প্রাপ্তি (দ্বিতীয় অধ্যায়) — পর্ব ১৮
লেখক: বিনতে ফিরোজ · পর্ব ১৮ · ২৫ পর্বের মধ্যে ১৮
মাহিবার কোলে ঘুমিয়ে আছে ইশিকা। হাসপাতালের দিনগুলোতে তাকে নাজমা বেগমের কাছে রেখে এসেছিল মাহিবা। বাড়ি এসে মেয়েটাকে কোলে নেওয়ার পর মনে হলো কতদিন পর এই মেয়েটার স্পর্শ পেলো সে। নিজেকে নিয়ে ভয় পায় মাহিবা। এই মেয়েটাকে ছাড়া যে তার কি পরিমান কষ্ট হবে সেটা সে নিজেও জানে না। আল্লাহর কাছে শুধু দোয়া করে সে। কি যে দোয়া করে সেটাও সে জানেনা। একেকবার একেকরকম দোয়া। তো সবসময় কমন যেই বিষয়টি থাকে সেটা হলো দূরত্ব। ইশিকার সাথে যেনো কখনও তার দূরত্ব না তৈরি হয় সেটাই ঘুরে ফিরে চায় মাহিবা।
স্ত্রীর চোখে পানি দেখে আহমাদ বললো,"কাঁদছো কেনো?"
"কাঁদছি না।"
"তাহলে চোখে পানি কেনো?"
মাহিবা বুঝতে পারেনি কখন তার চোখে পানি এসে গেছে। বিব্রত বোধ করলো সে।
"কি জানি কি.."
"ইশিকাকে নিয়ে এতো টেনশন করো কেনো?"
"আমি ওকে ছাড়া থাকবো কিভাবে?"
দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়ে আহমাদ। এই প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই।
•
নাজমা বেগমের দিকে তাকিয়ে মাহিবা বললো,"আপনাকে অনেক বেশি বয়স্ক লাগছে আম্মা।"
"বয়স হইলে তো বয়স্কই লাগবো বউ। চুল পাইক্যা গ্যাছে দেখো না? সময় তো ফুরায় আসতাছে।"
"রোগীর সামনে এসব কথা বলা ঠিক?"
গম্ভীর কণ্ঠে বললো আহমাদ। নাজমা বেগম হেসে ফেললেন।
"তোমার জন্যে বেলের শরবত আনছি মানিক। আমার সামনে খাও দেখি।"
"বেলের শরবত কেনো?"
"তোমার মায় কইসে তোমার নাকি হজমের সমেস্যা। হাসানরে দিয়ে মাত্র পাইরা বানায় আনছি। একদম টাটকা। খাও তো দেখি।"
আহমাদ মাহিবার দিকে তাকালো। এই কথাটা নিশ্চয়ই মাহিবা যেয়ে মায়ের কাছে বলেছে। সুড়সুড় করে নাজমা বেগমের পিঠের পেছনে যেয়ে বসলো মাহিবা। আহমাদ নাকমুখ কুচকে শরবত খেলো। বেলের শরবত জিনিসটা তার একেবারেই পছন্দ না। কিন্তু একটা মানুষ শুধুমাত্র তার জন্য এতো কষ্ট করে জিনিসটা বানিয়ে এনেছে। সেটা ফিরিয়ে দেওয়ার মতো অমানবিক সে না।
"অখন দেখবা। সকাল হওনের আগেই প্যাট কিলিয়ার হইয়া যাইবো।"
আহমাদ ঢেঁকুর তুললো। ইশ কি বিশ্রী!
"আমি যাই বউ। বিকালে একবার যাইও। মাইয়ারা তোমারে দেখতে চায়।"
"যাবো আম্মা। ইনশাআল্লাহ।"
নাজমা বেগম চলে গেলে আহমাদ টেনে টেনে বললো,"আমার হজমের সমেস্যা দুর করার জন্যে অনেক ধন্যবাদ বউ।"
"আমি তো শুধু মাকে বলেছি।"
"শুধু মাকে বললে কেনো? আহা! একটা মাইক হাতে নিলে একেবারে সবাইকে জানানো যেতো। তোমার এখনও বুদ্ধি হলো না মাহি।"
আহমাদ কাপড় পাল্টাচ্ছে। মাহিবা মিনমিন করে বললো,"আপনি কোথায় যাচ্ছেন?"
"ফ্যাক্টরিতে পুলিশ এসেছে। কিভাবে আগুন লাগলো যাচাই বাছাই করবে। দেখি ঘুরে আসি।"
•
ঘটনা শুনে আহমাদ অবাকের চূড়ান্ত হলো। রশিদ মিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,"আপনি এই কাজ কেনো করলেন ভাই?"
রশিদ মিয়া অবহেলা ভরে অন্যদিকে তাকিয়ে বললো,"মানুষের সুখ দেখতে পারি না ভাই। বুকের মধ্যে জ্বালাপোড়া করে। তাই।"
আহমাদ হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। পুলিশ অফিসার ধমকে উঠলেন।
"ইয়ার্কি মারো! আমাদের সাথে ইয়ার্কি!"
"ইয়ার্কি মারি না স্যার। কথা সত্য। মানুষের সুখ দেখলে আমার মাথা ঠিক থাকে না। এর আগে যার দোকানে কাজ করতাম সেই লোকটা ছিলো গরীব। কিন্তু খাটতে খাটতে ভালোই আয় রোজগার করতে শুরু করলো। জমি কিনলো, বাড়ি করলো। তাই দেখে আমার মাথা গেলো নষ্ট হয়ে। একদিন ক্যাশ বাক্সের সব টাকায় আগুন ধরায় দিলাম। টাকা পয়সা মেলাই ছিলো। ওস্তাদ ব্যাংকে নিয়ে যাবে। প্রায় লাখ খানেক টাকা। স্যার আমি তো টাকা চুরিও করতে পারতাম তাই না? কিন্তু করি নাই। আসলে আমি চোর না। কিন্তু মানুষের সুখ দেখতে পারি না। তারপর হইলো কি পোড়া টাকা দেখে ব্যাটা হার্টফেল করলো। হাসপাতালে ভর্তি। খরচ হইলো আরো লাখ খানেক টাকা। তারপর আমি মনে শান্তি নিয়ে চলে আসলাম। এই স্যারও ফাঁকা ফ্যাক্টরি শুরু করলো। দুইজন দুইজন হইতে হইতে মানুষ হইলো চল্লিশ। প্রতিদিন গাড়ি বোঝাই জামা কাপড় হয়। মার্কেটেও ডিমান্ড ভালো। আমার বুক জ্বালা করা শুরু করলো। দিলাম মেশিনে আগুন ধরায়ে। কাহিনী এইটাই স্যার। আর কিছু না।"
আহমাদ এবং পুলিশ অফিসার দুজনেই অবাকের চূড়ান্ত হলেন। আহমাদ অবাক সুরে বললো,"আমি তো আপনার কোনো ক্ষতি করিনি। কোনো মাসের বেতন কমও দিইনি। আপনার কাজ দেখে আরো বাড়িয়েছি।"
"জি এই কথাও সত্য। কিন্তু ঐ যে বললাম আমি মানুষের সুখ সহ্য করতে পারি না। এইটাই কারণ। আর কিছু না।"
লোকটাকে সরিয়ে নেওয়া হলো। অফিসার বললেন,"আমার ধারণা হচ্ছে লোকটা মানসিক ভাবে সুস্থ না।"
"আমিও তাই ভাবছি। আপনি তাকে কি করবেন স্যার?"
"আপনি চাইলে মামলা দিতে পারবেন। শক্ত প্রমাণ আছে। লোকটা নিজের মুখে স্বীকার করেছে।"
"একজন অসুস্থ মানুষকে শাস্তি দেওয়ার কোনো মানে হয় না। এতে তার অসুস্থতা আরো বাড়বে। আপনি যদি লোকটার ব্যকগ্রাউন্ড বের করতে পারেন তাহলে আমা খুব উপকার হয়।"
"আপনি কি করতে চাইছেন?"
"লোকটার আর কিছু হিস্ট্রি জানলে তার প্যাটার্ন ধরতে সুবিধা হবে। আর তাকে দেখে মনে হচ্ছে না সে আমাদের কাছে কিছু লুকাতে চায়। আমি তার সাথে আরেকদিন কথা বলতে চাই। যদি আপনি অনুমতি দেন।"
অফিসার উঠে বললেন,"আপাতত তাকে জেলে রাখতে হবে। কোথায় না কোথায় আবার চলে যায়। আমি তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবো। আসি।"
"আসসালামু আলাইকুম স্যার।"
"ওয়ালাইকুমুস সালাম।"
আহমাদ ভাবতে বসলো। এই পৃথিবীতে কত রকম মানুষ। রশিদ মিয়া নিশ্চয়ই বিনা কারণে এমন হয়নি। কিন্তু কারণটা কি? আহমাদ নিজের ভেতরে কৌতূহল অনুভব করলো।
চলমান।