পুনর্জন্ম (এক প্রেম কাহিনী) — পর্ব ০৩

লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: সিজন সিরিজ · পর্ব ০৩ · ৯ পর্বের মধ্যে ৩

রনি আর তৌহিদকে আব্বুর কার্ড দিয়ে আমরা শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বাড়ি ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে গেলো কারণ আমরা রাস্তায় আব্বুর সাথে তার কলিগদের মিটিং অ্যাটেন্ড করেছিলাম। বিকেলে বাসায় ফিরে এসে প্রথমেই আমি গোসল করতে গেলাম। গোসল সেরে আম্মুকে রান্নার কাজে সাহায্য করলাম, তারপর একসাথে খাওয়া দাওয়া করে আমি আমার রুমে শুয়ে শুয়ে গান শুনছিলাম। হঠাৎ করে ইয়ারফোনে গান আসা বন্ধ হয়ে গেলো। চেক করে দেখলাম ফোন থেকে গান প্লে হয়ে নেই, তাই গানটা আবার চালু করে শুনতে লাগলাম। কিন্তু এবার হঠাৎ করে বেডের এক কোণে পড়ে থাকা হেডফোন থেকে গান ভেসে আসছিলো। দেখে ঘাবড়ে গেলাম, কেননা ল্যাপটপের সাথে এটি কানেক্ট নেই এবং ল্যাপটপটাও বন্ধ। তাহলে এটাতে গান বাজছে কিভাবে? কি হচ্ছে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াতেই লোডশেডিং হলো। আমি ফোনের ফ্লাশ অন করলাম, কিন্তু পরক্ষণেই ফোনের ফ্লাশটা নিজেই অফ ও অন হতে লাগলো। রাগে ফোনটা আছাড় দিয়ে রুম থেকে বের হবো ভাবতেই দেখি রুমের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ। অনেকক্ষণ দরজা ধাক্কালাম, কিন্তু খুললো না। হঠাৎ করে রুমের লাইট জ্বলে উঠলো। লাইটের আলোতে খেয়াল করলাম সেই মেয়েটিকে, সে আমার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি পিছন ফিরে তাকাতেই রুমের লাইট আবার নিজে নিজে জ্বলছে আর নিভছে। এবার ভয়ে আমার শ্বাস ভারি হয়ে গেলো। হঠাৎ করে মেয়েটি আমার সামনে থেকে উধাও হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ পর মেয়েটি আমার পিছনে এসে কাঁধে হাত দিলো। পিছনে তাকিয়ে দেখি, সুকৌশলে সুন্দর মেয়েটির চেহারা বিভৎস হয়ে পচে গলতে শুরু করছে। এই দৃশ্য দেখে আমি ভয় পেয়ে চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে যাই।

জ্ঞান ফিরলো রনির কলের শব্দে। মাথা তুলে দেখি আমি নিচে পড়ে আছি, এবং আমার ফোনটা এক পাশে। ফোনটা হাতে নিয়েই দেখি রনি প্রায় ৩৩ টা কল করেছে। রাত প্রায় ০৩:১৭। আমি কল ব্যাক করতেই রনি ভয় ও আতঙ্কের সাথে বললো, "এতক্ষণে তোর কল ব্যাক করার সময় হলো?" আমি বললাম, "কেনো রেহ! কি হয়েছে? তোর ভয়েস এমন লাগছে কেনো?" রনি আতঙ্কিতভাবে বললো, "ভাই! তৌহিদ আর আব্রাহাম বেঁচে নেই! তুই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাকে এখান থেকে নিয়ে যা।" আমি তড়িঘড়ি জিজ্ঞেস করলাম, "কি! কি বলছিস এগুলা? কি হয়েছে ওদের? আর তুই কোথায় আছিস এখন?" রনি বললো, "আমি এখন পাহাড়িতলা গ্রামে আছি, প্লিজ আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাহ!" আমি বিস্ময়দীপ্ত হয়ে বললাম, "তোরা এখনো ওই গ্রাম থেকে আসিসনি?" রনি বললো, "আর আসবো কি জানি না! সে আসতে দিবে নাহ!" আমি জিজ্ঞেস করলাম, "মানে! সে কে? কার কথা বলছিস তুই?" রনি বললো, "এতকিছু বলার সময় নেই। তুই প্লিজ তাড়াতাড়ি আয়!" রনির কথা শুনে দ্রুত পাহাড়িতলা গ্রামের উদ্দেশ্যে বের হলাম। বাইরে বের হতে গিয়ে দেখলাম আমাদের উঠোনের এক পাশে থাকা তেঁতুল গাছের পাশে সেই মেয়েটি মাটি খুঁড়ছে এবং আমার দিকে তাকিয়ে বিভৎসভাবে হাসছে। আমি কিছু বুঝতে না পেরে জ্ঞান হারালাম।

জ্ঞান ফিরতেই দেখি আমি আমার রুমেই আছি। প্রথমে বাড়ির বর্ণনা দিতে হয়। সদর দরজা দিয়ে ঢুকতেই বিশাল ড্রইংরুম। ড্রইংরুমের ডান পাশে ফ্যামিলির জন্য একটি বাড়তি ওয়াশরুম। প্রত্যেক রুমেই এটাস্ট ওয়াশরুম আছে। বাম পাশে কিচেন। সদর দরজা দিয়ে নাক বরাবর দুই দিকেই দুইটা সিড়ি, সিড়ি বেয়ে উপরে উঠলে ৪টা বেডরুম - একটির মালিক আমি, অন্যটি আম্মু-আব্বুর এবং দুটো গেস্টরুম।

মূল গল্পে আসি... দিন শেষ হয়ে সন্ধ্যা নামলে বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার আর প্রচুর বৃষ্টি। ফোন টিপতে টিপতে দোতলা থেকে ড্রইংরুমে এসে পা রাখতে গেলাম, ঠিক তখনই কারেন্ট চলে গেলো। সৌরবিদ্যুতের আলোয় সোফায় বসে বসে ফোন টিপছি। হঠাৎ বৃষ্টির মধ্যে দরজায় নক, কেউ চিৎকার করে বলছে, "আরিয়ান, দরজা খোল, আমি তোর আম্মু।" আমি দরজা খুলতে যাবো, ঠিক ওই মুহূর্তে দোতলা থেকে আম্মুর ডাক, "যাস না, শব্দটা আমিও শুনেছি।" আমি অবাক দৃষ্টিতে দোতলায় আম্মুর দিকে যাবো, ঠিক তখনই ড্রইংরুমের ডান পাশ অর্থাৎ ওয়াশরুমের ভিতর থেকে আম্মু চিৎকার করছে, "আরিয়ান, আমি ওয়াশরুমে আটকে গেছি, দরজা খোল!" আমি হতভম্ব হয়ে আতঙ্কের সাথে ওয়াশরুমের সামনে যাচ্ছি। ভাবছি, আম্মু নিজেদের ওয়াশরুম রেখে নিচতলার ওয়াশরুমে কি করছে? ওয়াশরুমের দরজাটা খুলবো, হাত বাড়াচ্ছি, ঠিক ওই মুহূর্তে কিচেন থেকে আম্মু আমাকে ডাকছে। আমি প্রায় পাগল হয়ে যাচ্ছি, কি হচ্ছে আমার সাথে? আমি কোথায় যাবো, কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। তাড়াহুড়ো করে কিচেনের সামনে গিয়ে দেখি আম্মু এক গ্লাস দুধ চামচ দিয়ে নাড়ছে। আমি অবাক হয়ে ভাবছি, আমি তো দুধ খাই না, তাহলে আম্মু কার জন্য দুধ ঠান্ডা করছে? আমি সামনে এগোতেই দেখি, আম্মু আলতো করে আমার দিকে তাকালো। আম্মুকে দেখে আমি শিউরে উঠলাম। এটা কে? এটা আমার আম্মু হতে পারে না, তাহলে কে এই? আম্মুর চোখগুলো একদম কালো, মুখের রঙ ফ্যাকাসে। আমার দিকে তাকিয়ে বিদঘুটে হাসি দিতেই আমি এক চিৎকার দিলাম। চিৎকার দিয়ে ওঠার পর আম্মু বললো, "কি হয়েছিলো তোর? সেই ভোর বেলা তোকে বাইরে অজ্ঞান অবস্থায় পেয়েছি। বাইরেই বা কেনো গিয়েছিলি? সারাদিন গেলো জ্ঞান ফিরেনি, এখন আবার চিৎকার দিয়ে উঠলি?" আমি ফেলফেল করে আম্মুর দিকে তাকিয়ে রইলাম আর ভাবলাম, তারমানে এতক্ষণ আমি অন্য জগতে ছিলাম। তখনই আমার রনির কথা মনে পড়লো। তাড়াতাড়ি করে পাহাড়িতলা গ্রামের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। আম্মু পিছন পিছন ডাকলো, কিন্তু আমি কোনো সাড়া দিলাম না। পথ চলতে চলতে রনিকে অনেক কল দিলাম, কিন্তু কেউ কল ধরছে না। হঠাৎ রাস্তার মাঝে এক পাগল মহিলা আমার গাড়ি আটকে দাঁড়ালো। আমি গাড়ির কাঁচ তুলতেই মহিলাটি বললো, "কোত্থাও যাসনে? নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনছিস! ফিরে যা বলছি!" আমি তার কথার তোয়াক্কা না করেই গাড়ি চালিয়ে চলতে লাগলাম। অবশেষে আড়াই ঘন্টা পর গ্রামে এসে পৌঁছলাম।

সারা গ্রাম খুঁজেও রনিকে পেলাম না। তখনই আমার মাথার টনক নড়ে উঠলো, রনি হয়তো সেই নিষিদ্ধ স্থানে আছে। কারণ সেদিন যখন আমি আর আব্রাহাম নিষিদ্ধ স্থান নিয়ে কথা বলছিলাম, তখন কেউ লুকিয়ে আমাদের কথা শুনছিলো। তাই বুঝতে পারলাম, ওই দিন তৌহিদ অথবা রনির মধ্যে কেউ একজন আমাদের কথা শুনছিলো। তাড়াতাড়ি গিয়ে পৌঁছালাম সেই নিষিদ্ধ স্থানে। গিয়ে দেখি তৌহিদ এবং আব্রাহামের মাথা বিহীন লাশ দুটি দুই দিকে পড়ে আছে। তাদের এই করুণ দৃশ্য দেখে আমি অজান্তেই কান্না করে উঠলাম। ছুটে গিয়ে তাদের পাশে বসলাম কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে তাদের দেখলাম। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে খেয়াল করলাম গাছের ডালে সেই মাটির পাত্রটাও ভাঙ্গা, গাছের শরীরে বাঁধা সুতা আর তাবিজগুলোও নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। গাছটার কাছ থেকে বেশ কিছুটা দূরে রনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। তার এক পাশে ফোনটাও পড়ে আছে। ছুটে গিয়ে পাশে দাঁড়ালাম, এরপর ওকে তুলে গ্রামের বাড়ি নিয়ে গেলাম। আমাদের দেখে রফিক দাদু ছুটে এসে বললেন, "এ-কি দাদুভাই, তোমরা গেলে না? রনি দাদু ভায়ের কি হয়েছে?" আমি চুপ করে রইলাম। রফিক দাদুর সাথে কথা বলার সাহস পেলাম না। পাবোই বা কি করে? তাকে কি বলবো? তার প্রাণপ্রিয় নাতি আমাদের জন্য মারা গেছে এটাই? রফিক দাদুকে এড়িয়ে রনিকে নিয়ে রুমে চলে গেলাম। রফিক দাদুও চুপ করে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইলো। বুঝতে পারলাম, আমার ব্যবহার দেখে তিনি কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু কি করবো? আসল সত্যিটা জানতে পারলে তিনি আরো বেশি কষ্ট পাবেন। রুমে গিয়ে রনিকে শুইয়ে দিলাম। কিছুক্ষণ পর রনির জ্ঞান ফিরলো। জ্ঞান ফিরে রনি যা বললো, তাতে আমি প্রায় শিহরিত হয়ে উঠলাম।