প্রাপ্তি (দ্বিতীয় অধ্যায়) — পর্ব ১৩
লেখক: বিনতে ফিরোজ · পর্ব ১৩ · ২৫ পর্বের মধ্যে ১৩
মাহিবা ফ্যাক্টরিতে যেতে চেয়েছিলো। ইফাদ ফোন দিয়ে সেদিকে যেতে নিষেধ করেছে। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে হাসপাতালে যেতে নির্দেশ দিয়েছে। মাহিদ এবং সাহেদ সাহেব ছিলেন মাহিবার সাথে। ভাইকে মাহিবা বলল,"ইফাদ ভাইকে আরেকবার ফোন দে মাহিদ।"
"কি বলবো দিয়ে?"
"জানি না। জানি না।"
মাহিবা বিড়বিড় করলো। মাহিদ বোনের অবস্থা বুঝে তাকে এক হাতে বুকের কাছে জড়িয়ে নিলো।
"আল্লাহর কাছে দোয়া কর। এভাবে ভেঙে পড়িস না। তোর অবস্থা আরো একজনের উপর প্রভাব ফেলছে। এটা মাথায় রাখ।"
মাহিবা শুনলো বটে। কিন্তু মাহিদ বলতে পারবে সে কিছুই বুঝতে পারেনি। হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে বাইরের দিকে তাকালো মাহিদ। সি এন জি সে সময়েই থেমে গেলো। বাবা ভাইয়ের মাঝখানে থাকায় মাহিবা আগে বের হতে পারলো না। তবে মাহিদ বের হতেই ঝট করে বের হয়ে ঝড়ের গতিতে হাসপাতালের দিকে হাঁটতে লাগলো। মাহিদ তাকালো। ভয় পেলো। মেয়েটা না পড়ে না। ছুটে যেয়ে বোনের একটা হাত ধরলো মাহিদ। মাহিবা বলল,"ইফাদ ভাইয়ের কাছে শোন। উনি কোথায়?"
মাহিদ জানে আহমাদ কোথায়। বার্ন ইউনিট কথাটা মুখে আনতে তার কষ্ট হচ্ছিলো। সে বলল,"আমি জানি কোথায়। তুই আমার সাথে আয়।"
"কোথায় উনি? আগে বল আমাকে।"
"এতো কথা বলছিস কেন! আসতে বলছি আয়। নাহলে তোকে এখানে ফেলে রেখেই চলে যাবো।"
সাহেদ সাহেব প্রাণপণে ছুটছেন। জামাইয়ের সংবাদে যথেষ্ট মুষড়ে পড়েছেন তিনি। গতি বৃদ্ধি পাওয়ার বদলে অনুমিত শঙ্কায় মনটা ভয়ে কুঁকড়ে উঠছে। হাঁটার তাল ঠিক রাখতে পারছেন না তিনি। ছেলেমেয়েদের দিকে তাকিয়ে শুধু বললেন,"আল্লাহ! আল্লাহ!"
•
বার্ন ইউনিটের সামনে এসে মাহিবা থমকে গেলো। তার পেট গুলিয়ে আসছে। আশপাশের মানুষগুলোর আহাজারি তার কানকে যেনো গলিত সীসার ন্যায় পোড়াচ্ছে। ঢোক গিলে মাহিদের দিকে তাকালো মাহিবা।
"আমরা এখানে এসেছি কেনো?"
মাহিদ কিছু বলতে পারলো না। চারপাশে তাকিয়ে শুধু ইফাদকে খুঁজলো। না পেয়ে ফোন দিলো।
"ইফাদ ভাই আপনি কোথায়?"
মাহিবা ডানে তাকালো। এক মহিলা সমানে চিৎকার করে চলেছে। মাহিবা মহিলার দিকে অপলক তাকিয়ে রইলো। কিছুক্ষণের মাঝে মহিলার কোলে বছর তিনেকের একটা শিশুকে এনে দেয়া হলে তার চিৎকার যেনো বিশ হাজার ডেসিবেলের মাত্রা ছাড়ালো। মাহিবা কানে হাত দিলো,চোখ বন্ধ করলো। তার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে। চোখ খুললে তার নিশ্বাস যেনো আটকে গেলো। শিশুটির মুখ বোঝা যাচ্ছে না। ঝলসে যাওয়া চামড়া যেনো তার ভেতরের ব্যথার প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলছে। বাচ্চাটার গলা ভেঙে গেছে। সম্ভবত অনবরত চিৎকারের কারণে তার গলা আর কাজ করছে না। যখন মহিলার চোখে পানি টুপ করে বাচ্চাটার পুড়ে যাওয়া চামড়ায় পড়লো বাচ্চাটা চিৎকার করে উঠলো তার ভাঙ্গা গলা দিয়ে। মাহিবা দেখলো বাচ্চাটার পিঠের একপাশ, ডান হাত,দুই পায়ের তালু পুড়ে গেছে। চামড়ার পরিবর্তিত রূপ দেখে তার পিঠ বেয়ে ঠান্ডা জলের স্রোত বেয়ে গেলো। বুক ভাঙ্গা আহাজারি আর সে সহ্য করতে পারলো না। মুহূর্তেই গড়িয়ে পড়ল হাসপাতালের নোংরা ফ্লোরে।
•
চোখ মেলে তাকিয়ে কিছু বুঝতে পারলো না মাহিবা। চারপাশের সবকিছু ঝাপসা লাগছে। অজান্তেই পেটে হাত দিলো মাহিবা। আস্তে করে উঠে বসলো। আয়িশা বিছানার এক কোণে গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে। এদিক সেদিক তাকিয়ে মাহিবা বুঝলো সে একটা কেবিনে আছে। হঠাৎ আহমাদের কথা মন হতেই দ্রুত উঠে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো। সেই ক্ষণেই সালেহা বেগম ঢুকলেন। মাহিবাকে এভাবে ছুটে আসতে দেখে বললেন,"এভাবে ছুটোছুটি করছিস কেনো?"
সালেহা বেগমের গাল ভেজা,চোখ লাল। মাহিবা কথা বলার চেষ্টা করলো। পারলো না। সালেহা বেগমের হাত ধরলো। খুব কষ্ট উচ্চারণ করলো,"মা!"
সালেহা বেগম ডুকরে কেঁদে উঠলেন। মাহিবা আর থাকতে পারলো না। কেবিনের বাইরে আসতেই সাহেদ সাহেব,মালা বেগম,মাহিদ,আফিয়া,ইফাদ সকলেই নজরে এলো। মায়ের কাছে ছুটে গেলো। মালা বেগম মেয়েকে বুকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকলেন। মাহিবা ছুটে আফিয়ার কাছে গেলো।
"তোমার ভাই কই আফি?"
"আই সি ইউ তে।"
গম্ভীর কণ্ঠে,চোখ লাল করে বলল আফিয়া। সামনে তাকিয়ে মাহিবা দেখলো বড় বড় করে ইংরেজি অক্ষরে লেখা,"I C U"।
চলমান।