প্রাপ্তি (দ্বিতীয় অধ্যায়) — পর্ব ০৮

লেখক: বিনতে ফিরোজ · পর্ব ০৮ · ২৫ পর্বের মধ্যে ৮

হঠকারিতা মাহিবার স্বভাবে নেই। চুপচাপ কতক্ষণ কন্ঠটা চেনার চেষ্টা করলো সে। নিউরনে সিগন্যালের লাল রং পৌঁছে গেলেও কোনো মুখ ভেসে উঠলো না। শান্ত তরঙ্গের মত কণ্ঠে বলল,"কে বলছেন?"

"আশ্চর্য! আপনি ফোন দিয়েছেন আর আমাকে জিজ্ঞেস করছেন কে বলছি?"

"আমি আপনাকে ফোন করিনি। যার ফোন তাকেই করেছি। আপনি কেনো আরেকজনের ফোন ধরেছেন?"

"লিসেন মিস! এই ফোন ধরার রাইট আমার আছে। ফালতু আলাপের ইচ্ছে থাকলে অন্য কারো কাছে ফোন দিন। এটা ব্যস্ত মানুষের নাম্বার।"

খট করে কলটা কেঁটে গেলো। মাহিবার কানে ঘুরপাক খেলো একটাই কথা,"এই ফোন ধরার রাইট আমার আছে।"

তাহমিনা রেগেমেগে একাকার। কোনো কাজ নেই নাকি এদের? আননোন নাম্বারে ফোন দিয়ে আলাপ জমানোর চেষ্টা করছে। কি ফালতু! আয়নায় নিজেকে আরেকবার দেখে নিলো। আজকে ওড়নাটা একপাশে নিয়েছে। নিয়ে বেশ ভালই হয়েছে। মনে হচ্ছে তার লুকানো সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। অবশ্য হিমানী তাকে এই কথা আগেই বলেছে।

"তুমি একটু খোলামেলা চললে তো কেউ তোমার দিক থেকে চোখই ফেরাতে পারবে না তাহু!"

কথাটা মন করে তাহমিনার ঠোঁটে হাসি খেলে গেলো। ঘড়ির দিকে তাকালো সে। মিটিং শেষ হওয়ার সময় হয়ে এসেছে। এক কাপ চা বানিয়ে আনবে কি? আহমাদ কি পছন্দ করে? চা নাকি কফি? দুটোই বানিয়ে আনা যাক। যেটা খায় খাবে। দ্রুত ক্যান্টিনের দিকে গেলো তাহমিনা। চট করে দুটো কাপে কফি আর চা নিয়ে এলো। ততক্ষণে আহমাদ তার কেবিনে ফিরেছে। সাথে আছে ইফাদ। তাহমিনা ঢুকে পড়লে আহমাদ শান্ত কণ্ঠে বলল,"অনুমতি ছাড়া রুমে ঢোকাটা আমার পছন্দ নয়।"

শোনার সাথে সাথেই দরজার কাছে চলে গেলো তাহমিনা। নরম স্বরে বলল,"মে আই কাম ইন স্যার?"

ইফাদ মুখ ভেংচি দিলো। বিড়বিড় করে বলল,"ঢং!"

তাহমিনা কাপ দুটো টেবিলে রাখলো।

"স্যার! আপনার জন্য!"

"মানুষ চা,কফি সব একসাথে খায় নাকি? জানতাম না তো!"

ইফাদ রগড় করলো। কেনো যেনো সে এই মেয়েটাকে দেখতেই পারে না। কি মনে করে আহমাদ তাকে কাজে নিয়েছে ইফাদ জানে না।

"স্যার কি খান সেটা তো আমি জানিনা তাই দুটোই বানিয়ে এনেছি।" ইতঃস্তত করে বলল তাহমিনা। আহমাদ বলল,"আমার খাওয়া নিয়ে আপনাকে টেনশন করতে হবে না। আপনার যেটা কাজ সেটা করুন। যান।"

তাহমিনা চলে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই আহমাদ বলল,"এই কাপ দুটো নিয়ে যান।"

তাহমিনা কষ্ট পেলো। এত কষ্ট করে সে বানিয়ে আনলো,আহমাদ একটুও খাবে না? মনে দুঃখ নিয়ে চলে গেলো সে। একবার আহমাদের দিকে তাকালো। এত কথার মাঝে সে একবারও তার দিকে তাকায়নি। ল্যাপটপে মুখ গুঁজে রেখেছে তো রেখেছেই।

তাহমিনা চলে যেতেই ইফাদ বলল,"এসব মেয়েমানুষ হায়ার করার কি দরকার ছিল? হুদাই প্যাঁচাল।"

ইফাদের চোখে মুখে বিরক্তি। আহমাদ বলল,"কাজের ক্ষেত্রে ছেলে মেয়ে ম্যাটার করে না। সে এই পোস্টের জন্য যোগ্য ছিলো। তাই তাকে হায়ার করা হয়েছে। নাথিং এলস।"

"এলস যখন চৌদ্দ গুষ্ঠি নিয়ে হাজির হবে তখন তুমি বুঝবা!" বিড়বিড় করলো ইফাদ। টেবিলে রাখা নীল রঙের ফাইলটা নিয়ে চলে গেলো। কক্ষ ফাঁকা হতেই নিজের ফোন হাতে নিলো আহমাদ। কাল রাত থেকে মাহিবার সাথে ঠিকমতো কথা হয়নি। এর মাঝেই কল লিস্ট মাহিবার নতুন নাম্বারটা দেখলো। সেভ করবো করবো বলেও এটা সেভ করা হয়নি। সাতাশ মিনিট আগে কল এসেছিল। হিস্টোরি বলছে ছাপ্পান্ন সেকেন্ড কথা হয়েছে। কে কথা বলল? আহমাদের কপালে ভাঁজ পড়ল। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে মাহিবার কাছে ফোন দিলো সে। মাহিবার শান্ত কণ্ঠের সালাম শোনা গেলো। উত্তর নিয়ে আহমাদ ভাবলো কাল রাতের জন্য মাহিবা এখনও রাগ করে আছে। এমন তো কখনও করে না। তার গলার স্বরও পাল্টে গেলো।

"ফোন দিয়েছিলে কেনো?"

মাহিবা চুপ করে রইলো। আহমাদ বলল,"হ্যালো?"

"আপনার ফোনে আমি এখনো অপরিচিতার লিস্টে আছি জানলে ফোন দিতাম না।"

আহমাদ ভুরু কুঁচকে নিলো। "এসব কি কথা?"

"এখন কি আপনাকে ফোনও দিতে পারব না? নাকি আমি ফোন দিলে আপনার আশেপাশের কেউ বিরক্ত হয়?"

"তোমার কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। একটা জিনিস তুমি কেনো এতো প্যাচাচ্ছো সেটাই বুঝত পারছি না।"

খট করে ফোন কেঁটে দিলো আহমাদ। তার মেজাজ খারাপ হয় গেছে। আফিয়ার বিষয়টা নিয়ে মাহিবা এখনও এমন করে কথা বলছে! রাগের তোপে আহমাদ ভুলে গেলো সে ফোন দিয়েছিলো মাহিবাকে খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিতে। আজ যেনো তার জন্য অপেক্ষা না করে।

টেবিলে রাখা খাবারগুলো ঢেকে উঠে দাঁড়ালো মাহিবা। ভাতটা ঢেলে রাখা দরকার। নয়তো গরমে নষ্ট হয়ে যাবে। সব কাজ শেষ করে ঘরে যেতেই তৎক্ষণাৎ আবার ফিরে এলো। একটা প্লেটে কিছু ভাত নিয়ে খেয়ে নিলো। রাগটা আরেকজনের সাথে। তার নিজের মাঝে বেড়ে উঠতে থাকা প্রাণের উপর এমন অন্যায় করার অধিকার তার নেই।

রেস্টুরেন্টটা বেশ সাজানো গোছানো। আফিয়ার পছন্দ হলো। আফতাব বলল,"কি নেবেন?"

"কিছু একটা নিলেই হলো।"

অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল আফিয়া। তার নজর ছাদে ঝোলানো ঝাড়বাতির দিকে। আফতাব সেটা খেয়াল করে বলল,"আমার জীবনে যে শোভা বাড়াতে আসছে তার নিজস্ব পছন্দ আমাকে কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ঝাড়বাতির আড়ালে সেটাকে চাপা পড়তে দিতে চাচ্ছি না।"

আফিয়া বেশ হকচকিয়ে গেলো। আফতাবের এমন সরাসরি কথা সে আশা করেনি।

"একটা কোল্ড কফি।"

"ব্যস?"

"জি।"

"আমি শুনেছিলাম আপনার নাকি মিষ্টি অনেক পছন্দ?"

আফিয়া বেশ বিস্মিত হলো। সেটা তার চোখ মুখে ফুঁটে উঠলো। আফতাব সেটা দেখে হাসলো।

"আপনি কিভাবে জানলেন?"

"এভাবেই।"

কাধ ঝাঁকালো আফতাব। উঠে কেবিনের বাইরে গেলো। সেদিকে তাকিয়ে থাকলো আফিয়া। আফতাবের কথা,কাজ তাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে একটা শপিং মলে ঢুকলো তারা। আফিয়া বলল,"আমরা এখানে এলাম কেনো?"

"সামনের সপ্তাহে আমার এক বন্ধুর বিয়ে। তার জন্য একটা গিফট নেয়া দরকার।"

"তাহলে আমাকে বিদায় দিন। আমি চলে যাই।"

"আপনাকে তো আমি বিদায় দিতে চাচ্ছি না মিস। না এভাবে না সেভাবে।"

আফিয়া লজ্জা পেলো। তবে তার মুখ ঢাকা থাকায় সেটা দেখতে পেলো না আফতাব। গতকালকের পর তার মনে হয়েছে মুখ খুলে বাইরে গেলে আফতাব এবং তার পরিবারের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে তাকে। যে মেয়ে দুইজন পুরুষের সামনে যায় না সে কিভাবে রাস্তার হাজার হাজার মানুষের সামনে মুখ খুলে যেতে পারে। এমন প্রশ্ন ওরা করলে আফিয়া উত্তর দিতে পারবে না। সেজন্য আজ আফতাবের সাথে দেখা করতে আসার সময়ই সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবার থেকে মুখ ঢাকা শুরু করবে সে।

বন্ধুর জন্য কেনাকাটা শেষ হলে আফিয়ার জন্য কিছু নিতে চাইলো আফতাব। সেই ইচ্ছা ব্যক্ত করতেই আফিয়া কড়া সুরে নিষেধ করলো। বলল,"আমাদের এখনও দেয়া নেয়ার সম্পর্ক তৈরি হয়নি। আর না যখন তখন দেখা সাক্ষাতের। আজ নেহাতই প্রথম দিন বলে আমি নিষেধ করতে পারিনি। আশা করি আপনি বিষয়টা বুঝতে পারছেন।"

"পারছি। আপনি আমি চাইলেও আগামী একমাস এভাবে দেখা করা সম্ভব না। আগামী দশদিন খুবই টাইট শিডিউলের মাঝে থাকতে হবে। তারপর মা-কে নিয়ে চেকআপের জন্য ইন্ডিয়া যেতে হবে। বলতে গেলে আজকে আপনি আমাকে সি অফ করতে এসেছেন।"

হাসিমুখে বলল আফতাব। আফিয়ার নিষেধটা তার ভালো লেগেছে। সেখানে আত্মসম্মানের ছোঁয়া ছিলো।

আফিয়া যেনো একটু দমে গেলো। দুটো সাক্ষাতেই আফতাব নিজের ব্যক্তিত্বের অনেকখানি প্রকাশ করেছে যেটুকু আফিয়াকে দুর্বল করতে সক্ষম। আগামী এক মাসের জন্য আফতাব দৃষ্টির আড়ালে চলে যাচ্ছে। ভাবনাটা তার মন খারাপ করে দিলো। বাকি পথটুকু আর কোনো কথ বলল না সে। তাকে রিকশায় তুলে দেয়ার সময় আফতাব বলল,"নিজের যত্ন নেবেন।"

একটু থেমে বেশ নিচু কণ্ঠে বলল,"আমাদের আবার দেখা হোক।" আফিয়ার শ্বাস আটকে এলো। আফতাবের কথার মর্মোদ্ধার করতে তার ন্যানো সেকেন্ড সময়ও লাগলো না।

আহমাদ এলে মাহিবা হাসিমুখে দরজা খুলল। শুধু সেই জানে হাসিটুকু টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আসা। তবে সেই হাসির বিপরীতে আজ আর আহমাদকে হাসতে দেখা গেলো না। মাহিবা শব্দ করলো না। সবকিছুর বিনিময় লের হবে এমন কোনো কথা নেই।

খেতে বসেও আহমাদ বিশেষ কিছু বলল না। তবে সালেহা বেগম যখন এসে বললেন,"তুই জানিস আজ আফিকে আফতাব ডেকে নিয়ে গেছিলো?"

"জানি। আমাকে ফোন দিয়েই ও অনুমতি নিয়েছে।"

আহমাদের স্বর শোনা গেলো। সালেহা বেগমের কণ্ঠ গম্ভীর ছিলো। এবার সেটা কর্কশ হয়ে গেলো।

"ও অনুমতি চাইলো আর তুই দিয়ে দিলি? চেনা নেই জানা নেই একটা ছেলের সাথে ওকে পাঠিয়ে দিলি? তোর আক্কেলজ্ঞান দেখে আমি অবাক হচ্ছি।"

"চেনা জানা নেই এমন ছেলের সাথে দুই ঘণ্টা কাঁটিয়ে এসেছে বলে তুমি অস্থির হচ্ছো। সেই একই ছেলের সাথে যখন সারাজীবন কাঁটাবে তখন তোমার কেমন লাগবে?"

"আবোল তাবোল বকবি না। বিয়ে হলে তখন সারাজীবন কাঁটানোর প্রশ্ন আসবে। তখন ছেলেটা তোর বোনের স্বামী হবে। এখন কি হয়? যা করবি বুঝেশুনে করবি। পরে যেনো পস্তাতে না হয়।"

আহমাদ কোনো উত্তর দিলো না। শান্ত মুখে খাওয়া শেষ করলো সে। এর মাঝে মাহিবা একটা শব্দও করেনি। একই কথা দুবার শোনার ইচ্ছে তার নেই।

শোয়ার সময়ও আহমাদ মাহিবার সাথে বিশেষ বাক্যালাপ করলো না। সে সম্ভবত ভুলে গেছে তার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা। তবে মাহিবা ভোলেনি। বলা ভালো ভুলতে পারেনি। গতদিনের বাক্য,আজকের কণ্ঠ সবটাই তার কাছে অপরিচিত ছিলো। সেই অপরিচিত কষ্টগুলো মিশে একাকার হয়ে তার মন থেকে শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। মাঝরাতে কারো আর্তনাদ শুনে ঘুম ছেড়ে ধড়মড় করে উঠে বসলো আহমাদ। পাশে তাকাতেই তার গলা শুকিয়ে এলো।

চলমান।