প্রাপ্তি (দ্বিতীয় অধ্যায়) — পর্ব ১২

লেখক: বিনতে ফিরোজ · পর্ব ১২ · ২৫ পর্বের মধ্যে ১২

ঘেমে একাকার হয়ে গেছে মাহিদ। ফ্যান ছেড়ে বসতেই ফ্যানটা বন্ধ হয়ে গেলো।

"আল্লাহ! এই ফ্যান বন্ধ হওয়ার থেকে ভালো ছিলো তুমি আমারে উঠায় নিতা। আল্লাহ দয়া করে মায়া করে কারেন্টটা দিয়ে দেও আল্লাহ!"

মাহিবা গায়ে ওড়না জড়িয়ে বললো,"কারেন্ট যায়নি। আমার শীত লাগছে।"

মাহিদ চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকলো। বলল,"বাড়িটা চিড়িয়াখানা হয়ে গেছে। নিজেকে আমার বিলুপ্ত প্রায় মানুষ মনে হচ্ছে। তুই কি আদৌ কোনো প্রাণীর কাতারে পড়িস?"

মাহিবা টেবিলে উঠে বসলো। মাহিদ হায় হায় করে উঠলো,"আমার বাপের অন্ন ধ্বংস করে তোর শান্তি হচ্ছে না? এখন সম্পত্তি নষ্ট করতে উঠে পড়ে লেগেছিস। নাম! নাম বলছি! এসব দিয়ে আমি আমার জীবন পার করবো। নতুন করে কিছু বানাতে পারবো না।"

"তা পারবি কেনো? তুই তো আমড়া কাঠের ঢেকি!"

"হ্যাঁ তাই। এবার নাম।"

"নামবো না। কি করবি?"

কথা বলতে বলতে মাহিবা আপেল খাচ্ছিল। হঠাৎই পেট গুলে যেনো বমি চলে এলো। দৌঁড়ে বাথরুমের দিকে গেলো সে। মাহিদ বড়সড় ঝগড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। মাঝপথে মাহিবাকে দৌঁড়াতে দেখে প্রথমটায় কিছু বুঝতে না পারলেও বাথরুম থেকে মাহিবার আওয়াজ শুনতেই সেও ছুটলো। যেতে যেতে চিৎকার করে বলল,"মা! আপু বমি করছে! এদিকে আসো!"

মুখ ধুয়ে এসে মাহিবা বলল "ষাঁড়ের মতো চিৎকার করছিস কেনো? বমি মানুষ করে না?"

"তোর হয়ে গেলো? আরো কিছুক্ষন চেষ্টা করতি।"

মাহিবা চোখ মুখ কুঁচকে বলল,"কি বিশ্রী কথা! আরো কিছুক্ষন চেষ্টা করতাম কেনো?"

"পেট ফাঁকা হওয়ার জন্য। এই আপু! তুই কি মাথা ঘুরে টুরে পড়িস নি?"

"না। মাথা ঘুরে পড়বো কেনো?"

"মাথা ঘুরে না পড়লে কি তাকে আবার পোয়াতি বলা যায় নাকি? মাথা ঘুরে পড়বি,অজ্ঞান হয়ে যাবি,বমি করবি, টক ঝাল খেতে চাবি তাহলেই তোকে প্রকৃতি পোয়াতি বলা হবে।"

"থাক আমার প্রকৃত পোয়াতি হওয়া লাগবে না। আমার বাচ্চা যখন মামা মামা করে তোর কান ঝালাপালা করবে তখন বুঝবি প্রকৃত আর অপ্রকৃত কি।"

"তোর বাচ্চার কাথা টাথা কিন্তু আমি ধুতে পারবো না। আগে থেকে বলে দিলাম।"

"ওমা! তুই ধুবি না তো কে ধুবে? তোকে খাওয়ানো পড়ানো হচ্ছে কেনো?"

"আমাকে আমার বাপ খাওয়াচ্ছে পড়াচ্ছে তোর বাচ্চার কাথা পরিষ্কার করার জন্যে?"

"হুঁ। যা বের হ। আমার মেয়েটাকে দেখে আয়। আমি একটু ঘুমাবো।"

মাহিদ হতচেতন হয়ে বের হয়ে গেলো। তার জীবনের লক্ষ্য একজনের বাথরুম করা কাথা পরিষ্কার করা! এই ছিলো তার ঘটে!

আহমাদের দিনকাল অগোছালোভাবে পার হচ্ছে। যেনো জীবনটা একটা পাট ভাঙ্গা শাড়ি যার ভাঁজে ভাঁজ করে সেটা মিলিয়ে উঠতে পারছে না সে। আহমাদ হতাশ নিঃশ্বাস ছাড়লো। দুটো ফাইল বাড়িতে নিয়ে এলেও কোনো কাজই করতে পারছে না। তাহমিনাকে ফোন দিলো। একবার রিং হতেই কল রিসিভ হয়ে গেলো।

"জি স্যার! বলুন।"

"রানিং প্রজেক্টের কোনো আপডেট কেনো এখনও যোগ করা হয়নি? দুটো ফাইলের একটাতেও এই প্রজেক্টের কোনো ইনফর্মেশন নেই।"

"স্যার আসলে.."

"কোনো এক্সকিউজ শুনতে চাচ্ছি না আমি! আজকের ভেতরেই এটার আপডেট চাই আমার।"

আহমাদ চিৎকার করে উঠলো। কেঁপে উঠলো তাহমিনা। আস্তে করে বলল,"ওকে স্যার।"

কল কেঁটে চোখ বন্ধ করলো আহমাদ। তার জীবনের সুতো যেনো ছিঁড়ে গেছে। সুর হারিয়েছে, তাল খুইয়েছে। জোড়া লাগানোর উপায় কি?

বিকেলে ফ্যাক্টরিতে গেলো আহমাদ। কিছু মেশিনে সমস্যা দেখা দিয়েছে। সেগুলো সারানোর ব্যবস্থা করতে হবে। প্রোডাকশন গত এক মাসের তুলনায় কমে গেছে। কোনো কিছুরই কারণ ধরতে করছে না সে। কর্মীদের সাথে মুখোমুখি একটা আলোচনাও আজকে করবে বলে ভেবে রেখেছে সে। আসরের আযানের সময় ফ্যাক্টরিতে যেয়ে পৌঁছুল আহমাদ। ভাবলো মিটিং শেষ করে তারপরেই নামাজটা পড়ে নেবে। ইফাদকে ফোন করে বলল এখানে চলে আসার জন্য।

ওয়ার্কিং এরিয়াটা ঘুরে ঘুরে দেখলো আহমাদ। ম্যানেজারকে দিয়ে ঘোষণা দিলো সকলকে জড়ো হওয়ার জন্য। পনেরো মিনিটের মাঝে সকলে উপস্থিত হলো। আহমাদ বলতে শুরু করলো,"অনির্ধারিত এই মিট..."

হঠাৎই বিকট আওয়াজে সকলের কানে তালা লাগার জোগাড় হলো। আহমাদ কথা বন্ধ করে উৎসের দিকে তাকালো। তবে তার খোঁজ পাওয়ার আগেই ঘন কালো অন্ধকারে চারদিক ছেয়ে গেল। তার পরপরই সেই অন্ধকার কাঁটাতে এলো ভয়ঙ্কর এক হলুদাভ আলো।

ইশিকাকে ঘুম পাড়িয়ে চোখ বন্ধ করেছিল মাহিবা। ফোনের ভাইব্রেশনে আসি আসি করতে থাকা ঘুমটা পালিয়ে গেলো। আননোন নাম্বার দেখে রিসিভ করবে না ভাবলেও সেই নাম্বার থেকে কল আসতেই থাকলো। বিরক্ত হয়ে ধরলো মাহিবা। পরিচয় জিজ্ঞেস করার আগেই ওপাশ থেকে ভেসে আসা কথাগুলো শুনে মনে হলো তার পায়ের নিচের মাটি এবং মাথার উপরের ছাদ সবটাই ধ্বসে গেছে।

চলমান।