পুনর্জন্ম (এক প্রেম কাহিনী) — পর্ব ০১
লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: সিজন সিরিজ · পর্ব ০১ · ৯ পর্বের মধ্যে ১
প্রায় ১৬ বছর পরে আমি গ্রামে ফিরলাম। চারপাশে সবুজের বাহার, মন ছুঁয়ে যাওয়া ফুটফুটে বাতাস, আর সুন্দর প্রকৃতি আমাকে এক নতুন জীবনের স্বাদ দিচ্ছে। শহরের কোলাহলে বেড়ে উঠার পর গ্রামের শান্ত পরিবেশে এসে বোধ হয় যেনো আমি নতুন করে শ্বাস নিচ্ছি। আমার মা-বাবা আমার জন্মের অনেক আগে শহরে চলে যান, কারণ তারা গ্রামের পরিবেশে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন না। গ্রামের বাড়ির কেয়ারটেকার, রফিক দাদু, ছোটবেলা থেকে এই বাড়ির দেখাশোনা করছেন। তাঁর নাতি আব্রাহাম আমাদের সমবয়সী। আমরা তিন বন্ধু, আমি -আরিয়ান, তৌহিদ ও রনি, আব্রাহামের সাথে গ্রামটা ঘুরে দেখার পরিকল্পনা করি।
দ্বিতীয় দিনে আমরা গ্রামের কোণা-কোনা, নদীর পাড়ের গাছের ছায়া, পুরোনো পুকুরের ঘাট ঘুরে বেড়ালাম। সুর্যের আলোতে পাতা খেলা করছে, ঝিরিঝিরে বাতাস বইছে। গ্রামের শান্ত ও স্নিগ্ধ পরিবেশ আমার মনকে অবধারিত প্রশান্তি দেয়, যেনো আমি শহুরে জীবনের ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেয়েছি। তবে, বাড়ি ফিরার সময় আমি হঠাৎ নজর দিলাম এক হুজুরের উপর, সে একজন নিষ্পাপ ছেলেকে নিমপাতার ডাল দিয়ে মা*রছিলেন। হুজুর জোরে জোরে বলছিলেন, "এই নিষ্পাপ ছেলেটির দেহে কেনো এসেছিস, সয়তান? ছেড়ে দে এই নিষ্পাপ ছেলেটিকে!" আমি কৌতূহলবশত হুজুরের কাছে গিয়ে বললাম, "আপনি কি মানুষ? কীভাবে একজন মানুষকে এভাবে অ*ত্যা*চার করেন? আপনি যদি তাঁর মঙ্গল চান, তাহলে তাঁকে একফোঁটা ভালোবাসাও দিতে পারেন না?" হুজুর বললেন, "আপনাকে তো আগে কখনো দেখিনি। নতুন এসেছেন গ্রামে?" আব্রাহাম তখন জানালো, "ইয়ে মানে হুজুর, উনি খান সাহেবের নাতি।" হুজুর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আপনি এদের বিষয়ে কিছুই জানেন না। ওরা ইনসানের দুশমন।" আমি জানতে চাইলাম, "কে ইনসানের দুশমান?" হুজুর বললেন, "এই নিষ্পাপ ছেলেটির দেহে যে সয়তান আছে, সে-ই হচ্ছে ইনসানের দুশমন।" হুজুর আবারও ছেলেটিকে নিমপাতার ডাল দিয়ে মা*রতে থাকলে, আমি নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ইউনার হাত থেকে ডালটি কেড়ে নিয়ে ফেলে দিলাম। "যদি ভালো চান, ওকে ছেড়ে দিন, নতুবা বিপদ আছে বলে দিলাম।" আমি বললাম। এরপর চলে আসছিলাম ঠিক তখনই হুজুর আমাকে পিছু ডাক দিলেন, "বিপদ আমার নয়, বিপদ আপনার হতে চলেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই পাহাড়িতলা গ্রাম ছেড়ে যান।" অথচ আমি উনার কথার তোয়াক্কা না করে বাড়ি ফিরে এলাম। সারাদিন আমরা কৌতূহল নিয়ে গ্রামে ঘুরলাম। সন্ধ্যাবেলায় ঘটনার আলোচনা করতে থাকলাম। এমন সময় আম্মু চা দিতে এসে আমাদের কথা শুনলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, "কি হয়েছে বিকেলে?" রনি বললো, "বিকেলে দেখলাম একজন হুজুর একটা ছেলেকে মা*রছিলো এবং বলছিলো, 'এই নিষ্পাপ ছেলেটিকে ছেড়ে দে ইনসানের দুশমন!'" আম্মু আশ্চর্যের সুরে বললেন, "আব্রাহাম! ওরা কোন হুজুরের কথা বলছে?" আব্রাহাম জানালো, "আসলে, খালামণি, উনারা আলতাফ সাহেবের কথা বলছেন।" মা বললেন, "শুনো বাবারা, আলতাফ সাহেব বহুদিন ধরে এই পাহাড়িতলা গ্রামে আছেন। তাঁর বাবা যখন এখানে এসেছিলেন, তখন আলতাফ সাহেবও ছোট ছিলেন। তিনি এখানকার ইমামতি করেন এবং গ্রামবাসীদের বিনামূল্যে সেবা করে আসছেন। উনার দেয়া সতর্কবানীগুলো সব সত্যি।" এরপর আমরা আলাপচারিতায় মগ্ন হয়ে পড়লাম।
পরের দিন, আমরা চারজন আবারো গ্রামে ঘুরতে বের হলাম। হাঁটার সময় হঠাৎ আমি একটা মেয়েকে লক্ষ্য করলাম, যার চোখ ছিলো ডাগর ডাগর নীল নয়না, গায়ের রঙ ছিলো দুধে আলতা, আর হালকা কুঁকড়ানো চুল যেনো এক অপরূপ সুন্দরী। আমি অজ্ঞাতসারে তার পিছু নিতে লাগলাম, এক নির্জন জায়গায় গিয়ে পৌঁছালাম। সেখানে শুধু বিশাল একটি বটগাছ ছাড়া কিছুই ছিলো না। আমি মেয়েটিকে বটগাছের পাশ দিয়ে যেতে দেখলাম, কিন্তু পরে আর তাকে খুঁজে পেলাম না। আমি পাগলের মতো তাকে খুঁজতে লাগলাম, কিন্তু সফল হলাম না। চারপাশের মানুষের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার কোনো হুঁশ ছিলো না আমার। হঠাৎ আব্রাহামের চিৎকারে আমার হুঁশ ফিরলো। "এ-কি সাব! আপনি এই নিষিদ্ধ স্থানে কী করছেন? আপনি জানেন না এই জায়গায় আসা বারণ?" সে বললো। আমি মাথা নেড়ে নিষ্প্রভভাবে ফিরে এলাম। বাড়িতে এসে আমি আব্রাহামকে ডেকে আলাদা করে জানতে চাইলাম, "আচ্ছা আব্রাহাম! ওই জায়গাটিকে নিষিদ্ধ স্থান বলা হয় কেনো? আর সেখানে যাওয়া বারণ কেনো?" আব্রাহাম বললো, "কথিত আছে, বহু বছর আগে এই গ্রামে একটি ডাইনীর অভিশাপ ছড়িয়ে পড়েছিলো পরে আপনার পরদাদা নিজের জীবন দিয়ে ওই ডাইনীকে নিষিদ্ধ স্থানে বন্দী করে রেখেছিলেন।" কথা বলার সময় আমি লক্ষ করলাম, দেওয়ালের দিকে একটি ছায়া যেনো সরে গেলো। আমি তাতে পাত্তা না দিয়ে রুমে চলে এলাম। আব্রাহামের কথার প্রভাবে চিন্তিত হয়ে পড়লাম। আমি মনে মনে ভাবলাম, কি আমি ডাইনির কেলেঙ্কারিতে পড়ে গেলাম? তারপর থেকেই আমি কেমন অন্যমনস্ক থাকার চেষ্টা করছি, আমার মনের মধ্যে শুধু ওই মেয়েটির চিন্তা। মাথায় শুধু সেই নীল নয়না মেয়েটি, এবং একটি উদ্বেগ মেয়েটিই কি সেই ডাইনী, নাকি অন্য কেউ?
আমাকে এমন অবসাদগ্রস্ত দেখে আম্মু আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, "আরিয়ান, কি হয়েছে তোর?" আমি বললাম, "কিছু হয়নি তো?" আম্মু বললেন, "তোকে আমি দুই দিন ধরে দেখছি, কি হয়েছে সত্যি করে বলতো?" অবশেষে, পরিস্থিতির চাপের কারণে সাহস সঞ্চয় করে বললাম, "আচ্ছা আম্মু, গ্রামের ওই নিষিদ্ধ স্থানের কাহিনি কি?" কথাটি বলার সাথে সাথেই আম্মুর মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেলো। তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, "এই বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আমার অনেক কাজ আছে। এখন এসব নিয়ে কথা বলার সময় না আমি কাজে গেলাম।" তাঁর অনিচ্ছা এবং রহস্যময় চাহনি আমার মনে আরও প্রশ্ন উত্থাপন করলো