প্রাপ্তি (দ্বিতীয় অধ্যায়) — পর্ব ২৩
লেখক: বিনতে ফিরোজ · পর্ব ২৩ · ২৫ পর্বের মধ্যে ২৩
মাহিবার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। তার বুকের উচাটন আহমাদের বুক শুকিয়ে কাঠ করে দিচ্ছে। আহমাদ কথা বলতে চাইছে। জিজ্ঞেস করতে চাইছে, "তোমার কি হয়েছে মাহি?" পারছে না। তার কন্ঠনালী আটকে গেছে মাহিবার কাহিল মুখশ্রী দেখে। বারকয়েক মাহিবার মাথায় হাত বুলিয়ে উঠতে চাইলো সে। ডাকতে চাইলো সালেহা বেগমকে। মাহিবা তার হাত টেনে ধরলো। খুব কষ্ট উচ্চারণ করলো, "যাবেন না।"
আহমাদ ঠোঁট চেপে ধরলো। তার কান্না আসছে। চারটা মানুষের জীবনের শঙ্কা তার চোখের মরু ভিজিয়ে জল আনতে চাইছে।
শুকনো ঢোক গিলে আহমাদ বলল, "তোমার ইনহেলারটা নিয়ে আসি।"
"আমার ভালো লাগছে না।"
আহমাদ জানেনা এমন শ্বাসকষ্টের কারণ কি। কখনও তো এভাবে হঠাৎ করে শ্বাসকষ্ট হয়নি। তবে?
"তোমার কি পেটে ব্যাথা করছে? দাঁড়াও মাকে ডাকি।"
আহমাদ উঠতে চাইলে তাকে সর্বশক্তি দিয়ে যেনো আঁকড়ে ধরলো মাহিবা। স্ত্রীর এমন আকুতি এবার আহমাদের চোখ ফুঁড়ে জল আনলো।
"তুমি এমন করছো কেনো মাহি?"
"আপনি আমার কথা শুনুন।"
"শুনছি। তুমি আমাকে একটু ছাড়ো। মাকে একটা ডাক দিয়েই আমি আসছি।"
"না আপনি যাবেন না। প্লিজ! আমার কথা শুনুন।"
"বলো মাহি। একটু শান্ত হও। তোমার ইনহেলার কোথায়?"
বেড সাইড টেবিলে হাতড়ালো আহমাদ। নেই। ইনহেলারটা নেই।
"আফি আফতাব ভাইকে পছন্দ করে। আপনি একটু দেখুন।"
আহমাদ সহসাই থমকে গেলো। তারপর পরই আবার চারপাশে ইনহেলার খুঁজতে খুঁজতে বলল, "এসব কথা পরে হবে। তুমি আগে বলো ইনহেলার কোথায়?"
"পরে যদি আমি না থাকি?"
আহমাদ চমকে স্ত্রীর দিকে তাকালো।
"মাহি!"
"শুনুন। আপনি একটু দেখুন। আফতাব ভাই তো নিজেই ফোন দিয়েছে। আফিটা খুব উইক হয়ে পড়েছে। আমাদের কাউকে তো বলতে চায় না। কিন্তু আমি বুঝেছি।"
যতটুকু বলতে চেয়েছিলো ততটুকু বলতে পারলো না মাহিবা। ডান হাত অজান্তেই গলায় পৌঁছে গেলো। আহমাদ তড়িঘড়ি করে পানির বোতলের মুখ খুলে সেটা মাহিবার ঠোঁটের সাথে চেপে ধরলো। গলা ভিজিয়ে মাহিবা বলল, "আপনি আমার কথাটা রাখুন। আফির দিকে তাকিয়ে হলেও এই ছেলেমানুষী জেদটা ছেড়ে দিন। আর কথা তো নাও বলতে পারি। শেষ কথাটা রাখবেন না?"
আহমাদের মন আকাশে তখন শঙ্কার কালো মেঘ ওড়াউড়ি করছে। তার মাঝে মাহিবার কথাটা যেনো সহসাই বাজ ফেললো। আহত, ভগ্ন কণ্ঠে সে বলল, "মাহি!"
"আপনি আমাকে কথা দিন।"
চোখ বন্ধ করলো মাহি। পেটের কোণায় যেনো চিক করে একটা ব্যাথা করে উঠলো। আজকাল প্রায়ই ব্যাথাটা হচ্ছে। সেই অবস্থাতেই আবার আহমাদের হাত ঝাঁকি দিলো সে।
"কথা দিন।"
আহমাদ দ্রুত বলল, "কথা দিলাম মাহি। আমি দেখবো। আফতাবের সাথেই আমি আফির বিয়ে দেবো।"
মাহিবার ঘর্মাক্ত মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সহসাই শরীর ছেড়ে দিলো সে। আহমাদ ভয় পেয়ে গেলো।
"এই মাহি! এই!"
"ইনহেলার রিডিং টেবিলের ড্রয়ারে।" ফিসফিসিয়ে বলল মাহিবা। আহমাদ ছুটে যেয়ে ইনহেলার নিয়ে এলো। মাহিবার মুখে ধরতেই তার নিশ্বাস প্রশ্বাসের গতি কমলো।
•
রাতটা ঘুমাতে পারলো না আহমাদ। তিনটে নাগাদ মাহিবা শান্ত হয়েছে। তাকে শুইয়ে দিয়েই জায়নামাজে দাঁড়িয়েছে আহমাদ। চোখের শুষ্ক বালিয়াড়ি ভেজার জন্য জলের বাধ খুলে দিয়েছে। বাঁধনহারা স্রোতেরা ভিজিয়ে চলেছে এক মুষ্ঠি সমান দাঁড়িগুলোকে। গলার কাছে দলা পাকানো জিনিসটা বেরিয়ে আসতে চাইলে দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরছে আহমাদ। শরীরটা ঝাঁকি দিয়ে উঠছে। কপালটা মাটির ছোঁয়া পেতেই হৃদয়টা যেনো বেদিশা হয়ে গেলো। আকুতির ফর্দ এতো লম্বা হলো যে আহমাদ আর কিছু বলতেই পারলো না। শুধু কালিমাখা হৃদয়টা তার কারিগরের সামনে পেশ করে দিলো। তিনি তো নিশ্চয়ই সেই হৃদয়ের নীরবতার ভাষা বুঝবেন। তাহলে আর বাক্য গাঁথার চিন্তা কেনো?
রাতজাগা ক্লান্তি যতোটা না প্রকট তার চেয়ে স্পষ্ট ভয়। আহমাদের চেহারা দেখার মতো হয়েছে। চোখের চারপাশে কালো বৃত্ত জানান দিচ্ছে তার নির্ঘুম রাতের। সালেহা বেগম বললেন, "কি রে! রাতে ঘুমাসনি?"
আহমাদের হৃদয়টা যেনো হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। তবে চোখ ভেজা ছাড়া মুখে কোনো শব্দ হলো না। সালেহা বেগমকে জড়িয়ে ধরে তার কাঁধে মাথা এলিয়ে দিলো সে। সালেহা বেগমের মনে হলো তার ছোট্ট অভিমানী ছেলেটা যেনো হঠাৎ করেই ফিরে এসেছে। নরম কণ্ঠে তিনি বললেন, "কি হয়েছে বাবা?"
"আমি হওয়ার সময় কি তোমারও এমন কষ্ট হয়েছে মা?"
প্রশ্নটা, ভাবনাটা আহমাদকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। মাহিবা রোগা মেয়ে নয়। যথেষ্ট শক্তি সামর্থ্য সে রাখে। তবুও হঠাৎ হঠাৎ মেয়েটা কেমন নেতিয়ে পড়ে। দেখলে বুকটা কেঁপে ওঠে। তার মায়েরও কি এমনই কষ্ট হয়েছে? শুধু তার কারণে।
সালেহা বেগম মৃদু হেসে ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন, "মাহির বিষয়টা একটু জটিল। একসাথে তিনটা বাচ্চা। তিনজনে কষ্ট একবারে হবে।"
আহমাদ যেনো বুকের ভেতরে আরেকটু সেধিয়ে গেলো।
"মা।"
"বল।"
আহমাদ বলতে পারলো না, "আমাকে তুমি ক্ষমা করে দাও। তোমার জীবন দেওয়া কষ্টের বিনিময়ে আমি এখন এই অবস্থায়। কিন্তু তার বিনিময় হিসেবে আমি তোমার যোগ্য ছেলে হয়ে উঠতে পারিনি। আমাকে তুমি ক্ষমা করে দাও মা।" শুধু ফিসফিসিয়ে বলল, "সরি মা।"
সালেহা বেগম চোখে জল নিয়ে হাসলেন। তার বড় ছেলেটার মনের কথা তিনি দুর থেকেই বুঝতে পারেন। এখন এই যে বুকের ভেতর ঢুকে বলছে তিনি কি বুঝতে পারছেন না? আহমাদের মাথায় হাত বুলিয়ে তিনি বললেন, "মেয়েটা খুব কঠিন সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে বাপ। ওর খেয়াল রাখিস। আমার তো ভয় করে কখন জানি.."
"কাল রাতে ওর শ্বাসকষ্ট বেড়েছিল মা।"
"আমাকে ডাকলি না কেনো?"
"মাহি আমাকে ছাড়ছিল না মা। আমার একবার মনে হলো ও মনে হয় এবার.."
সালেহা বেগম কিছু বলতে পারলেন না। বুঝতে পারলেন তার ঘাড় ভিজে যাচ্ছে। গরম জলের নোনা স্রোতে। যেই স্রোতের প্রত্যেকটা বিন্দু এক আশঙ্কা বুকে বয়ে বেড়ানোর সাক্ষী।
•
আহমাদের মুখ দেখে মাহিবা ছুটে আসতে চাইলো। বুঝতে পেরে আহমাদ নিজেই ছুটে গেলো।
"আপনার কি অবস্থা হয়েছে!"
অবস্থা মোটামুটি ভয়াবহ। উষ্কখুষ্ক চুল, লালাভ চোখ, সেই চোখের চারপাশে কালো ছায়া। মাহিবা ডুকরে উঠে বলল, "সরি।"
"সরি বলছো কেনো? তুমি কি ইচ্ছে করে করেছো? কান্নাকাটি করো না তো। অফিসে যাওয়ার আগে কান্নাকাটি দেখতে ভালো লাগে না।"
প্রথম কথাটুকু শুনে মাহিবার কান্নার বেগ বাড়লো বৈ কমলো না। কান্নামাখা ভগ্ন কণ্ঠে সে আবার বলল, "সরি।"
•
কলেজ থেকে এসেই মাহিবার সাথে দেখা করতে এসেছে আফিয়া। মাহিবা হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিলো।
"ভাবি?"
মাহিবা চোখ খুললো। আফিয়াকে দেখে তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো।
"এসো আফি। বসো।"
"কেমন আছো এখন?"
"আলহামদুলিল্লাহ।"
"বাবুরা?"
"সবাই ঠিক আছি।"
"মা বলল তোমার নাকি শ্বাসকষ্ট বেড়ে গিয়েছিল?"
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হেলান দিলো মাহিবা। চোখ বন্ধ করে বলল, "আফতাব ভাইয়ের সাথে সংসার করার প্রস্তুতি নাও আফি।"
মাহিবা জানে আফিয়া এখন কিছু বলতে পারবে না। সে নিজেই বলল, "তোমার ভাইকে রাজি করিয়েছি কাল রাতে।"
মাঝরাতে মাহিবার যেনো দমবন্ধ হয়ে আসছিল। উঠে বসে কতক্ষন এদিক ওদিক করলো সে। বিষয়টা আহামরি না। সে জানে একটু পরেই ঠিক হয়ে যাবে। তবে তৎক্ষণাৎ মনে হলো এই সুযোগটাকেই কাজ লাগানো যায়। আহমাদকে ধাক্কা দিলো সে ।
মাহিবা মুখ ফুটে স্বীকার করতে পারলো না তোমার ভাইয়ের সাথে আমি ছোট্ট একটা নাটক করেছি। বলতে পারলো না সেই ছোট্ট নাটকটা মানুষটাকে ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছে। তবে চোখ খুলে নিজেই ভয় পেয়ে গেলো মাহিবা। আহমাদ দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখের দিকে তাকাতেই মাহিবার মেরুদন্ড বিয়ে যেনো একটা শীতল স্রোত বয়ে গেলো। আহমাদ এখন কেনো? ঘড়ি দেখল সে। তার জন্যই কি এতো তাড়াতাড়ি এসেছে? অপরাধবোধের পাশাপশি ভয়টা বেড়ে গেলো। ঐ লালাভ আঁখিতে দ্বিতীয়বার তাকানোর সাহস পেলো না মাহিবা। মানুষটার সামনে এভাবে ধরা পড়ে গেলো সে!
ভাইয়ের আওয়াজে ঘর ছাড়লো আফিয়া। আহমাদ গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "ব্যাগ গোছাও।"
মাহিবা অবাক চোখে আহমাদের দিকে তাকালো। তবে কোনো প্রশ্ন করতে ভয় পেলো।
"ব্যাগ গোছাতে বললাম।"
"কোথায় যাবো?"
সাহেদ সাহেবের গলা পাওয়া যাচ্ছে। আহমাদ আর কিছু বলল না। শক্ত ভঙ্গিতে মাহিবার পাশে বসলেও ভগ্ন কণ্ঠে বলল, "আমার অনুভূতি নিয়ে তুমি এভাবে খেলা করতে পারলে!"
চলমান।