প্রাপ্তি (দ্বিতীয় অধ্যায়) — পর্ব ১৪

লেখক: বিনতে ফিরোজ · পর্ব ১৪ · ২৫ পর্বের মধ্যে ১৪

কান্না নদী শুকিয়েছে। থেমেছে তার স্রোত। ঝড়ো সেই স্রোতে ভেসে যাওয়ার ভয় আর নেই। তবুও সকলে চিন্তিত। খরস্রোতা নদীর হঠাৎ রূপ বদল তাদের দিচ্ছে বিপদ সংকেত। কিন্তু কিসের বিপদ? প্রকৃতির নাকি মানুষের?

মেয়েকে দেখে সাহেদ সাহেবের বুকটা মুচড়ে উঠলো। হঠাৎ করেই যেনো মেয়েটা পাথর হয়ে গেছে। কোনো শব্দ নেই,নড়চড় নেই। ঠিক যেনো একটা জড়ো বস্তু। মালা বেগম চেয়েও পারছেন না মেয়েকে একটু স্বান্তনা দিতে। তার নিজের চোখেই জল থামছে না। এই মুখ নিয়ে তিনি কি করে মেয়েকে শক্ত থাকতে বলবেন?

মাহিবা স্থির হয়ে বসে আছে। মাহিদের কথাটা সম্ভবত বজ্রপাত ছিলো। কানের পর্দা ফাঁটিয়ে ফেলার মতো তার শক্তি। তারপর থেকে মাহিবা আর কিছু স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে না। মাথায় কেমন যেন একটা চি চি শব্দ হচ্ছে। থেকে থেকে ভোতা একটা যন্ত্রণা নিজ অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে। যখন সেই যন্ত্রণা হচ্ছে মাথায় যেনো ঝিলিক দিচ্ছে সাথে চি চি শব্দ। মাহিবার মনে হলো পৃথিবীটা দুলছে। তার চোখটা বন্ধ হয়ে আসতে চাইছে। আধা হুশে থাকা অবস্থায় তার মনে হলো মাগরিবের নামাজটা পড়া হয়নি। পাশে বসে থাকা মাহিদকে বললো,"আমি নামাজ পড়বো।"

বোনের দিকে তাকালো মাহিদ। উঠে একজন নার্সের কাছে গেলে তিনি মহিলাদের নামাজ ঘর দেখিয়ে দিলেন। বোনকে সেখানে পৌঁছে দিয়ে এলো মাহিদ। ওযু করে নিজেকে স্থির করার চেষ্টা করলো মাহিবা। পারলো না। পা টলছে। হাঁটতে গেলে যেনো এক পা আরেক পায়ের সাথে পেঁচিয়ে যাচ্ছে। কোনো রকমে তাকবির পড়লো মাহিবা। তারপরই বাঁধ দিয়ে আটকে রাখা ঝড়ো স্রোত বাঁধন ছাড়া হলো। শব্দহীন ঝড়ে প্লাবিত হলো নামাজের খরখরে পাটি। মাহিবা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলো কোনরকম শব্দ না করার জন্য। ঘন ঘন ঢোক গিললো। সিজদায় পড়তেই তার দেহ নির্দেশ মানতে অস্বীকার করলো। নিজের সবটুকু অপারগতা ঢেলে দিলো মহা মহিমের দরবারে। মাহিবা শুধু বলে গেলো,"সুবহানা রব্বিয়াল আ'লা।"

সালাম ফিরিয়ে মোনাজাত ধরতেই বোবা শব্দরা প্রাণ ফিরে পেলো। তার হাহাকার করা কান্নার শব্দে ঘরের আরেক প্রান্তে থাকা এক মহিলা যেনো সহসাই আতকে উঠলো। চোখ বড় বড় করে দেখলো এক মানবীর বুক ভাঙ্গা আহাজারি। চোখের পর্দায় আহমাদের ছবি আর হাতের স্পর্শে অনাগত ছোট্ট প্রাণটা ছুঁয়ে মাহিবা তার আঁখি সিন্দুকে জমানো সবটা অশ্রু ঢেলে দিলো। শব্দরা যখন প্রাণ হারালো অশ্রুরা তখন নৈঃশব্দের নৈবেদ্য বাজিয়ে এক অন্য ভুবন গড়ে তুললো। সেই ভুবনে কেউ নেই। কেউ না। শুধু আছে মালিক আর তাঁর কান্নায় ভেসে যাওয়া অসহায় বান্দী।

মাহিবা বের হলো ধাতস্থ হয়ে। শাশুড়ির কাছে এসে যেনো নির্দেশ দিলো।

"মা,নামাজ পড়ে আসুন।"

সালেহা বেগম ড্যাবড্যাব করে পুত্রবধূকে দেখলেন। যেনো ডুবন্ত নাবিক একটা খড়কুটো পেয়েছে। সালেহা বেগম উঠলে মাহিবা ফিসফিস করে বলল,"আপনার ছেলের অনাগত সন্তানের উসিলায় সাহায্য চান মা। আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাদের ফেরাবেন না?"

মাহিবার চোখের আকুতিটুকু হাওয়ায় ভেসে সালেহা বেগমের চোখে চলে গেলো। মায়ের পিছু নিলো আফিয়া। এই শোকের মাঝে তার জীবনের বসন্ত অধ্যায়ে আরো একটা শোক যুক্ত হয়েছে। না সে কাউকে বলতে পারছে,না সইতে পারছে। অশ্রুকে সম্বল করে সবটা সয়ে যাচ্ছে।

ক্লান্তিকর অপেক্ষার প্রহর। না কোনো আশা,নাই বা হতাশা। মুমিন তো হতাশ হয় না। এটুকুই মাহিবার মাথায় মৌমাছির মত ভনভন করে চলেছে। তাহলে তো তার হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। বিপদেও তার জন্য বিশেষ কিছু,কল্যাণকর কিছু লুকিয়ে আছে। মনেপ্রাণে এটুকু বিশ্বাস করে মাহিবা।

রেলিংয়ে মাথা ঠেকিয়ে রাখার কারণে কপালের দৃশ্যমান অংশে দাগ পড়ে গেছে। আজ তৃতীয় দিন। পোড় খাওয়া জীবনের তৃতীয় দিন। এর মাঝে সূর্য উঠেছে তার নিয়মে। পাখি ডেকেছে তার সুরে। কিন্তু মাহিবার জীবনের সুর কেঁটে গেছে। চন্দ্রমল্লিকায় এখন আর যাওয়া হয় না। আয়িশা,আফিয়াকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে হাসপাতালমুখী হয়েছে মাহিবা। সাথে থাকছেন সালেহা বেগম। মাহিদ এবং সাহেদ সাহেব থাকছেন পালা করে। ইফাদেরও বিশ্রাম নেই। বন্ধুর অবর্তমানে কোম্পানির সবটুকু দায়িত্ব তার ঘাড়ে চেপে যাওয়ায় বেচারা ফেঁসে গেছে। ডাক্তার বলেছে হয়তো আগামী পরশু আহমাদের জ্ঞান ফিরতে পারে। এর মাঝে তার জ্ঞান ফেরার সম্ভাবনা খুবই কম। দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো মাহিবা।

ঘাড়ে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে পেছনে তাকালো সে। সালেহা বেগম বললেন,"নিজের খেয়াল না রাখলে তোর বাচ্চার কি হবে মা?"

মাহিবা দুর আকাশের দিকে তাকালো। আকাশটা নিশ্চয়ই অনেক দূরে! ঠিক কতোটা দূরে গেলে তাকে ছোঁয়া যাবে? মাহিবা জানে না। কিন্তু তাকালেই তো আকাশটাকে পাশে পাওয়া যায়। দুঃখ গাঁথা গুলো মেঘের খামে পাঠিয়ে দিয়ে নির্ভার হওয়া যায়। আকাশটা এতো অদ্ভুত কেনো!

"আমি রোজা আছি মা।"

নত কণ্ঠে বললো মাহিবা। সালেহা বেগম আর বলার কিছু পেলেন না। শুধু বললেন,"তোর বাচ্চা তোর আমানত। সেই আমানতের যত্ন কিভাবে করবি তুই ভালো জানিস।"

ইফতারির একটু আগে ওয়েটিং রুম থেকে বের হলো মাহিবা। সেদিনের সেই বাচ্চাটা তার মন থেকে মোছেনি। কি অবস্থায় এখন আছে কে জানে? পুরোটা হাসপাতাল ঘোরার চিন্তায় পা চালালো। দুই তলায় এসে সেই মহিলার দেখা পেলো।

"আসসালামু আলাইকুম।"

মহিলা চমকালেন। তার শীর্ণ মুখের ভাঁজে ভাঁজে সেই চমক দৃশ্যমান হলো। এই সময়ে এই জায়গায় সালাম ছিলো তার কাছে পুরোপুরি অনাকাঙ্ক্ষিত একটা বিষয়। আহা! সালাম! কতদিন তার জন্য কেউ শান্তি চায়নি!

"ওয়ালাইকুম সালাম।"

"কেমন আছেন?"

মাহিবার মুখ ঢাকা থাকলেও মহিলা স্পষ্ট বুঝলেন মেয়েটার মুখে হাসি। সেই নিঃশব্দে হাসির গুঞ্জন কি হাওয়ায় ভেসে মহিলার মুখে ছুঁয়ে গেলো? হালকা হেসে তিনি বললেন,"আল্লাহ রাখছে ভালো।"

"আপনার বাচ্চাটা কেমন আছে?"

এবার মহিলা প্রকৃতই চমকালেন। শুধু টাকার ভয়ে আত্মীয় স্বজন তার বাচ্চাটার খোঁজ নেয়নি। কোন জায়গার কোন মেয়ে এসে এখন তার ছেলের খোঁজ নিচ্ছে।

"এখন ভালোই আছে। আপনি আমার ছেলের খবর কেমন করে জানলেন?"

"আমার স্বামীর এক্সিডেন্ট হয়েছে। যেদিন তাকে এখানে এনেছে সেদিন আপনার ছেলেকে দেখেছি।"

মহিলার চোখে বিস্ময় ছেয়ে গেলো। স্বামীর দুর্ঘটনার মাঝেও চারপাশে খেয়াল করেছে এই মেয়ে! সেই খেয়াল থেকে আবার খুঁজে খুঁজে খবর নিতে এসেছে! চোখে জল এসে গেল। মাহিবার হাত খপ করে ধরে তিনি বললেন,"আমার একটা আত্মীঔ ছেলেটার একটা খোঁজ নেয়নি। আরেকটু হলে আমার বাচ্চাটার চোখ পুড়ে যেতো। আল্লাহ খুব বাঁচা বাঁচিয়েছে। ডাক্তার বলেছে ঠিকমতো ওষুধ খাওয়ালে,মলম দিলে সব সেরে যাবে।"

গড়গড় করে বলে গেলেন মহিলা। বিপদের সময়ে মনের ঝাঁপি খুলে বসার মত একটি মানুষ পাননি তিনি। অসময়ে,অচেনা মানুষের কাছে নিজেকে তুলে ধরতে তার একটুও খারাপ লাগলো না। নির্দ্ধিধায় কাজটুকু সারলেন তিনি। তার হাত আরো শক্ত করে ধরে মাহিবা বললো,"আল্লাহ আপনার ছেলেটাকে একদম সুস্থ করে দিন।"

মহিলা খুশি হয়ে গেলেন। ছলছল চোখে বললেন,"আমিন। আমিন।"

মাহিবা শুনলো না ইথারে ভেসে যাওয়া কিছু শব্দ। শুনলো না একদল সত্ত্বা তার জন্যও একই দুয়া করছে। "আমিন। আমিন।"

ঘড়ি দেখল মাহিবা। আযানের আর ছয় মিনিট আছে। মাহিদ খাবার নিয়ে এসেছে। নামাজের ঘরে যাওয়ার জন্য উঠতেই আই সি ইউএর ভেতর থেকে একজন নার্স দৌঁড়ে বের হলো। ছুটে আরেকজনকে ডেকে নিয়ে এলো। মাহিবা অপলক দেখলো। সে কিছুই বুঝতে পারছে না। দ্বিতীয় জন যেয়ে কর্মরত ডাক্তারকে ডেকে আনলো। ডাক্তার দেখে মাহিদ এগিয়ে গেলো। তিনি ভেতরে বেশ কিছুক্ষণ পরীক্ষা নিরীক্ষা করে হাসিমুখে বের হলেন। মাহিদ জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতেই হাসিমুখে বললেন,"পেশেন্টের জ্ঞান ফিরেছে।"

মাহিবা শুনলো। শুধু শুনেই গেলো। সে বুঝলো না একটা ছোট্ট কাজ,ছোট্ট একটা বাচ্চার মায়ের এক ফোঁটা চোখের জলে ভাসা আনন্দ বাতাসের খামে করে আরশে পৌঁছে কি জাদু করেছে। আরশ! সেখান থেকে কি কেউ খালি হাতে ফেরে? ফিরতে পারে!

চলমান।