প্রাপ্তি (দ্বিতীয় অধ্যায়) — পর্ব ২২
লেখক: বিনতে ফিরোজ · পর্ব ২২ · ২৫ পর্বের মধ্যে ২২
চিৎকার দিয়ে মাহিবা নিজেই হতভম্ব হয়ে গেছে। চিৎকারটা যে এতো জোরে হয়ে যাবে সে বুঝতেই পারেনি। এইটুকু মুখ করে শুয়ে পড়ল সে। চোখ বন্ধ করে ঘুমের ভান ধরলো। কিন্তু সেই চেষ্টা বিফলে গেলো।
"এই মাহি! কি হয়েছে? এই মাহি! এই?"
আহমাদের ক্রমাগত ধাক্কায় মাহিবা আর চোখ বন্ধ করে থাকতে পারলো না। সালেহা বেগম, আহমাদ, আফিয়া সকলেই উদ্বিগ্ন চেহারায় তার দিকে তাকিয়ে আছে। মাহিবা আমতা আমতা করে বলল, "পেতে ব্যাথা করছিল।"
"হঠাৎ আবার পেতে ব্যাথা কেনো? দাঁড়াও ডাক্তারকে ফোন দিয়ে শুনি।"
"আরে দাঁড়ান! ফোন দিতে হবে না। আরেহ!"
আহমাদ তার কথা শোনার জন্য দাঁড়ালোই না। সালেহা বেগম বললেন, "কোথায় ব্যাথা করছে রে? এমন করে চিৎকার দিলি!"
"আসলে মা ব্যাথা অল্পই। কিন্তু হঠাৎ করে এতো জোরে চিৎকার করে ফেলব আমি নিজেই বুঝতে পারিনি।" মিনমিন করে বলল মাহিবা।
"এদের নিয়ে আমি কোথায় যাবো!" দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন সালেহা বেগম। আহমাদ ফিরে এসে বলল, "ডাক্তার বললেন চিন্তার বিষয় না। এমন ব্যাথা মাঝে মাঝে হতে পারে।"
দরজার দিকে তাকিয়ে ভুরু কুচকে নিলো মাহিবা। সালেহা বেগম সেদিকে তাকিয়ে বললেন, "ও মা! তুমি ওখানে দাঁড়িয়ে আছো কেনো? ভেতরে এসো।"
হেমা ধীর পায়ে ভেতরে এলেন। সালেহা বেগম তার ঘটনা মাহিবাকে জানালে সে সালাম দিলো। বলল, "আপনি এক্সিডেন্ট করেছেন কিভাবে?"
"রাস্তা পার হতে গিয়ে।"
"মা আন্টিকে স্যাভলন দিয়েছেন?"
"দিয়েছি। তুই কিছু খাবি?"
"নাহ।"
নাক মুখ কুচকে নিলো মাহিবা। আহমাদ রুষ্ট কণ্ঠে বলল, "তা খাবে কেনো? খেলে তো কষ্ট অর্ধেক কমে যায়।"
আহমাদ চলে গেলো। সালেহা বেগম হতাশ নিশ্বাস ছাড়লেন।
"খেতে ইচ্ছে না করলে কি করবো মা?"
"খেতে ইচ্ছে না করলে জোর করে খাবি।"
মাহিবা হতাশ হলো। শাশুড়ির থেকে স্বন্তনামূলক বাক্য শুনতে চেয়েছিল সে।
•
"আফিয়ার জন্য একটা সম্বন্ধ এসেছে মা।"
"আর যাই করিস ঝুলিয়ে রাখিস না।"
আহমাদের কথায় আফিয়া থেমে গেলো। তার অন্ননালি আটকে গেলো। মনের কোণে আফতাবের নাম উকি দিতে চাইলো। মাহিবা মিনমিন করে বলল, "সেদিন আফতাব ভাই ফোন দিলো। আপনি একটু ভেবে দেখবেন না?"
আহমাদ ধমকে উঠে বলল, "এক কথা বারবার বলবে না মাহি। একটা ব্যাকবোনলেস ছেলের কাছে আমি আমার বোনকে কখনোই দেবো না।"
আহমাদ চলে গেলে মাহিবাকে জেঁকে ধরলেন সালেহা বেগম।
"কি হয়েছে রে?"
"আফতাব ভাই ফোন দিয়েছিলো মা। কথাবার্তা যা বুঝলাম মায়ের কারণেই তিনি পিছিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ইন্ডিয়া থেকে চেকাপ ওরও আসার পর নাকি উনার মা আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। শরীর অসুস্থ হলে যা হয়। মন দুর্বল হয়েছে। ছেলের পছন্দ তো তিনি বোঝেন। এখন শুধু ছেলেকে সুখী দেখতে চান। আর আমার মনে হয় আফতাব ভাই আসলেই আমাদের আফিকে পছন্দ করে।"
"ছেলেকে সুখী দেখতে চায় মানে? যায় যায় অবস্থা নাকি?"
"তা তো জানিনা।"
সালেহা বেগম ভাবুক হয়ে বললেন, "ছেলেটাকে আমার আসলেই পছন্দ হয়েছিল। কিন্তু ওর বাপ মার কথাবার্তা শুনে তো মনে হলো না আমাদের সাথে চিন্তা চেতনা মেলে।"
মাহিবা ফিসফিস করে বলল, "আমি খোঁজ নিয়েছি মা। আফতাব ভাইয়ের মা অসুস্থ হওয়ার পর থেকে নাকি উনার বাবা দিনে পাঁচ বারের জায়গায় দশবার মসজিদে যান।"
সালেহা বেগম ফিক করে হেসে ফেললেন।
"কে কোন উসিলায় হিদায়াত পায় আমরা তো বলতে পারি না। তুই খোঁজ নিলি কিভাবে?"
"সিক্রেট!" হেসে বলল মাহিবা।
সালেহা বেগম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, "কিন্তু ছেলেটা তো বেকে বসেছে। ওকে রাজি করাবি কিভাবে?"
মাহিবা বুক উঁচিয়ে বলল, "রাজা যদি রাজ্য চালায় রানী তার রাজাকে চালায়। আফিয়া তুমি রাজি কি না বলো। তোমার ভাইকে রাজি করানো আমার দায়িত্ব।"
এতক্ষণে আফিয়ার দিকে নজর দিলো সবাই। আফিয়া হকচকিয়ে চোখের পলক ফেললো। টুপ করে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। তার বুকের ভেতর বাজতে থাকা এতক্ষণের ডামাডোল সে কাকে শোনাবে?
তড়িঘড়ি করে উঠে হাত ধুতে ধুতে সে বলল, "আমি কিছু জানিনা। কিচ্ছু জানিনা।"
"কি বুঝলেন মা?" এক ভুরু উঁচু করে বলল মাহিবা। সালেহা বেগম শাসানোর ভঙ্গিতে বললেন, "উদ্ভট কিছু করবি না মাহি!"
•
হেমা তার ছোট্ট পুঁটলি থেকে একটা কাঁথা বের করেছেন। বৃষ্টির দিনে রাতে শীত শীত লাগে। সেটা রোদে দিয়েছিলেন। ছাদ থেকে আনার সময় মাহিবা দেখে বলল, "কাঁথাটা তো অনেক সুন্দর আন্টি। আপনি বানিয়েছেন নাকি?"
উপর দেখে দেখে বলল মাহিবা। হেমা পুরোটা খুলে বললেন, "হ্যাঁ মা। আমি বানিয়েছি।"
মাহিবা বিস্মিত হলো। সূক্ষ্ম কাজ করা এক নকশী কাঁথা।
"মা শা আল্লাহ! কি সুন্দর!"
হেমা উৎসাহিত হয়ে পুঁটলি থেকে আরো কয়েকটা জিনিস বের করলেন। মাহিবা বলল, "আন্টি আমার বাবুদের জন্য এমন করে কাঁথা বানিয়ে দিবেন?"
মহিলা আপ্লুত হলেন। মালিক শ্রেনীর কারো কাছে এমন ভালোবাসা মাখা আবদার সম্ভবত তিনি আশা করেননি। ধরা গলায় বললেন, "অবশ্যই দেবো মা। আমার অনেক শখ ছিল সেলাই করার। কিন্তু সব শখ কি আর পূরণ হয়?"
মাহিবা কাঁথাটা নেড়েচেড়ে দেখলো। কিছুই বলল না।
•
দিনকে দিন মাহিবার শরীর ভারী হচ্ছে। নড়াচড়া করে দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছে। ইশিকাকে কোলে নেয়না সে কয়েকদিন হয়ে গেলো। কোনরকমে খাইয়ে আবার শাশুড়ির কাছে দিয়ে দেয়। আজ মেয়েটা নাছোড়বান্দা হয়ে লেগেছে। কোলে সে উঠবেই। মাহিবা বুঝতে পারে তার প্রতি ইশিকার দুর্বলতা বেড়েছে। মেয়েটাকে বুকে নিয়ে হাঁপিয়ে উঠলো সে।
"ভাবিমণি! ওকে আমি নিয়ে বসে থাকি। তুমি গল্প কর।"
"ভাইয়ের মতো মিনিটে মিনিটে অর্ডার করবি না। চুপচাপ বসে থাক।"
আয়িশা চুপ করে গেলো। আজকাল মাহিবার হঠাৎ হঠাৎ ধমকে সে অভ্যস্ত।
"আম্মা! এই দেখো পেট ফুলে ঢোল হয়ে গেছে। তোমাকে যে কোলে নিবো কোল কি আর আছে?"
ইশিকা সুড়সুড় করে নেমে গেলো। পেটে হাত দিয়ে বলল, "বাবু?"
"হ্যাঁ। তিনটা।"
"তিনতা! আল্লাহ!"
মাহিবা আয়িশা দুজনেই হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল।
•
আহমাদ বাড়িতে আসার পর থেকেই তার সামনে ঘুরঘুর করছে মাহিবা। চারটা কাঁথা নিয়ে এসে আহমাদের সামনে ধরে বলল, "দেখুন হেমা আন্টি বানিয়েছে। সুন্দর না!"
আহমাদ এক নজর দেখে বলল, "সুন্দর।"
"এই আপনি কিন্তু একটা কাজ করতে পারেন। এরকম নকশী ডিজাইনের প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ করতে পারেন।দারুন হবে।"
"লোকজন কোথায় পাবো? একা হেমা আন্টিকে দিয়েই হবে?"
"না। আমি একটা কথা ভেবেছি। যারা ডিভোর্সী, ছেলেমেয়ে নিয়ে একেবারে বাঁচা ম-রা অবস্থায় আছে তাদের নিয়ে আপনি কাজটা শুরু করুন। আমাদের চারপাশে বিশাল অংকের মহিলারা একদম ভাসমান অবস্থায় আছে। হেমা আন্টির মতো।"
ভাবনাটা আহমাদকে নাড়া দিলো। তবে মাহিবা থামলো না। একটু পরপরই হতাশ সুরে সে বলছে, "কি মোটা হয়েছি! মুখ আর মুখ নেই। পুরো বেলুন হয়ে গিয়েছে। পেট তো প্যারাসুট।"
আহমাদ কপাল গুছিয়ে একবার স্ত্রীর দিকে তাকালো। সেন্সরে যে আসলেই ডিফেক্ট দেখা দিয়েছে এটা পদে পদে প্রমাণিত হচ্ছে।
"শুনুন।"
"বলো। শুনছি।"
আহমাদ ঘরের বাইরে চলে গেলো। মাহিবা মন খারাপ করতে চেয়েও করলো না। এখন মন খারাপ করলে লস। নিজেও আহমাদের পিছু পিছু গেলো।
"শুনুন না!"
"আশ্চর্য! শুনছি তো। বলো।"
"একটা গ্রিল খেতে ইচ্ছা করছে।"
টিভির রিমোট টিপে আহমাদ নির্বিকার গলায় বলল, "বারান্দায় এতো বড় গ্রিল লাগানো আছে। ওটা খুলে খেয়ে নিলেই পারো।"
আফিয়া পানি খাচ্ছিল। তালুতে উঠে যাওয়ায় কাশতে কাশতে ঘরে চলে গেলো। মাহিবা ধরা গলায় বলল, "এখন আপনি আমাকে খাওয়ার খোটা দিচ্ছেন! ভালো। পেটের গুলো শুনতে পাচ্ছে। ওরা শুনুক। একটা গ্রিল খেতে চেয়েছি বলে কত বড় খোটা দিলো আমাকে।"
আহমাদ আশ্চর্য গলায় বলল, "আরে পুরো বাড়ির বারান্দায়, জানালায় গ্রিল। খুলে খেতে শুরু করো। শেষ হয়ে গেলে আবার আনিয়ে দেবো।"
মাহিবা সম্ভবত আহমাদকে চোখ দিয়ে ভস্ম করতে চাইলো।
•
ঘুমাতে যাওয়ার আগে আফিয়ার কাছে গেলো মাহিবা। সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল, "আফি আফতাব ভাইকে নিয়ে তুমি কি ভাবছো একটি বলো। হয় তাকে না করে দিই নয়তো.."
না করে দিই শুনেই আফিয়া এমন ভঙ্গিতে তাকালো যে মাহিবা তার উত্তর পেয়ে গেলো।
সেই রাতেই গভীর ঘুমের মাঝে মাহিবার আর্তনাদ আহমাদের ঘুম ভাঙ্গালো। মাহিবার অবস্থা দেখে প্রকৃতই তার ঘাম ছুটে গেলো।
চলমান।