প্রাপ্তি (দ্বিতীয় অধ্যায়) — পর্ব ১৭

লেখক: বিনতে ফিরোজ · পর্ব ১৭ · ২৫ পর্বের মধ্যে ১৭

ফোন কানে ধরে চুপ করে বসে আছে আফিয়া। নিজেকে তার বড়ই বেহায়া মনে হচ্ছে। কেনো তার প্রাণ যাই যাই করছে আফতাবের সাথে একটু কথা বলতে না পেরে? ওপাশের মানুষটা তো বেশ আছে। তাহলে কেনো তার এই একতরফা ছটফটানি? সব প্রশ্নকে উপেক্ষা করে নিজের অন্য একটা সিম থেকে আফতাবকে ফোন দিয়েছে আফিয়া। আগেরটা তো ব্লকের খাতায়। তার বুকের কম্পন পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পর যখন প্রমাণিত হলো সে এখনও বেঁচে আছে ঠিক তখনই তারহীন সংযোগের অপর দিক থেকে আফতাবের কণ্ঠ পাওয়া গেলো।

"হ্যালো!"

আফিয়ার স্পন্দন সহসাই কমে আসলো। স্তিমিত হলো চক্ষুদ্বয়। যেনো জমিয়ে রাখা কথাগুলো বলার সবটুকু শক্তি শেষ। সবটুকু!

"হ্যালো! কে বলছেন?"

আফিয়ার নিঃশ্বাস দ্রুততর হলো। আফতাবের কুঞ্চিত ভুরু সমান হয়ে গেলো। কপালে আর কোনো ভাঁজ নেই নাই বা আছে মনে কোনো প্রশ্ন।

"আফিয়া!"

প্রশ্ন নয়। কি আত্মবিশ্বাসের সাথে সে সম্বোধন করলো। আফিয়ার চোখ ছাপিয়ে ঘন বর্ষার বারিধারা প্রবাহিত হওয়ার অনুমতি চাইলো। আফিয়া দিতে নারাজ। যেই মানুষটা তার শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দে তাকে চিনতে পারে কেনো তার এই অবহেলা? জানতে সে বদ্ধপরিকর। সেই পরিকল্পনার শ্রাবণ আসা নিষেধ। চোখ মুছে, কণ্ঠ শক্ত করে আফিয়া প্রশ্ন করলো,"আমাকে ইগনোর করার মানে কি আফতাব? বিয়ে করবে না সেটা সোজাসুজি হলে দিলেই হচ্ছে। এভাবে স্কুল বয়দের মত ব্লকের খেলা খেলে জাস্ট একটা ছেলেমানুষী করলে।"

আফতাব গভীর নিঃশ্বাস ছাড়লো। সেই নিঃশ্বাসের আওয়াজ আফিয়ার শক্ত কণ্ঠে কাপন ধরাতেই মুখ বন্ধ করলো আফিয়া। কোনো রকম দুর্বলতা সে আফতাবকে দেখাতে চায় না। নিষ্ঠুর মানুষটা এই ভেবে আনন্দ পাবে যে আফিয়া তার শোকে আধম-রা হয়ে গেছে।

"কেমন আছো আফিয়া?"

তাচ্ছিল্যের হাসি নিজ থেকেই আফিয়ার ঠোঁটে জায়গা করে নিলো।

"নিজে থেকে সব জায়গায় ব্লক করে এমন একটা প্রশ্ন করতে তোমার লজ্জা করছে না? যাই হোক। এসব খোশ গল্প করতে তোমাকে ফোন দিইনি। আমি শুধু শুনতে চাই ঠিক কি কারণে তোমার বিশাল স্বপ্নের সুতো গোড়াতেই ছিঁড়ে গেলো। আশা করি শেষবারের মতো আমার প্রশ্নের উত্তর দেবে।"

আফিয়া দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরলো। কান্নারা ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সে কাঁদবে না। যে মানুষটা ভালোবাসার নীতি শেখালো সে নিজেই যখন অনৈতিকের মতো কাজ করে তখন তার সামনে কান্না মানায় না।

"আফিয়া! আসলে মা চাচ্ছেন না এই সম্পর্কটা আর এগিয়ে যাক। তাই.."

"ব্যস! অবশ্যই তাই। আপনার মা প্রথম দিনেই নিমরাজি ছিলেন। সেক্ষেত্রে আপনার উচিত ছিলো এমন সম্পর্ককে আশার আলো না দেখানো যেটা আপনার মায়ের নারাজীতে হচ্ছে। যাক। এসবে আপনার কিছুই যাবে আসবে না। আপনি হলেন সোনার আংটি। সে বাঁকাও ভালো। কিন্তু কি হবে জানেন? এর পরে পাড়ায় রটে যাবে,"আফিয়ার বিয়ে ভেঙে গেছে। নিশ্চয়ই মেয়ের সমস্যা আছে।" থাক, ওসব নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না। মায়ের সেবা করুন এবং তার পছন্দের মেয়েকে নিয়ে সংসার করুন। ভালো থাকবেন।"

আফতাব টু শব্দটাও করলো না। যে সম্পর্কটা সে তুমিতে উঠিয়েছিলো সেটা আফিয়া আপনিতে নামিয়ে শেষ করলো। অবশ্য আফিয়া শেষ করলো এটা বলা ঠিক না। শেষটা সে-ই করেছে। একটা বিশ্রী সমাপ্তি।

মনের ক্ষোভ যতোটা সম্ভব ততোটা প্রকাশ করার চেষ্টা করলো আফিয়া। ফোন কাটতেই ডুকরে কেঁদে উঠলো মেয়েটা। সে কি শুধুই আশপাশের মানুষের কথাকে ভয় করে? যে মানুষটা তার মনের আকাশে ভালোবাসার সাদা মেঘের ভেলা ভাসিয়ে নিজে কালো মেঘ হয়ে গেলো তার বিরহের দুঃখটুকু সে কাকে দেখাবে? কেউ নেই। এই নামহীন সম্পর্কের কোনো অধিকার নেই। শুধু আছে একঝাঁক রংচঙে বাক্য। আফিয়ার মনে হয় সেগুলো সব প্রতারণা। দ্রুত মুখে হাত চাপা দিলো। কান্নার শব্দটুকুও সে কাউকে শোনাতে চায় না। চোখ মুছে টাল মাটাল পায়ে ভাইয়ের ঘরের দিকে রওনা দিলো আফিয়া। শেষ শুধু আফতাবই করতে পারে না।

আহমাদ বাড়িতে এসেছে কয়েকদিন হলো। তবে পুড়ে যাওয়া চামড়া এখনও শুকায়নি। ফলাফল স্বরূপ হাত এবং পা ভালো করে নাড়াতে পারে না। ইশিকা বিছানায় গড়াগড়ি করে খেলছে। একটু পরপরই আহমাদের গায়ে ঝাঁপ দিচ্ছে। আহমাদ সোফায় চলে এলো। হাতে একবার ব্যাথা লেগেছে। পায়ে লাগলে সে আর বাঁচবে বলে মনে হচ্ছে না। সোফায় পিঠ ঠেকাতেই আফিয়া ঘরে এলো। তাকে দেখে আহমাদের কাছে যু-দ্ধে পরাজিত বিদ্ধস্ত সৈনিকের মত লাগলো।

"ভাইয়া।"

"কি হয়েছে? তোর চোখমুখের এই অবস্থা কেনো?"

"আফতাব বিয়েটা ভেঙে দিয়েছে।"

আহমাদের মনে হলো এই খবর শোনার চেয়ে আরেকবার পুড়ে যাওয়া সহজ।

"তোমার কাছে অনুরোধ রইলো। এরপরে বিয়ে ঠিক করার সময় বিয়েটা করিয়ে দিও প্লিজ। আর নয়তো ভেঙে দিও। এভাবে বোঝাবুঝির নামে নামহীন একটা সম্পর্কে জড়িয়ে দিও না।"

আফিয়া ঘুরতেই মাহিবাকে দেখলো। তবে সে পা থামালো না। তারা বিশ্রাম পেলো ঘরের দরোজা আটকানোর পর।

আহমাদ স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। মাহিবা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। ঠিক এই অনিশ্চয়তার কারণেই সে দুটো ছেলেমেয়েকে এভাবে ছেড়ে দিতে রাজি হয়নি। এখন আর সেসব বলে লাভ নেই। শুধু শুধু কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দেয়া।

অক্ষম আক্রোশে ফোন হাতে নিলো আহমাদ। আফতাবের বাবার কাছে সে একটা জবাবদিহি চাইবে। এতোটা দিন পর হঠাৎ কেনো তাদের পক্ষ থেকে নেতিবাচক উত্তর এলো। তার বোন তো ফেলনা নয়। সে-ও সেধে দিতে চায়নি। তাহলে?

ভদ্রলোক সম্ভবত আহমাদের কল আশা করেননি। রিজেকশনের পর মেয়েপক্ষের চুপ করে যাওয়াটা নিয়ম কি না। তাই আহমাদের শক্ত কণ্ঠ তাকে বেশ নাড়িয়ে দিলো। কিন্তু তিনিও হাওয়ায় বুড়ো হন নি। জবাব দিতে তিনিও ওস্তাদ। আহমাদ জিজ্ঞেস করলো,"এতো দিন পর আপনাদের থেকে এমন উত্তর আশা করিনি আঙ্কেল।"

"কেমন উত্তর আশা করেছিলে বাবা?"

ভদ্রলোক বেশ নম্র কণ্ঠে বললেন। আহমাদ বলল,"না হলে তো প্রথমেই বলে দিতে পারতেন। এভাবে ঘোরানোর কোনো মানে ছিলো না। আমার বোনকে আপনাদের কাছে যেচে দিতে আমি চাইনি। আপনারাই উপযাচক হয়ে এসেছিলেন।"

"সেটা তো ঠিক। কিন্তু তুমি নিজেই ওদের মধ্যে একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং হওয়ার জন্য সময় কাটানোর সম্মতি দিয়েছিলে। এখন যদি তাদের মাঝে ভালো বোঝাপড়া না হয় তাহলে তারা আগাতে চাইবে কেনো?"

নিজের কাজে নিজেই ফেঁসে গেলো আহমাদ। মর্মে মর্মে অনুভব করতে পারলো সে নিজে তার বোনটাকে তাদের কাছে খুচরো পয়সার মতো ভেঙে দিয়েছে। না পারছে টুটি চেপে ধরতে না পারছে মুখে কুলুপ এঁটে থাকতে।

"বোঝাপড়া তৈরি করতে সময় দিয়েছিলাম। সম্পর্ক ভাঙার জন্য নয়। যাই হোক কথাগুলো আফতাব বললে বেশি খুশি হতাম। কিন্তু যে ছেলে নিজের পছন্দের জন্য একটা স্ট্যান্ড নিতে পারে না তার কাছে আমি আমার বোনকে কখনোই দিতে চাই না। ভালো থাকবেন।"

কল কেটে দিলো আহমাদ। বিয়ের আগে বোঝাপড়াটাকে তার কাছে শুভঙ্করের ফাঁকি মনে হলো। ইচ্ছেমত নিজেদের উজাড় করে দেওয়ার পর হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেয়া হলো বিয়ে হবে না। কি আশ্চর্য!

"কিছু মনে না করলে একটা কথা বলি?"

পাশে এসে বসা স্ত্রীর দিকে তাকালো আহমাদ। গম্ভীর কণ্ঠে বলল,"বলো।"

"আল্লাহর আদেশের উপর নিজেদের যুক্তি চলে না। আপনি সাদা চোখে যেটা দেখতে পান না সেটা সর্বদ্রষ্টা আল্লাহ দেখেন। দেখে,জেনে,বুঝেই তিনি আমাদের উপর কোনো বিধান দেন। অনেক ক্ষেত্রে হয়তো সেই বিধান মেনে আমরা জীবনে সুখী হতে পারি না। তবুও এটা একটা স্বস্তি যে অন্তত আল্লাহর যাচ্ছে আমরা বলতে পারবো তোমার বিধান আমরা মেনেছি। কিন্তু তাঁর বিধান না মেনে নিজেদের ঠুনকো যুক্তির উপরে জীবন চালিয়ে কি তাঁর কাছে নালিশ করা চলে?"

আহমাদ কিছু বলার আগেই মাহিবা আবার বলল,"শুধু আফির বিষয়টার জন্যই বলছি না। জীবনের প্রত্যেকটা ধাপে আমাদের এই চিন্তটুকু মাথায় রাখা উচিত। আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাদের খারাপ চান না। তিনি তো আমাদের শত্রু নন। একটা ভুল আমাদের জীবনকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু ভেঙে গুড়িয়ে যাওয়া সেই জীবনকে নতুন একটা রূপ দেওয়ার সামর্থ্য আমাদের আছে। তাই না?"

পুড়ে যাওয়া হাতের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে ছিলো আহমাদ। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে সেদিকে তাকিয়ে মাহিবা হেসে বললো,"দাগ থেকে যদি দারুণ কিছু হয় তবে দাগই ভালো!"

আহমাদ দেখলো তার ভুল ভাঙিয়ে দেওয়া ফুলকে। অযত্নে অবহেলায় যে আজ মলিন হয়ে গেছে।

চলমান।