অবক্ষয় রহস্য ভয় ও বিস্ময় — পর্ব ০৬
লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: ছোট গল্প · পর্ব ০৬ · ৬ পর্বের মধ্যে ৬
রাতের আকাশে আজ যেনো চাঁদের দেখা নেই। আকাশে কোনো তারা'ও নেই। শীততাপ প্রকৃতি আজ একটু বেশিই শান্ত। শান্ত হয়ে লুটিয়ে আছে জুনায়েদ। শরীরের অবস্থা এখন আর দেখার মতো নেই। এক দিনেই চোখ মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে গেছে। গাল দুটো একেবারে ভেঙে গেছে। যেনো কত বছরের অসুস্থতায় ভুগছে। রাত গভীর হলে তার শরীরের যন্ত্রণাও যেনো আরো বাড়ে। কিন্তু আজ সে নিশ্চিন্তে একটু ঘুমাচ্ছে। এই ঘুম কি আসলেই নিশ্চিন্তের?
_
খোলা মাঠ, দূর দূর পর্যন্ত নেই কোনো গাছগাছালির চিহ্ন। উত্তপ্ত রোদে গা পুড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। সেই রোদের তেজস্ক্রিয় রোশ্মিকে গায়ে মাখিয়ে ছুটে চলেছে জুনায়েদ। কোথায় যাচ্ছে জানে না সে। কেনোই বা ছুটছে এটাও জানে না। শুধু ছুটছে তো ছুটছে। ক্লান্ত শরীর নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে থামলো পথিমধ্যে। কপাল বেয়ে ঘাম ঝড়ছে তার। নাকের ডগায় এক ফোটা ঘামের চিহ্ন দেখা গেলা। তেষ্টা পেয়েছে খুব। এ-যেনো এক মরুভূমিতে এসে পৌঁছেছে জুনায়েদ। পানির কোনো হদিশ নেই। পানির খোঁজে এদিক ওদিক হাঁটছে, কিন্তু পানি নেই কোত্থাও। সরু পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। পুরো জায়গায় জীবিত প্রাণী বলতে শুধু এই একজনই। না! আর দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব না। আবারও হাঁটছে, কোথায় যাচ্ছে? কেনো যাচ্ছে? কোনো উত্তর নেই। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলো। মুখ থুবড়ে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। শক্তি প্রয়োগ করে নিজেকে থামালো। শরীর ঝাকড়া দিয়ে উঠতে যাবে তখনই মাটির নিচ থেকে কিছু একটা তার পা ধরে রাখে শক্ত করে। অনেক জোরাজুরি করছো পা ছাড়ানোর। কিন্তু সব বৃথা। সে যখন নিজের পা ছাড়াতে ব্যস্ত তখন তার কানে আসে একটা উদ্ভট শব্দ। শব্দের উৎস খুঁজতে এদিক ওদিক তাকিয়ে বুঝতে পারে, সেই অন্ধকার রাতের বিশাল দেহী লোকটা এক দিক থেকে তেড়ে আসছে। ভয় ও আতঙ্কে জুনায়েদের শরীর জড়োসড়ো হয়ে যাচ্ছে। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। এমন সময় দেখতে পায় অপর দিক থেকে গত তিন দিন আগের রাতে দেখা হওয়া সেই লোক দু'জনও তেড়ে আসছে। এবারও তাদের মুখ কুকুরের মতো। বিভৎস দেখতে এক চেহারা নিয়ে দৌঁড়ে আসছে। "ওরা সামনে আসার আগেই আমাকে উঠতে হবে।" মনে মনে বলছে জুনায়েদ। কিন্তু মাটির নিচ থেকে কিছুতেই নিজের পা ছাড়াতে পারছে না। কি করবে, মাথা কাজ করছে না?
সর্বশক্তি দিয়ে নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টায় জারি। ওদিকে ওরা সবাই সামনে এগিয়ে আসছে। ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিচ্ছে জুনায়েদ। বাতাসের প্রবণতা বেড়ে গেছে। বাতাসও যেনো ভারী হয়ে উঠেছে। হঠাৎ মাটির নিচ থেকে ঠান্ডা অনুভব করলো। চারপাশ থেকে পানির ঢল বইতে লাগলো। এত পানি কোত্থেকে এলো? মুহূর্তেই ভাসিয়ে নিয়ে গেলো জুনায়েদকে।
"নাআআআআআ!" এক আর্তচিৎকার দিয়ে আবারও ঘুম ভাঙলো জুনায়েদের। ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে দেখলো সে তার ঘরেই আছে। তার মানে আরো একটা দুঃস্বপ্ন ছিলো এটা। ড্রিম লাইটের মৃদু আলোয় বুঝতে পারছে, তার শরীর ঘেমে একাকার। পানি পিপাসা লেগেছে। খাট থেকে নেমে টেবিলের উপরে রাখা পানির জগে দেখলো পানি নেই। ওয়াটার বোতল নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলো জুনায়েদ। ধীরে ধীরে হাঁটছে। প্রতিটা পদক্ষেপে মনে হচ্ছে তার পিছনে কেউ আছে। প্রতি বারই পিছন ঘুরে তাকিয়ে দেখে কেউ নেই। আবারও রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায়। এবারও কেউ তার পিছু পিছু হাঁটছে। রান্নাঘরে প্রবেশ করলো। ওয়াটার বোতলে পানি ভরে, পান করছে। এমন সময় পিছন থেকে শীতল স্পর্শ অনুভব করলো। চোখ কপলাে উঠার মতো হয়ে গেছে। ওয়াটার বোতল থেকে তার মুখে অনবরত পানি পড়তেই আছে। সে-ও চুপচাপ গিলছে। আড়চোখে পিছনে তাকাতেই তার শরীর কেঁপে উঠলো। সেদিন রাতেই সেই বিশাল দেহী লোকটা। ভয়ে ওয়াটার বোতল ফেলে ছুটে রান্নাঘর থেকে বের হবে তখনই রান্নাঘরের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। বার বার দরজা ধাক্কায় তবুও খুলছে না। লোকটা এক পা এক পা করে জুনায়েদের দিকে এগোচ্ছে। একদম সামনে চলে এসেছে। আরো সামনে। আরো সামনে। এখন একদম সামনে। এক বিশ্রী হাসি দিয়ে কর্কশ কণ্ঠে বললো, "তোকে বলেছিলাম। কাজটা ঠিক করিসনি। এবার ভোগান্তি তো ভোগ করতেই হবে।" এটা বলেই জুনায়েদের গলা টিপে ধরে। দম বন্ধ হয়ে আসছে জুনায়েদের। হাত পা অবশ হয়ে আসছে। নিঃশক্তি হয়ে গেছে সে। এমন সময় সে দেখতে পায়, সেই ভদ্রলোকটিকে, যে তাকে পথ দেখানোর কথা বলেছিলো। সাদা জোব্বা পরিহিত লম্বা লোকটি। মাথায় বড় রুমাল পেঁচানো। যেনো কোনো সূফী সাহেব। হাতে একটা বড় লাঠি। হ্যাঁ! এই লোকটাকে ওইদিনের আগে আরো একবার দেখেছিলো সে। যেদিন সৃজনের সাথে রাতে কথা বলছিলো। একই দেখতে সেই পুরুষাবয়ম যেনো কাউকে লাঠি হাতে ধাওয়া করছিলো। আজও উনিই এসেছে। সাদা জোব্বা পরিহিত। মাথায় বড় রুমাল পেঁচানো। হাতে সেই লাঠিটাও আছে। জুনায়েদের দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিলো। সঙ্গে সঙ্গে বিশাল দেহী লোকটা কোথায় যেনো উধাও হয়ে যায়। জুনায়েদ কাশতে লাগলো। কাশতে কাশতে আবারও তার মুখ দিয়ে রক্ত পড়তে লাগে। রক্ত ভেজা হাত চোখের সামনে তুলে ধরলো জুনায়েদ। অজান্তেই চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়লো। এরপর পাশে তাকিয়ে দেখলো সেই ভদ্রলোকটাও নেই। আশ্চর্য! কোথায় গেলো?
_
ভোরের আলো ফুটেছে সাথে কুয়াশার মিশ্রণ। শীত শীত সকালে ফুরফুরে বাতাস যেনো এক অন্য রকম শিহরণ। ঘুম থেকে রান্নাঘরের উদ্দেশ্যের ধীরে ধীরে হেঁটে আসছে জোহরা। রান্নাঘরের সামনে আসতেই যেনো তার আকাশ পাতাল সব এক হয়ে যায়। শরীর থরথর করে কাঁপতে থাকে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে অবিশ্বাস হচ্ছে। চোখের সামনে জুনায়েদ মাটিতে লুটিয়ে আছে। ছুটে গিয়ে জুনায়েদের মাথার পাশে গিয়ে বসলো। আলতো হাতে মাথা তুলে নিজের কোলো রাখলো। "জুনায়েদ! জুনায়েদ! কি হইছে বাবা? ছোখ খোল?" কান্নামাখা গলায় ডেকে যাচ্ছে জোহরা। অথচ ছেলের কোনো সারা নেই। ওদিকে পুরো বাড়িতে জোহরা একাই। জুনায়েদের অসুস্থতার দিন থেকে তার বাবা দরকারি কাজে ঢাকা গেছে। ছেলের অসুস্থতার কথা এখনো জানে না সে। জোহরা কাঁদো কাঁদো গলায় ডেকেই চলেছে। চোখ দিয়ে অজান্তেই টপটপ করে অঝোরে পানি ঝরছে।
"আমি আগেই বলেছিলাম, এমনটাই হবে।" উঠোন থেকে অস্পষ্ট এক নারী কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। জোহরা চোখ তুলে উঠোনের দিকে তাকিয়ে দেখে জাহানারা এসেছে।
"জা-হানারা আপা। দেখেন না জুনায়েদের কি হয়েছে। আজ কয়েক দিন ধরে ধুম জ্বর। ঘন ঘন রক্ত বমি করছে। চেহারা-ছবির কি অবস্থা হয়ে গেছে। আমার ছেলেটার কি হয়ে গেলো আপাআআ।" জাহানারকে দেখেই হাউমাউ করে কেঁদে দিলো জোহরা।
"আমি তো বলেই ছিলাম। ওই টিটিসি ভালো না। ওখানে গেলে কেউই জীবিত থাকে না। আমার কথা তো শুনো নাই।" গম্ভীর কণ্ঠে বললো জাহানারা।
"আপা! কিছু একটা করেন। আমার ছেলেটার এই অবস্থা দেখতে পারছি না আমি।" কাঁদতে কাঁদতে বলছে জোহরা।
"হুম। দেখছি কি করা যায়। ধরো ওকে। রুমে নিয়ে যাই।"
ধরাধরি করে জুনায়েদকে তার ঘরে আনা হলো। শুইয়ে দিলো তার খাটে। ঘুমন্ত মানুষকে বুঝি এতটাই মায়াবী মনে হয়। যে সে নিষ্পাপ কোনো প্রাণ।
"ক-কি করছেন জাহানারা আপা?" কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলো জোহরা। জাহানারা এক রাগান্বিত চোখে তাকালো জোহরার দিকে। আবারও বিরবির করে কি যেনো পড়ছে। খানিকক্ষণ পর পর জুনায়েদের শরীরে দম ফুক করছে। এভাবে প্রায় তিন বার দম ফুক করার পর বললো, "এখন আমি একটা তাবিজ দিয়ে যাচ্ছি। ওটা পড়ানোর এক ঘন্টার মধ্যে ওর জ্ঞান ফিরে আসবে।" এই বলেই তার ব্যাগ থেকে একটা তাবিজ বের করে জুনায়েদের ডান হাতে বেঁধে দিলো।
_
আজ অনেক দিন পর ইলেকট্রিক্যাল ল্যাবে এসেছে জুনায়েদ। আশপাশটা একটু বেশিই ধূসরাজ্জ্বল। চোখ ধাধালো আলো সোজা চোখে বিধছে। স্যারের দেখানো ডায়াগ্রাম অনুযায়ী সবাই কাজ করছে যে যার বোর্ডে। আশ্চর্য করা বিষয়, এতদিন পর জুনায়েদ ল্যাবে ঢুকলো অথচ কেউ একটি বারও তার সাথে কথা বলছে না। যেনো কেউ তাকে দেখতেই পাচ্ছে না। সবকিছু উপেক্ষা করে জুনায়েদ নিজের মতো কাজ করছে। নিজের বোর্ডে একের পর এক ফিটিংস আর ফিকচার্স লাগানো শেষ। পুরো ডায়াগ্রাম অনুযায়ী ওয়্যারিং করাও শেষ। এবার কানেকশন দিতে হবে। এনার্জি মিটারে বিদ্যুৎ সংযোগ দিলো। সার্কিট ব্রেকার অন করতেই ধুম করে ব্লাস্ট করলো। পুরো ল্যাবে আগুন ধরে গেলো। জুনায়েদের মুখের একপাশ পুড়ে গেছে। ছিটকে পড়ার সময় পিছনের বোর্ডে ধাক্কা লেগে পিঠে মারাত্মক আঘাত পায়। ফ্লোরে পড়ে আছে। কাতরাচ্ছে। কেউই এগোচ্ছে না। ফ্লোর ভেদ করে একজোড়া পঁচাগলা হাত জুনায়েদকে ঝাপটে ধরে। নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। চিৎকার করছে গলা চিঁড়ে। চোখ মেলে উপরে তাকাতেই দেখে সেই বিশাল দেহী লোকটা তার বড় বড় পায়ে জুনায়েদের মুখ বরাবর সেপ্টে দিলো। এক ভয়ংকর আর্তচিৎকারের সাথে এবারও তার ঘুম ভাঙলো। এটাও ছিলো একটা দুঃস্বপ্ন। বিছানার এক কোণে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে জুনায়েদ। হৃৎস্পন্দনের গতি বেড়ে গেছে। নিঃশ্বাস প্রশ্বাস চলছে অনবরত।
"জুনায়েদ! তোর জ্ঞান ফিরেছে।" জুনায়েদের চিৎকার শুনে জোহরা ছুটে এসেছে। দৌঁড়ে গিয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলো। জুনায়েদ কিছু বলবে এমন সময় দেখে তার মায়ের পিছনে সেই বিশাল দেহী লোকটা দাঁড়িয়ে কর্কশ কণ্ঠে হাসছে। তার খাটের দুই পাশ থেকে কর্কশ কণ্ঠের হাসি ভেসে আসছে। চোখ বুলিয়ে দেখতেই বুঝতে পারলো, সেই দুই লোক। যাদের চেহারা দেখতে কুকুরের মতো। অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে তার। ওদের হাসির এক একটা শব্দ যেনো জুনায়েদের জান চিঁড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। এই অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে দুই হাতের আঙ্গুল দুই কানে চেপে ধরলো জুনায়েদ। সে অনুভব করছে তার বমি পাচ্ছে। আটকে রাখার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। গলগল করে আবারও বমি করতে লাগলো। জোহরা মৃদু ছোঁয়ায় জুনায়েদের পিঠে হাত বুলাচ্ছে। দু'জনই কেঁপে উঠলো, যখন তাদের চোখে পড়লো রক্ত। হ্যাঁ! এবারও জুনায়েদ রক্ত বমি করছে। মুখ তুলে মায়ের দিকে তাকলো জুনায়েদ। জুনায়েদের চেহারা দেখে জোহরা এক চিৎকার দিলো। জুনায়েদের চেহারা দেখতে এই মুহূর্তে অতিব ভয়ংকর লাগছে। তার দুই চোখ বেয়ে রক্ত পড়ছে। নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে। ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া গায়ের রঙ, চোখের নিচে কালো দাগ। নিজের ছেলোকে আজলের মতো কুৎসিত অবস্থায় এর আগে কোনোদিন দেখেনি জোহরা।
_
গোধূলি বিকেল পেরিয়ে আকাশ বেয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছে জুনায়েদ। ঘুম আসছে না তাই বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। ঘরের মধ্যে পায়চারি করছে। কিছুই ঠিক লাগছে না। মনের মধ্যে এক অস্বস্তির আধার। এই কোণ ওই কোন পায়চারি করতে করতে খাটের একপাশে পা ঝুলিয়ে বসলো। নিভৃতে কাঁদে উঠলো জুনায়েদের মন। কেনো কাঁদছে? জানে না সে। ঘরের মধ্যে আলা আধারের খেলা। সবকিছু স্পষ্ট না আবার অস্পষ্টও না। হঠাৎ মনে হতে লাগলো খাটের নিচ থেকে কেউ যেনো গুনগুন করছে। উঁকি দিবে? না থাক। উঁকি দিবে ভেবেও দিলো না। তাকিয়ে আছে স্টাডি টেবিলটার দিকে। মনে হচ্ছে কতদিন বসে না এই টেবিলটাতে। উঠে এক পা টেবিলের দিকে এগোতেই খাটের নিচ থেকে কেউ পা টেনে ধরলো। ধপাস করে পড়ে গেলো সে। সামনে তাকিয়ে দেখে সেই বিশাল দেহী লোকটা দাঁড়িয়ে। তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে ওই কুকুরের মতো দেখতে লোক দুইটা।
"জুনায়েদ! সন্ধ্যা হয়ে গেছে বাবা, উঠ। ঘর অন্ধকার করে বসে আছিস কেনো?" জোরে জোরে কথা বলতে বলতে জুনায়েদের ঘরে প্রবেশ করলো জোহরা। ঘরে ঢুকেই লাইট জ্বালিয়ে দিলো। লাইটের আলো পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে জোহরা ছিটকে গেলো দুই পা। জুনায়েদ ফ্লোরে বসে ঝিমাচ্ছে। জোহরা এক পা এক পা করে সামনে এগিয়ে গিয়ে জুনায়েদের কাঁধে হাত রাখলো। জুনায়েদ পিছে তাকাতেই যেনো জোহরা কেঁপে উঠলো। তার চোখ বেয়ে রক্ত পড়ছে। চোখের মনি ধবধবে সাদা। "জু-জু-জুনায়েদ?" কাঁপা গলায় নাম ধরে ডাকতেই জুনায়েদ ঝাপিয়ে পড়লো জোহরার উপর। শক্ত হাতে চেপে ধরলো জোহরার গলা। যেনো এক্ষুণি গলা টিপে হত্যা করবে।
জুনায়েদ তার চোখে এক অদ্ভুত অগ্নিকুণ্ড ধারণ করে ছিলো। তার পুরো শরীর সজাগ ছিলো, যেনো কোন এক অতিপ্রাকৃত শক্তি তাকে শাসন করছে। এক হাতে জোহরার গলা চেপে ধরে, আরেক হাতে দেওয়ালে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলো। জোহরা কোনো ভাবেই তার শক্তির সাথে পেরে উঠছিলো না। তার গলা যেনো প্রায় থেমে এসেছে, নিঃশ্বাস অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিলো। চোখের সামনে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছিলো, আর শরীর পুরো অবশ হয়ে যাচ্ছিলো।
সেই মুহূর্তে, ইকরাম আর আযান সেখানে পৌঁছালো। তারা দেখলো, জুনায়েদ সম্পূর্ণ উন্মাদ হয়ে গেছে, তার দৃষ্টি ছিলো একেবারে মূর্ত, খুনের নেশায় টগবগ করছে তার শরীর। তার হাতে আটকে থাকা জোহরা ক্রমশ শ্বাসহীন হয়ে পড়ছিলো, একটানা অশ্রু ঝরছিলো চোখ থেকে। এমন দৃশ্য দেখে আযান ও ইকরাম ধস্তাধস্তি করে জুনায়েদকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলো, কিন্তু সে যেনো কিছুই শুনছিলো না। তার চোখের ভেতরে এক অদ্ভুত ঘৃণা আর রাগের তীব্রতা ফুটে উঠছিলো।
"জুনায়েদ! থামো!" আযান চিৎকার করে বললো, "এই মুহূর্তে একদম নিজেকে হারাবে না। নিজেকে হারালে চলবে না। তুমি শক্ত না থাকতে পারলে অশরীরী তোমাকে কাবু করে ফেলবে।"
কিন্তু জুনায়েদ কোনো কিছুতেই কান দিচ্ছিলো না। তার শ্বাসপ্রশ্বাস ছিলো ভারী। পুরো ঘর এক উত্তপ্ত পরিবেশে ভরে গিয়েছিলো। তার হাতের শক্তি যেনো একটা নীল অগ্নির মতো লেগে গিয়েছিলো। ইকরাম এবং আযান একে অপরকে জড়ো করে জুনায়েদকে শক্ত করে ধরে ফেললো। জুনায়েদ তখনো ছিলো বিক্ষিপ্ত। সেই এক অজানা শক্তির ঝড় তাকে পাগল করে রেখেছিলো।
আযান আর ইকরাম একযোগে শক্তি প্রয়োগ করলো, একে অপরকে সাহায্য করে জুনায়েদকে শক্তভাবে খাটের সাথে বেঁধে রাখলো। এরপর এক দীর্ঘ নীরবতা নেমে আসে।
"ত-তোমরা কারা?" মিনমিন করে জিজ্ঞেস করলো জোহরা।
"এখন এসব কথা বলার সময় না আন্টি। আমরা জুনায়েদের সাথেই টিটিসিতে পড়ি। কয়েকদিন ধরে জুনায়েদ যাচ্ছে না, ভেবেছিলাম অসুস্থ। কিন্তু আজ আযান ভাই কিছুটা জোর করেই আমাকে আপনাদের বাসায় আসতে বাধ্য করলো। বার বার বলছিলো, এখন যদি না আসি তাহলে একটা অনর্থক হয়ে যাবে। সত্যিই যদি না আসতাম কিছু একটা হয়ে যেতো।" এক দমে বললো ইকরাম।
"আলো যাদের জন্য, তারা কখনো অন্ধকারের দাম বোঝে না। আমি সেই অন্ধকার, যে সত্যকে আলোতে নিয়ে আসে।" জুনায়েদের দিকে তাকিয়ে থেকে বললো আযান। ইকরাম ও জোহরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।
কিছু বুঝার আগেই জুনায়েদ আবারও অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে। তার চোখে এক অদ্ভুত উন্মাদনা, এবং তার শরীর যেনো এক অচেনা শক্তির অধিকারী হয়ে উঠেছিলো। তার হাত পা কাঁপছিলো, মুখে এমন এক অসহনীয় রাগ যেনো তাকে নিজের থেকেই বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হচ্ছে। জুনায়েদের চোখের মধ্যে এক ভয়ংকর অন্ধকার ছিলো, যা দেখলে যে কেউ ভয় পেতে বাধ্য হবে।
আযান খুব ভালো করে জানে, এমন পরিস্থিতিতে যেকোনো মুহূর্তে খারাপ কিছু ঘটতে পারে। সে জানতো যে, জুনায়েদকে এরকম অবস্থায় শারীরিকভাবে শান্ত করার চেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল আত্মিক শান্তি এবং আল্লাহর সাহায্য।
“আমরা এখন একমাত্র আল্লাহর সাহায্যেই জুনায়েদকে সুস্থ করতে পারবো। তুমি কি প্রস্তুত?” ইকরামের দিকে শীতল চোখে তাকিয়ে বললো আযান। ইকরাম কিছুটা দ্বিধায় ছিলো, তবে আযানের দৃঢ়তায় সে সায় দিলো।
__
ইকরাম ধীরে ধীরে অন্ধকার গ্রামের সেই নীরব কবরস্থানের দিকে রওনা হয়। চারপাশে ঘন কুয়াশা। ঝোপঝাড়ে ভরপুর, শেয়ালের কান্নায় এক অদ্ভুত পরিবেশ তৈরি করেছে। কিছুদূর যাওয়ার পর ইকরাম সেই পুরনো কবরটার সামনে দাঁড়ায়। কবরটা অনেক পুরনো, মাটিতে ফাটল ধরেছে, আর একপাশে শুকিয়ে যাওয়া পাটপাতার স্তূপ। ইকরাম মাটি খুঁড়তে শুরু করে। ঠিক তখনই হঠাৎ পেছন থেকে গর্জনের মতো শব্দ শোনা যায়।
সে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, দুইটি বিকৃত, কুকুরের মতো দেখতে লোক তার দিকে ধেয়ে আসছে! তাদের চোখ আগুনের মতো লাল, দাঁতগুলো ধারালো, গলা থেকে বের হচ্ছে ঘন ঘন গোঁ গোঁ শব্দ। তারা ঠিক মানুষ নয়, আবার পুরোপুরি পশুও নয়। ইকরাম সাধ্যমতো প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। কিন্তু ওদের শক্তি অস্বাভাবিক। তার শরীর প্রায় অবশ হয়ে আসছিলো। লোক দুইটা ইকরামকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। মাটির ভিতরে প্রায় ইকরামের মাথা গুঁজে দিচ্ছে। ইকরাম কিছুই করতে পারছে না এই মুহূর্তে।
তখনই হঠাৎ এক অদ্ভুত প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ে কবরস্থানে। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে, সাদা জোব্বা পরা, মাথায় বড় রুমাল পেঁচানো এক ভদ্রলোক ধীরে ধীরে কুয়াশার ভেতর থেকে সামনে আসছে। তার হাতে লম্বা একটি লাঠি, চোখে তীব্র তেজ। তিনি মুচকি হেসে ইকরামের দিকে তাকান, আর কিছু না করেই শুধুমাত্র তার উপস্থিতিতে কুকুরের মতো দেখতে মানুষ দুইটি চিৎকার করে গায়েব হয়ে যায়! ইকরাম অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। কিছু বলার আগেই সেই ভদ্রলোক পেছন ঘুরে ধীরে ধীরে চলে যেতে থাকেন, এবং কুয়াশার মাঝে মিলিয়ে যান। যেনো কখনো ছিলেনই না।
ইকরাম নিঃশ্বাস ছেড়ে আবার মাটি খুঁড়তে শুরু করে। কিছুক্ষণ পর মাটির নিচে স্পর্শ পায় এক ছোট্ট কাপড় মোড়ানো পুটলির। পুটলি হাতে নিয়ে ইকরাম ছুটে ফিরে আসে আযানের কাছে।
ইকরাম ফিরে আসার পর আযান প্রথমে নিয়ত করলো, “আল্লাহর রাহমত ও সাহায্যের মাধ্যমে, আমি জুনায়েদকে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য রুকাইয়া করছি।”
তারপর আযান অতি ধীরে, গভীর মনোযোগ সহকারে সূরা আল-ফাতিহা পাঠ করলো। সূরার তিলাওয়াতে এমন এক শক্তি ছিলো যে, জুনায়েদের শরীরে একটু একটু করে প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ছিলো।
আযান আস্তে আস্তে পড়তে থাকল সূরা আল-ইখলাস, আল-ফালাক, এবং আল-নাস। তিনটি সূরা একসাথে পড়ার পর, তার হাতে এক অদৃশ্য শক্তির অনুভব হচ্ছিলো। আযান জানতো, আল্লাহর বাণীই সবথেকে বড় শক্তি, যা সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
আযান তারপর দোয়া পড়তে লাগলো।
"اللهم إني أعوذ بك من الشيطان الرجيم"
"হে আল্লাহ, আমি শয়তান থেকে তোমার আশ্রয় চাই।"
"اللهم اشفِ عبدك شفاءً لا يغادر سقماً"
"হে আল্লাহ, তোমার বান্দাকে এমন একটি আরোগ্য দাও, যা কোনো অসুখ রেখে যায় না।"
এমনকি আযান নিজ হাতে ফুঁ দিয়ে জুনায়েদের শরীরে হাত বুলিয়ে দিলো। জুনায়েদলর চোখে তখন আর আগের মতো ভয় বা উন্মাদনা ছিলো না। জুনায়েদের শরীরে কিছুটা শান্তি ফিরছিলো।
এখন আযান হাত তুলে আল্লাহর কাছে একটি বিশেষ দোয়া করতে লাগলো।
"اللهم عافه في دينه ودنياه وآخرته"
"হে আল্লাহ, তাকে তার ধর্ম, দুনিয়া এবং আখিরাতে সুস্থ করে দিন।"
দোয়া শেষে আযান দেখল, জুনায়েদের শরীর একটু নরম হয়ে এসেছে। তার শ্বাসপ্রশ্বাস এখন সহজ হয়ে গেছে, এবং তার চোখে আবার এক শান্তি ফিরে এসেছে। কিছুক্ষণ পর, জুনায়েদ সম্পূর্ণভাবে শান্ত হয়ে পড়লো। জোহরা অবাক চোখে সবকিছু পরখ করলো শুধু। কি হচ্ছে, কেনো হচ্ছে জানে না সে। এরপর আযান, ইকরামের কাছ থেকে সেই পুটলিটা নিলো। পুটলিটা খুললো। পুটলিটার ভেতরে ছিলো কুকুরের দাঁত, মানুষের চুল, জুনায়েদের জামার কিছু অংশ, ছোট হাড়, ও রক্তে ভেজা কিছু লেখা কাগজ।
"ভয়ংকর কালো যাদু করা হয়েছিলো জুনায়েদকে।" বিস্মৃত সুরে বললো আযান। এতক্ষণে যেনো ইকরাম আর জোহরা নড়ে বসলো। আযান আবারও পুটলিটা গুছিয়ে হাতে নিয়ে চোখ বন্ধ করে কিছু দোয়া পড়ে, তারপর এক টুকরো শুকনো কাঠে আগুন ধরিয়ে দেয়। দোয়ার সুরে যেনো বাতাস ভারি হয়ে আসে। আগুনে পুটলিটা ছুঁইয়ে দিতেই দপ করে এক লাল শিখা জ্বলে উঠে, চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত গন্ধ। সেই মুহূর্তে জুনায়েদের চোখ খুলে যায়। তার শরীর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসে। সেই ভয়ঙ্কর উন্মাদনা আর নেই, তার চোখে ফিরে আসে চিন্তার ছায়া।
আযান মুখ তুলে এক গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলে, "আযান নামটা ওরা কখনো ভুলে যাবে না। কারণ আমি ওদের সবচেয়ে সুন্দর ভুলগুলো ঠিক করতে এসেছি, নিজের নিয়মে।"
ইকরাম অবাক হয়ে বললো, "কিসের ভুল?"
"যুদ্ধ শুরু করিনি আমি, কিন্তু শেষটা আমার ইচ্ছেমতো হয়েছে।" মুচকি হাসি গেলে আছে আযানের মুখে।
"কি হয়েছে? কিসের যুদ্ধ? কিসের ভুল? আমাকে একটু বুঝিয়ে বলবে?" জোহরা কাঁদতে কাঁদতে বলছে।
"তারা ভাবে আমি নায়ক হবো। অথচ ওরা জানেই না, নায়ক হবার ইচ্ছা আমার কখনোই ছিলো না। আমি শুধু প্রতিশোধ নিতে জানি। শান্ত, ধৈর্যশীল, নির্মম।" দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো আযান।
"হেয়ালি কথাগুলো ভালো লাগছে না।" বিরক্ত নিয়ে বললো জোহরা। তখনই খাটের উপর থেকে জুনায়েদ বললো, "আযান ভাই! আপনি এখানে?" সবাই ওদিকে তাকালো।
"আলোতে যারা খেলে, তারা ছায়ার গভীরতা বোঝে না। আমি সেই ছায়া, যে কাউকে ছাড়ে না।" এটুকু বলে থামলো আযান। এরপর আবারও বলা শুরু করলো।
"আমি এখানে আসার আগে থেকেই জানতাম জুনায়েদের প্রাণ সংশয় হতে চলেছে। প্রথমে আমি আমার সাহায্যকারী জ্বিনকে পাঠাই। তার আগমনে খুব একটা কাজ হয়নি। এজন্য আমাকেই আসতে হলো। এমন মরন ফাঁদ পেতেছিলো, ওর ভাগ্য ভালো আল্লাহর ইচ্ছায় আমি ওকে সাহায্য করেছিলাম। নয়তো এতদিনে ওকে ইহলোকে খুঁজে পাওয়া যেতো না। ভেবেছিলাম, আমার উপস্থিতি টের পেয়ে ওরা এসব বন্ধ করে দিবে। কিন্তু তারা আরো উঠে পড়ে লেগেছে। এবার মজা বুঝুক।" শান্ত ও শীতল কণ্ঠে বলে থামলো আযান।
"কারা? কারা এসব করেছে?" প্রশ্ন করলো ইকরাম। জোহরাও অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে আছে জানার জন্য। জুনায়েদও জানতে চায়, কে বা কারা ওর সাথে এমন অন্যায় করেছে।
"রক্তের সম্পর্ক থাকেই কেউ আপন হয় না। আপন হতে লাগে আত্মার সম্পর্ক।" এটুকু বলে থামলো। এরপর আবারও বলা শুরু করলো, "জুনায়েদের ফুফা আর ফুফু চেয়েছিলো ও যেনো ঢাকা ওর ফুফার শো-রুমে কাজ করতে যায়। ও ওখানে গেলে কোনো একটা চক্রান্ত করে সেখানেই ওকে মেরে ফেলতো। কিন্তু ওদের পরিকল্পনায় পানি ফেলে দিলো জুনায়েদ। এজন্যই ওর ফুফু দ্বিতীয় পরিকল্পনা করে, ওকে কালো যাদু করার। আর এসবের পিছনে দায়ী করা হয়েছে টিটিসির সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে। সে প্রমাণ করতে চেয়েছিলো, টিটিসির সেই ঘটনার পর থেকেই যে ওখানে যায় তার সাথেই এমন ঘটনা ঘটে। সবকিছু প্রমাণ করার জন্য টিটিসি'তে একের পর এক দূর্ঘটনা সে-ই ঘটায় তার পোষা বাধ্য জ্বিন দ্বারা। অতিমাত্রায় মন খারাপ থাকতো, কিন্তু মন খারাপের কোনো কারণ খুঁজে পেতো না। ঘন ঘন দুঃস্বপ্ন। সবকিছু যখন আমি মিটিয়ে দিচ্ছিলাম তখন সে তার বড় চাল চাললো।" গম্ভীর কণ্ঠটা এবার থামলো। সবাই হতবাক।
"কিন্তু জাহানারা আপা এমনটা কেনো করবে? জুনায়েদ তো তারই রক্ত?" বলেই চুপ করে গেলো জোহরা। মনে পড়লো আযানের একটু আগে বলা কথাটা। "রক্তের সম্পর্ক থাকলেই কেউ আপন হয় না।"
"আপনাদের একমাত্র ছেলে। ওর বাবার আর কোনো ভাই নেই, আছে একটা বোন। সেই বোনেরও একটাই সন্তান। যদি আপনার সন্তান মারা যাওয়ার শোকে আপনার স্বামীও মারা যায়? তাহলে এই সম্পত্তি কার হতো?" প্রশ্ন করলো আযান। সবাই চুপ। কেউ কিছুই বলছে না।
_
আযানের সাথে যোগাযোগ নেই প্রায় এক বছর হয়ে গেলো। লোকটাকে ওইদিনের পর আর দেখা যায়নি। কোথায় আছে কেউ জানে না। তার বলা ঠিকানায় অনেক বার তার খোঁজ করেছে জুনায়েদ ও ইকরাম। কিন্তু পায়নি তাকে। হয়তো হারিয়ে গেছে। মানুষ কি এভাবেই হারিয়ে যায়? হয়তো! ওইদিনের পর থেকে জুনায়েদের ফুফু আর তার পরিবার কারে সাথেই কোনো সম্পর্ক রাখেনি কেউ। সপ্তাহ খানেক পর জানা যায়, জুনায়েদের ফুফা অ্যাক্সিডেন্টে করে। দুই পা একদম ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। তবুও ওদের বাড়ি থেকে কেউ যোগাযোগ করেনি। করার কথাও না৷ এতটা আপন হয়েও যদি কেউ এমন বিশ্বাসঘাতকতা করে তাহলে কেউই করবে না।
_
বিকেলের ফুরফুরে বাতাস। গোধূলি আকাশ। পাখিদের ফিরে যাওয়া। সব'টাতেই যেনো এক অপরূপ সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। এমন সময় সাইকেলে করে এক মাঝবয়েসী লোক এলো। জুনায়েদকে দেখে সাইকেল থামায়।
"এই নাও তোমার চিঠি।" এই বলে জুনায়েদের হাতে একটা খাম ধরিয়ে দিলো। জুনায়েদ ভাবনাগ্রস্ত হয়ে চিঠি খুলে খুলে দেখলো। কারো নাম লিখা নেই। কয়েকটা লাইন আছে।
"চশমার নিচে ঢাকা পড়া চোখ__
ভিড়ের মধ্যে একা হয়ে যাওয়া লোক।
অবসাদ কোনো কুশলকাব্য নয়,
চড়া আলোতেও মন খারাপের ভয়।
খুব একা লাগছে—
কিছু কথা মনে পড়ছে,
যদিও তারা হারিয়ে গেছে।"
চিঠির লিখার ধরন দেখে বুঝতে বাকি রইলো না, এটা কার চিঠি হতে পারে। তার মানে কেউ হারায় না। "কেউ হারায় না, কেউ শুধু পথ বদলায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কেউ আমাদের গল্পে থাকে, কেউ হয়ে যায় স্মৃতি।" মনে মনে এটা বলে চিঠি হাতে চলে গেলো সেই ব্রিজের পাশে থাকা ছোট্ট পুকুরপাড়ে।
THE END