পুনর্জন্ম (এক নতুন অধ্যায়) — পর্ব ২৬
লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: সিজন সিরিজ · পর্ব ২৬ · ২৮ পর্বের মধ্যে ২৬
সন্ধ্যার ঠিক পরমুহূর্তে শহরটি একটি স্বপ্নীল রূপ ধারণ করেছে। আকাশে সূর্যাস্তের শেষ আলোর রেখাগুলো মিলিয়ে গেছে, আর তার জায়গা নিয়েছে নীলচে-সাদা একটি আভা। শহরের রাস্তার আলো একে একে জ্বলে উঠেছে, আর সেই আলোয় ফুটপাথে গাছপালার ছায়াগুলো দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে শুরু করেছে।বাড়িঘরগুলোতে জানালার পর্দাগুলোর ফাঁক দিয়ে উষ্ণ, হলুদ আলো বের হচ্ছে, যা একটি ঘরোয়া এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশের আভাস দিচ্ছে। চারিদিকে একটি নীরবতার পর্দা ছড়িয়ে আছে, কিন্তু মাঝে মাঝে দূরের কোনো গাড়ির হর্ণ কিংবা কোনো সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি সেই নীরবতা ভেঙে দিয়ে এক অদ্ভুত সৌন্দর্য সৃষ্টি করছে।হালকা বাতাসে শহরের গাছগুলোর পাতাগুলো মৃদু কাঁপছে, আর সেগুলো থেকে যেন এক মনোরম সুবাস বেরিয়ে আসছে। রাস্তায় কিছু লোকজন হেঁটে চলেছে—কেউ কেউ কর্মব্যস্ত দিন শেষ করে বাসায় ফিরছে, আর কেউ হয়তো সন্ধ্যার পর কিছুটা সময় কাটাতে বাইরে বেরিয়েছে।নদীর ধারের পার্কে বসা কয়েকজন মানুষ শহরের আলো-আঁধারি দেখে মুগ্ধ হচ্ছে। জলরাশিতে রোদের শেষ আলোর প্রতিফলন আর রাস্তাগুলোর আলো মিশে গিয়ে নদীর জলকে একটি দ্যুতিময় আভা দিচ্ছে। সন্ধ্যা নেমে এসেছে। চিশতি ঘরের জানালা দিয়ে বাইরের মনোরম পরিবেশ দেখে আর থাকতে পারলো না। মনের ভেতর একটা অদ্ভুত টান অনুভব করলো, যা তাকে বাইরে বের হতে বাধ্য করলো। সে ধীরে ধীরে দরজা খুলে বাইরে পা রাখলো। শহরের বাতাসে সন্ধ্যার নীরবতা, রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো আলো ছড়াচ্ছে। চারপাশের গাছগুলোতে এক ধরনের মায়াবী ছায়া পড়েছে। চিশতি ধীরে ধীরে পায়ে হেঁটে রাস্তায় নামলো, মনে হচ্ছে যেন সে দিনের সমস্ত ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে দেয়ার জন্যই বের হয়েছে।পায়ে চলা রাস্তায় ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলো চিশতি। আশেপাশে দেখলো, কিছু মানুষ তাদের নিজেদের মতো ব্যস্ত, কেউ কেউ দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে, আবার কেউ রাস্তার পাশের বেঞ্চে বসে গল্পে মশগুল। শহরের স্নিগ্ধ বাতাসে এক ধরনের সতেজতার অনুভূতি, যা চিশতির ভেতরের সমস্ত অবসাদ দূর করে দিচ্ছে। চিশতি বাইরে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর, গুলশিরিন এবং ফুরকান বাসায় একা থাকে। গুলশিরিন বসার ঘরে চুপচাপ বসে আছেন, আর ফুরকান তার নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। সন্ধ্যার নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ দরজার কলিংবেলের শব্দ হয়। গুলশিরিন কিছুটা অবাক হয়ে উঠে দাঁড়ান। "চিশতি তো সবে মাত্র বাইরে গেছে, এত তাড়াতাড়ি তো ফেরার কথা না, তাহলে কে আসতে পারে?" কোনো কিছু ভাবার আগেই গুলশিরিন দরজার কাছে গিয়ে সেটি খুললেন। দরজা খোলার সাথে সাথে তিনজন মুখোশ পড়া লোক দ্রুত ভেতরে ঢুকে পড়ে। গুলশিরিন ভয় পেয়ে গেলেও কিছু বলতে পারলেন না; তার চোখগুলো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। ফুরকানও এসময় হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।তিনজনের মধ্যে একজন নারী, তার পোশাক ঠিক যোদ্ধাদের মতো—কালো রঙের শক্ত কাপড়ের পোশাক, কোমরে একটি বেল্ট বাঁধা। তার চোখগুলো ছিলো ধূসর, যা রহস্য এবং ভয়ঙ্করতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ তৈরি করেছে। মুখে ওড়না প্যাঁচানো, শুধু চোখ দুটি দেখা যাচ্ছে। সেই চোখের দিকে তাকালেই এক ধরনের শীতল অনুভূতি হয়, যেন সে কোনো মিশনে এসেছে, যেখানে দয়া কিংবা মানবিকতার কোনো স্থান নেই।গুলশিরিন দ্রুত পেছনে সরে আসার চেষ্টা করলেও লোকেরা তাকে এবং ফুরকানকে জোর করে বসার ঘরে টেনে নিয়ে আসে। ফুরকান সাহস করে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই একজন মুখোশধারী তার সামনে দাঁড়িয়ে গেল, এবং ফুরকান যেন কোনো শব্দ করতে সাহস পেল না।এই নারীর পেছনে থাকা বাকি দুজন মুখোশধারী চুপচাপ গুলশিরিন আর ফুরকানকে নজরে রাখছে। মনে হচ্ছে, তারা আগে থেকেই পরিকল্পনা করে এসেছে। গুলশিরিন আর ফুরকানের জন্য একটি অজানা ভয়ের রাত শুরু হলো, যেখানে তারা বুঝতেও পারছে না যে সামনে কী হতে চলেছে। মুখোশধারী তিনজনের সামনে গুলশিরিন এবং ফুরকান এখন বন্দী অবস্থায়। দুইজন মুখোশধারী তাদেরকে একদিকে আটকে রেখেছে, আর নারী যোদ্ধা সবার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। গুলশিরিন নিজের সাহস সঞ্চয় করে এগিয়ে এসে দৃঢ় কণ্ঠে জানতে চায়, “তোমরা কে?” নারী যোদ্ধা ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। তার চোখের তীক্ষ্ণতা আর কর্কশ কণ্ঠ সবার মনোযোগ আকর্ষণ করলো। সে বললো, “আমি শীতাক্ষী। চিশতিকে আমি সুখে থাকতে দিবো না। ওর প্রতিটা প্রিয়জনকে আমি এভাবেই ওর কাছ থেকে কেড়ে নিবো আর ওকে একদম একা করে দিবো।” শীতাক্ষীর কথা শেষ হতেই, মুখোশধারীরা একে একে তাদের অস্ত্র বের করলো। গুলশিরিন আর ফুরকান হতাশা এবং ভয়ের সম্মুখীন হয়ে পড়ে, কিন্তু কোনো প্রতিরোধ করার মতো শক্তি তাদের নেই। শীতাক্ষীর নির্দেশে, মুখোশধারীরা তাদের উপর হামলা শুরু করলো। একে একে, তারা গুলশিরিন এবং ফুরকানকে ক্ষতবিক্ষত করতে লাগলো।শীতাক্ষীর তীক্ষ্ণ, নির্দয় চোখগুলো সবকিছু অবজার্ভ করছে, যেন সে দৃশ্যের প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগ করছে। গুলশিরিন এবং ফুরকান বারবার চেষ্টা করলেও পালানোর কোনো সুযোগ পাচ্ছে না। অস্ত্রাঘাতের আওয়াজ আর তাদের বিক্ষিপ্ত চিৎকারের মাঝে, চিশতির পরিবার ক্রমেই ধ্বংসের দিকে চলে যাচ্ছে।এতসব কিছুর মধ্যে শীতাক্ষীর মুখে এক ধরনের ভৌতিক হাসি, তার পরিকল্পনার পূর্ণতা দেখে সে যেন এক অদ্ভুত আনন্দ পাচ্ছে। গুলশিরিন এবং ফুরকানের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর, শীতাক্ষী তাদের দেহগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে নিয়েছে এবং সবার সাথে অন্ধকারে হারিয়ে যায়। চিশতির মনে হঠাৎ অশান্তির এক অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ে। তার মনে বার বার অনুভূত হতে থাকে যে কিছু ভয়াবহ হতে চলেছে। সে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয় বাড়ির দিকে ফিরে যাওয়ার। হাঁটার পথে সে বারবার নিজেকে বলতে থাকে, “বাসায় গিয়ে আম্মি আব্বুকে বলে কালকেই সিমন ভাইয়ার সাথে দেখা করতে যাবো। তারপর আমরা সবাই একসাথে হবো। আমাদের পরিবারটাও পূর্ণতা পাবে। তবে কেনো জানি না, আমার মনটা কু ডাকছে। আল্লাহ না করুক আর যেনো কোনো বিপদ না আসে আমাদের জীবনে।” চিশতি যখন দ্রুত গতিতে হাঁটছে, তার মন কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না। বাড়ি এসে সে দেখতে পায় ফ্ল্যাটের দরজা খোলা। মনে এক ধরনের খটকা লাগতেই সে ভেতরে প্রবেশ করে।ভেতরে প্রবেশ করে চিশতি তার চোখে বিশ্বাস করতে পারছে না। গুলশিরিন এবং ফুরকান মাটিতে নিহত অবস্থায় পড়ে আছে। মাটির ওপর রক্তের ছাপ আর তাদের দেহের অবস্থায় চিশতির হৃদয়ে এক তীব্র শোকের ঢেউ বয়ে যায়। সে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর তীব্র কান্নায় ভেঙে পড়ে।দ্রুত এগিয়ে গিয়ে, চিশতি গুলশিরিনের মাথা নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে। গুলশিরিন তার শেষ নিশ্বাসের আগে বেদনার্ত কণ্ঠে “শীতাক্ষী” বলে, তার হাতে থাকা প্রাণের শেষ শক্তি দিয়ে চিশতির বুকে মাথা রেখে মারা যায়। গুলশিরিনের শেষ শব্দগুলো চিশতির হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করে।চিশতি ধরা গলায় কাঁদতে থাকে, তার অশ্রু এবং বুকের হাহাকার এই ভয়ঙ্কর রাতে এক অপ্রতিরোধ্য শোকের চিহ্ন হয়ে ওঠে। এই মুহূর্তে তার মনে হয় যেন সব কিছু হারিয়ে গেছে, পরিবার, সুখ, এবং শান্তি। শীতাক্ষীর অদৃশ্য উপস্থিতি যেন তার সামনে ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চিশতির দৃষ্টি থেমে গেছে, তার চারপাশের পৃথিবী যেন হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেছে। গুলশিরিন ও ফুরকানের মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে সে একদম ভেঙে পড়ে, তার মনোবল একেবারে হারিয়ে যায়। তার ভেতরে একটি অন্ধকার শূন্যতা ছড়িয়ে পড়ে, আর একাকীত্বের অনুভূতি তাকে ঘিরে ধরে।যতক্ষণ ধরে সে বসে থাকে, তার হৃদয়ের প্রতিটি কম্পন যেন শূন্যতার সাথে মিশে যায়। ঘরটি একেবারে নিস্তব্ধ, চারপাশে কোন সান্ত্বনা বা সহানুভূতির উপস্থিতি নেই। চিশতি নিজেকে খুব একা এবং অপহরণিত মনে করে, যেন পুরো পৃথিবী তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে।এমন এক ভয়ঙ্কর মুহূর্তে, চিশতির মনের মধ্যে একটাই চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে, যেনো সে কোনোভাবে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে চায়। সে তার ফোন বের করে সিমনকে কল করে। কলের আওয়াজ বেজে উঠছে, আর চিশতির হৃদয়ে অস্থিরতা বাড়ছে।কল ধরার পর, সিমনের সাথে কথা বলতে বলতে চিশতির কণ্ঠ কাঁপছে। সে সিমনকে তৎক্ষণাৎ দেখা করার অনুরোধ জানায়। “সিমন ভাইয়া, আমি খুব বিপদে আছি। তোমার সাথে তাড়াতাড়ি দেখা করতে চাই। আমার কিছু ভালো লাগছে না, আমি একা হয়ে পড়েছি। দয়া করে দ্রুত আসো।”তার কথা শেষ হতেই সিমন উত্তেজিত কণ্ঠে প্রশ্ন করে, “কি হয়েছে চিশতি? তুমি ঠিক আছো তো?”চিশতি সান্ত্বনার জন্য অপেক্ষা করে, কিন্তু তার ভেতরের শূন্যতা এবং অসহায়ত্ব তাকে বশে আনতে পারে না। সিমনের আগমন তাকে কিছুটা শান্তি এনে দেবে, এই আশা নিয়েই চিশতি ফোন রেখে দেয় এবং নিজেকে কিছুটা শান্ত করার চেষ্টা করে। ভোরের আকাশে প্রথম আলোর রেখা ফুটতে শুরু করেছে। সিমন দ্রুত চলে আসছে, তার মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। রাতে চিশতির কল পেয়ে সে বাসায় কাউকে না বলেই দ্রুত বেরিয়ে আসে। রাস্তা পেরিয়ে সিমন ফ্ল্যাটের কাছে এসে পৌঁছায়, তার চোখের সামনে একটি অদ্ভুত নিস্তব্ধতা দেখায়।ফ্ল্যাটের দরজা খোলা, যা আরও বেশি অস্বস্তি সৃষ্টি করে। সিমন আতঙ্কিত মনে করে দ্রুত ভেতরে প্রবেশ করে। ভেতরে ঢুকে সে দেখতে পায় পুরো ঘর অন্ধকার। এক কোণে চিশতি দরজায় হেলান দিয়ে বসে, তার মুখ এবং চোখে অশ্রু আর কান্নার চিহ্ন স্পষ্ট।সিমন চিশতির কাছে গিয়ে তাকে আলতোভাবে ডাকতে থাকে, “চিশতি, তুমি ঠিক আছো তো? কি হয়েছে তোমার?” চিশতি কাঁপা কণ্ঠে শুধু কাঁদছে, তার শব্দ আর কান্নার আওয়াজ ঘরের নিস্তব্ধতা ভাঙছে।অস্থির হয়ে, সিমন রুমের লাইট অন করে দেয়। আলো জ্বলতেই ঘরের ভেতর দৃশ্য পরিষ্কার হয়ে উঠে। সিমনের চোখে পড়ছে গুলশিরিন এবং ফুরকানের মৃতদেহ মাটিতে পড়ে রয়েছে। রক্তের দাগ আর আহত দেহ দেখে তার মুখ পলকেই সাদা হয়ে যায়। এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে সিমনের হৃদয়ে এক তীব্র শোকের ঢেউ বইয়ে যায়।তিনি চিশতির পাশে গিয়ে তার হাত ধরে, শান্ত করার চেষ্টা করেন। চিশতির চোখে ভয় আর শোকের এক আশ্চর্য মিশ্রণ। সিমনের চোখে ক্ষোভ আর হতাশার ছাপ, এবং তার মুখে চিশতির পরিস্থিতির প্রতি গভীর সমবেদনা।সিমন কিছু বলার চেষ্টা করে, কিন্তু তার কণ্ঠ যেন আটকে যায়। দৃশ্যের ভয়াবহতা তাকে স্তব্ধ করে দেয়, আর চিশতির কান্না এবং ঘরের শূন্যতা তাদের দুজনকেই এক গভীর শোকের অনুভূতির মধ্যে আবদ্ধ করে রাখে। সিমন চিশতিকে বহুক্ষণ শান্তনা দেয়, তার হাত ধরে সান্ত্বনার চেষ্টা করে। চিশতির কাঁপা কণ্ঠ শুনে সিমন দৃঢ়ভাবে বলে, “দেখো চিশতি, উনারা আমারও বাবা মা। কে বা কারা উনাদের এই অবস্থা করেছে, আমরা তা খুঁজে বের করবোই। তুমি এভাবে ভেঙ্গে পড়ো না প্লিজ। আমাদের এখন শক্ত হতে হবে এবং অপরাধীদের খুঁজে বের করতে হবে।”চিশতি সিমনের কথা শুনে চোখের জল মুছে, কাঁপা কণ্ঠে বলে, “সবকিছু আমার জন্য হচ্ছে! ওরা আমাকে সুখে থাকতে দিবে না, আমার প্রতিটা প্রিয় মানুষকে মেরে ফেলবে। আমরা ওদের সাথে পারবো না, ওরা অনেক শক্তিশালী। ভাইয়া! আমাকে কথা দাও, তুমি কাউকে বলবে না যে তুমি আমার আপন ভাই। তাহলে ওরা তোমাকেও মেরে ফেলবে। কথা দাও ভাইয়া, আমার সাথে আজকের পর আর কোনোদিন যোগাযোগ রাখবে না। আমি দূরে চলে যাবো, অনেক দূরে, যাতে কেউ খুঁজে না পায়। আমি চাই না আমার জন্য আর কেউ প্রাণ হারাক। তুমি চলে যাও ভাইয়া! আমি বাবা মায়ের লাশ দাফন করে এই দেশ ছেড়ে চলে যাবো। আর প্লিজ কাউকে বুঝতে দিবে না যে তুমি আমার বড় ভাই।”সিমন চিশতির আবেগ আর সংকটের কথা বুঝতে পেরে, তার চোখে কষ্টের ছাপ নিয়ে সান্ত্বনার কথা বলে, “আমি কথা দিলাম, কাউকে বলবো না। তুমি শক্ত হও। আমি চলে যাবো, কিন্তু তোমার প্রতি আমার সহানুভূতি থাকবে। আমাদের অপরাধীদের খুঁজে বের করার কাজ চলতেই থাকবে।”চিশতি এবং সিমনের কথোপকথন শেষে, সিমন গভীরভাবে চিন্তিত মুখে ফ্ল্যাট ত্যাগ করে। পরদিন, চিশতি নিজের বাবার ও মায়ের মৃতদেহ দাফনের প্রস্তুতি নেয়। সে বুকের পাথর চাপা দিয়ে, শোক এবং কষ্ট নিয়ে কাজটি করে।চিশতি ধীরভাবে এবং সযত্নে মৃতদেহগুলো দাফন করে। তার মুখে দৃঢ়তা আর যন্ত্রণার একটি মিশ্রণ দেখা যায়। পুরো প্রক্রিয়া চলাকালে, চিশতি তার অশ্রু মুছে, শক্তি নিয়ে কাজ করতে থাকে। দাফন প্রক্রিয়া শেষে, চিশতি মাটি দিয়ে কবরে মৃতদেহগুলো ঢেকে দেয়। চিশতির চোখে কষ্টের ছাপ, কিন্তু তার দৃঢ় মনোবল আর আশঙ্কার ভেতরে, সে এক নতুন জীবন শুরু করার প্রস্তুতি নেয়।
অস্ট্রেলিয়া.....
চিশতির বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর, সে এক গভীর শোকের মধ্যে নিমজ্জিত হয়। নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে নিতে সে অস্ট্রেলিয়ায় চলে যায়, নতুন জীবনের আশায়। কিন্তু বিদেশের মাটিতে পা রেখে চিশতি বুঝতে পারে যে, শোক আর একাকীত্ব থেকে পালানো এত সহজ নয়। অস্ট্রেলিয়ায় প্রথমে চিশতি একাই থাকতে শুরু করে। সে প্রতিদিনই মনমরা হয়ে থাকে, তার বাবা-মায়ের স্মৃতি তাকে তাড়া করে বেড়ায়। শহরের ব্যস্ততা এবং নতুন পরিবেশেও তার ভেতরের অন্ধকার দূর হয় না। একলা ঘরে বসে থাকা, শূন্য দৃষ্টিতে জানালার বাইরে তাকানো, এই ছিল তার দৈনন্দিন জীবনের অংশ। এই পরিস্থিতিতে, ওহাইও চিশতির খবরাখবর নিচ্ছিলেন। তিনি চিশতির এই একাকীত্বের কষ্ট বোঝতে পারেন এবং তাকে সমর্থন দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসেন। একদিন ওহাইও ফোনে চিশতির সাথে কথা বলে, তার উদ্বেগ স্পষ্ট কণ্ঠে, “চিশতি, আমি বুঝতে পারছি, তুমি এখন অনেক কষ্টে আছো। একা থাকার চেয়ে তুমি আমাদের সাথে থাকো। এই সময়ে তোমার পাশে কেউ থাকা দরকার। আমরা সবাই মিলে একসাথে থাকলে হয়তো তোমার কিছুটা ভালো লাগবে। আর অফিস শেষে আমার মেয়ে অলিভিয়ার সাথে এ ব্যাপারে কথা বলো। ও তোমাকে সাহায্য করবে।” চিশতি প্রথমে দ্বিধা করে, তবে ওহাইওর আন্তরিকতায় সান্ত্বনা খুঁজে পায়। সে বুঝতে পারে যে, এই সময়ে তার একা থাকা উচিত নয়। ওহাইওর প্রস্তাবটি চিশতির জন্য এক নতুন আশার আলো নিয়ে আসে, আর সে সম্মতি জানায়। চিশতি অফিস শেষে বিকেল বেলা ওহাইওর বাসার উদ্দেশ্যে বের হয়। পড়ন্ত বিকেল। সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। আকাশে লালচে-কমলা আভা মাখা মেঘেরা একে অপরের সাথে মিলেমিশে এক অপার্থিব দৃশ্য তৈরি করছে। গাছের পাতা গুলোতে হালকা বাতাসের স্পর্শে মৃদু সোঁ সোঁ শব্দ হচ্ছে। পাখিরা ঘরে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাদের ডানার আওয়াজ সেই শান্ত পরিবেশকে আরো জীবন্ত করে তুলছে। চারিদিকের পরিবেশকে চোখ বন্ধ করে উপভোগ করলো চিশতি। এরপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে কলিংবেল চাপলো। কলিংবেলের শব্দ পেয়ে দরজার দিকে দ্রুত পা বাড়ালো অলিভিয়া। দরজা খুলতেই চিশতির দৃষ্টিতে ধরা পড়ল এক অনিন্দ্যসুন্দরী রমণী। অলিভিয়াকে দেখে তার পুরো দুনিয়া যেনো মুহূর্তেই থেমে গেলো। ধবধবে ফর্সা ত্বক, সবুজ চোখের মায়া, আর হালকা বাদামি রঙের চুলের মৃদু ঢেউ। এতটাই মুগ্ধকর যে চিশতির পক্ষে চোখ সরানো সম্ভব হলো না। অলিভিয়ার সৌন্দর্য যেনো তাকে এক মুহূর্তে বন্দী করে ফেলল, আর সেই মুহূর্তটি যেনো চিরস্থায়ী হয়ে রইল চিশতির মনে। ওহাইও তখনো অফিসে, কিন্তু অলিভিয়া বাসায় আছে। বাসায় পৌঁছানোর পর, চিশতির মনে এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করে। সে নিজের শোকের ভার নিয়ে চলা একজন গুমোট প্রকৃতির মানুষ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, ওহাইওর মেয়ে অলিভিয়া পুরোপুরি তার বিপরীত চঞ্চল, প্রাণবন্ত, এবং সর্বদা হাসিখুশি। চিশতি যখন ওহাইওর বাসায় প্রবেশ করে, অলিভিয়া প্রথমেই তাকে স্বাগত জানায়। অলিভিয়ার মুখে সবসময় একটা হাসি লেগে থাকে, যা চিশতির মনমরা ভাবের সাথে ঠিক মেলে না। “তুমি তাহলে চিশতি?” অলিভিয়া উচ্ছ্বসিতভাবে বলে, তার চোখে মিশে থাকে কৌতূহল। চিশতি একটু বিরক্তিভরে মাথা নাড়িয়ে বলে, “হ্যাঁ, আমিই চিশতি। তবে আমি ভেবেছিলাম তুমি হয়তো একটু কম কথা বলবে।” অলিভিয়া চঞ্চলভাবে হেসে বলে, “আমার কথা শুনে তোমার মাথা ব্যথা হয় না তো? আমি এমনিই একটু বেশিই কথা বলি।”চিশতি একটু বিরক্ত হয়ে বলে, “হুম, বুঝতে পারছি।”অলিভিয়া তার কথায় দমে না গিয়ে আরও বলে, “তুমি মনে হয় একটু বেশি সিরিয়াস! আমার মতো চঞ্চল মানুষের সাথে কিভাবে থাকবে?”চিশতি তখন একটু মুচকি হেসে বলে, “তোমার মতো চঞ্চল মানুষের সাথে থাকতে পারলে হয়তো আমার এই গুমোট ভাবটা কমে যাবে। তবে, আমি কিন্তু তোমার সাথে পাল্লা দিতে পারবো না।”অলিভিয়া হেসে বলে, “তাহলে তোমাকে একটু ফ্রি মুডে আনতে হবে। আমরা কিছু মজার কাজ করবো, যা তোমার মন ভালো করবে।”চিশতি কিছুটা কৌতূহলীভাবে বলে, “তুমি কি এসব কাজ সবসময় করো?”অলিভিয়া হেসে বললো, “অবশ্যই! আর তুমি আমার সঙ্গ পাওয়াতে খুব মজা পাবে, দেখে নিও।” চিশতি ঘাড় নাড়িয়ে বললো "আচ্ছা!" অলিভিয়া আবারও বললো "তোমার রুমে কিন্তু আমার কিছু জিনিসপত্র রাখা আছে, সেগুলো সরিয়ে নিতে হবে।” চিশতি একটু মজা করে বলে, “তাহলে তো তুমি বেশ স্বার্থপর, আমাকে জায়গা না দিয়েই সব দখল করে রেখেছো!” অলিভিয়া হেসে বলে, “হুম, আমার রুম আমার রাজ্য। তবে তোমাকে একটু জায়গা দিতে পারি, যদি তুমি ভালো ব্যবহার করো।” চিশতি হেসে বলে, “ঠিক আছে, আমি চেষ্টা করবো তোমার রাজ্যে ভালো অতিথি হওয়ার।” এরপর অলিভিয়া চিশতিকে তার কক্ষে নিয়ে যায়, " আজ আপাতত এখানেই থাকুন, এরপর বাবা এসে আপনাকে আপনার রুম দেখিয়ে দিবে। তারপর কাল দু'জন মিলে সেই রুম গুছিয়ে নেবো।" এক গাল হেসে বললো অলিভিয়া। "উমম ঠিক আছে! তবে আমাকে যেই রুমই দেক না কেনো আমার কোনো আপত্তি নেই। তাছাড়া আমার রুম আমি একাই গুছিয়ে নিতে পারবো, কারে কোনো প্রকার হেল্পের প্রয়োজন নেই।" বিরক্ত নিয়ে চোখ সরিয়ে বললো চিশতি। "না লাগলে নেই, আমারও তোমাকে সাহায্য করার কোনো ইচ্ছে নেই। সরো তো আমাকে এখান থেকে আমার বই নিতে হবে" এই বলে সেখানে তার কিছু প্রয়োজনীয় বইপত্রের দিকে এগিয়ে গেলো অলিভিয়া। বইগুলো নিয়ে যখন সে কক্ষ থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছিলো, তখন আচমকা চিশতির সাথে ধাক্কা লেগে বইগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ে। চিশতি বইগুলো তুলতে আগাতে গেলে অলিভিয়াও তাড়াহুড়ো করে একসাথে চেষ্টা করে, আর ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের মাথা একে অপরের সাথে গুঁতা খায়। ব্যথায় চমকে উঠে তারা দুজনেই মাথা চেপে ধরে। চোখে চোখ পড়তেই দুজনের মধ্যে শুরু হয় বাচ্চাদের মতো এক হাস্যকর ঝগড়া। চিশতি একটু রেগে বলে উঠে, "তুমি আগে সরতে পারতে!" উত্তরে অলিভিয়া রেগে গিয়ে বলে, "তুমিই তো আমার পথে দাঁড়িয়ে ছিলে!" চিশতি কিছু বলতে যাবে তার আগেই অলিভিয়া আবারও বললো, "তুমি সামনে না থাকলে এমন হতো না! সবকিছু এত তাড়াতাড়ি করতে গিয়ে এখন দেখো কী করেছো!" চিশতি অবাক হয়ে বললো "আমি? আমি তো তোমার সাহায্য করার চেষ্টা করছিলাম! তুমি এত অসতর্কভাবে চলে আসলে কেন?" অলিভিয়া চোখ গরম করে বললো "অসতর্ক? আমি অসতর্ক? তুমি তো দাঁড়িয়ে ছিলে, ঠিক আমার সামনে! তুমি সরতে পারতে!" চিশতি মুখ বাঁকিয়ে বললো "আর তুমি দেখতে পারতে আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি! এগিয়ে এসে ধাক্কা লাগানোর কোনো দরকার ছিলো?" অলিভিয়া কথা ছাড়তে নারাজ "তুমি জানো না, তোমার মতো গোঁয়ার মানুষের সাথে কথা বলা কতটা কষ্টকর?" চিশতি মুচকি হেসে বললো "গোঁয়ার? তাহলে তুমি আমাকে দেখো! আমার জায়গায় অন্য কেউ হলে তোমার সাথে ঝগড়ার বদলে হেসে উড়িয়ে দিত!" অলিভিয়া রাগে ফুঁসে উঠে বললো "তুমি সবকিছু এত হালকাভাবে নিতে পারো? এটা কোনো হাসির ব্যাপার নয়, চিশতি!" চিশতি অবশেষে একটু মজা করে বললো "হয়তো না, কিন্তু তোমার রাগ যে কেমন মজার তা বোঝার জন্য এরকম কিছু ঘটতেই হবে!" অলিভিয়া অবাক হয়ে বললো "তুমি কি বলছো? এটা মজার?" চিশতি হেসে বললো "হ্যাঁ, তুমি যখন রেগে যাও, তখন তোমাকে আরেকটু সুন্দর লাগে!" অলিভিয়া হাসি মুখে বললো "আচ্ছা, এবার বুঝলাম। তুমি ইচ্ছা করেই ঝগড়া করছো, তাই না?" চিশতি মুচকি হেসে বললো "হয়তো। কিন্তু, এই ছোট্ট ঝগড়াটা আমাদের দিনটাকে একটু অন্যরকম করলো, তাই না?" অলিভিয়া লজ্জায় চোখ নামিয়ে বললো "হয়েছে! সরো! তুমি তোমার মতো শুয়ে থাকো। কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে নিচে আমি আছি আম্মুও আছে ডেকে নিও" এই বলে বইগুলো নিয়ে বেরিয়ে গেলো অলিভিয়া।
অন্ধকার ঘর, যেখানে চারিদিকে ধোঁয়াশা ছড়িয়ে আছে। ঘরের মাঝখানে এক ২০-২৫ বছরের যুবতীকে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে, আর তার পাশে বাঁধা একটি ছোট্ট ৮-৯ বছরের বাচ্চা। বাচ্চাটি ক্রমাগত "মা, মা" বলে চিৎকার করছে, আর সেই চিৎকার মুহুর্তেই ঘরটির পরিবেশকে দিচ্ছে। হঠাৎ ঘরে প্রবেশ করে একজন কালো পোশাক পরিহিত লোক। লোকটির মুখে এক ভয়ংকর মুখোশ, যা তার প্রকৃত চেহারা সম্পূর্ণ ঢেকে রেখেছে। তার উপস্থিতি এতটাই ভীতিকর যে মেয়েটির শরীরের রক্ত হিম হয়ে আসে। লোকটি দুটো হাত উপরের দিকে তুলে কোনো অজ্ঞাত ভাষায় তন্ত্র মন্ত্র করতে থাকে। ধীরে ধীরে ঘরের ভেতর কালো শক্তি ভর করতে শুরু করে। লোকটি যেনো কোনো অশুভ আত্মাকে আহ্বান করছে, যা আরও ভয়ঙ্কর কিছু ঘটাতে চলেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে, ঘরের দেওয়ালে হঠাৎ দুটি লাল রঙের চোখ জ্বলজ্বল করতে শুরু করে। সেই চোখগুলো যেন ঘরের ভেতরের সবকিছুকে পর্যবেক্ষণ করছে, মেয়েটির মনে তখন গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। মেয়েটি আর সহ্য করতে না পেরে উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠে। "মাআআআআআআআআআআআ" হঠাৎ চিৎকারেই অলিভিয়ার ঘোর কাটে। ঘাম ঝরতে থাকে শরীরে, সে ঘুম থেকে উঠে বসে, বুক ধড়ফড় করছে, কিন্তু সে বুঝতে পারছে যে এই বিভীষিকাময় দৃশ্য কেবল একটি স্বপ্ন ছিলো। তবুও, সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতা তার মনের গভীরে থেকে যায়, যেনো বাস্তব আর স্বপ্নের সীমারেখা মুছে গিয়ে তাকে অশুভের সম্মুখীন করেছে।
সকাল সকাল সূর্যের প্রথম কিরণ গাছপালার মাঝে ছড়িয়ে পড়ছে। হালকা কুয়াশা আর তাজা শিশিরের স্নিগ্ধ আভা মাটির ওপর দ্যুতি ছড়াচ্ছে। পাখিরা মিষ্টি সুরে গান গাইছে, আর বাতাসে প্রভাতী হাওয়ার মৃদু ঠাণ্ডা স্পর্শ অনুভূত হচ্ছে। ঘর থেকে বের হয়ে মানুষের মুখে এক প্রশান্তির রেখা দেখা যায়, যেন নতুন দিনের সম্ভাবনা নিয়ে তারা উদ্দীপ্ত। সকালের নাস্তায় বসে, ওহাইও চিশতিকে মৃদু হাসির সাথে বললো, "আজকে তোমাকে অফিসে যেতে হবে না, চিশতি। তুমি সারাদিন ধরে তোমার নতুন ঘর গোছাও। অলিভিয়াও তোমাকে সাহায্য করবে।" চিশতি কৌতূহলপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বললো "নতুন ঘর? কোথায়?" ওহাইও তার দিকে ইঙ্গিত করে বলে "আমার সাথে আসো।" এরপর ওহাইও চিশতিকে একটি পুরনো, ধুলোময় ঘরের সামনে নিয়ে যায়। ঘরের দরজার উপর পুরনো তালা ঝুলছে, আর গায়ে বেশ কিছু সার্ভিসিংয়ের চিহ্ন দেখা যায়। ওহাইও চিশতির দিকে চাবি তুলে দিয়ে বললো "এই চাবিটা তোমার। একটা মজার বিষয় কি জানো চিশতি, এই ঘর প্রায় ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ হয়ে আছে।" চিশতি চাবি হাতে নিয়ে অবাক হয়ে বললো "৭০ বছর! এত দিন বন্ধ ছিল কোনো?" ওহাইও কিছুটা মৃদু হেসে জবাব দেয় "পরে সময় বের করে সব বলবল। এখন শুধু ঘরটা গোছাও, আর মনে রাখবে, অলিভিয়া তোমার সহায়তাকারী হবে। আমি অফিসে যাচ্ছি।" চিশতি চাবির দিকে তাকিয়ে নরম সুরে বললো "আচ্ছা, আমি আমার কাজ শুরু করছি। ধন্যবাদ!" ওহাইও অফিসে চলে গেলে, চিশতি ধীরে ধীরে তালা খুলতে শুরু করে। তার মনে ঘরের রহস্যের প্রতি এক গভীর আগ্রহ জন্ম নেয়। চিশতি ধীরে ধীরে পুরনো তালাটা খুলে দরজাটা ঠেলে দেয়। দরজা খুলতেই ভেতর থেকে ভেসে আসে এক গুমোট, স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। ঘরটা এতদিন বন্ধ ছিলো যে বাতাস ভারী হয়ে আছে। চিশতি এক পা ভেতরে রাখতেই তার শরীর শিরশির করে উঠে। ভেতরে একটি মাত্র জানালা থেকে অল্প একটু আলো আসছে, তাও ধুলো জমে ম্লান হয়ে গেছে। দেয়ালগুলোতে যেনো শতাব্দীর পুরনো আঘাতের চিহ্ন, ফাটল আর কালো দাগ। মেঝের ইপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুরনো কাঠের টুকরো, ভাঙা আসবাবপত্রের অংশ, আর পোকামাকড়ের মৃতদেহ। ঘরের কোণায় একটা ভাঙা চেয়ারে ধূলায় ঢাকা কিছু বইপত্র পড়ে আছে, আর তার উপরে ছেঁড়া মাকড়সার জাল ঝুলছে। ঘরের মাঝখানে একটা বড় ড্রয়ার, যার উপর কয়েকটি পুরনো অশুভ চিহ্ন আঁকা। চিশতি ড্রয়ারের দিকে তাকিয়ে অনুভব করলো, তার শরীরের রক্ত হিম যেনো হয়ে যাচ্ছে। ড্রয়ারের উপরের চিহ্নগুলো তাকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। তার মনে হলো, এই ঘরটি কেবল সময়ের হাত থেকে নয়, কোনো অশুভ শক্তির কবল থেকে সুরক্ষিত ছিলো এতদিন। হঠাৎ, চিশতির মনে হলো, ঘরের কোনায় কেউ যেনো দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ভালো করে তাকানোর আগেই সেটা অদৃশ্য হয়ে যায়। ঘরের তীব্র নীরবতা তার মনে ভয়ের জন্ম দেয়। চিশতি জানে, এই ঘরটা কেবল গোছানোর জন্য নয়, বরং একটি গা-ছমছমে রহস্যের দ্বার খুলে দিচ্ছে তার সামনে। চিশতি ঘরের ভেতর ধীরে ধীরে ঘুরতে থাকে। মেঝেতে পড়ে থাকা পুরনো জিনিসপত্রের মধ্যে তার চোখে পড়ে একটা পুরনো ডায়েরি, যেটা ধুলোর আস্তরণে ঢাকা। ডায়েরিটা হাতে তুলে নিয়ে চিশতি ধীরে ধীরে তার পাতা উল্টায়। পাতাগুলো এত পুরনো যে কিছু কিছু জায়গায় দাগ আর অদ্ভুত চিহ্ন দেখা যায়। ডায়েরির লেখাগুলো প্রায় ম্লান হয়ে গেছে, কিন্তু কিছু কিছু শব্দ ও বাক্য এখনো স্পষ্ট। চিশতির মনে কৌতূহল জাগে "এটা কিসের ডায়েরি হতে পারে?" চিশতি ডায়েরির পৃষ্ঠাগুলো আরও গভীরভাবে দেখার চেষ্টা করে, কিন্তু এক ধরনের অস্বস্তি তাকে পেয়ে বসে। ডায়েরির বিষয়বস্তু এবং সেই অদ্ভুত চিহ্নগুলো তাকে অস্থির করে তোলে। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়, এই ডায়েরিটা পরে শান্ত পরিবেশে বসে দেখবে। সে ডায়েরিটা তার কাঁধে থাকা ব্যাগে ঢোকাতে শুরু করে। ঠিক সেই মুহূর্তে, পিছন থেকে এক তীব্র চিৎকার ভেসে আসে, "চিশতি!" চিশতি হঠাৎ ভয় পেয়ে লাফিয়ে উঠে। তার মনে হলো কেউ যেনল তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। সে দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখে, অলিভিয়া তার দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। অলিভিয়া রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললো "তুমি একা একা এখানে কি করছো? আমাকে না বলে একা ঢুকলে কেনো?" চিশতি আত্মরক্ষামূলকভাবে ঢোক গিলে বললো "আমি ভেবেছিলাম একটু ঘুরে দেখবো। তাছাড়া, তোমাকে তো ডাকিনি তুমি কি রাগ করলে?" অলিভিয়া রাগ প্রকাশ করে বললো "অবশ্যই রাগ করেছি! তুমি কি জানো এই ঘরটা কতটা পুরনো আর বিপজ্জনক? এখানে একা একা ঢুকলে যদি কিছু হয়ে যেতো, তাহলে কি করতাম?" চিশতি চমকে গিয়ে বলে "কেন? কি হতে পারতো?" অলিভিয়া একটু শান্ত হয়ে বললো "তুমি জানো না এই ঘরের ইতিহাস। এখানে এমন অনেক কিছু আছে, যা তোমার ধারণার বাইরে। তোমাকে সাবধান করার জন্যই আমি আসতে চেয়েছিলাম।" চিশতি মৃদু হাসি দিয়ে বললো "তুমি এত চিন্তা করছো কেনো? আমি তো কেবল ঘরটা দেখছিলাম। আর কিছু করিনি।" অলিভিয়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে "তুমি বুঝতে পারছো না, চিশতি। এই ঘরে যা আছে, তা হয়তো তোমার জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। আমি চাইনি তুমি একা একা এতে জড়াও।" চিশতি কিছুটা রেগে বলে "তুমি আমাকে বাচ্চা মনে করছো? আমি জানি কি করছি। তাছাড়া, এই ঘরটা তো শুধু পুরনো, আর কিছুই তো দেখছি না।" অলিভিয়া আক্ষেপের সুরে বললো "এটা শুধু পুরনো ঘর নয়, চিশতি। এখানে অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে। তুমি যখন একা একা এভাবে ঢুকে যাও, তখন আমি সত্যিই চিন্তিত হয়ে পড়ি।" চিশতি অবজ্ঞাসূচক কণ্ঠে বললো "তোমার এত চিন্তা করার কিছু নেই। আমি ঠিক আছি। তাছাড়া, আমি তো কেবল দেখতে এসেছি, কোনো বিপদে পড়ার জন্য নয়।" অলিভিয়া উত্তেজিতভাবে বলে "তুমি বুঝছো না। আমি চাই না তুমি কোনো সমস্যায় পড়ো। আর এই ঘরের ভেতর অনেক কিছুই হতে পারে, যা আমরা কল্পনাও করতে পারি না!" চিশতি গম্ভীরভাবে প্রশ্ন করলো "তুমি কি সত্যিই মনে করো এখানে কিছু অস্বাভাবিক আছে?" অলিভিয়া কিছুটা চিন্তিত হয়ে দৃষ্টিকোণ করে বললো "এটা আমার কথা নয়, ইতিহাসের কথা। আমি শুধু চাই তুমি নিরাপদে থাকো। তাই একা একা এভাবে ঢুকলে আমার খুব ভয় হয়।" হঠাৎ "ওহ্ হ্যালো! কি দেখছো অমন হ্যাঙলার মতো? আর তুমি আমাকে না নিয়ে একা একা কেনো এসেছো? ইশশশ! কত আশায় ছিলাম নিজ হাতে এই ঘরের দরজা খুলবো আর তুমি সব বানচাল করে দিলে" অলিভিয়ার ডাকে ঘোর কাটে। তার মানে এগুলো চিশতির মনের ভুল ছিলো। তার মনে হচ্ছিলো অলিভিয়া সত্যিই তার নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। সে ভাবছিলো, হয়তো অলিভিয়া তাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন, কারণ এই পুরনো ঘরটা রহস্যময় এবং বিপজ্জনক হতে পারে। তার কল্পনায় অলিভিয়ার সতর্কতাগুলো বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিলো। কিন্তু আসলে বাস্তবতা ছিলো ভিন্ন। অলিভিয়ার অনেক দিন ধরেই ইচ্ছা ছিলো এই ঘরে ঢোকার, কিন্তু সে কখনো সাহস করে ঢুকতে পারেনি। আজ চিশতি যখন একা একা ঘরে ঢুকে যায়, অলিভিয়ার মনে হয় তার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। সেই রাগ আর হতাশা থেকেই সে চিশতির উপর রাগারাগি করে। অলিভিয়া আবারও রাগান্বিত হয়ে বললো, " কি হলো, বলো! তুমি একা ঢুকে গেলে কেনো? আমাকে একবারও বললে না?" চিশতি কিছুটা অবাক হয়ে বলে "তুমি কি এ জন্যই রেগে আছো? আমি ভেবেছিলাম তুমি আমার জন্য চিন্তিত ছিলে।" অলিভিয়া মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে "চিন্তিত ছিলাম ঠিকই, কিন্তু এটা আসলে আমার ইচ্ছাও ছিলো এই ঘরে ঢুকে রহস্য উন্মোচন করার। আমি তো কখনো সাহস করে ঢুকতেই পারিনি!" চিশতি একটু দুঃখিতভাবে বললো "ওহ, আমি বুঝতে পারিনি। তোমাকে না ডেকে আসাটা আমার ভুল হয়েছে।" অলিভিয়া সত্যিকার হাসি দিয়ে বলে "এখনো দেরি হয়নি। চলো, আমরা একসাথে ঘরটা গোছাই।" এরপর চিশতি এবং অলিভিয়া দুজন মিলে ঘরটা গোছানোর কাজ শুরু করে। পুরনো আসবাবপত্র সরানো, ধুলা পরিষ্কার করা সব মিলিয়ে দুজনের মধ্যে নতুন একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। তারা একসাথে কাজ করতে করতে পুরনো দিনের অনেক গল্প শোনে। চিশতি মনে মনে হাসলো, নিজের কল্পনার জন্য। হয়তো কিছু কিছু সময় আমরা অযথাই কিছু বিষয় নিয়ে ভেবে বসি, যেখানে বাস্তবতা আসলে আরও সহজ এবং সরল।