অবক্ষয় রহস্য ভয় ও বিস্ময় — পর্ব ০৩

লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: ছোট গল্প · পর্ব ০৩ · ৬ পর্বের মধ্যে ৩

কাটাখালীর বিশাল মাঠে আজ অনেক দিন পর বের হলো জুনায়েদ। মাঠের সৌন্দর্য ছিলো অপরূপ। সোনালি রোদ্দুরে স্নিগ্ধ ঘাসের ওপর জলবিন্দুর মতো ঝরে পড়ছিলো সকালবেলা। পাখিদের গান সব মিলিয়ে একটি শান্তির আবহ তৈরি করেছিলো। কিন্তু জুনায়েদের মনে ছিলো একটি অস্বস্তি, তার মানসিক চাপ যেনো এই পবিত্র পরিবেশকেও ভীষণ অশান্ত করে রেখেছিলো।

হঠাৎ, মাঠের এক প্রান্তে শ্রবণেন্দ্রিয়কে আঘাত করলো গরুর জবাইয়ের দৃশ্য। কিছু লোক মিলে একত্রে একটি গরু জবাই করছিলো। জুনায়েদ অস্থির হয়ে অন্য দিকে মুখ ঘুরালো। দৃষ্টি চলে গেলো মাঠের অপর প্রান্তের দিকে, যেখানে কিছু মানুষ কারো একজনের জানাজা পড়াচ্ছিলো। হৃদয়ের চাপবোধে সে সেদিকে এগিয়ে গেলো। কিন্তু অদূরে গিয়ে দেখলো, জানাজা শেষ হয়ে গেছে।

আচমকা, সে দেখতে পায়, চার পাঁচজন লোক মিলে লাশটিকে দুলাতে দুলাতে একটি ট্রাকের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সুন্দরতাটি দ্রুত তার চোখের সামনে অধঃপাতে গেলো। লাশটি ট্রাকে মধ্যে ধপাস করে ফেলে দিলো। আর অস্বাভাবিক হাসিতে চারপাশে গমগম করে উঠলো। জুনায়েদ আতঙ্কিত হলো। কী এমন অমানবিকতায় তারা মত্ত! সে লাশটার পরিচয় খুঁজতে তাড়াহুড়া করে এগোতে শুরু করলো। সেই মুহূর্তে, তার চোখের সামনে একটি বিশাল দরজা উঠলো, আর বাইরে থেকে মানুষগুলো তা বন্ধ করার প্রস্তুতি নিতে লাগলো। জুনায়েদ দ্রুত দৌড়াতে লাগলো। এই সময়ে সাত আটটি শক্তিশালী হাত পিছন থেকে ধরে ফেললো। একই সঙ্গে অস্বাভাবিক হাসির আওয়াজ তার কানে আসতে লাগলো। তাদের ভাষা ছিলো অচেনা, কিন্তু আসল কথা হলো, সেখান থেকে তাকে মুক্ত হওয়া সম্ভব ছিলো না। বরাবরই জীবন থেকে মুক্ত হয়ে যাওয়ার অতুলনীয় বর্তমান অনুভূতির জন্য সে ঝাপটাঝাপটি করতে থাকলো। কয়েক মুহূর্ত পেরিয়ে গেলে, অবশেষে সে নিজেকে মুক্ত করতে সক্ষম হলো। দরজা বন্ধ হওয়ার আগে দ্রুত ট্রাকের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। ঠাণ্ডার ঘাম কপাল থেকে পড়তে থাকলো। সে হাত বাড়িয়ে লাশের মুখ থেকে কাপড়টি সরিয়ে দিলো। কাপড় সরিয়ে জুনায়েদ দেখতো পায় এটা তার নিজেরই লাশ। ভয়াবহ আতঙ্কে সে এক চিৎকার দেয়। আচমকা তার চোখ খুলে গেলো। সে নিজের ঘরে, নিঃশব্দ। বুঝতে পারলো, এটি ছিলো কেবল একটি দুঃস্বপ্ন।

হঠাৎ ঘুম ভাঙতেই জুনায়েদ অস্থির হয়ে হাঁপাতে থাকে। তার কপাল বেয়ে হিমশীতল শ্রোত বইছে। নাকের ডগায় শিশিরবিন্দুর মতো ছোট ছোট ঘামের ফোঁটা দেখা যাচ্ছে। ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলছে। নিজেকে শান্ত করার জন্য বার বার ঢোক গিলে। ভয়টা কিছুতেই কাটছে না। নিজেকে কিছুটা সান্ত্বনা দিয়ে আবারও ঘুমানোর চেষ্টা করে, তখনই শুনে বাইরে কারো কান্নার আওয়াজ। একটু হতবাক হয়ে মনে মনে ভাবলো, "ওইদিন টিটিসি'তে দূর্ঘটনা ঘটার পর থেকেই আমার সাথে এমন আজগুবি ঘটনা ঘটছে। তাহলে কি ফুপির বলা কথাগুলো সত্যি ছিলো? আমার কি ফুপির কথা শোনা উচিৎ ছিলো?" এসব ভাবতে ভাবতে জুনায়েদ নিজের ঘর থেকে বের হয়, কান্নার শব্দটা কোত্থেকে আসছে দেখার জন্য।

বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। রাত তখন গভীর। কান্নার কান্নার শব্দটা তখনও ভেসে আসছে। শব্দের পিছু ছুটতে ছুটতে বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তার ধারে এসে দাঁড়ায় জুনায়েদ। রাস্তার পাশ ধরে হাঁটছে, তার চোখ জোরা সেই কান্নার উৎস খুঁজে বেড়াচ্ছে। তখনই জুনায়েদের ফোনটা বেজে উঠলো। ফোনের স্ক্রিনে দেখতে পেলো "সৃজন" কল করেছে। জুনায়েদের ফুফাতো ভাই। তাড়াতাড়ি কল রিসিভ করলো জুনায়েদ।

"কিরে ঘুমাসনি?" কল রিসিভ করার সাথে সাথে প্রশ্ন করলো সৃজন।

"ঘুমিয়ে থাকলে কি তোর কল রিসিভ করতাম?" পাল্টা প্রশ্ন করলো জুনায়েদ।

"তা অবশ্য ঠিক। তুই ঘুমিয়ে থাকলে কখনোই কল রিসিভ করিস না। তা কি করছিস এখন?" আবারও প্রশ্ন করলো সৃজন।

"এই তো একটু বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। খোলা আকাশের নিচে। তুই কি করিস? এত রাতে এখনো ঘুমাসনি কেনো?" রাস্তার ধারে সবুজ ঘাসের ক্রোড়ে বসতে বসতে বললো জুনায়েদ।

"আ-আমার ঘুম আসছিলো না। গেম খেলছিলাম। ভাবলাম তোকে একটা কল করি। যাই হোক, এত রাতে বাইরে কি করছিস?" সৃজন আবারও প্রশ্ন করলো।

সৃজনের প্রশ্নটা জুনায়েদ খেয়াল করলো না। তার মনে হলো, এই মাত্র তার সামনে দিয়ে কেউ একজন হেঁটে গেলো। সাদা জোব্বা পরিহিত লম্বা কোনো পুরুষাবয়ম। মাথায় বড় রুমাল পেঁচানো। যেনো কোনো সূফী সাহেব। হাতে একটা বড় লাঠি। যেনো কাউকে ধাওয়া করছে। জুনায়েদ অপলকভাবে তাকিয়ে রইলো সেই পুরুষাবয়ম'টার দিকে।

"কিরে? কথা বলছিস না কেনো?" সৃজনের কথায় আবারও হুঁশ ফিরলো জুনায়েদের।

"হ্যাঁ? কিচ্ছু বললি আমায়?" আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলো জুনায়েদ।

"এতক্ষণ তাহলে কার সাথে কথা বলছি আমি? জিজ্ঞেস করলাম তুই নাকী টিটিসি'তে অ্যাসেট ব্যাচে ভর্তি হয়েছিস?" একটু কঠিন স্বরে জিজ্ঞেস করলো সৃজন।

"হ্যাঁ! আজাইরা সনয় কাটে না, তাছাড়া ওখানে খুব মজা হয়। কাল থেকে অ্যাসের ব্যাচের ক্লাস শুরু।" উত্তরে বললো জুনায়েদ।

"আচ্ছা! মন দিয়ে ক্লাস কর। আর যত্ন নিস নিজের। আল্লাহ হাফেজ।" কথা শেষ করেই কল কেটে দিলো সৃজন।

সৃজনের কল কাটার পর জুনায়েদ কিছু মুহূর্ত পূর্বের কথা মনে কথা লাগলো। আসলেই কি কেউ তার সামনে দিয়ে হেঁটে গেলো নাকী সবটাই তার মনের ভুল?

_

"আম্মু! আমি ক্লাসের জন্য বের হচ্ছি। দুপুরে লাঞ্চ ব্রেকে আসতেও পারি আবারও না-ও আসতে পারি।" বাসা থেকে বের হতে হতে মাকে ডেকে বলে যাচ্ছে জুনায়েদ।

"আচ্ছা! সাবধানে যাস।" ছেলের ডাকে সায় দিয়ে জানান দিলো জোহরা।

মাকে বিদায় জানিয়ে টিটিসি'র উদ্দেশ্যে বের হলো জুনায়েদ। টিটিসি'তে পৌঁছেই কম্পিউটার ক্লাস অ্যাটেন্ড করলো জুনায়েদ। কিছুক্ষণ পরেই ইলেকট্রিক্যাল ক্লাস শুরু হবে তার। আজকে প্রথম দিন। খুব উৎসুক হয়ে আছে জুনায়েদ।

_

দুপুর বারোটা বেজে ছয় মিনিট। জুনায়েদ বসে আছে নতুন ক্লাসে। পুরো ক্লাসে ত্রিশ জনেরও বেশি মানুষ উপস্থিত। ক্লাস টিচার সাইদুল সিকদার লেকচার দিচ্ছেন, এখানে কি কি কাজ শেখানো হবে, কোন কোন কাজ কতদিন ধরে শেখানো হবে, আর সব রুলস ও রেজুলেশন সবাইকে বুঝিয়ে দিচ্ছে। জুনায়েদ মনযোগ দিয়ে সব কথা শুনছে। বরাবরই সে একজন মনোযোগী ছাত্র। কম্পিউটার ক্লাসে ভর্তি হয়ে নতুন নতুন অনেক মানুষের সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে। এখানে অসংখ্য নতুন মুখ দেখতে পাচ্ছে জুনায়েদ। তবে, এই মুখগুলো যেনো একে অপরকে নিয়ে একটু বেশিই ব্যস্ত। তারা যেনো আগে থেকেই একে অপরকে চিনে। মুহূর্তেই বুঝতে পারলো, এরা আসলেই সবাই সবাইকে চিনে। তাদের মধ্যে আগে থেকেই পরিচিত। তাদের দিক থেকে একমাত্র নতুন মুখ হচ্ছে জুনায়েদই। প্রথম ক্লাসটা কোনো রকম শেষ হয়ে গেলো।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। জুনায়েদ ধীরে ধীরে বাড়ির পথ জমিয়েছে। আপন মনে গান গাচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে যখন সে ক্ষেতের মাঝের কবরস্থানের সামনে গিয়ে পৌঁছায় তখন তার শরীর আচমকা অস্বাভাবিক ভাবে ভারি হতে শুরু করে, যেনো কেউ শক্ত করে তার শরীরে আটকে আছে। এরপরও নিজেকে স্থির করে পা বাড়ায় জুনায়েদ। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ পিছন থেকে কেউ যেনো তাকে ডাকছে। সবকিছু উপেক্ষা করে সে বাড়ি পৌঁছায়।

_

"আম্মু! আম্মু! আমার ফোনটা কোথায়? খুঁজে পাচ্ছি না তো?" সজোরে চিৎকার করে ডেকে চলেছে জুনায়েদ।

"দেখ তোর পড়ার টেবিলের উপর রেখেছি।" রান্নাঘর থেকে জোহরা জবাব দিলেন। মায়ের কথা মতো পড়ার টেবিলের উপর তন্নতন্ন করে খুঁজেও ফোন পেলো না জুনায়েদ। বাধ্য হয়ে নিজের ঘরের প্রতিটা কোণা খুঁজে দেখলো। তা-ও কোত্থাও পেলো না। এরপর মায়ের ঘরে গিয়ে খুঁজে। সেখানেও পাচ্ছে না।

"আশ্চর্য! ফোনটা গেলো কোথায়? আম্মু! আমি কিন্তু এখনো ফোনটা পাইনি।" রাগান্বিত কণ্ঠে চেচাচ্ছে জুনায়েদ।

"তোর পড়ার টেবিলের উপরে দেখ ভালো করে।" উত্তরে বলে জোহরা। এবার জুনায়েদ একটু ক্ষিপ্ত সুরে বলে, "পুরো বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেও পেলাম না তো। ক্লাসের জন্য দেরি হয়ে যাচ্ছি তো!" বলেই নিজের ঘরে পা বাড়ায় জুনায়েদ। ঘরে পা রাখতেই তার চোখ আটকে যায় পড়ার টেবিলের উপর। ফোনটা টেবিলের উপরেই পড়ে আছে। কিন্তু কিছুক্ষণ আগেও তো এই জায়গায় তন্নতন্ন করে খুঁজলো। "যাই হোক, হয়তো খেয়াল করিনি। আম্মুওওওও! ফোন পেয়েছি। আমি টিটিসি'তে গেলাম।" মাকে ডেকে বিদায় জানালো জুনায়েদ।

কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে ধীর পায়ে হাঁটতে লাগলো জুনায়েদ। প্রতিটা সকাল তার কাছে এক নতুন পথচলা। "জীবন যদি সত্যিই এতটাই সহজ হতো, যতটা সহজ ভাবে আমরা কল্পনা করি।" হঠাৎ মাঝপথে থেমে গিয়ে মনে মনে বললো জুনায়েদ। তার চোখে আটকে গেলো, দূরের গাছের মগডালে বসে থাকা একজোড়া পাখি। "যদি পুনর্জন্ম বলে কিছু থেকে থাকে, তাহলে আমি চাইবো পাখি হয়ে জন্মাতে। ডানা মেলে অসীম আকাশে উড়ে বেড়াবো। যখন যেখানে খুশি উড়ে উড়ে চলে যাবো। বাঁধা দেওয়ার কেউ থাকবে না। অতিথি পাখি হয়ে দেশ-দেশান্তরে ঘুরবো।" একটু শব্দ করে হেসে উঠলো জুনায়েদ। "কল্পনা সত্যি কত সৌখিন হয় তাই না, আমরা কল্পনায় নিজের সুখ খুঁজে নিতে পারলেও বাস্তবে পারি না।" নিষ্পলক দৃষ্টিতে এখনো পাখি জোড়ার দিকে তাকিয়ে আছে জুনায়েদ। "এতটুকু জীবনে বুঝতে পেরেছি, চলার পথে একটা বিশ্বস্ত কাঁধের প্রয়োজন। যে কাঁধ আমার ক্লান্তিকর মাথাকে আশ্রয় দিবে। ঠিক যেমন একটি পাখি আরেকটি পাখির ডানায় মুখ লুকায়।" কথাটুকু বলতে বলতেই পাখি দু'টো ডাল ছেড়ে উড়ে চলে গেলো। জুনায়েদও নিজের পথে চলতে লাগলো। চলতে চলতে সে তার গন্তব্যস্থানে পৌঁছায়। "আমরা কি অদ্ভুত! যখন যে জায়গায় যাই, ওই জায়গাকেই গন্তব্য বলে দাবী করি। অথচ আমাদের আসল গন্তব্য কোথায় নিজেরাও জানি না।" এক গাল মুচকি হেসে টিটিসি'তে প্রবেশ করলো জুনায়েদ।

প্রথমেই সে কম্পিউটার ক্লাসে গেলো। আজকে পুরো ক্লাসটা একটু অন্য রকম লাগছে। সবকিছু ঠিকই আছে তবুও তার কাছে নতুন মনপ হচ্ছে। বাইরে থেকে এক ঝলক বিস্মিতা আলো প্রবেশ করেছে জুনায়েদের ডেস্কে। হাতের কাজ থামিয়ে দিয়ে, জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। আকাশের মেঘগুলো স্থির হয়ে আছে। সূর্যটা ঝলমল করছে। "একটা পর্যায়ে গিয়ে আমরা প্রত্যেকেই ওই মেঘের মতোই থমকে যাই। ঠিক যখনই নিজেকে সামলে নিতে পারি তখনই সূর্যের মতো ঝলমলে হাসতে পারি।" আজকে যেনো জুনায়েদ নিজেকে নতুন রূপে রূপান্তরিত করছে। তার কাছে সবকিছুই নতুন মনে হচ্ছে। তার ভাবনাগুলো নতুন রঙ খুঁজে পাচ্ছে। যা দেখছে তাই ভালো লাগছে।

_

বারোটা আঠারো! ইলেকট্রিক্যাল ক্লাসে বসে বসে সার্কিট ডায়াগ্রাম আঁকছে জুনায়েদ। সাইদুল স্যার এলইডি টিভিতে দেখিয়ে দিচ্ছে কিভাবে আঁকতে হবে সার্কিট ডায়াগ্রাম। সেটাই দেখাদেখি করে সবাই আঁকছে। তবে প্রথম দিন যেমন ত্রিশ জনের উপরে মানুষ হয়েছিলো, তেমনই দ্বিতীয় দিন থেকে মানুষ কমতে শুরু করে। বর্তমানে তাদের ক্লাসে একুশ জন ছাত্র আছে। কিছুক্ষণ আগেই সাইদুল স্যার সবাইকে বললো, পঁচিশ ছাত্র পূরণ হলেই উনি রেজিস্ট্রেশনের কাজ শুরু করবে। প্রত্যেকটা ট্রেডে রেজিষ্ট্রেশন শুরু হয়ে গেছে। শুধুমাত্র ইলেকট্রিক্যাল ট্রেডেই স্টুডেন্টের সংখ্যা কম থাকায় রেজিষ্ট্রেশন শুরু হয়নি।

ইলেকট্রিক্যাল ক্লাসে ভর্তি হওয়ার পর কারো সাথেই তেমন আলাপ হয়নি জুনায়েদের। সবাই সবার মতো ব্যস্ত। অতি প্রয়োজন হলে একজন আরেক জনের সাথে কথা বলে। "চারপাশে মানুষ আছে মানেই আমি কোলাহলে নেই। মনের মধ্যে যদি একাকিত্ব বাস করে তাহলে বাইরের কোলাহল কিছুতেই মনকে হালকা করতে পারে না।" কি মনে করে যেনো জুনায়েদ কথাটুকু তার খাতার প্রথম পৃষ্ঠা বড় বড় অক্ষরে লিখলো।

আজকে ক্লাস শেষ হতে হতে অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। সন্ধ্যা গড়িয়ে আকাশে রাতের আঁধার নেমে আসছে। হালকা হালকা কুয়াশা দেখা দিয়েছে। শীতের নরম ছোঁয়া লাগছে প্রকৃতিতে। এক অন্য রকম ভালো লাগা কাজ করে। "শীতের সন্ধ্যা মানেই স্নিগ্ধ চাঁদের আলোয় কুয়াশাময় পথের বাঁকে শিশিরবিন্দুর ছোঁয়া।" একটা মুচকি হাসি দিয়ে বললো জুনায়েদ।

আনমনে পথ চলছে জুনায়েদ। পথ চলতে চলতে সে এখন ক্ষেতের খুব কাছাকাছি। মৃদু চাঁদের আলোয় চারিপাশটা একটু অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। "জীবন যদি আঁধারের অতলে হারিয়ে যায়, চাঁদের এই মৃদু আলোই আমাকে পথ দেখায়।" মনে মনে বললো জুনায়েদ। আবারও এক পা এক পা করে এগোতে থাকে। হঠাৎ তার কানের সামনে ফিসফিসে গলায় কেউ বলছে, "যাস না! যাস না! বিপদ আছে। যাস না!" বারংবার শব্দটা তার কানে ভাসতে থাকে। সে নিজের মনের ভুল ভেবে উপেক্ষা করে বিষয়টা। সামনে এগিয়ে যায়। যখন সে ক্ষেতের মাঝের কবরস্থানের পাশে এসে থামে তখন, "এই সময় এখানে কি করছো তুমি?" একজন মধ্যবয়স্ক লোক, সাদা জোব্বা পরিহিত, হাতে লাঠি মাথায় বড় রুমাল পেঁচানো। জিজ্ঞেস করলো জুনায়েদকে।

"আ-আমি বাসায় যাচ্ছি।" জুনায়েদ একটু চমকে গিয়ে বললো।

"তুমি জানো না, এই জায়গাটা ভালো না? এই সময় এখান দিয়ে কেনো এসেছো?" লোকটা আবারও প্রশ্ন করলো।

"হ্যাঁ, জানি। আর আমার বাসা সামনেই। আমার কোনো সমস্যা হবে না আশা করি।" উত্তরে বললো জুনায়েদ।

"সমস্যা কার কখন কিভাবে হয়ে যায় তা তো আমরা বলতে পারি না। কেউ রাজ কপাল নিয়ে জন্মেও ভিক্ষা করে খায় আবার কেউ ভিক্ষারির ঘরে জন্ম নিয়েও পুরো বিশ্ব রাজত্ব করে।" মুচকি হেসে উত্তর দিলো লোকটা। উনার কথায় জুনায়েদ একটু ইতস্তত বোধ করছে। "তুমি কিছু মনে না করলে, আমার সাথে চলো। আমি তোমাকে অন্য পথে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি।" জুনায়েদ কিছু বলার আগেই লোকটা আবারও বললো। "কি ভাবছো?"

"প্রয়োজন নেই। আমি এলাকারই ছেলে। সব রাস্তাই আমি চিনি, আমার আপনার সাহায্যের দরকার নেই। ধন্যবাদ। আপনি আসতে পারেন।" এক দমে বলে গেলে জুনায়েদ।

"ঠিক আছে। তবে সাবধানে যেও।" লোকটা এটুকু বলেই বিপরীত পথ ধরে চলে গেলো। জুনায়েদ কিছুক্ষণ উনার পথপানে তাকিয়ে রইলো। এরপর নিজ পথে হাঁটা শুরু করলো।

কিছু মুহূর্ত পূর্বের মতো এবারও তার মনে হচ্ছে কেউ তার কানে ফিসফিস করে বলছে, যেনো সে না যায় এই পথে। ব্যাপারটা আমলে না নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ক্ষেতে শেষ সীমানায় এসে পৌঁছায়। সামনের পথ ধরে হাঁটলেই বাড়ির রাস্তা, ওই রাস্তার পাশে আরেকটা সামাজিক কবরস্থান। এরপরই ওদের বাড়ি। ক্ষেতের শেষ সীমানায় আসার পর জুনায়েদ খুব ভালো করে লক্ষ্য করে, কিছুটা দূরে বিশাল খাম্বার মতো একটা মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। এটা মানুষ নাকী খাম্বা সে সঠিক ভাবে বলতে পারছে না। তার পা যেনো সামনে এগোতে চাইছে না। তবুও মনে সাহস জমিয়ে এগিয়ে গেলো।

"কিরে!" একটা কর্কশ কণ্ঠ ভেসে এলো জুনায়েদের কানে। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সেখানেই। পা কাঁপছে, ঠোঁট জোড়া খসখসে হয়ে এসেছে। "তোকে কতবার বারণ করেছে, এই পথে না আসার জন্য। তারপরও কেনো এসেছিস?" বিশাল দেহী লোকটা জুনায়েদকে উদ্দেশ্য করে বললো।

"এই পথ কি কারো বাপের নাকী যে, বারণ করবে আর আমি আসবো না।" মনে সাহস জুগিয়ে উত্তর দিলো জুনায়েদ। তার এখনো মনে হচ্ছে সে কল্পনায় আছে।

"তুই জানিস আমি কে?" জুনায়েদকে আবারও বললো লোকটা।

"আপনি কি কোনো সেলিব্রিটি? দেখুন ভাই, আমি সেলিব্রিটিদেরও তেমন চিনি না। তাই আপনি যদি কোনো সেলিব্রিটি হোন তবুও আমি আপনাকে চিনবো না। রাস্তা ছাড়ুন আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।" ক্ষিপ্ত সুরে বললো জুনায়েদ।

"বেশি বারাবাড়ি করছিস তুই, তোকে দেখে নিবো।" লোকটা বললো।

"আমারও চোখ আছে, আমিও দেখে নিবো।" বড় বড় চোখে লোকটার দিকে তাকিয়ে পাশ কেটে চলে গেলো জুনায়েদ। কয়েক কদম এগিয়ে পিছন ঘুরে তাকিয়ে দেখে লোকটা নেই। "আজব তো! লোকটা গেলো কোথায়? হয়তো মনের ভুল ছিলো।" মনে মনে বলে বাসায় চলে যায়। বাড়ি গিয়ে এসআ ঘটনা কাউকেই জানায় না জুনায়েদ।