প্রাপ্তি (দ্বিতীয় অধ্যায়) — পর্ব ১৫

লেখক: বিনতে ফিরোজ · পর্ব ১৫ · ২৫ পর্বের মধ্যে ১৫

কেবিনে ঢুকে মাহিবা একদৃষ্টে কিছুক্ষণ আহমাদের আঘাত পাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। থুতনির এক জায়গায় একটা সেলাই দেওয়ার কারণে সেখান থেকে কিছু দাঁড়ি কেঁটে ফেলতে হয়েছে। জায়গাটা বেখাপ্পা দেখতে লাগছে। মাহিবা চোখ বন্ধ করে বড় করে শ্বাস নিলো। এই বেখাপ্পা মুখটাই সে দেখতে চায়। বারবার। নার্সের অনুমতি নিয়ে সেখানেই মাগরিবের নামাজ পড়তে দাঁড়িয়ে গেলো। সালেহা বেগম শুনেই ছুটে এসেছেন। হাউমাউ করে যতক্ষন কান্নাকাটি করে তারপর আহমাদের মুখে হাত বুলিয়ে বললেন,"কিভাবে এসব হয়ে গেলো বাবা?"

আহমাদ একবার নত মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মাহিবার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,"আল্লাহর দেয়া নিয়ামতের ঠিকঠাক যত্ন না করতে পারলে,আমানতের খিয়ানত করলে একটা শিক্ষা তো পেতেই হবে।" মুখে বলল,"ফ্যাক্টরিতে দুটো মেশিন নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এমনিতেই গত এক মাস লসের ভেতরে ছিলাম তার উপরে আবার মেশিনে সমস্যা। তাই দেখতে ওখানে গিয়েছিলাম। যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই একটা নষ্ট মেশিনের ইঞ্জিনে সমস্যা হয়। ওটা কে চালু করে রেখেছিল খেয়াল করেনি। সেখান থেকেই আগুন লেগে আশপাশের আরো মেশিনে ছড়িয়ে পড়ে। তারপর পুরো ফ্যাক্টরি।"

দম ছাড়লো আহমাদ। সালেহা বেগম বললেন,"আর কেউ তো এমন পুড়ে টুরে যায়নি। তোর এই অবস্থা হলো কেনো?"

"কোম্পানি আমার মা। লস হলেও আমার লাভ হলেও আমার। আগুন দেখে তখনই কেউ বের হয়নি। এগিয়ে গিয়ে দেখেছিলাম নেভানো যায় নাকি। কিন্তু আগুন ছড়িয়ে পড়ায় কাজটা কঠিন হয়ে গিয়েছিল। তাই সবাই বেরিয়ে পরে। আমি আরেকটু চেষ্টা করেছিলাম আগুন নেভানোর তাই.."

"এই আরেকটুর মানে এক ঘন্টা। ইফাদ ভাই বলেছে উনি আরো এক ঘন্টা ভেতর ছিলেন। আগুনের তাপ, ধোঁয়া সরাসরি ফুসফুসে যেয়ে আক্রমণ করেছে। হাত পুড়েছে,কোমরের নিচে পায়ের কাছে পুড়েছে। গলার নিচে কেটেছে। সব থেকে বেশি দুর্বল হয়েছে ফুসফুস। সেজন্যই সরাসরি আই সি ইউতে নিতে হয়েছে।"

সালেহা বেগমের দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলল মাহিবা। আহমাদ বুঝলো আবহাওয়া গরম। খুবই গরম।

আহমাদকে তরল খাবার খাওয়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেসময় অতগুলো কথা একসাথে বলে বেচারা বেশ হাঁপিয়ে গেছে। কতক্ষন ঝিম মেরে পড়ে ছিলো। যেনো শক্তি জুগিয়েছে। তার পর নতুন উদ্যমে মাহিবার পিছে লেগেছে। স্যুপ খাওয়াচ্ছিল মাহিবা। আর অনবরত কথা বলে চলছিলো আহমাদ।

"কথা বলবে না?"

"একটাও কথা বলবে না?"

"ইয়ে.. দুই এক অক্ষরে কথা তো বলতেই পারো। তাই না?"

শেষমেষ হতাশ হয়ে আহমাদ বলল,"মনে হচ্ছে জ্ঞান না ফিরলেই ভালো হতো। একেবারে সারাজীবনের মত অজ্ঞান..."

ঠাস করে চামচটা রাখলো মাহিবা। বেশ উঁচু গলায় বলল,"দিনের পর দিন আপনি আমাকে অবহেলা করে গেছেন,কতগুলো রাত আপনার পাশে থেকে জেগে কাটিয়েছি একটাবার উঠে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করেননি। নিজের অ্যাসিসটেন্ট হিসেবে একটা মেয়েকে নিয়োগ দিয়েছেন। বাইরের মেয়েদের চকচকে রূপ দেখে আমাকে আর ভালো লাগেনি। একবারও আমি বলেছি সারাজীবনের মত অজ্ঞান হয়ে গেলে ভালো হতো? বলেছি! সবসময় আপনার মনমর্জি চলবে না।"

একদম কথাগুলো বলে নিশ্বাস নিল মাহিবা। সবটা শুনলেও শেষ কথাটা আহমাদের কাছে বড্ড বেমানান লাগলো।

"মেয়ে অ্যাসিসটেন্ট রেখেছি ঠিক। কিন্তু তার জন্য তোমাকে ভালো লাগেনি এটা কে বলল?"

"আমি বধিরও না,অন্ধও না। যে লোক বাইরের মোমবাতির ঝলক দেখে অভ্যস্ত হয়ে তার কাছে যে ঘরের চাঁদ কলঙ্ক মাখা মনে হবে।এতটুকু বোঝার ক্ষমতা আমার আছে। আপনি নিজেই বলুন। সেই মেয়েটার থেকে নজরের হেফাজত করেছেন? যেই নজর পাওয়ার অধিকার ছিলো আমার,শুধু আমার সেই বিশুদ্ধ নজর আমাকে এনে দিতে পেরেছেন? পারেননি বলেই আমার অসুস্থতা,দুর্বলতা আপনার কাছে অপরিপাট্য মনে হয়েছে। আপনার চোখের ভাষা পড়ার মতো চোখ এখনও আমার আছে। আপনার মুখ দেখেই আমি বুঝতে পারি আপনার ভেতরে কি চলছে। না বুঝলেও ভালো হতো। অন্তত আমি যে আপনার জীবনে অবহেলার খাতায় চলে গেছি এটুকু জানতে হতো না।"

চোখ মুছলো মাহিবা। দ্রুতগতিতে কেবিন থেকে বের হতে যেয়ে দরজায় ধাক্কা খেলো। পায়ে আঘাত পেলেও সেদিকে তাকালো না। আহমাদ উঠে আসতে চাইলো। পারলো না। যে সময় পারতো সে সময়টায় সে উঠে যায়নি। অপারগতার এই সময়টায় সে ভীষণ আফসোসে ভুগলো।

ইফাদ একটা প্যাকেট নিয়ে এসেছে। আহমাদ উঁকি দিয়ে দেখলো।

"কি এনেছিস?"

"রোগীদের এত কৌতূহল থাকতে নেই। যা এনেছি এনেছি। খাওয়ার ভাগ্য থাকলে খেতে পারবি।"

"রোগীর সাথে রুড ব্যবহার করা উচিত না। নরম করে কথা বল। দেখি কে এনেছিস। প্যাকেট খোল।"

ইফাদ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,"কিছু আনিনি।"

"কি!"

"কিছু আনিনি।"

"তাহলে প্যাকেট কেনো?"

"খালি হাতেই আসছিলাম। ঢোকার সময় দেখি নার্স,কেবিন বয় সবাই চোখ বড় বড় করে আমার হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। তারপর ফেরত যেয়ে দোকান থেকে একটা প্যাকেট নিয়ে এলাম।"

"কি আজব কারবার! কিছু নিয়ে আসতে কি হলো?"

"টাকা আনিনি। ভাড়া দিয়ে দেখি টাকা শেষ।"

বিরস মুখে বলল ইফাদ। আহমাদ হতাশ নিঃশ্বাস ছাড়লো। এই নাহলে বন্ধু! টাকা নেই তাই অসুস্থ বন্ধুকে দেখতে খালি প্যাকেট এনেছে। ইফাদকে এবার প্রকৃতই গম্ভীর দেখালো। সে বলল,"সেদিনের ডিলটা ক্যানসেল হয়ে গেছে।"

"জানতাম। ফ্যাক্টরি পুড়ে গেছে। ওরা ডিল রাখবে কার ভরসায়?"

ইফাদ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল,"এই ধাক্কা সামলাতে কতদিন লাগে আল্লাহই ভালো জানে।"

আহমাদ শুনলো কিন্তু কিছুই বলতে পারলো না।

আফিয়ার চোখমুখ লাল হয়ে আছে। মাহিবা সেটা খেয়াল করলো। আহমাদের ওষুধ পত্র গুছিয়ে সালেহা কাছে দিয়ে আফিয়াকে টেনে নিয়ে এলো এক কোণে। ফিসফিস করে বলল,"তুমি কি অসুস্থ আফি??

"না।"

"কি হয়েছে তাহলে? চোখমুখ এমন লাল হয়ে আছে কেনো?"

আফিয়া হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠলো। নিজ উদ্যোগে মাহিবার বুকে জায়গা করে নিলো। মাহিবা প্রথমটায় হতচকিত হয়ে গেলেও পরপরই আফিয়ার পিঠে ভরসার স্পর্শ দিলো। নরম কণ্ঠে বলল,"কি হয়েছে আফি? আমাকে বলো।"

কান্নার দমকে আফিয়া শুধু এটুকু বলতে পারলো,"আফতাব.."

চলমান।