এর মাঝেই তার চেহারার মানচিত্র পাল্টে গেছে। আর সবসময় তো দিনের বেলা মাহিবাই ইশিকাকে রাখে। বাচ্চাটাকে সামলাতে যেয়ে তার নিজের চেহারা দেখার সময়ই হয়তো হয় না। তার উপর এখন সে নিজেই সন্তানসম্ভবা। আয়নার দিকে তাকিয়ে আহমাদ দেখলো ভাবনায় বিভোর হয়ে শার্টের বোতাম উল্টাপাল্টা লাগিয়েছে সে। আচ্ছা মাহিবাকে কি একবার ফোন করবে? চট করে কল দিলো। ফোন বাজতে বাজতে কেঁটে গেলো। দুই বার এমন হলে আহমাদ আর কল দিলো না। হতে পারে মাহিবা ব্যস্ত। আজকাল তো প্রায়ই তার সাথেও এমন হয়। মাহিবা কল দিলে দশ বারে একবার ধরার সময় পায় সে। এতটাই ব্যস্ত যে মাহিবার নতুন নাম্বারটা এখনও সেভ করা হয়নি। মনে হতেই নাম্বারটা সেভ করে নিলো আহমাদ। এক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো সেই নামটার দিকে।
•
বাড়ি ফিরে চাদর ছাড়া বিছানা দেখে মাহিবার ক্লান্তি যেনো এক ধাপ বেড়ে গেলো। এখন এই বিছানা গোছাতে হবে ভেবেই মুখটা বিরক্তিতে ছেয়ে গেলো। মন চাইলো ইশিকাকে কষে একটা ধমক দিতে। কিন্তু বাচ্চা মেয়েটার আর কি দোষ। কিছুই গোছালো না মাহিবা। বালিশ নিয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়লো। তার খুব ক্লান্ত লাগছে।
সালেহা বেগম এক গ্লাস বেলের শরবত এনে মাহিবাকে ডাকলেন।
"এই মাহি! ওঠ। ঠান্ডা ঠান্ডা আছে,খেয়ে নে। ওঠ ওঠ!"
মাহিবা বিনা বাক্য ব্যয়ে শরবতটা খেয়ে নিলো।
"ইশু কই মা?"
"আমার ঘরে। ঘুমায়।"
মাহিবা আবার শুয়ে পড়ছিল। সালেহা বেগম বললেন,"সাহেদ ভাই,আপা দুজনেই সমানে ফোন দিয়ে যাচ্ছে। ওরা ভাবছে আমি মনে হয় তোকে আটকে রেখেছি। আমি বলছি আপনারা চাইলে মেয়েকে নিয়ে যান। তুই নাকি যেতে চাচ্ছিস না?"
মাহিবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,"আজকে যাবো মা?"
সালেহা বেগম পুত্রবধূর চেহারা পড়ার চেষ্টা করলেন। শুধু বললেন,"যা।"
মাহিবা শুয়ে পড়লো। চোখ বন্ধ করে কান্নাদের আটকে দিল। কিছুক্ষণ পর আহমাদকে ফোন দিলো। আহমাদ ধরবে না ভেবেই দিয়েছিলো। তাই হলো। শেষে একটা মেসেজ পাঠিয়ে দিলো।
"আমি কিছুদিন ঐ বাড়ি থেকে ঘুরে আসি।"
অভিমানের প্রগাঢ়তা এতোই ছিলো যে মাহিবা অনুমতি নেওয়ার বদলে শুধু জানিয়ে দিলো। ফিরতি কোনো মেসেজের অপেক্ষা করলো না। সন্ধ্যার আগেই সাহেদ সাহেব এসে মেয়েকে নিয়ে গেলেন।
রাতে বাড়ি ফিরে আহমাদ বুঝতে পারলো সালেহা বেগম তার হু-ম-কি সত্য প্রমাণিত করেছেন। ফোনের দিকে তাকিয়ে আফসোস হলো। কেনো সে ফোনটা সাইলেন্ট করে রাখতে গেলো!
•
উত্তরের অপেক্ষা করছে আফিয়া। উত্তরটা আহামরি কিছু নয়। আফতাবের কথা শোনাটাই মুখ্য। আফতাব সম্ভবত আজ একটু বেশীই ব্যস্ত। নয়তো একটা টেক্সট এর রিপ্লাই দিতে এতটা সময় সে কখনোই নেয় না। ডেটা অফ করার মিনিটের মাথায় কল এলো। অবহেলায় ফোনটা হাতে নিলো আফিয়া। আফতাব ফোন করেছে। কেঁটে দিয়ে হোয়াটস অ্যাপে ফিরতি কল করলো সে। আফতাবের ক্লান্ত কণ্ঠ শোনা গেলো।
"কেমন আছেন আফিয়া?"
আফিয়া চোখ বন্ধ করলো। মাঝে মাঝে নিজেকে তার বেহায়া মনে হয়। আফতাবের সাথে তার পরিচয় খুব বেশি হলে মাসের কাছাকাছি। এরই মাঝে লোকটার উপর সে এতখানি নির্ভর হয়ে পড়েছে যে কন্ঠটা না শুনলে অস্থির লাগে। ধাতস্থ হয়ে আফিয়া বলল,"ভালো আছি। আপনার কি অবস্থা?"
"আমার আর অবস্থা। এই আছি।"
"চারপাশে তাকিয়ে দেখুন,অনেকের থেকে অনেক ভালো আছেন। আলহামদুলিল্লাহ বলুন।"
"আলহামদুলিল্লাহ। মাঝে মাঝে তুমি যে এভাবে কথা বলো তখন তোমাকে একদম অন্য মানুষ মনে হয়।"
আফতাবের হাসি মুখের কথা শুনে আফিয়া চুপ করে গেলো। আফতাব বিষয়টা বুঝতে পেরে বলল,"সরি। স্লিপ অফ টাং। মনের কাছাকাছি যে থাকে সম্বোধনে কি আর তাকে দূরে রাখা যায়?"
আফিয়া বুঝলো না ভয়ংকর এই প্রশ্নের উত্তরে সে কি বলবে। কিছু না বলার সিদ্ধান্তে অটল রইলো। মাঝে মাঝে চুপ থাকতেই ভালো লাগে।
•
অফিসের একজনের আজ প্রথম বিবাহ বার্ষিকী থাকায় সবাইকে সে মিষ্টিমুখ করিয়েছে। কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আহমাদ আর ইফাদ অবশ্য বাড়তি খাতির পেয়েছে। মিষ্টি দেওয়ার পাশাপাশি সেই ব্যক্তি তাদেরকে বেশ কিছু চকলেট উপহার দিয়েছে। মিষ্টি আহমাদ পছন্দ করে না। চকলেটগুলো আয়িশার জন্য নিয়ে এসেছে। বাড়ি ফিরে এখন ঘরটায় থাকতে একদমই ভালো লাগে না। কেমন একটা হাহাকার তৈরি হয় মনে। ইশিকার চিৎকার অথবা মাহিবার হঠাৎ ধমকে ওঠা, ওগুলো যেনো অনাকাঙ্ক্ষিত নয়। খুব কাঙ্ক্ষিত সেই কোলাহলের অনুপস্থিতি আহমাদকে যেনো নতুন করে ভাবায়। জীবনটা আসলে কি? পরিবারের যাবতীয় কোলাহল শোনার এক অদ্ভুত আকাঙ্ক্ষা।
"দাদাভাই। ডেকেছিলে?"
আহমাদের ভাবনার সুতো ছিঁড়ল।
"হ্যাঁ। তোর তো আজকাল দেখাই পাওয়া যায় না। অমাবস্যার চাঁদ হয়ে গেছিস।"
"অমাবস্যায় চাঁদ ওঠে না দাদাভাই। আমি সারাদিনই বাড়িতে ঘুরি। আম্মু বলে আমি চরকি হয়ে গিয়েছি। কিন্তু তুমি যদি আমাকে দেখতে না চাও তাহলে দেখবে কিভাবে?"
আহমাদ যেনো থমকে গেলো। দেখতে না চাইলে দেখবে কিভাবে? কি কঠিন কথা!
"কথা তো দারুন শিখেছিস।"
"তা শিখেছি। সবই তোমার গুণবতী বউয়ের কেরামতি।"
মাথা নেড়ে বলল আয়িশা। আহমাদ হেসে চকলেটের প্যাকেট নিয়ে বলল,"নে,অনেকদিন হলো তোকে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয় না।"
ভাইয়ের পাশে এসে বসলো আয়িশা। চকলেটের প্যাকেট হাতে নিয়ে বলল,"তোমার মনে আছে দেখে খুশি হলাম। আমি তো ভেবেছিলাম আমি যে তোমার একমাত্র ছোটো বোন সেটা তুমি ভুলে যাচ্ছো।"
আহমাদ বোনের দিকে তাকালো। ছোট্ট বোনটা কতো তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাচ্ছে।
"এগুলো কিসের চকলেট?"
"কিসের মানে?"
"যেভাবে বক্স করা মনে হচ্ছে উপহার পেয়েছো।"
আয়িশার বুদ্ধি দেখে আহমাদ প্রকৃতই অবাক হলো।
"একজনের ম্যারেজ ডে ছিলো। সে সবাইকে উপহার দিয়েছে।"
আয়িশাকে কিছুটা গম্ভীর দেখালো। মুখের হাসিটা গায়েব হয়ে গেলো সহসাই।
"ম্যারেজ ডে পালন করা কি আল্লাহ পছন্দ করে দাদাভাই?"
"জানিনা তো।"
আহমাদ এমন প্রশ্ন আশা করেনি। কিছুটা চমকালো সে।
"নবীজী কখনও পালন করেছেন?"
"না।"
এটা আহমাদ জানে। আয়িশা বলল,"তাহলে আল্লাহ পছন্দ করে না। আল্লাহর অপছন্দের জিনিস আমি খাবো না। আমি আল্লাহর ভালোবাসা চাই।"
চকলেটের প্যাকেটটা সন্তর্পনে রেখে আয়িশা চলে গেলো। তার পছন্দের যেই চকলেটটা ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছিল সেটার দিকে ফিরেও তাকালো না। আহমাদ ভাবার জন্য চমৎকার একটা বিষয় পেলো। আল্লাহর ভালোবাসা!
চলমান।