পুনর্জন্ম (এক প্রেম কাহিনী) — পর্ব ০২
লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: সিজন সিরিজ · পর্ব ০২ · ৯ পর্বের মধ্যে ২
ঘুম থেকে উঠে দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচের দিকে নজর দিলাম। দেখতে পেলাম, তৌহিদ এবং আব্রাহাম কিছু একটা নিয়ে কথা বলছে। তাদের মাঝে কি হচ্ছে তা জানার জন্য নেমে গেলাম। আমাকে দেখে তৌহিদ আমতা আমতা করে বললো, "কিরে! এত তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙ্গে গেলো?" আমি বললাম, "হ্যাঁ, ওই আরকি।" ঠিক তখনই রনি ভেতর থেকে ডাক দেওয়ায় তৌহিদ তড়িঘড়ি করে ভেতরে চলে গেলো। আমি আব্রাহামকে নিয়ে আলতাফ সাহেবের বাসায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম, এবং আব্রাহামও সঙ্গে আসতে রাজি হয়ে গেলো।
আমি এবং আব্রাহাম মাওলানা আলতাফ সাহেবের বাড়িতে পৌঁছালাম। সেখানে গিয়ে, আব্রাহাম বললো, "হুজুর, শহরের সাব এসেছেন আপনার সাথে দেখা করতে।" মাওলানা আলতাফ সাহেব একটু অভিভূত হয়ে বললেন, "কি মনে করে আসা হলো এই গরীবের দরবারে?" আমি আমার ভুল বুঝতে পেরে বললাম, "হুজুর, সত্যি আমাকে ক্ষমা করে দিবেন প্লিজ, আসলে আমি ভেবেছিলাম যে আপনি ভুল কাজ করছেন। কিন্তু বাসায় গিয়ে আম্মুর কথা শোনার পর আমি বুঝতে পারলাম যে আমি বিভ্রান্ত ছিলাম।" তিনি হেসে বললেন, "ও-ও, আমি কিছু মনে করিনি। আপনি আপনার ভুল বুঝতে পেরেছেন, এটাই অনেক।" এভাবে আমাদের কথোপকথন চলতে থাকলো। "আচ্ছা! এবার তাহলে যাই। ভালো থাকবেন।" বললাম আমি। মাওলানা আলতাফ সাহেব বললেন, "চলে যাবেন? আচ্ছা যান! কিন্তু তাড়াতাড়ি এই গ্রাম থেকে চলে যান। আর একটি কথা, আপনার বন্ধুরা কিন্তু আপনার বিপদ হয়ে দাঁড়াবে।" আমি অবাক হয়ে বললাম, "মানে! ওরা আমার বিপদ হবে কেনো?" তিনি সাঙ্ঘাতিকভাবে বললেন, "সময় হোক, সব বুঝতে পারবেন।" তাঁর কথা আমাকে আরও হতভম্ব করে দিলো।
বাড়ি ফিরে এসে, আমি তৌহিদ এবং রনিকে নিয়ে গ্রাম ঘুরতে বের হলাম। সারাদিন ঘুরাঘুরি করার পর আমরা একটি পাহাড়ি ঝর্ণায় গেলাম। ঝর্ণার কাছে গিয়ে হঠাৎ আমার মাথা ব্যথা শুরু হলো। ঝাপসা চোখে কিছু দেখতে পেলাম, কিন্তু ঠিক কি দেখলাম তা মনে পড়ছিলো না। তবে একটুকু নিশ্চিত ছিলাম যে আমি নিজের প্রতিবিম্ব দেখলাম। যদি আমি নিজের প্রতিবিম্ব দেখে থাকি তাহলে এত ঝাপসা কেন? এর আগে তো আমি এই পাহাড়তলা গ্রামে আসিনি। তাহলে আমি কিভাবে এরকম দৃশ্য দেখতে পেলাম? শরীর খারাপ হয়ে বাড়ি ফিরে এলাম, প্রচুর ক্লান্ত লাগছিলো। সন্ধ্যাবেলা বাসায় ফিরে এসে আমি সন্ধ্যার নাস্তা সারলাম। কিছুক্ষণ টিভি দেখার পর ফোন দিয়ে যথারীতি হালকা ঘাটাঘাটি করতে থাকলাম। কিছুক্ষণ পর আম্মুকে বললাম, "আব্বুকে বলো, আমাদের যেনো কালকেই এসে নিয়ে যায়।" আম্মু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "হঠাৎ, কালকেই চলে যাওয়ার কথা বলছিস কেনো? তুই তো গ্রামের বাড়ি আসার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলি, এখন তুই'ই চলে যেতে চাইছিস?" আমি বললাম, "হ্যাঁ, আমি কালকেই চলে যাবো। তোমাদের যদি থাকার ইচ্ছে থাকে, তাহলে তোমরা আরো কিছুদিন থাকতে পারো।" আম্মু মাথা নেড়ে বললেন, "আচ্ছা, কালকে তোর আব্বুকে এসে নিয়ে যেতে বলবো। এখন ঘুমা, অনেক রাত হয়েছে।"
আম্মুকে বিদায় জানিয়ে আমি ঘুমাতে গেলাম, কিন্তু ঘুম আসছিলো না। মনে তখনও সেই মেয়েটি আর গ্রামের সেই নিষিদ্ধ স্থানটির কথা ঘুরপাক খাচ্ছিলো। তাই কাউকে জানান না দিয়েই একা একা সেই স্থানে চলে গেলাম। জায়গাটা আজ যেনো অন্যরকম মনে হচ্ছিলো। বটগাছটির ভেতর থেকে যেনো অনেকের কান্নার শব্দ ভেসে আসছিলো। একটু ভালো করে লক্ষ্য করতেই দেখলাম, গাছের এক কোণে একটা মাটির পাত্র বেঁধে রাখা ছিলো। পাত্রটি মনে হচ্ছিলো বহুদিন ধরে ওই গাছে বাঁধা পড়ে আছে। গাছের চারপাশে অনেক লাল সুতা ও তাবিজ বেঁধে রাখা ছিলো, যেনো শেওলা পড়ে এসব প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। এদিকে, আমার মূল কাজ হলো সেই মেয়েটিকে খুঁজে বের করা এবং জানতে চাওয়া, সে কেনো এই নিষিদ্ধ স্থানে আসে। আবার একটু নজর দিতে যাবো, তখনই রিশার ফোন কল আসলো। রিশা আমার কলেজ জীবনের বেস্ট ফ্রেন্ড, এবং আমার বাবার বন্ধু রাশেদ আঙ্কেলের একমাত্র মেয়ে। কল রিসিভ করতেই, "তুমি এমন বেইমান হলে কিভাবে?" আমি অবাক হয়ে বললাম, "কি! আমি আবার কি করলাম?" রিশা উত্তর দিলো, "গ্রামের বাড়ি গেছো আজকে প্রায় ৯ দিন, এতদিনে একটা কল বা টেক্সট দেওয়ারও প্রয়োজন মনে করোনি আমায়।" আমি বললাম, "ওহ্, এই ব্যাপার! আচ্ছা বাবা সরি, এখন থেকে প্রতিদিন তোমাকে কল দিবো। গ্রামের পরিবেশটা এত সুন্দর যে একবার গ্রাম ঘুরতে বের হলে কিছুই মনে থাকে না।" রিশা বললো, "এতকিছু আমি বুঝি নাহ, তুমি এখন থেকে প্রতিদিন আমার সাথে কথা বলবে।" আমি হেসে বললাম, "আচ্ছা ঠিক আছে, আর আমরা হয়তো কালকে চলে আসবো। ওরা না আসলেও আমি কালকে চলে আসবো এটা শিওর।" রিশা বললো, "ওমা কেনো? তোমরা তো অনেক দিনের জন্য গেছো, তাহলে কালকেই চলে আসবে কেনো? আর ওরা না আসলেও তুমি কেনো চলে আসবে? কি হয়েছে, আমার কাছে বলো।" আমি বললাম, "নাহ! তেমন কিছু না। এমনি তোমাকে ছাড়া একা একা ভালো লাগে না, তাই চলে আসবো তোমার কাছে।" এভাবে রিশার সাথে কথা বলতে বলতে দ্রুত ওই জায়গা থেকে ফিরে এলাম। বাড়ির সদর দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকতে গিয়ে দেখি আম্মু, তৌহিদ, রনি আর রফিক দাদু দাঁড়িয়ে আছেন। আমি অবাক হয়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, "এত রাতে তোমরা এখানে কি করছো? ঘুমাওনি তোমরা?" আম্মু একটু ক্রুদ্ধ সুরে বললেন, "এত রাতে তুমি কোথায় ছিলে?" আমি দ্রুত উত্তর দিলাম, "আরে কিছু না, আমি কিছু সময়ের জন্য বেড়িয়েছিলাম।" রফিক দাদুও বললেন, "জানো, আমরা তোমার জন্য কত চিন্তা করছিলাম!" তৌহিদ আবার বললো, " বিলেকেই তো তোর শরীর খারাপ করলো, তারপর আবার তুই একা একা কি করে বাইরে বেড় হলি?" আমি আর কোনো উত্তর দিলাম না। বুঝতে পারলাম কাজটা আসলেই করা উচিৎ হয়নি। তখন আম্মু বললো, "আজকে যা করেছো - করেছো আর যেনো কখনো এমন না হয়, কাল সকালে তোমার আব্বু আসবে, ব্যাগ প্যাক করে রেখো কালকেই আমরা চলে যাবো.!" রবি একটু অবাক হয়ে বললো, "কালকেই.!" আম্মু বললো "হ্যাঁ কালকেই.।" ড্রয়িংরুমের কথোপকথন শেষ করে আমরা যে যার রুমে ঘুমতে চলে গেলাম।
সকালে সবাই ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট করতে বসেছিলাম। ব্রেকফাস্টের দিকে যখন সবাই মনোযোগী, তখন আব্বু এসে হাজির হলেন। সেই মুহূর্তে আমরা সবাই আব্বুর সাথে বের হবার জন্য পরিকল্পনা করছিলাম। এমন সময় তৌহিদ বললো, "আসলে আঙ্কেল, আপনারা যান আমি আর রনি বিকেলে আসছি!" আব্বু একটু চিন্তিত হয়ে বললেন, "কি বলো! তোমরা একা একা যেতে পারবে তো?" রনি সজাগভাবে উত্তর দিলো, "হ্যাঁ! হ্যাঁ! আঙ্কেল, আমরা চিনবো। আপনি একদম টেনশন করবেন নাহ।" আম্মু তখন তাদেরকে সতর্ক করে বললেন, "আচ্ছা, তাহলে তোমরা কিন্তু ঠিক মতো চলে এসো। তোমাদের সাথে কি আরিয়ানকেও রাখবে নাকী, ওকে আমাদের সাথে নিয়ে যাবো?" তৌহিদ দ্রুত বললো, "নাহ! নাহ! আন্টি, ওকে আপনাদের সাথেই নিয়ে যান।" আব্বু একটু নিশ্চিত হয়ে বললেন, "আচ্ছা, তাহলে ঠিক আছে। আমরা চলে যাচ্ছি। আর এই ধরো, আমার কার্ড। পাসওয়ার্ড হচ্ছে 67874। তোমাদের যত টাকা লাগে, খরচ করবে। ঠিক আছে?" রনি আনন্দে জানালো, "আচ্ছা, আঙ্কেল।" এরপর আমি আর আব্বু-আম্মু চলে আসি, আর রনি ও তৌহিদ গ্রামে থেকে যায়।