অভিশপ্ত হাসি — পর্ব ০১

লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: ছোট গল্প · পর্ব ০১ · ৪ পর্বের মধ্যে ১

তৃণা মায়ের কাছে এসো, মায়ের খুব কষ্ট হচ্ছে।

খাটের উপর আমার ফোনটা নিয়ে পুলিশকে একটা কল দাও মা।

আমি মরতে চাই নাহ, আমি তোমাদের নিয়ে বাঁচতে চাই।

মায়ের এমন কথা শুনে ভয়ে রুমের দরজা বন্ধ করে চলে আসে ৭ বছরের ছোট্ট মেয়ে তৃণা।

তৃণার মা মিসেস শ্রেয়সী দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন কারণ তৃণা ও নয়না যখন ছোট তখনই ওদের নিজের বাবা গাড়ি এক্সিডেন্টে মারা যান।

এই ছোট্ট ছোট্ট মেয়ে দুটোর মুখের দিকে তাকিয়ে শ্রেয়সী দ্বিতীয় বিয়ে করে।

নয়নার যখন ১০ বছর হয় তখন নয়নাকে বোর্ডিং-এ পাঠিয়ে দেয় এখন তৃণাকে নিয়েই৷ তাদের ছোট্ট সংসার।

শ্রেয়সীর যেদিন আত্মহত্যা করেন ওইদিন সকালে শ্রেয়সীর দ্বিতীয় স্বামী মিস্টার হিদায়তের সাথে অনেক ঝগড়া হয়।

স্বামীর সাথে ঝগড়ার পর নিজেকে অপরাধী বোধ করে তখন অনেকগুলো ঘুমের ঔষধ খেয়ে শ্রেয়সী আত্মহত্যা করেন কিন্তু যখন তার শরীরে ঘুমের ঔষধ অতিমাত্রায় প্রভাব বিস্তার করতে থাকে তখন তিনি বাঁচার জন্য তৃণাকে বলে পুলিশকে কল করতে কিন্তু তৃণা ভয় পেয়ে তার মাকে রুমের মধ্যে দরজা বন্ধ করেই পালিয়ে যায়।

২০ বছর পর....

তৃণা আজ একটা সরকারি হাসপাতালে সাইক্রেটিস্ট ডাক্তার হিসেবে সবাইকে চিকিৎসা প্রদান করে।

কিন্তু আজও তার মায়ের মৃত্যুর জন্য নিজেকে দায়ী মনে করে, যদি সে ওইদিন ভয় পেয়ে নাহ পালাতো তাহলে হয়তো তার মা মারা যেতো নাহ।

দিনটা ছিলো সোমবার, হাসপাতালে আজ অনেক ভিড়, রোগী দেখা শেষ হলে তৃণা সেই হাসপাতালের প্রধান ডাক্তার হাম্মামের সাথে দেখা করে। তৃণাকে দেখে হাম্মাম কিছুটা ক্রুদ্ধ গলায় বললো....

হাম্মাম:- দেখো তৃণা, তুমি একজন খুব ভালো ডাক্তার, হাসপাতালে তোমার চেম্বারের রোগীর সংখ্যা বেশি। তুমি যদি তাদের বিনামূল্যে চিকিৎসা নাহ করে কিছু টাকার বিনিময়ে চিকিৎসা করো তাহলে আমাদের রোজগারটাও একটু বেশি হয়।

তৃণা:- সরি স্যার, আমার যদি টাকা রোজগারের এত শখ থাকতো তাহলে আমি সরকারি চাকরি করতাম নাহ।

আমি সরকারি চাকরি নিয়েছি যাতে গরীবদের বিনামূল্যে চিকিৎসা করতে পারি।

তখন হঠাৎ করে কেবিন নাম্বার ৯৯ এর পেসেন্ট জ্যাকসন হাম্মামের চেম্বারে ঢুকে চিৎকার করতে করতে এসে তৃণার গলা চেপে ধরে তাকে উদ্দেশ্য করে বলে...

জ্যাকসন:- তুই মরবি, তুই মরবি, হা! হা! হা! তুই মরবি, কেউ বাঁচাতে পারবে নাহ তোকে..

তৃণা:- ওয়ার্ড বয়.! ওয়ার্ড বয়! কি আশ্চর্য রোগীরা কেবিন থেকে বের হয় কিভাবে..?

হাম্মাম:- দাঁড়াও, তৃণা..

জ্যাকসন কি হয়েছে তুমি ওকে এসব বলছো কেনো....

জ্যাকসন:- ও মরবে! ও মরবে!

তখন দুইজন ওয়ার্ড বয় এসে জ্যাকসনকে নিয়ে যায়।

তৃণা:- স্যার, জ্যাকসন তোহ কখনো এমন করে নাহ আজ হঠাৎ এমন করলো কেনো..?

হাম্মাম:- কি জানি.? তুমি একটু সাবধানেই থেকো।

তৃণা:- আচ্ছা স্যার ঠিক আছে।

তখন তৃণার ফোনে একটা ইমার্জেন্সি কল আসে, কলটা রিসিভ করতেই....

তৃণা:- হ্যালো, কে.?

তিতির:- আরে, আমি তিতির, তাড়াতাড়ি ক্লিনিকে আয় একটা পেসেন্ট এসেছে..

তৃণা:- ১৫ মিনিট অপেক্ষা করতে বল আমি এক্ষুনি আসছি...

১৫ মিনিট পর তৃণা পাশের ক্লিনিকে গিয়ে হাজির হলো...

সে তার চেম্বারে গিয়ে বসলো, কিছুক্ষণ পর একটা ১৮-১৯ বছরের মেয়ে তার সামনে এসে বসলো...

তৃণা:- কি নাম তোমার..?

হোপ:- হোপ!

তৃণা:- হোপ, বাহ্ খুব সুন্দর নাম তোহ তোমার.!

হোপ:- হ্যাঁ, ধন্যবাদ।

তৃণা:- হোপ সোনা তুমি কি জানো তোমার নামের মিনিং কি..?

হোপ:- হ্যাঁ জানি...

তৃণা:- তাহলে বলো তোহ...

হোপ:- হোপ অর্থ আশা।

তৃণা:- বাহ্ খুব সুন্দর।

আচ্ছা তাহলে বলো তোমার কি সমস্যা..?

হোপ:- আমি চারপাশে শুধু একটা বিদঘুটে হাসি দেখতে পাই...

তৃণা:- কেমন হাসি.? আর কবে থেকে তোমার এই সমস্যা..?

হোপ:- একটা মানুষ যখন সয়তানি হাসি দেয় তখন তাকে দেখতে যেমন ভয়ংকর লাগে ঠিক ওই রকম হাসি...

তৃণা:- কবে থেকে তুমি এমন হাসি দেখতে পাচ্ছো.??

হোপ:- যেদিন থেকে আমার প্রফেসর আমার সামনে এই হাসি দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলো ওইদিন থেকে আমি প্রতিনিয়ত এটা ফেস করছি...

আমি সবাইকে বলেছি কিন্তু কেউ আমার কথা বিশ্বাস করে নাহ, আমি জানি তুমিও আমাকে বিশ্বাস করছো নাহ...

তৃণা:- হোপ সোনা তুমি শান্ত হও, কাম ডাউন...

হোপ:- সবার মতো তুমিও আমাকে পাগল ভাববে আমি জানি, কিন্তু আমি পাগল নই...

তৃণা:- হোপ সোনা প্লিজ কাম ডাউন...

হঠাৎ হোপ চিৎকার দিয়ে বলছে..

হোপ:- তুমিও! তুমিও সেই বিদঘুটে হাসি দিচ্ছো...

তোমরা সবাই একই রকম সবাই! সবাই! সবাই!

হঠাৎ করে তৃণা হোপকে কোথাও দেখতে পাচ্ছে নাহ...

কোথায় গেলো মেয়েটি..?

তৃণা তাড়াতাড়ি করে সিকিউরিটি গার্ডদের কল দিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখে হোপ তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, হোপের হাতে এক টুকরো কাচ...

হোপ তৃণাকে উদ্দেশ্য করে বললো...

হোপ:- কেউ বাঁচবে নাহ, তুমিও বাঁচবে নাহ।

এই বলে হোপ তৃণার দিকে তাকিয়ে সেই বিদঘুটে হাসিটা দিয়ে তার হাতে থাকা কাচের টুকরোটা দিয়ে নিজের গলা কেটে ফেললো।

এটা দেখে তৃণা একটা চিৎকার দিয়ে চেম্বার থেকে বেরিয়ে এসেই অজ্ঞান হয়ে যায়।

কতক্ষণ অজ্ঞান হয়ে ছিলো তৃণার মনে নেই, যখন চোখ খুলে তাকালো তখন সে নিজেকে সিনিয়র ডাক্তার হাম্মাম সাহেবের কেবিনে আবিষ্কার করে।

এবং তার চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে হাম্মাম সাহেব, তিতির, সাবইন্সপেক্টর ফুয়াদ ও সিনিয়র ইন্সপেক্টর শরাফত।

তৃণা:- স্যার! স্যার! কি থেকে কি হয়ে গেলো.? আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম নাহ.! মেয়েটার হাসিটা কি অদ্ভুত আর কি ভয়ংকর! স্যাররররর আহ্ হা হা আআআ!

শরাফত:- আপনারা সবাই একটু বাইরে যান, উনার সাথে আমাদের একটু আলাদা ভাবে কথা বলা দরকার...

শরাফতের কথা অনুযায়ী সবাই বাইরে চলে গেলো...

ভিতরে শুধু ফুয়াদ, তৃণা আর সিনিয়র ইন্সপেক্টর শরাফত আছেন।

শরাফত:- তোহ ডাক্তার তৃণা বলুন কি হয়েছিলো আপনার চেম্বারে...?

তৃণা:- স্যার মেয়েটি আমাকে ওর সমস্যার কথা বলছিলো কিন্তু হঠাৎ করে কি হলো ও নিজেই আমার সামনে সুইসাইড করলো...

আমার খুব ভয় হচ্ছে স্যার, আমার খুব ভয় হচ্ছে....

ফুয়াদ:- ভয়ের কিছু নেই, অ্যানকুয়ারি চালু থাকবে যতদিন নাহ মেয়েটির খুনের রহস্য সামনে আসছে...

তৃণা:- মেয়েটি খুন হয়নি মেয়েটি সুইসাইড করেছে বিশ্বাস করো আমার কথা প্লিজ.....

ফুয়াদ:- কেউ কি করে তোমার কথা বিশ্বাস করবে বলো...? কোনো পেসেন্ট ডাক্তারের কাছে এসে কেনো সুইসাইড করবে..?

তৃণা:- দেখো তোমার সাথে আমার ব্রেক আপ হয়েছে তাই বলে এই নাহ যে তুমি অন্যায় ভাবে আমাকে দোষারোপ করবে।

ফুয়াদ:- এখানে রিলেশন অথবা ব্রেক আপের প্রশ্ন আসছে নাহ, এখানে একটা মানুষের মৃত্যুর প্রসঙ্গ নিয়ে কথা হচ্ছে, আর একজন পুলিশ হিসেবে সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখাই আমার কাজ।

তৃণা:- প্লিজ আমাকে বিশ্বাস করো, আমি ওকে খুন করিনি ও সুইসাইড করেছে।

শরাফত:- আচ্ছা বুঝলাম ও সুইসাইড করেছে...

কিন্তু কেনো..? কোনো ক্লু আছে বা ও সুইসাইড করার আগে এমন কোনো কথা বলেছে আপনার কাছে..?

তৃণা:- হ্যাঁ! ও বলেছিলো ওর প্রফেসর ওর সামনে একই ভাবে গলা কেটে সুইসাইড করার পর থেকে ও সব জায়গায় ওর প্রফেসরকে দেখতে পেতো।

ফুয়াদ:- স্যার, তৃণার কথা যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে তোহ এটা কোনো ভৌতিক ক্যাস বলে মনে হচ্ছে...

শরাফত:- দেখো ফুয়াদ এখন এসব ভৌতিক ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করার সময় নাহ, আমাদের এখন এটা প্রমাণ করতে৷ হবে মেয়েটি কি সত্যি সত্যি সুইসাইড করেছে কি নাহ।

তৃণা:- উফ স্যার আপনারা কেনো আমাকে বিশ্বাস করছেন নাহ, মেয়েটি সত্যি সত্যি সুইসাইড করেছে।

এক মিনিট....

লাশটার পাশে গেলেই তোহ জানতে পারবেন এটা সুইসাইড নাকী খুন...

ওরা সবাই লাশটির পাশে গেলে তৃণা সবাইকে বলে...

তৃণা:- দেখুন স্যার কাঁচের টুকরোটা এখনো হোপের হাতেই আছে, আর ওর গলায় কাটার চিহ্নটা খেয়াল করুন বাম পাশে মোটা ডান পাশে সরু।

ফুয়াদ:- আচ্ছা ধরে নিলাম এটা সুইসাইড, তাহলে তোমার সামনে এসেই কেনো ওকে সুইসাইড করতে হবে..?

তৃণা:- সেটাই তোহ আমি বুঝতে পারছি নাহ.?

হঠাৎ করে তৃণা লক্ষ করে তিতির সেই বিদঘুটে হাসিটা দিয়ে তৃণার দিকে তাকিয়ে আছে।

এটা দেখে তৃণা ভয়ে একটা চিৎকার দিয়ে এদিক সেদিক ছুটতে থাকে তখন ফুয়াদ তাকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করে বলে...

ফুয়াদ:- কি হয়েছে এমন করছো কেনো..?

তৃণা:- তিতির সেই বিদঘুটে হাসিটা দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো..!

শরাফত:- সেই বিদঘুটে হাসি মানে কোন বিদঘুটে হাসি.?

তৃণা:- এটা সেই বিদঘুটে হাসি যেটা হোপের প্রফেসর ওর দিকে তাকিয়ে দিয়েছি এবং নিজে সুইসাইড করেছিলো আর হোপ আমার সামনে।

আমি বুঝতে পারছি আমিও মামা যাবো, আমাকে কেউ বাঁচাতে পারবে নাহ।

এই বলে তৃণা কান্না করতে থাকে।

এভাবে আরো কিছুক্ষণ তৃণার সাথে ওদের কথোপকথন হলো, তারপর তৃণাকে ফুয়াদ বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসার দায়িত্ব ফুয়াদকেই দেওয়া হয়....