প্রাপ্তি (দ্বিতীয় অধ্যায়) — পর্ব ২৪
লেখক: বিনতে ফিরোজ · পর্ব ২৪ · ২৫ পর্বের মধ্যে ২৪
"বাচ্চা কাচ্চা হওয়ার কথা শুনলেই মানুষ বাপের বাড়ি চলে যায়। তোর চার পাঁচ মাস হয় যাচ্ছে ওদিকে যাওয়ার নামই নেই।"
সাহেদ সাহেব হাসতে হাসতে বললেন। সেই হাসি প্রমাণ করে মেয়ে তার বাপের বাড়িতে না যাওয়াতে তিনি যতোটা না দুঃখিত তার চেয়ে অনেক বেশি খুশি। মেয়ে তার নিজের বাড়িতে ভালো আছে, সুখে আছে এটা সম্ভবত একজন বাবার সর্বোচ্চ আকাঙ্ক্ষা।
মাহিবা হাসার চেষ্টা করলো। স্পষ্ট বুঝতে পারলো আসলে তার হাসি আসছে না। আহমাদ ঘর থেকে বের হয়নি। কি করছে সে?
ভাবতে না ভাবতেই আহমাদ এলো। চোখমুখ স্বাভাবিক করে শ্বশুরের সাথে গল্প শুরু করলো। সেই গল্প "চন্দ্রমল্লিকা"র ডায়নিং ছেড়ে হোয়াইট হাউস পর্যন্ত চলে গেলো। মাহিবা মানুষটাকে গভীর চোখে দেখার চেষ্টা করলো। পড়তে চেষ্টা করলো তার চোখের ভাষা। হঠাৎ করেই সে আবিষ্কার করলো সে আসলে ততক্ষণ আহমাদকে বুঝতে পারে না যতক্ষণ না সে নিজে থেকে তাকে বুঝতে দেয়।
ঘরে যেতেই সালেহা বেগম এলেন। বললেন, "আপা কবে থেকেই যাওয়ার কত বলছেন।"
শাশুড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে মাহিবা বুঝতে পারলো তিনি চাচ্ছেন না মাহিবা যাক। মোক্ষম একটা সুযোগ পেলো মাহিবা।
"আপনি বললে আমি না যাই। সমস্যা নেই মাকে আমি বুঝিয়ে বলব।"
"না না! যাবি না কেনো? এই সময়ে সব মেয়েই মায়ের কাছ থাকতে চায়। মায়ের যত্ন-আত্তি চায়। আমিও আহমাদ আফিয়া দুজনের সময়েই আমার মায়ের কাছে ছিলাম। আয়িশার সময় অবশ্য যাওয়া হয়নি। থাক ওসব কথা। তুই যা ঘুরে-টুরে আয়।"
সালেহা বেগম চলে গেলে আহমাদ এলো। এক পলকের জন্যেও তার দিকে তাকালো না। মাহিবার মনটা হু হু করে উঠলো।
"শুনুন!"
"ব্যাগ গোছানো হয়েছে?"
"আমার কথাটা একবার শুনুন।"
"আমি কাপড় বের করছি। কোনটা নেবে নিয়ে নাও।"
"আমি যাবো না।"
ট্রলি নার করলো আহমাদ। মাহিবার কথার কোনো জবাব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলো না সে।
"আমি যাবো না।" কণ্ঠে চূড়ান্ত আকুতি নিয়ে বলল মাহিবা। আহমাদ নিজেই মাহিবার কাপড়-চোপড় গুছিয়ে দিলো। বোরখা এগিয়ে দিয়ে বলল, "পড়ে নাও। তোমাদের এগিয়ে দিয়ে আমাকে অফিসে যেতে হবে।"
"আমি এভাবে যাবো না। প্লিজ!"
আহমাদের হাত ধরে বলল মাহিবা। শক্ত কণ্ঠে আহমাদ বলল, "যাও মাহি। ঘুরে এসো।" সেই স্বরে কি ছিল মাহিবা জানে না। এরপর তার বিপরীতে সে একটা শব্দও করতে পারলো না। কলের পুতুলের মতো গুছিয়ে নিলো। গাড়ি থামলে মাহিবা ফিসফিসিয়ে বলল, "আমাকে ক্ষমা করে দিন। প্লিজ।"
আহমাদ হাসলো। কাষ্ঠ হাসি।
•
মালা বেগম যত্নের চূড়ান্ত করলেও মাহিবার মন টিকছে না। বারবার শুধু আহমাদের সেই কথাটাই কানে বাজছে।
"আমার অনুভূতি নিয়ে তুমি এভাবে খেলা করতে পারলে!"
কথাটা মনে হলেই মাহিবার ইচ্ছে করছে ছুটে আহমাদের কাছে চলে যেতে। কেঁদে-কেটে অস্থির হয়ে লোকটার মান ভাঙাতে। সম্ভব হচ্ছে না। তবে মাহিবা বুঝতে পারছে এভাবে চলতে থাকলে সে খুব শীঘ্রই অসুস্থ হয়ে পড়বে।
"পেট তো একখান বানাইছিস মাশাআল্লাহ! খাবার দাবার ঢোকে ওতে?"
মাহিবার হেলদোল না দেখা গেলেও মালা বেগম ছেলের পিঠে দুদ্দাড় করে দুটো মা-র-লে-ন।
"কথা বার্তার কি ছিরি! ওর পেটে কি একটা বাচ্চা? তিন তিনটা বাচ্চা। বুঝিস তুই? বুঝিস!"
"বুঝলাম!" পিঠ ডলতে ডলতে আহত স্বরের বলল মাহিদ। সকালে সে আইসক্রিম আনলে মাহিবা চেটেপুটে খেয়েছে। তারপর ধন্যবাদ দেওয়ার পরিবর্তে রুষ্ট কণ্ঠে বলেছে, "চারটা মানুষের জন্য একটা আইস্ক্রিম এনেছিস লজ্জা করে না তোর!"
মাহিদ হতভম্ব হয়ে তার অকৃতজ্ঞ বোনকে দেখেছে।
আহমাদ ফোন দিলে ইশিকাকে নিয়ে মালা বেগম চলে গেলেন। মাহিদও থাকলো না। আজকাল তার বোনের সাথে একা থাকতে ভয় করে। শুধু মনে হয় বোনটার উপর, মাহিবার মুখের উপর তার নজর লেগে যাবে।
"আসসালামু আলাইকুম।"
"ওয়া আলাইকুমুস সালাম। কি অবস্থা? কেমন আছো?"
"আলহামদুলিল্লাহ। আপনি কি করছেন? খেয়েছেন?"
"হ্যাঁ। খেলাম মাত্র। তুমি খেয়েছো?"
"হুঁ।"
"বাবাকে বেশি সবজি টবজি বেশি করে খাওয়াতে। ঠিকঠাক খাবে মাহি। তুমি ইদানিং খেতেই চাচ্ছো না।"
আহমাদের এই স্বাভাবিক ব্যবহারটাই মাহিবাকে বেশি পোড়াচ্ছে। মানুষটা রাগ করলে, রেগে দু-চার কথা শুনিয়ে দিলে বোধহয় বাঁচা যেতো।
"খাবো।"
"গুড। ইশিকা কি করছে?"
"মায়ের কাছে। খাচ্ছে।"
"আচ্ছা। রাখছি তাহলে। তুমি কি ঘুমাবে নাকি এখন?"
ঘড়ির দিকে তাকালো মাহিবা। দুটো চল্লিশ বাজে।
"না। শুনুন।"
"বলো।"
"আমি বাড়ি যাবো।"
"আসবেই তো। দুদিন হলো গিয়েছ। কয়েকটা দিন ঘুরে আসো।"
"আমার ভালো লাগছে না।"
"ভালো না লাগালে লাগবে কিভাবে? টেনশন করছো? কোনো টেনশন নেই। আফতাবের বাবা মা আমাকে ফিরিয়ে দিলে ওদের হাতে পায়ে ধরে হলেও আমি বিয়েটা দেবো। তুমি নিশ্চিন্তে থাকো।"
আহমাদ ফোন কেঁটে দিলো। ডুকরে কেঁদে উঠলো মাহিবা। সে কি সবটাই ভুল বুঝেছে?
•
মানসিক অস্থিরতার সার্বক্ষণিক সঙ্গী হয়েছে শারীরিক অস্থিরতা। সাত মাসের পেটটা নিয়ে নড়াচড়া করা মাহিবার পক্ষে যেনো অসম্ভব হয়ে উঠেছে। পায়ে পানি জমে ফুলে গেছে। দেখলে মাহিবার নিজের কাছেই বিদঘুটে লাগে। এখন আর সিজদাহ দিতে মাথাটা জমিনে ছোঁয়াতে পারে না। এর চেয়ে আরও বেশি কষ্টকর কিছুর মধ্য দিয়ে এখনও যায়নি মাহিবা।
ইশিকা গুটি গুটি পায়ে হাঁটতে শিখেছে। আজকাল তাকে ধরে রাখা দায়। খাওয়া শেষ করেই ছুটলো সে। চিকন গলায় হাঁক ছাড়লো। "মামা! মামা!"
আজকাল তার গলায় মায়ের থেকে মামা ডাক বেশি শোনা যাচ্ছে। মাহিদ বলে সুবিধাবাদী। মামা ডেকে ডেকে তার পকেট খালি করার ধান্দা।
সূরা আর রহমান চলছে। মোবাইলটা বিছানায় রেখে জানালার সামনে এসে বসলো মাহিবা। দূরে একটা মৌচঙ্গা ফুলের গাছ দেখা যাচ্ছে। ফুলগুলোকে কেমন যেনো মলিন দেখাচ্ছে। যেনো নেতিয়ে পড়েছে। আসলে ওগুলো দেখতেই অমন। প্রথম দিন থেকেই খেয়াল করেছে মাহিবা। কিন্তু রংটা সুন্দর। কেমন যেনো মিষ্টি মিষ্টি একটা রং।
বিকেলের নরম রোদে একটা গন্ধ থাকে। স্মৃতি গন্ধ। সেই গন্ধটা টেনে নিয়ে যায় বহুদূরের, অনেক পেছনে ফেলে আসা জীবনের একটা টুকরোয়। যেটাকে তখন আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতোই মনে হয়েছে। অথচ সেটাই ছিলো জীবনের স্বর্ণালী অতীত। মানুষ জীবনের বর্তমান সময়টাকে মূল্য দেয় না। তারপর যখন ভবিষ্যতে পা বাড়ায় তখন ফেলে আসা অতীতকে নিয়ে আফসোস করে। সেই আফসোসের নাম দেয় স্মৃতি। মাহিবা ঠিক সেই আফসোসটাই করছে। ইশিকার সাথে যখন কলেজের এই প্রান্ত থেকে ঐ প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন তখন সেটা আহামরি বিশেষ কিছু মনে হয়নি। যখন ইশিকা তার খোঁজ নিয়েছে তখন মনে হয়েছে এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু যখন হঠাৎ করে মেয়েটা একদম নাই হয়ে গেলো তখন অবহেলা করা সময়টার চরম মূল্য বুঝতে পারলো মাহিবা। তবে পৃথিবী তখন সিন্ডিকেট করেছে। সেই সময়টুকু কালের মহাগর্ভে বিলীন করে দিয়ে তার চড়া মূল্য নির্ধারণ করেছে। সেই মূল্য শোধ করে ইশিকাকে ফিরিয়ে আনার সামর্থ্য মাহিবার ছিলো না। তাই স্মৃতির অনুসরণ করে হাতে একটা নতুন মানুষ আসা মাত্রই তার নাম রেখেছে ইশিকা। প্রকৃতি কি তার এই ছেলেমানুষী দেখে খুব হেসেছে? কে জানে।
আহমাদ ফোন দিয়েছিল। আগামী মাসের মাঝামাঝিতে আফিয়ার বিয়ের তারিখ ফেলা হয়েছে। বলা বাহুল্য কাতর আফতাব। মাহিবা আজকাল আহমাদকে এই বুঝতে পারে না। তার কঠিন আবরণে মোড়ানো শক্ত মনে কি চলে মাহিবা সেটা ঘুণাক্ষরেও টের পায় না।
• • • • • • • •
সাড়ে আট মাসের পেট নিয়ে বিয়ের আনন্দ উপভোগ করার উপায় নেই। মাহিবা শঙ্কায় আছে। কখন না জানি কি হয়। আহমাদকে দেখে তার মনে হলো মানুষটা যেনো আগের থেকে আরো সুন্দর হয়ে গেছে।
"কিছু লাগবে নাকি?"
আহমাদের ফিসফিসিয়ে বলা কথার পরিবর্তে মাহিবা মন্ত্রমুগ্ধের মতো বলল, "না তো।"
"কখন থেকে তাকিয়ে আছো। আমি ভাবলাম কিছু লাগবে।"
"আপনাকে অনেক সুন্দর দেখাচ্ছে।"
আহমাদ হাসলো। মাহিবার মনে হলো হাসিটা একটু বেশিই সুন্দর। অনেকখানি সৌন্দর্যের বিপরীতে প্রকৃতি কি লুকিয়ে রেখেছে?
"আপনার পাশে আমাকে আর মানাচ্ছে না।"
"যে অলরেডি আমার চার বাচ্চার মা তাকে নিয়ে তো আর মানানো না মানানোর কোনো প্রশ্ন থাকতে পারে না। একটু পোলাও আনি। দই দিয়ে খাও।"
"আনুন।"
"মোজো আনবো?"
"না। ঠান্ডা পানি খাবো।"
"সরাসরি ঠান্ডা পানি খাওয়া যাবে না। মিশিয়ে দিচ্ছি।"
মাহিবা তাকিয়ে রইলো এক ধ্যানে।
আফিয়া যাওয়ার সময় শুধু মাহিবাকে ধরেই কাঁদলো। মাহিবা বলল, "এতো কান্নাকাটি করলে তো প্রেশার হাই হয়ে যাবে আফি। পেটে অলরেডি তিনটা আছে। তোমার ভার আর নিতে পারছি না।"
আফিয়া দ্রুত মাহিবার বুক থেকে সরে এলো। চোখ মুছে আবার কেঁদে ফেলল। মাহিবা আসলো। আনন্দের হাসি।
পরদিন আফিয়ার বউভাতে আর কারো যাওয়া হলো না। মাহিবার উত্তরোত্তর দুর্বল হওয়া দেহ নিয়ে আহমাদ ছুটলো হাসপাতালে। তার নিঃশ্বাসটা গলায় আটকে গেলো যখন মাহিবা বলল, "আমাকে মাফ করে দিয়েন প্লিজ। আমি আপনাকে সেদিন কষ্ট দিতে চাইনি। আমার প্রতি কোনো অসন্তুষ্টি রাখবেন না।"
আহমাদ বলতে পারলো না, "আমি তো তোমাকে কবেই মাফ করে দিয়েছি।" রুদ্ধ কণ্ঠে শুধু বলল, "মাহি!"
চলমান।