অবক্ষয় রহস্য ভয় ও বিস্ময় — পর্ব ০৪
লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: ছোট গল্প · পর্ব ০৪ · ৬ পর্বের মধ্যে ৪
দুপুরের স্নিগ্ধতায় জলের ঢেউগুলো চকমক করছে। থেমে থেমে জল স্পর্শ করছে জুনায়েদের পায়ে। উদাস মনে পুকুরপাড়ে পা ভিজিয়ে বসে আছে জুনায়েদ। কিছু দিন ধরে কোনো কাজেই মন বসাতে পারছে না। অতিরিক্ত মন খারাপ হলেই পুকুরপাড়ে এসে পা ভিজিয়ে বসে থাকে। এতে এক অন্য রকম প্রশান্তি কাজ করে অন্তরে।
"শত উদাসীনতা বিলিয়ে দিলাম জলের মাঝে, কেউ যদি খুঁজতো আমায় সন্ধ্যা সাঝে।" দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিরবির করে বললো জুনায়েদ।
আজ সে কম্পিউটার ক্লাসে যায়নি। বাসা থেকে বের হয়েছিলো ঠিকই কিন্তু আর ক্লাসে যাওয়া হলো না। মনের মধ্যে অজানা এক ক্লান্তি নিয়ে এসে বসেছে পুকুরপাড়ে। প্রায় তিন ঘন্টা হলো এখানে বসে আছে। দূরে কিছু ছেলেমেয়ে পুকুরের পানিতে কত আয়েশ করে গোসল করছে।
"রঙিন শৈশবের স্মৃতি ভোলা যায় না, আহ! কত সুন্দর ছিলো দিনগুলো। ভাবতে বসলে এখনো চোখ দিয়ে পানি ঝড়ে। তখন বুঝতাম না, বাস্তবতা কি। আপন মনে জীবন উপভোগ করতাম। মাঝে মাঝে ভাবি, বড় হওয়াটাই জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। কিন্তু মানুষ না চাইতেও তাদের বড় হতে হয়, বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়।" আনমনে আবারও বিরবির করলো জুনায়েদ।
পুকুরের ঠিক মাঝ বরাবর একটা শুকনো বাঁশ দাঁড়িয়ে আছে। বাঁশটার একদম মগে বসে আছে পানকৌড়ি। একটু পর পর পানিতে ডুব দেয়, মুখে করে মাছ নিয়ে ফিরে আসে। খুব তৃপ্তি করে বাঁশের উপরে বসে মাছটা আহার করে। জুনায়েদ আপন দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো। হঠাৎ হুঁশ ফিরলো। পিছন থেকে কেউ তার কাঁধে হাত দিয়েছে। একটু চমৎকৃত হয়ে পিছনে তাকায়।
"জুনায়েদ! কি হয়েছে তোমার?" পিছনে থেকে জুনায়েদের পাশাপাশি পানিতে পা ভিজিয়ে বসে জিজ্ঞেস করলো ইকরাম।
"ক-কই কিছু হয়নি তো ইকরাম ভাই। আপনি এখানে কি করছেন?" পাল্টা প্রশ্ন করলো জুনায়েদ।
"ভালো লাগছিলো না, তাই পুকুরপাড়ে আসলাম। এসে দেখি তুমিও এখানেই। যাই হোক, কম্পিউটার ক্লাসে আসলে না কেনো আজকে?" দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জিজ্ঞেস করলো ইকরাম।
"জানি না ভাই! কি যেনো হয়েছে আমার। কোনোকিছু ভালো লাগে না। সবসময় মন খারাপ হয়ে থাকে। অথচ মন খারাপের কোনো কারণ খুঁজে পাই না। সবকিছু ঠিকঠাক আছে, তবুও..." বলেই চুপ হয়ে গেলো জুনায়েদ।
"মন খারাপ না হলে তুমি কোনোদিন বড়ই হও'নি। তোমার মন খারাপ হয় মানেই তুমি বাস্তবতা বুঝতে শিখেছো।" এতটুকু থামলো। আবারও বললো, "মাঝে মাঝে এমন হয়। এতে চুপ হয়ে যেতে নেই। এগুলোকে স্বাভাবিক ভাবে নিতে শিখো।" জুনায়েদের দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসি দিলো ইকরাম।
পুরো টিটিসি'তে একমাত্র ইকরামের সাথেই জুনায়েদের একটু বন্ধুসুলভ সম্পর্ক। এই মানুষটা জুনায়েদের চেয়ে অনেক বড়, কিন্তু তার ব্যবহার আচরণ সবটাই যেনো সমবয়সী বন্ধু ন্যায়।
"ইকরাম ভাই! সত্যি বলতে এই সময়টাতে আমার ঠিক এমনই সাপোর্টের দরকার ছিলো। আমি আসলে নিজের ভিতর থেকে মচকে গেছি। সারাক্ষণ ভিতরে একটা ভয় কাজ করে। নিজেকে পরাজিত মনে হয়। মনে হয় নিজেকে শেষ করে দিলেই যেনো মুক্তি।" এক দমে বলে গেলো জুনায়েদ।
"প্রতিটা পরাজয় তোমাকে জেতার জন্য অনুপ্রেরণা দিবে। যাতে তুমি পরবর্তী সুযোগটা সুন্দর মতো কাজে লাগাতে পারো। পরাজয় মানেই সবকিছু শেষ নয়, পরাজয় মানে নতুন করে শুরু করা। যারা পরাজিত হয়েও রুখে দাঁড়ায় তারাই আসল বিজয়ী।" জুনায়েদ লক্ষ্য করলো, ইকরামের কণ্ঠস্বরে এক সংগ্রামী আওয়াজ। তার চোখ চকচক করছে। চুপ করে রইলো জুনায়েদ।
"শুনো জুনায়েদ! চলো ক্লাসে চলো। ইলেকট্রিক্যাল ক্লাসটা মিস দিও না।" নরম কণ্ঠে বললো ইকরাম।
"আজকে অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। আজ আর যাবো না।" মর্জি সুরে বললো জুনায়েদ।
"তো কি হয়েছে? আমিও তো এখানে সময় নষ্ট করলাম। দেরি একা তোমার হয়নি, আমারও হয়েছে। চলো একসাথেই যাবো৷ স্যার কিচ্ছু বলবে না।" আড়দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো ইকরাম। জুনায়েদ আর না করলো না। গুটি গুটি পায়ে তারা টিটিসি'র গেট অতিক্রম করে ভিতরে প্রবেশ করলো।
_
ইকরাম আর জুনায়েদকে দেরিতে ঢুকতে দেখে সাইদুল স্যার বললেন, "আজকে এত দেরি হলো কেনো তোমাদের?" জবাবে জুনায়েদ চুপ করে রইলো। ইকরামই বললো, "স্যার একটু কাজ ছিলো। আসলে সকালে না খেয়ে এসেছিলাম। হোটেল থেকে খেয়ে আসতে আসতে দেরি হয়ে গেলো।" ইকরামের জবাব শুনে সাইদুল স্যার আর কথা বাড়ালেন না। ইকরাম নিজের জায়গায় বসে পড়লো। জুনায়েদ সিটের ব্যাগ রাখার সময় একটা বিষয় লক্ষ্য করলো, অন্য দিনের তুলনায় আজ ক্লাসটা একটু বেশিই শান্ত। বাকি সব দিন তো ক্লাসে হৈ-হুল্লোড় লেগেই থাকে। আজ একদম তার ব্যতিক্রম। তিন দিন আগেই ইকরাম'সহ আরো তিনজন ইলেকট্রিক্যাল ক্লাসে ভর্তি হয়েছে। ক্লাসে চব্বিশ'জন ছাত্র থাকার কথা, তবে আজ পঁচিশ'জন দেখা যাচ্ছে। তাহলে বোধহয় আজকে নতুন একজন ভর্তি হয়েছে। সে আবারও আঙুল দিয়ে গুনে গুনে দেখছে। হঠাৎ তার দৃষ্টি আটকায় সামনের বেঞ্চে। একজন বসে আছে। একদম ভিন্ন। সবার চেয়ে আলাদা। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ গায়ের রঙ, সাদা পাঞ্জাবি পাজামা পরিহিত, চোখে সাদা ফ্রেমের চশমা। হাতে সোনালী ঘড়ি। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। বয়স আর কত হবে? —এই বিশ থেকে একুশ। ডান হাতে কলম ধরে খাতার পৃষ্ঠায় কি যেনো আঁকিবুঁকি করছে। তার কাছে লোকটাকে আজব মনে হলো। সে পিছনের সারি থেকে উঠে সামনের সারিতে ওই লোকটার পাশাপাশি বসলো। লোকটা এক চুলও তার দিকে তাকালো না। যেনো সে নিজের ভাবনায় ডুবে আছে। এতটা ভাবনাগ্রস্ত মানুষ আগে কখনো দেখেনি জুনায়ে। নিষ্পলকে কেউ নিজের কাজে কিভাবে অটুট থাকে? এই প্রশ্নটাই বার বার তার মাথায় আসছে।
_
দুপুর একটা বেজে পনেরো মিনিট। ক্লাসে এখন টিফিন টাইম। যে যার মতো টিফিন নিয়ে এসেছে। রুমের এক কোণে সবাই মিলেমিশে টিফিন ভাগাভাগি করে খাচ্ছে। একই সময়ে জুনায়েদ বাইরে থেকে খাবার খেয়ে ক্লাসে ঢুকলো। ঢুকেই তার কাছে ক্লাসটা অপরিচিত মনে হতে লাগলো। যেখানে সবাই মিলেমিশে এক কোণে সেখানেই ক্লাসের আরেক কোণে চুপটি করে সেই লোকটি বসে আছে। খাতা কলমে লিখালিখি করছে। জুনায়েদ বরাবরই সব জিনিসে আগ্রহী বেশি। সে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেলো। নিজের সিটে বসলো। পাশের সিটেই ওই লোকটা বসে খাতা কলমে লিখালিখি করছে। জুনায়েদ ঘুরে ঘুরে তার দিকে তাকাচ্ছে। ক্লাস বাকিরাও জুনায়েদকে পরখ করলো। আবার যে যার খাবারে লক্ষ্য স্থির করলো। জুনায়েদ একটু ঝুকে তার দিকে তাকালো। লোকটা এখনো আপন মনে কাজ করছে। জুনায়েদ একবার তার খাতার দিকে তাকালো। এক অচেনা ভাষায় কিছু লিখছে। মনে হয়, কোনো গল্প বা অন্য কিছু। আরেকটু ঝুঁকে লক্ষ্য করলে স্পষ্ট দেখতে পায়, খাতায় হিন্দি ভাষা লিখছে। জুনায়েদ অবাক সুরে জিজ্ঞেস করে, "আ-আপনি হিন্দি লিখতে পারেন?" জুনায়েদ যেনো বিস্মৃত হলো, তার এই গুনটা দেখে। লোকটা এক নজর জুনায়েদের দিকে তাকালো। একটা মুচকি হাসি দিলো, আবার লিখা শুরু করলো। "হ্যালো! আমি জুনায়েদ। আর আপনি?" নিজের সিট থেকে উঠে লোকটার সামনে দাঁড়িয়ে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিলো জুনায়েদ। লোকটা যেনো বরাবরই জুনায়েদকে উপেক্ষা করছে। "হ্যালোওওওও!" একটু সজোরেই বললো। ক্লাসের বাকিরা এখন টিফিন ক্যারি বক্স গোছাতে ব্যস্ত। এত ব্যস্ততার মাঝেও এক পলক এদিকে তাকালো। জুনায়েদ কিছুটা সংকোচ বোধ করলো। গিয়ে নিজের সিটে বসে পড়লো। তার চোখে মুখে আঁধার দেখা দিলো। "আমি আযান" পাশের সিট থেকে একটা গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। জুনায়েদের কানগুলো যেনো শীতল হয়ে গেলো এই কণ্ঠস্বরে। এই কণ্ঠস্বর যতটা ভয়ংকর ততটাই মাধুর্যতা বহন করে। "আপনি এত চুপচাপ থাকেন কেনো?" একটু উত্তেজিত হয়ে বললো জুনায়েদ।
"চুপচাপ সবাই থাকতে পারে না। যারা চুপচাপ থাকে, তারা মূলত অসংখ্য শব্দহীন কথা বলে। যে কথা আশেপাশের কেউ শুনতে পারে না।" কথাটা শেষ করে জুনায়েদের দিকে চোখ তুলে তাকালো আযান। জুনায়েদ যেনো ভয়ভীত হলো আযানের চাহনিতে। চশমার ভেতরে একজোড়া চোখ দেখা যাচ্ছে। তার চোখজোড়াই যেনো হাজারটা কথা বলে। এক মুহূর্তের জন্য জুনায়েদের মনে হলো, এই চোখের দিকে তাকালে যে কেউ হার মানতে বাধ্য হবে। এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ তার চোখে।
"আপনি কি সবসময়ই একা থাকেন? কারো সাথে মিশেন না?" নরম গলায় আবারও প্রশ্ন করলো জুনায়েদ।
"ভালো সম্পর্ক সবার সাথেই রাখি। তবে এতটাও ঘনিষ্ঠ হই না যতটা ঘনিষ্ঠ হলে চলতে অসুবিধা হবে।" নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বললো আযান।
"আচ্ছা! আচ্ছা! আপনি কোথায় থাকেন?" এক গাল মুচকি হেসে জানতে চাইলো জুনায়েদ।
"আমি টঙ্গীবাড়ী উপজেলায় থাকি।" জবাবে বললো আযান।
"কি বলছেন! এত দূর থেকে প্রতিদিন যেয়ে এসে কোর্স করবেন?" অবাক হয়ে আবার জিজ্ঞেস করলো জুনায়েদ।
"আমি না আসতে চাইলেও যে আমাকে আসতেই হতো। কোনো না কোনো ভাবে তো এখানে আসা হতো আমার।" কথাটুকু শেষ করে আবার নিজের লিখায় মন দিলো আযান।
"মানে?" আযানের কথাটা যেনো জুনায়েদের কানে বিঁধতে লাগলো।
"কিছু না! সব প্রশ্নের উত্তর হয় না। আমরা কোথাও হয় বাধ্য হয়ে যাই। নয়তো কারো জন্য। আর নয়তো নিজের জন্য।" চোখ তুলে তাকালো আযান।
"তা অবশ্য ঠিক। আচ্ছা যাই হোক, আপনার অসুবিধা হবে তো নিশ্চয়ই!" সাধারণ ভাবে বললো জুনায়েদ।
"হ্যাঁ সমস্যা তো হবেই। দেখি এদিকে কোনো বাসা ভাড়া পাই কি-না। তাহলে আর কষ্ট করতে হবে না।" মুখ ফুটে হাসতে না চাইলেও জোর করেই হাসলো আযান। জুনায়েদ আর কথা বাড়ালো না। কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্লাস শুরু হয়ে গেলো। যে যার মতো ক্লাস করতে ব্যস্ত।
__
"স্যার আমি পরীক্ষা দিবো না। আমার ভালো লাগছে না।" খিটখিটে মেজাজ নিয়ে বললো জুনায়েদ।
"কি হয়েছে জুনায়েদ? পরীক্ষা দিবে না কেনো?" পাশ থেকে ইকরাম প্রশ্ন করলো।
"কিছু না। আমার কিছুই ভালো লাগছে না। স্যার আমি পরীক্ষা দিবো না প্লিজ" আবারও অনুরোধ করলো জুনায়েদ।
"ঠিক আছে। পরীক্ষা না দিলে চলে যাও।" অনেকক্ষণ চুপ থেকে সাইদুল স্যার বললেন। সবাই হা হয়ে তাকিয়ে রইলো। জুনায়েদ কোনো কথা না বাড়িয়ে ক্লাস রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। ধীর গতিতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে, হঠাৎ তার পা পিছলে যায়। তার মনে হতে থাকে সে যেনো আকাশ থেকে পড়ছে। "আআআআআআআআ" এক আর্তচিৎকার দিয়ে সে টিটিসি'র বাগানে গিয়ে পড়লো। এত উপর থেকে পড়েও সে অক্ষত আছে। এটা ভেবেই সে অবাক। এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখতে দেখতেই বৃষ্টি শুরু হলো। দুই হাত মাথায় রেখে উঠতে যাবে তখনই একজন প্রশিক্ষনার্থীর গাড়ি সোজা এসে জুনায়েদকে ধাক্কা দেয়। দ্বিতীয় বারের মতো এক আর্তচিৎকার দিয়ে তার ঘুম ভেঙে যায়। তার মানে এতক্ষণ সে দুঃস্বপ্ন দেখছিলো। তার সারা শরীর ঘেমে একাকার। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছে বার বার। ড্রিম লাইটের মৃদু আলোও যেনো তার কাছে গভীর অন্ধকার মনে হচ্ছে। বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি হচ্ছে। ইচ্ছে করছে উঠে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে। "না! যাই হোক। মনটা হালকা করতে হবে।" মনে মনে নিজের সাথে কথা বলেই বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। দরজা খুলে এসে বাইরে দাঁড়ালো জুনায়েদ। মুশলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। এই শীতের সময় বৃষ্টি দেখাই যায় না। মনে মনে কত ভাবনা ভেবে আনমনে পা বাড়ালো বৃষ্টির পানিতে নিজেকে ভিজিয়ে দিতে। ছোট ছোট ফোঁটা এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে জুনায়েদের শরীর। ঠান্ডা অনুভব হচ্ছে খুব। এরপরও যেনো ভালো লাগা কাজ করছে। চোখ বন্ধ করে গিয়ে উঠোনে দুই হাত মেলে দাঁড়িয়ে রইলো। "বৃষ্টির এই কোমলতা, মৃদু তার ছোঁয়া। বিষিয়ে থাকা মনটা হয়েছে আনমনা।" আবারও বিরবির করে বললো জুনায়েদ।
__
সূর্যের আলোয় স্পষ্ট দিক বেদিক। পাখিদের কোলাহল। মন মাতিয়ে তোলা হাওয়া। কম্পিউটার ক্লাস শেষ করে জুনায়েদ বসে আসে টিটিসি'র ছাঁদে। একাকী সময় কাটাতে সে প্রায়ই এখানে এসে বসে থাকে।
"তুমি জানো! যখন মানুষের মন খারাপ থাকে, তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে। কারণ মানুষ ভাবে, ওই সময়টাতে মানুষের হৃৎস্পন্দনও আকাশের মতো ধীরে ধীরে চলতে থাকে। তাদের নিঃশ্বাস প্রশ্বাস সবটাই যেনো তখন আকাশ সমপরিমাণ হয়ে উঠে।" পিছন থেকে বলে উঠলো ইকরাম।
"আরে ইকরাম ভাই আপনি?" আকস্মিক প্রশ্ন করলো জুনায়েদ।
"হ্যাঁ! অনেকক্ষণ আগেই এসেছি। দেখলাম আনমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছো। তাই আর ডিসটার্ব করিনি। কি হয়েছে তোমার? আমাকে বলতে পারো!" সামনে গিয়ে জুনায়েদের পিঠে হাত রাখলো ইকরাম।
"আমি নিজেও জানি না ইকরাম ভাই। আমার সবকিছুই ঠিক আছে, বাসায় কোনো প্রবলেম না, লাইফও সুন্দর মতোই চলছে —তবুও কেনো এত মন খারাপ হয়?" নিষ্পাপ চোখে তাকিয়ে রইলো আকাশের দিকে।
"অজানা মন খারাপ খুব কষ্টদায়ক। মানুষকে ভালো থাকতে দেয় না। যাই হোক, চলো ক্লাস শুরু হয়ে যাবে।" ইকরামের কথা মতো উঠে এলো জুনায়েদ।
ক্লাসরুমে ঢুকেই জুনায়েদ সামনে এগিয়ে যেতে থাকে। ইকরাম একটু অবাকই হলো। এতক্ষণ একসাথে এসে, হুট করে জুনায়েদ তাকে উপেক্ষা করছে। "ইকরাম ভাই। এদিকে আসুন।" জুনায়েদের ডাকে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে ইকরাম।
"হ্যাঁ বলো।" শান্ত সুরে বললো ইকরাম।
"আযান ভাই! কেমন আছেন?" মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলো জুনায়েদ। আযান নিজের মতো বসে আছে। যেনো সে জুনায়েদকে দেখতেই পাচ্ছে না।
"জুনায়েদ? কি হয়েছে তোমার? এই ছেলেটা তোমার সাথে কথা বলতে চায় না।" জুনায়েদকে টেনে পাশে নিয়ে বললো ইকরাম।
"না! না! ইকরাম ভাই। উনি আসলে বেশি কথা বলে না। এজন্য এমন করছে। আসুন আমার সাথে।" এই বলে ওরা দু'জন আবারও আযানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
"মানুষকে এতটাও আপন ভাবা ঠিক না। মানুষ হচ্ছে সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক।" গভীর কণ্ঠে বলে উঠলো আযান। ইকরাম আর জুনায়েদ হতবাক হয়প তাকিয়ে রইলো। চশমার ভিতরে লুকিয়ে থাকা চোখগুলো যেনো কত-শত প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিচ্ছে।
"আ-ম! আ-যান ভাই।" আমতা আমতা করে বললো জুনায়েদ।
"আমি ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?" আগের সুরেই জবাব দিলো আযান। ইকরাম এখনো বুঝতে পারছে না, জুনায়েদ কেনো ওর সাথে মিশতে চাইছে। ছেলেটা বরাবর তাদের উপেক্ষা করছে। আযান এক প্রকার বিরক্ত লাগতে শুরু করে ইকরামের কাছে।
"আ-আমিও আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।" হাসি মুখে বললো জুনায়েদ। সবাই চুপচাপ। কেউ কোনো কথা বলছে না। নিস্তব্ধতা ভেঙে জুনায়েদ আবারও বললো, "আযান ভাই। চলেন একটু বাইরে যাই।" আযান চোখ তুলে তাকালো জুনায়েদের দিকে। ছেলেটা খুব উৎসুক।
"বাইরে যাবে?" একটু থেমে আবার বললো, "বাইরের জগতটা যতটা সুন্দর ততটাই বিষাক্ত। একজন বিষাক্ত মানুষের জন্য সবাইকে বিষ মনে হবে এবং একজন সরলের জন্য সবাইকে বোকা মনে হবে। তবে, বাইরের জগতটা দেখা উচিৎ। নয়তো বুঝা যায় না, মানুষের আসল রূপ কেমন। মানুষ রূপী অসংখ্য নরপশু আছে এই দুনিয়া। সবাইকে চেনা না গেলেও আশেপাশে যারা থাকে তাদের চিনে রাখা দরকার।" এক সুরে বলে চললো আযান। এতক্ষণ পর এই একটা কথাই যেনো ইকরামের ভালো লাগলো। সে মনে মনে উপলব্ধি করলো, আযান কেনো এত চুপচাপ থাকে। যখনই বলে, তখনই তার কথার এক অন্য রকম মাধুর্য খুঁজে পাওয়া যায়।