পুনর্জন্ম (এক নতুন অধ্যায়) — পর্ব ১১

লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: সিজন সিরিজ · পর্ব ১১ · ২৮ পর্বের মধ্যে ১১

জনশূন্য কোনো এক পরিত্যক্ত পুরনো ডেরায় দুই হাত শিকল বন্দী হয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে গোঙ্গাচ্ছে নূরী। চেহারাটা একদম ফেকাসে হয়ে গেছে। আধপাকা মাথা ভর্তি চুল। শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। চোখগুলো যেনো একদম গর্তে ঢুকে গেছে। গোঙ্গাতে গোঙ্গাতে বলছে নূরী "কেউ আছো!! আমাকে এখন থেকে মুক্তি করো। আমি বাইরে যেতে চাই। কত বছর হলো এই অন্ধকারের জগৎ থেকে বের হই নাহ। আমি বাইরের আলো দেখতে চাই। কেউ শুনতে পাচ্ছো আমার ডাক!! কেউ আছো.?" গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে নিজেকে মুক্তি করার অনুরোধ করছে নূরী। পুরো ঘরে অন্ধকার। এতটাই অন্ধকার যে নূরী নিজেই নিজের অস্তিতকে দেখতে পাচ্ছে নাহ। কি আছে আশেপাশে সেটাও জানে নাহ নূরী। কতগুলো বছর কেটে গেছে এই অন্ধকারে নূরী নিজেও জানে নাহ। তার মধ্যে থাকা নাগিন শক্তিকেও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। নিঃশক্তি হয়ে আটকে আছে এই অন্ধকারে। দূর থেকে লন্ঠন হাতে নিয়ে এগিয়ে আসছে একজন মানুষ। লন্ঠনের আলোটা দেখেই নূরীর শরীর কেঁপে উঠলো। এই আলো যেনো যুগের পর যুগ ধরে চিনে নূরী। মিটিমিটি আলোয় খুব স্পষ্ট দেখা নাহ গেলেও এতটুকু ঠিকই বুঝা যাচ্ছে, লন্ঠন হাতে থাকা লোকটা লম্বা কালো পোশাক পরিধান করা। কালো ওড়না দিয়ে পুরো মুখ ঢাকা। ঠিক যেনো কোনো নারী যোদ্ধা এসেছে শত্রু পক্ষের সাথে যুদ্ধ করতে। লন্ঠনের আলোয় শুধু স্পষ্ট চোখ দুটোই দেখা যায়। কি ভয়ংকর সেই চোখ। ভয়ংকর তার চাহনি। ধূসর রঙের চোখে গাঢ় করে লেপ্টে আছে কাজল। চোখের পাপড়িগুলো ঠিক যেনো বটবৃক্ষের ছায়ার মতো। বড় বড় চোখে একবার নূরীকে দেখে আরেকবার দেওয়ালে টাঙ্গানো কিছু ছবি। লন্ঠনের আলোয় সবগুলো ছবি দেখা নাহ গেলেও তিন থেকে চারটা ছবি একদম স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, একটা ছবি চিশতি কুরেশির, দ্বিতীয় ছবিটা নূরী'র তৃতীয় ছবিটা আরিয়ান খান এবং লন্ঠনের নিভু নিভু আলোয় চতুর্থ ছবিটাতে আরো একটা ছবি দেখা যাচ্ছে সেটা কার কেউ জানে নাহ, কারণ ওই ছবিটা অরিন এবং ইরিন দুইজনের মতোই। এখানে আসলে কার ছবি সেটা অজানা। কে হতে পারে অরিন নাকী ইরিন?? ভয়ার্ত কণ্ঠে থেকেথেকে বললো নূরী "তোমার এই অসৎ উদ্দেশ্য কোনোদিন সফল হবে নাহ শীতাক্ষী। আমি ক্ষমতার লোভে তোমার সাথে হাত মিলিয়ে জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করেছি। আমি জানতাম নাহ তুমি এতটা স্বার্থপর। এতটা ক্ষমতার লোভী। আজ এতগুলো বছর ধরে আমাকে এই অন্ধকার ঘরে আটকে রেখেছো তুমি। কি দোষ ছিলো আমার?? কি কারণে আটকে রেখেছো আমাকে.?" লন্ঠনটা বিশাল এক পাথরের উপর রেখে অট্টহাসিতে মেতে উঠলো শীতাক্ষী। "হা!হা!হা! পূব আকাশে চাঁদ উঠেছে, বোবার মুখে বুলি ফুটেছে। দেখবি তোরা আয়রে ছুটে, বোবা এখন কথা বলেছে। হা!হা!হা!" কর্কশ গলায় বললো শীতাক্ষী। একটা মানুষের কণ্ঠ এতটা ভয়ংকর হয় কিভাবে। কণ্ঠ কানে যেতেই শরীর কেঁপে উঠলো নূরীর। নিমিষেই আবারও ভয়ে চুপসে গেলো নূরী। কোমর থেকে একটা ছুড়ি বের করে নানান অঙ্গিভঙ্গিতে ঢোলতে ঢোলতে বললো শীতাক্ষী "শোন নূরী! তুই হয়তো ভুলে গেছিস! মিরানের মৃত্যু এবং তোর সকল অপকর্মের একমাত্র সাক্ষী হলাম আমি" এই বলে হাতে থাকা ছুড়িটা ছুড়ে মারলো। আতংকিত হয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললো নূরী। নিস্তব্ধতা কাটিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ মেলে তাকায় নূরী। তাকানো মাত্র দেখতে পেলো ছুড়িটা চিশতি কুরেশির ছবিতে বিঁধে আছে।

--------------

ভর দুপুর বেলা অফিসের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে আজরাফ। নিরিবিলি বসে বসে সকল হিসাব মেলানোর কাজে ব্যস্ত। পই পই করে হিসাব রাখতে হয় তাকে। হঠাৎ অচেনা নাম্বার থেকে আজরাফের ফোনে কল আসে। কল রিসিভ করতেই ফোনের অপর প্রান্ত থেকে একটা মেয়েলি কণ্ঠ বলে উঠে "হ্যালো! আজরাফ ভাই, আমি আজকে অফিসে আসতে পারবো নাহ। কলেজে একটা ফ্যাশন কম্পিটিশন শো-এর প্রোগ্রাম আছে। আমিও সেই শো-তে পার্টিসিপ্যান্ট করেছি। এখন ড্রেস নিয়ে কলেজে যাচ্ছি।" এই বলে কল কেটে দিলো। আজরাফের বুঝতে বাকি রইলো নাহ এটা আইদা ছাড়া আর কেউই নাহ। ওদিকে আইদা নিজের তৈরি সব ড্রেস গাড়িতে তুলছে। সবকিছু গাড়িতে তোলা শেষ হলে আইদাও গাড়িতে উঠতে যাবে ঠিক ওই মুহুর্তে আইদার ফোনে কল আসে "হ্যালো! হ্যাঁ মেরাজুল বলো" ফোন রিসিভ করে বললো আইদা। "ইয়ে মানে আইদা! একটা কথা বলতাম আরকি?" ইতস্তত হয়ে বলছে মেরাজুল। "কি কথা?? নিঃসংকোচে বলো!" বললো আইদা। "আসলে হয়েছে কি!! আমি একটা বিপদে পরে গেছি।৷ আমার পক্ষে তোমার কম্পিটিশনের মডেল হওয়া সম্ভব নাহ। তুমি প্লিজ অন্য কাউকে ম্যানেজ করে নিও।" আইদাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ নাহ দিয়েই মুখের উপর কল কেটে দিলো মেরাজুল। আইদা তোহ আকাশ সমান চিন্তা নিয়ে মাঝপথেই থেমে গেলো। শেষ মুহুর্তে এখন মডেল কোথায় পাবে। এমন একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে আগে জানলে আইদা এই কম্পিটিশনে পার্টিসিপ্যাটই করতো নাহ। মাথা ভর্তি টেনশন নিয়ে রাস্তার মাঝেই পায়চারি করছে আইদা। একবার এদিক একবার ওদিক ছুটছে। কি করবে ভেবে পাচ্ছে নাহ। রাস্তার অপর প্রান্ত দিয়ে তানভীরকে আসতে দেখে আইদা মনে মনে কিছু ভাবলো। ওদিকে আইদাকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভয়ের চোটে এদিকে আর এগোচ্ছে নাহ তানভীর। দেওয়ালের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চাইছে তানভীর যাতে আইদা তাকে দেখতে নাহ পায়। ব্যাপারটা আইদা বুঝতে পেরে নিজেই তানভীরের কাছে যায় কিছু বলার জন্য। "কি ব্যাপার! আপনি আমাকে দেখে লুকিয়ে পরলেন কেনো.? আমি কি বাঘ নাহ ভাল্লুক.?" চোখ ছোট করে তাকিয়ে হাসি লুকিয়ে বললো আইদা। তানভীর কেনো আইদাকে দেখে ভয় পাচ্ছিলো সেটা আইদা খুব ভালো করেই জানে। "নাহ! বাঘ, ভাল্লুক হতে যাবে কেনো? তুমি তোহ জ্বিন ভুতের রাণী। তোমার সাথে কথা বললে যদি ওরা আমাকে মেরে ফেলে!!" কাঁপা কাঁপা গলায় বললো তানভীর। "ওরা!! ওরা কারা.?" জিজ্ঞাসা সুরে বললো আইদা। "ওইযে, ওরা!!" ঢোক গিলে বললো তানভীর। "আবারও বলে ওরা!! ওরা কারা?? নাম নেই তাদের??" মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলো আইদা। "উমমম! তোমার সাথে যে জ্বিনগুলো আছে তারা।" একদমে বললো তানভীর। "এখন তোহ আপনি আমার পিছু নিচ্ছেন নাহ তাই ওরা আপনার কোনো ক্ষতি করবে নাহ। আমি ওদের বলে দিবো ওরা যেনো আপনার কোনো ক্ষতি নাহ করে। এবার এদিকে আসুন দরকার আছে।" তানভীরের বাচ্চামোগুলো আইদার ভালোই লাগছে।

"সত্যি বলছো! ওরা আমার কোনো করবে নাহ তোহ??"

"আরে হ্যাঁ বাবা!! সত্যি বলছি। এদিকে আসুন দরকার আছে বললাম তোহ" তানভীরকে ডেকে বললো আইদা, "শুনুন, আজকে কলেজে ফ্যাশন শোয়ের কম্পিটিশন আছে জানেনই তোহ, আমিও ওই কম্পিটিশনে পার্টিসিপ্যাট করেছি। কিন্তু আমার মডেল হবার কথা ছিলো মেরাজুলের অথচ সে এখন বলছে যে আমার মডেল হতে পারবে নাহ। আপনি প্লিজ আমাকে একটু হেল্প করবেন??" করজোড় করে বললো আইদা। পছন্দের মানুষটি যখন এভাবে অনুরোধ করে তখন কোনো পুরুষেরই সাহস নেই মুখের উপর নাহ করে দেওয়ার। আইদার আকুতি শুনে তানভীরের সরল মনটা মুহুর্তেই গলে গেলো। "আরে! তুমি একদম চিন্তা করো নাহ। আমি হেল্প করবো তোমাকে। কিন্তু প্রবলেম হচ্ছে আমি তোহ কোনোদিন রেম্পওয়াল্ক করিনি।" নিচু কণ্ঠে জানালো তানভীর। "কোনোদিন করেননি তোহ কি হয়েছে, আজকে করবেন।" জোর খাটিয়ে বললো আইদা। যেনো তানভীরের উপর আইদার ব্যক্তিগত হক আছে। আইদা এত করে অনুরোধ করছিলো যে তানভীরের সাহসে কুলচ্ছিল নাহ আইদাকে মুখের উপর নাহ করে দেওয়ার। রেম্পওয়াল্ক করার জন্য তানভীরও রাজি হয়ে যায় আইদার কথায়। আজ যা হবার হয়ে যাবে তাও তানভীর রেম্পওয়াল্ক করবে। নিজের জন্য নাহ হোক আইদার জন্য। আইদার জন্য বলতে আইদাকে ইমপ্রেস করতে। যদি আজকে তানভীর রেম্পওয়াল্ক করতে সফল হয়ে যায় তাহলে হতেও পারে আইদার তানভীরের সাথে প্রেম করতে রাজি হয়ে যাবে। "আচ্ছা! ঠিক আছে তুমি যেহতু বলছো আমি অবশ্যই চেষ্টা করবো।" তানভীরের মুখে এই কথা শুনে আইদা যেনো দিনের বেলা আকাশের চাঁদ খুঁজে পেলো। মুহুর্তেই আইদার চোখ মুখ চকচক করতে লাগলো। "তাহলে দেরি কিসের চলুন কলেজে যাই।" আইদা আর তানভীর গাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তখনই আইদার ফোনে আজরাফের কল। কল রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত থেকে আজরাফ বলে উঠে "আইদা! আমিও আসছি তোমাদের ফ্যাশন শো দেখার জন্য। তুমি তোহ ইনভাইট করলে নাহ তাই আমি নিজে থেকেই আসছি।" আজরাফের কথা শুনে আইদার নিজেকে অপরাধী মনে হলো। "আআআ! অ্যাকচুয়ালি ভাইয়া!" অপরাধী সুরে কিছু বলতে যাবে আইদা তার আগেই আজরাফ বললো "বাদ দাও! আমি কিছু মনে করিনি। আমি একটু পরই আসছি। তুই কোথায় এখন.? প্রিপারেশান কেমন হচ্ছে??" আজরাফের মুখে প্রিপারেশনের কথা শুনে আইদার কণ্ঠ ভারি হয়ে গেলো।

"আসলে ভাইয়া! আমার মডেল আসবে নাহ।" "কি বলছো.? এখন তাহলে কি করবে.?" আইদাকে প্রশ্ন করার সাথে সাথে আজরাফের অফিসে এসে পা রাখে আতিশ। আতিশকে দেখে আজরাফের মাথায় কিছু একটা বুদ্ধি আসে। কলের অপর প্রান্তে আইদাকে থামিয়ে দিয়ে বলে "তুমি একদম চিন্তা করো নাহ, মডেল পেয়ে গেছি। তুমি এক্ষুনি অফিসে আসো।" আজরাফের কথায় আইদা কিছু স্বস্তি পেলো। আজরাফ যেহেতু বলেছে নিশ্চয়ই ভালো কাউকেই ম্যানেজ করেছে। অতশত নাহ ভেবে আইদা তানভীরকে গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে বলে "আপনি ড্রেসগুলো নিয়ে কলেজের ক্যাম্পাসে ওয়েট করবেন আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই আসছি। আমি আসা পর্যন্ত একটু এগুলো সামলান প্লিজ!"

"কিন্তু.... তুমি কোথায় যাবে.?" আইদার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো তানভীর। "আমি একটু অফিসে যাবো!" জবাব দিলো আইদা। "অফিস.? কার অফিস? কিসের অফিস?" অজানা কিছু জানার পর মানুষের মুখ আর কথা বলার সুর যেমন বদলে যায় আইদার কথা শুনে তানভীরেরও একই অবস্থা হলো। "আমি একটা অফিসে বুটিক'সের জব করি। সেখানেই যাচ্ছি একটু। আপনি প্লিজ এগুলো সামলান আমি যাবো আর আসবো একটুও সময় নষ্ট করবো নাহ।" তানভীরকে অল্প কথায় জবাব দিয়ে বেরিয়ে গেলো আইদা। এদিকে হা করে আইদার চলে যাওয়া দেখছে তানভীর। কিছুক্ষণ পর যখন আইদাকে আর দেখা যাচ্ছিলো নাহ তখন ড্রাইভারকে বললো গাড়ি স্টার্ট করতে।