পুনর্জন্ম (এক প্রেম কাহিনী) — পর্ব ০৮

লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: সিজন সিরিজ · পর্ব ০৮ · ৯ পর্বের মধ্যে ৮

রফিক দাদু আমাকে আরেকটু কাছে ডেকে হেয়ার পিনটা আমার হাতে দিয়ে আস্তে আস্তে বললো.....

রফিক দাদু:- ফজরের আযান দিচ্ছিলো তখন, হঠাৎ করে দেখি কেউ একজন তোমার আম্মুর চুল ধরে হ্যাচরাতে হ্যাচরাতে দোতলা থেকে নামছে, পিছনে তোমার আব্বু ছুটে আসছে তোমার আম্মুকে বাঁচানোর জন্য।

কে তোমার আম্মুর চুল ধরে হ্যাচরাতে হ্যাচরাতে নিচে নামিয়ে আনলো এটা দেখার জন্য আমি লুকিয়ে পড়ি, কিছুক্ষণ পর দেখি সেটা আর কেউ নাহ, রিশা দাদুভাই। কিন্তু আমি বুঝে গেছিলাম এটা রিশা দাদুভাই নাহ এটা হানা যে রিশার রূপ নিয়ে এসব করছে।

তারপর তোমার আব্বু রিশার কাছে অনেক কাকুতিমিনতি করে সে যেনো তোমার আম্মুকে ছেড়ে দেয় কিন্তু রিশা তা নাহ করে তোমার আব্বুর মাথাটা ধর থেকে আলাদা করে মেরে ফেললো।

এটা দেখে আমি চিৎকার দিয়ে দোতলার দিকে দৌড়ে আসার সময় দেখি রিশা তোমার আম্মুর মাথাটাও ধর থেকে আলাদা করে ফেলে আমার পিছু পিছু আসছে।

আমি দৌড়ে এই ঘরে এসে বহুযুগ আগে রিশার ব্যবহৃত চুলের কাঠিটা হাতে নি কারণ আমার দাদা মারা যাওয়ার আগে আমার বাবাকে বলে গিয়েছিলো রিশার ব্যবহৃত চুলের কাঠি দিয়েই তাকে হত্যা করা সম্ভব আর আমার বাবা মারা যাওয়ার আগে আমাকে বলে গিয়েছিলো।

তারপর রিশা রূপী হানা আমার পিছু পিছু এখানে চলে আসে আমি ওর ব্যবহৃত চুলের কাঠিটা দিয়ে বার বার ওকে আঘাত করি কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছিল নাহ বরং সে আমার পেটে ছুড়ি বসিয়ে চলে গেলো।

এই বলে রফিক দাদু মারা যায়।

আমি তখনও নিজেকে ক্ষমা করতে পারছিলাম নাহ, আমি আমার জীবন রক্ষা করার জন্য আমার বাবা মাকে হানার কাছে উৎসর্গ করে দিলাম।

তখন মাওলানা আলতাফ সাহেব আমাকে বললেন...

মাওলানা আলতাফ সাহেব:- হানা আর কেনান একে অপরকে নিজের জীবনের চাইতেও বেশি ভালোবাসতো।

কেনান সাহেব হানাকে সবসময়ই নিজের জীবন দিয়ে আগলে রাখার চেষ্টা করতো কিন্তু হানা কেনানের সাথে বেইমানি করে, কেনানের প্রিয় বন্ধু জিলানীর সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে....

ঠিক তখনই যেনো আমার সবকিছু মনে পড়ে যায়......

আমি:- তারা এক হওয়ার জন্য আমাকে তাদের পথ থেকে সরাতে চেয়েছি সেজন্য আমার উপর কালো জাদু করে যাতে আমি মারা যাই কিন্তু আমার সাথে হানার বিয়ে ঠিক হয়ে যায়...

আমাদের বিয়ের দিন হানা আর জিলানী একে অপরের সাথে কথা বলছিলো...

হানা:- আমি কেনানকে বিয়ে করতে চাই নাহ আমি তোহ তোমাকে ভালোবাসি,এখন আমি কি করবো এখন...?

জিলানী:- তুমি চিন্তা করো নাহ, তুমি নিশ্চিতে কেনানকে বিয়ে করো, কেনানকে আমাদের রাস্তা থেকে হাটানোর দায়িত্ব আমার, কেনান মারা গেলে ওর ভাগের সম্পত্তিও তোমার হয়ে যাবে, হা! হা! হা!

কিন্তু একটা কথা মাথায় রেখো বাসর রাতে কেনানকে পানি পান করতে দিবে নাহ।

হানা:- আচ্ছা মাথায় থাকবে। কিন্তু কি করবে তুমি..?

জিলানী:- সময় হলেই জানতে পারবে.!

বিয়েটা সুন্দর মতো হয়েছিলো সেদিন, তারপর বাসর রাতে আমি হানার পাশে গিয়ে বসলাম, কিছুক্ষণ গল্প করার পর আমার অনেক তৃষ্ণা পায়।

আমি:- তুমি একটু অপেক্ষা করো আমি পানি পান করে আসছি.!

হানা:- আজকের মতো একটা দিনে তুমি আমাকে একা রেখে চলে যেতে চাইছো.! বুঝেছি.! তুমি আমাকে একটুও ভালোবাসো নাহ.?

আমি:- আরে এমনটা নয়, আচ্ছা যাবো নাহ খুশি তোহ এবার.?

হানা:- হ্যাঁ অনেক.!

এই বলে আরো কিছুক্ষণ গল্প করে আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম অপরদিকে জিলানী কালো জাদু চালিয়ে যাচ্ছে।

মাঝরাতে আমার শরীর থেকে রুহ্টা বের করিয়ে নিলো পানি পান করানোর জন্য, রুহ্টা যখনই পানির পাত্রে গেলো তখনই হানা পাত্রটা ঢাকনা দিয়ে ঢেকে ফেললো...

মাওলানা আলতাফ সাহেব:- পরদিন সকালে খান বাড়িতে দুঃখ নেমে আসে কারণ খান বাড়ির বড় ছেলে কেনান খান মারা গেছে।

হানা কান্না করতে করতে বার বার জ্ঞান হারাচ্ছিল।

সকল নিয়ম মেনে কেনান খানের লাশ দাফন করা হয়।

কেনান খানের মৃত্যুর কিছুদিন পর হানাকে খান ভিলার লোকেরা দায়িত্ব নিয়ে জিলানীর সাথেই বিয়ে দেয়।

কারণ সদ্য বিধবা হওয়া মেয়েটিকে পরিচিত কেউ ছাড়া অন্য কেউই বিয়ে করতে চাইবে নাহ।

যেহেতু কেনান খানের ছোট ভাই হেলাল খান [আরিয়ানের পর দাদা] কেনান খানের আগেই বিয়ে করে ছিলো তাই হানাকে খান ভিলার অন্ধকার কোনো পুত্র নাহ থাকার কারণে কেনান খানের কাছের বন্ধু জিলানীর সাথেই বিয়ে দেওয়া হয় এবং তাদের আগামী জন্ম নেওয়া সন্তানের জন্য কিছু জমি এবং নগদ টাকা দেওয়া হয়।

ওদের বিয়ের মাস খানেক পর গ্রামে কোথা থেকে যেনো এক ভদ্রলোক এসে বলছে...

এই গ্রামে অন্যায় হয়েছে, একজনকে জীবিত অবস্থায় তাকে দাফন করা হয়েছে.!

সবাই তাকে জিজ্ঞেস করলো কাকে জীবিত অবস্থায় দাফন করা হয়েছে...

সেই লোকটি কেনান সাহেবের কথা বললো...

লোকটি খান ভিলার সেই ঘরটিতে যায় যেখানে কেনান আর হানার বাসর ঘর সাজানো হয়েছিলো।

ওই ঘরের খাটের নিচ থেকে সেই পানির পাত্রটা বের করে সবাইকে বলে...

-- এই ঘটের মধ্যেই এই বাড়ির বড় ছেলের রুহ্ এখনো আটকা পড়ে আছে।

সাবধান! এই ঘট থেকে যেনো ওর আত্মা কখনো বের হতে নাহ পারে, যদি কখনো ভুল বসৎ কেউ এমনটা করে তাহলে গ্রামে মহামারি নেমে আসবে। কারণ ওর আত্মা ঘট থেকে বের হওয়ার পর নিজের শরীর খুঁজবে আর যদি নিজের শরীর খুঁজে নাহ পায় তাহলে গ্রামের সবাইকে শেষ করে ফেলবে...

এই বলে সেই ভদ্রলোকটি পানির পাত্রটা গ্রামের সেই বটগাছটিতে নিয়ে বেঁধে রাখে।

তারপর হানা হয়তো সত্যিই কেনানের শূন্যতা অনুভব করছিলো তাই জন্য একদিন রাতে পাগলের মতো ছুটে গিয়ে সেই পাত্রটার মুখ উন্মুক্ত করে দেয় সাথে সাথে পাত্র থেকে জোড়ে৷ হাওয়া প্রবাহিত হলো....

তৎক্ষনাৎ তেমন কিছু হয়নি, হানা কেনানকেও তার আশেপাশে দেখতে নাহ পেয়ে চলে নিজের বাড়ি চলে আসে।

আমি আবারও বললাম...

আমি:- হানা তোহ সেদিন বাড়ি ফিরে যায়, কিন্তু আমি৷ ঘট থেকে মুক্তি পাওয়ার পর নিজের শরীর পাগলের মতো খুঁজতে থাকি কিন্তু কোত্থাও খুঁজে পাচ্ছিলাম নাহ, নিজের শরীর খুঁজে নাহ পেয়ে রাগে আর ক্ষোভে পুরো গ্রামে অভিশাপ দি।

গ্রামের প্রতিটি নদীনালা, খাল-বিল, পুকুর, ঝর্ণা, পানির কল সব সব সব বিষাক্ত হয়ে যায়, যে'ই পানি পান করছিলো সেই জীবন হারাচ্ছিল।

শিশু থেকে বৃদ্ধ কেউই মুক্তি পায়নি আমার অভিশাপ থেকে।

আমার অভিশাপে অভিশপ্ত হতে লাগলো গ্রামটি।

গ্রামের সবাই তখন নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য পাগলের মতো গ্রাম পরিত্যাগ করতে লাগলো।

মাওলানা আলতাফ সাহেব:- হ্যাঁ ঠিক তখনই সেই লোকটি আবারও গ্রামে এসে পৌছায়...

এসেই লোকটি ক্ষিপ্ত হয়ে বললো....

ভদ্রলোক:- এই দঃকার্য কেনো করেছো তোমরা.? আমি বারংবার নাহ করেছিলাম কেউ যেনো এমন ভুল নাহ করে, যদি এমনটা করো তাহলে এই গ্রাম অভিশাপে লিপ্ত হবে।

তখন গ্রামবাসীরা সবাই সেই লোকটির কাছে জানতে চায় এই কাজ কে করছে..

লোকটি হানার দিকে আঙ্গুল তুলে বলে এই কাজটি হানা করেছে...

তখন হানা বললো.....

হানা:- আমি লোভে পরে জিলানীর সাথে হাত মিলিয়ে আমার ভালোবাসার মানুষকে হত্যা করি কিন্তু বিশ্বাস করুন আমি জিলানীর সাথে সুখে নেই, আমি প্রতিটা দিন কেনানের শূন্যতা অনুভব করি আমি কেনানকে ভুলতে পারছিলাম নাহ।

আমি ভেবেছিলাম, কেনানকে মুক্তি করে দিলে হয়তো আমরা আবার এক হয়ে যাবো কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি আমার ছোট্ট একটা ভুলে পুরো গ্রামটি অভিশাপে ভরে যাবে শত-শত মানুষ মারা যাবে।

আপনারা আমাকে যা শাস্তি দিবেন আমি তাই মাথা পেতে নিবো, বলুন আমাকে কি করতে হবে..?

ভদ্রলোক:- তুমিই ওকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলে, আর তুমিই ওকে মুক্ত করেছো এখন তোমাকেই ওকে আটকাতে হবে..!

হানা:- কি করতে হবে আমায় বলুন..?

ভদ্রলোক:- আমি যে কাজটির কথা বলবো এতে কিন্তু তোমার প্রাণ সংশয় হতে পারে।

হানা:- আমি তাতেও রাজি.!

ভদ্রলোক:- ঠিক আছে তাহলে শুনো, আমি জানি৷ কেনান এখনো তোমাকে ভালোবাসে, আর কেনানকে যদি কেউ প্রকাশ্যে আনতে পারে সেটা একমাত্র তুমি, তোমার ভালোবাসা।

হানা:- আচ্ছা তারপর..?

ভদ্রলোক:- তুমি কেনানকে ডেকে আনবে, তারপর আমি তোমাকে একটা থালা দিবো সেই থাকাটি ভরে পানি তোমার সামনে রাখবে, যেহেতু কেনানের উপস্থিতিতে সকল পানি বিষাক্ত হয়ে যায় সেহেতু ওই থালার পানিও বিষাক্ত হয়ে যাবে...

কেনান তোমার সামনে হাজির হলেই তুমি সেই থালার পানিটা পান করবে যদি কেনান তোমাকে এখনো ভালোবাসে তাহলে সে তোমার কাছে ছুটে যাবে, কেনান যখন তোমার সামনে যাবে তখন তুমি কেনানকে কথায় কথায় আটকে রাখবে তারপর বাকি কাজটা আমি করবো..!