অবক্ষয় রহস্য ভয় ও বিস্ময় — পর্ব ০১
লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: ছোট গল্প · পর্ব ০১ · ৬ পর্বের মধ্যে ১
বিকেলের নরম আলো চারপাশে ছড়িয়ে আছে। পশ্চিম আকাশে সূর্য হেলে পড়েছে, হালকা বাতাসে গাছের পাতারা দুলছে। শহরের টিটিসি থেকে বেরিয়ে একটি কালো রঙের সেডান দ্রুতগতিতে ছুটে চলেছে ফাঁকা রাস্তায়। স্টিয়ারিংয়ের সামনে বসে আছে তাজ, একজন তরুণ, যার রক্তে বেপরোয়া উত্তেজনা। তার পাশে বসে আছেন মিস্টার সালমাত, টিটিসির অভিজ্ঞ ড্রাইভিং প্রশিক্ষক। বহু শিক্ষার্থীকে সঠিকভাবে গাড়ি চালানো শিখিয়েছেন তিনি, কিন্তু তাজের বেপরোয়া মনোভাব তাকে বারবার শঙ্কিত করে তুলছে। "তাজ! সাবধানে! এভাবে ড্রাইভ করো না। এ*ক্সি*ডেন্ট হতে পারে!" আতঙ্কিত গলায় বলে ওঠেন মিস্টার সালমাত। তাজ হেসে বলে, "আরে সালমাত স্যার, আপনি ভয় পাবেন না, কিচ্ছু হবে না!" তার কথা শেষ হওয়ার আগেই সামনে কিছু একটা নজরে আসে। চমকে ওঠে তাজ, দ্রুত স্টিয়ারিং সামলানোর চেষ্টা করে, কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। গাড়ি সজোরে ধাক্কা খায় রাস্তার পাশের কংক্রিটের ওয়ালে। মুহূর্তের মধ্যে বিকট শব্দে বি*স্ফো*রণ ঘটে, আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। পুরো এলাকা ধোঁয়ায় ছেয়ে যায়, বিকেলের আকাশ যেনো হঠাৎ অন্ধকার হয়ে ওঠে। শব্দ শুনে আশেপাশের মানুষ ছুটে আসে, আগুনের লেলিহান শিখায় জ্বলতে থাকা ধ্বং*সস্তূ*পের দিকে তাকিয়ে সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়। মুহূর্তের বেপরোয়া উচ্ছ্বাস কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা যেনো বাস্তব হয়ে ধরা দেয় সবার সামনে।
_____________________________
ধোঁয়ায় ঢাকা সবকিছু। চারপাশটা ঝাপসা হয়ে উঠেছে, যেনো কোনো কিছুই স্পষ্ট নয়। শুধু একটি ছায়ামূর্তি দেখা যাচ্ছে, কিছুটা দূরে। তার শরীরের গঠন লম্বা ও শক্ত, তবে তার প্রতিটি পদক্ষেপে যেনো কোনো ভয় বা সংকোচ। কাশির সঙ্গে সঙ্গে সে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়ে, ক্লান্তি ও অবসাদে ভরা। দুই হাত দিয়ে সে নিজের মুখ চেপে ধরে, যেনো তার য*ন্ত্র*ণাকে কোনোভাবে দমন করতে পারে। তবে হাত দু’টো ধীরে ধীরে সরিয়ে তাকে দেখতে হলো, যেনো পৃথিবীটা কেমনভাবে তার চারপাশে মুছে যাচ্ছে। হাত দু’টো রক্তে ভেসে যাচ্ছে, লাল হয়ে উঠেছে। চোখগুলো মুহূর্তেই ছানাবড়া হয়ে যায়, ভয় আর আ*তঙ্কের চিহ্ন ফুটে ওঠে চোখে। কিন্তু সে কিছুই করতে পারে না, শুধু কাশি থেমে থেমে বের হতে থাকে। এবার কাশির সাথে তার মুখ দিয়ে গলগল করে র*ক্ত পড়তে শুরু করে, যেনো পৃথিবীটা তার জন্য আরও অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। শরীরের শক্তি শেষ হয়ে আসছে, ক্লান্তি তাকে গ্রাস করছে। চোখের কোণে অন্ধকারের শাসন আসে, আর মাটি তার পায়ের তলা থেকে সরে যায়। সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, চোখগুলো একে একে হারিয়ে যায় অন্ধকারের গভীরে।
চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার, যেনো পৃথিবীটুকুও অদৃশ্য হয়ে গেছে। কোথাও কোনো আলো নেই, যেনো সবকিছু শ্বা*সরু*দ্ধ হয়ে গেছে। অন্ধকারে একটি শীতল, গা ছমছমে পরিবেশ তৈরি হয়েছে। হঠাৎ, সেই অন্ধকারের ভেতর থেকে এক গ*ম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, যেনো মাটি থেকে উঠে আসছে, "সময় হয়ে গেছে। এবার আমাকে প্রস্তুত হতে হবে।" কণ্ঠস্বরটি যেনো সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে, মহাকালের গভীর থেকে উঠে এসেছে। কিছু মুহূর্ত পরই, সেই ভ*য়ংকর কণ্ঠস্বর আবার অন্ধকারের গহ্বরে মিলিয়ে যায়। মুহূর্তেই চারপাশে ফিরে আসে সেই নিরব, থমথমে অবস্থা। গা ছমছমে পরিবেশ আরও তীব্র হয়ে ওঠে, যেনো কিছু ভ*য়ানক ঘটতে চলেছে। আবারও সবকিছু তলিয়ে যায় অন্ধকারের অতলে, যেনো পুরো পৃথিবী এক গভীর নীরবতায় ডুবে গেছে। সময় থেমে থাকে, আর সেই নিস্তব্ধতা যেনো অবিরাম।
নিস্তব্ধতা যেনো এক শান্ত সমুদ্র। চারপাশ ডুবে আছে গাঢ় অন্ধকারে, যেনো সময় থমকে গেছে, আর পৃথিবীটা ঘুমিয়ে আছে এক গভীর নীরবতায়। হঠাৎ, সেই নীরবতা ভেঙে তীক্ষ্ণ রিংটোনের শব্দে জুনায়েদের ঘুম ভেঙে গেলো। চোখের পাতা দুটি যেনো রাজ্যের ক্লান্তি নিয়ে এসেছে, শরীর আর মন তখনও ঘুমের ঘোর থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পায়নি।
অলস হাতে ফোনটা তুলতেই আলোটা চোখে বাঁধলো। স্ক্রিনে ফুটে উঠল পরিচিত একটি নাম – ফুফা। দৃষ্টি তখনও ঝাপসা। ফোন কানে তুলতেই ওপাশ থেকে গমগমে কণ্ঠস্বর, "জুনায়েদ, কি করছো?" ঘুম জড়ানো গলায় জুনায়েদ জবাব দিলো, "ঘুমাচ্ছিলাম আঙ্কেল। কিছু বলবেন?" মাঝহার আলী শাহ-র কণ্ঠ শান্ত, "আরে, তোমার তো এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হলো, ভালো রেজাল্টও করেছো। শুনলাম এখন বেকার বসে আছো। আমাদের শোরুমে একজন ম্যানেজার দরকার। যদি চাও, তাহলে এই কাজটি করতে পারো।" জুনায়েদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে এদিক-ওদিক তাকালো, যেনো তার ভেতরের দ্বিধাটা অনুভব করার চেষ্টা করছে। তারপর বললো, "আঙ্কেল, চাইলেই তো সব হয় না। আমি আব্বু-আম্মুর সঙ্গে কথা বলে আপনাকে জানাচ্ছি।" মাঝহার আলী শাহ আর কোনো কথা না বলে ফোন কেটে দিলেন। জুনায়েদ আবারও ঘুমের গভীরে তলিয়ে গেলো, তার চিন্তাভাবনার মাঝেই হয়তো উঁকি দিচ্ছিলো নতুন এক দিগন্তের হাতছানি।
সকাল তখন সাড়ে দশটা। মিষ্টি রোদ এসে পড়েছে জুনায়েদের ঘুমন্ত চোখে। "জুনায়েদ! এই জুনায়েদ! উঠ!! ক'টা বাজে দেখেছিস? সাড়ে দশটা বাজে। তাড়াতাড়ি উঠ!" মায়ের ডাকে ঘুম ভেঙে যায় তার। ধড়মড়িয়ে বিছানা থেকে উঠে, তাড়াহুড়ো করে ফ্রেশ হতে বাথরুমে ঢোকে জুনায়েদ।
ফ্রেশ হয়ে এসে, সকালের নাস্তার টেবিলে বসে মায়ের সাথে কথা বলতে শুরু করে জুনায়েদ। "আম্মু! ফুফা কল দিয়েছিলো সকালে। বললো, তাদের শোরুমে নাকী ম্যানেজার লাগবে, সেই পোস্টে আমাকে জয়েন করতে।" জুনায়েদের মা, জোহরা বেগম একটু অবাক হয়ে বললেন, "বেশ তো! তোর ইচ্ছে হলে করবি। আমি আর তোর বাবা তো কোনোদিন তোকে জোর করে কিছু করতে বলি না।" জুনায়েদ একটু শঙ্কিত হয়ে বললো, "কিন্তু আম্মু, আমি চাকরি করতে চাই না। আমি বিজনেস করতে চাই, তা-ও নিজের যোগ্যতায়।" জোহরা মুচকি হেসে উত্তর দিলেন, "ঠিক আছে। তাহলে তোর ফুফাকে বলে দিস, তুই কাজটি করবি না। তাহলেই তো হয়।" জুনায়েদ এবার একটু শান্ত হয়ে বলল, "থ্যাংক ইউ, আম্মু। কাগজপত্র সবকিছু গুছিয়ে রেখেছো তো?" জোহরা একটি ফাইল উঁচু করে ধরে বললেন, "হ্যাঁ! এই যে, তোর সব কাগজপত্র এখানে। দেখ কি হয়।" নাস্তা শেষ করে, জুনায়েদ জোহরার হাত থেকে ফাইলটা নিয়ে বললো, "টিটিসি থেকে কম্পিউটার কোর্সটা কমপ্লিট করি, এরপর দেখি কি হয়। আপাতত এই কথা কাউকে বলার দরকার নেই। তুমি, আমি, আর আব্বুর মধ্যেই থাকুক।" জোহরা, জুনায়েদের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, "আমাদের একমাত্র সন্তান তুই। তোর কোনো শখ আমরা অপূর্ণ রাখিনি, বাবা। এখন শুধু এটুকু দোয়া করি, তুই যেনো তাড়াতাড়ি সফল হতে পারিস।" জুনায়েদ একগাল হেসে, ফাইল হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো, তার ভবিষ্যৎ স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় নিয়ে।
জুনায়েদের টিটিসিতে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম দিনটি ছিলো বেশ উত্তেজনাপূর্ণ। টিটিসির গেট দিয়ে প্রবেশ করতেই তার চোখে পড়ে আধুনিক স্থাপত্যের এক বিশাল ভবন, যা তার কল্পনার থেকেও অনেক বেশি উন্নত। ক্লাসরুমগুলো ছিলো সুসজ্জিত, যেখানে অত্যাধুনিক কম্পিউটার এবং মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর বসানো ছিলো। শিক্ষকদের আন্তরিক ব্যবহার এবং পড়ানোর মনোমুগ্ধকর পদ্ধতি জুনায়েদের মন জয় করে নেয়। ভর্তি হয়ে টিটিসি থেকে বাসায় ফিরে দেখে জুনায়েদের ফুপি জাহানারা খাতুন তাদের বাসায় এসেছে। "আসসালামু আলাইকুম ফুপি! কেমন আছো?" জিজ্ঞেস করলো জুনায়েদ। "আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?" জাহানারা জিজ্ঞেস করলো। "জ্বি ফুপি আমিও আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।" এতটুকু বলে জুনায়েদ নিজের রুমে যাবে তখনই জাহানারা পিছু ডাকে "শুনলাম, তুমি নাকী টিটিসি'তে ভর্তি হয়েছো?" জুনায়েদ শান্ত গলায় জবাব দিলো, "হ্যাঁ ফুপি।" জাহানারা আবারও বললো, "তুমি তো জানো, ওই টিটিসি'টা ভালো না। ওখানে একবার গাড়ি এ*ক্সিডে*ন্টে শিক্ষার্থী আর স্যার মা*রা যাওয়ার পর থেকে অনেকে অনেক ভাবে ভয় পায়। টিটিসি'টা এত উন্নত হওয়া সত্ত্বেও মানুষ এত কম হয় কেনো? কারণ টিটিসি'টা ভালো না। আমিও তো তোমার ফুফাতো ভাই, সৃজনকে বাইরে থেকে ড্রাইভিং শিখিয়েছি। যেখানে এই টিটিসি কাছে। বাবা! তুমি ওই টিটিসি'তে আর যেও না।" জুনায়েদ কোনো কথা না বলে নিজের রুমে চলে গেলো। ফুপির কথায় জুনায়েদ কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত হলেও, টিটিসির পরিবেশ এবং সেখানকার মানুষের আন্তরিকতায় সে মুগ্ধ ছিলো।
পরের কয়েকদিন জুনায়েদ টিটিসির প্রতিটি দিক ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে। সে দেখে, ক্লাসে সবসময় শিক্ষার্থীদের উপচে পড়া ভিড়, সবার মধ্যে কাজ শেখার আগ্রহ, হাসি-ঠাট্টা আর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। টিটিসির পরিবেশ সম্পর্কে ফুপির উদ্বেগের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল খুঁজে পায় না জুনায়েদ।
প্রতিদিনের মতো আজও ক্লাস শেষে জুনায়েদ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়। টিটিসি থেকে বের হয়ে সে মেইন রোড ধরে উত্তর দিকে হাঁটা শুরু করে। পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথে সে একটা সরু ব্রিজের কাছে এসে পৌঁছায়। ব্রিজটি পেরোলেই শুরু হয় কাঁচা পথ, যা গ্রামের সবুজ আর শান্ত প্রকৃতির প্রতিচ্ছবি। আরও পাঁচ মিনিট হেঁটে সে একটা বিশাল ধানক্ষেতের কাছাকাছি আসে। দু'পাশে সবুজ ধানের ক্ষেত, মাঝে সরু পথ যেনো প্রকৃতির এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। ক্ষেতের মাঝামাঝি স্থানে রয়েছে পুরনো একটি কব*রস্থান। জায়গাটা বেশ নির্জন এবং কিছুটা ছমছমে। দিনের আলোতেও অনেক মানুষ এখানে যেতে ভয় পায়। জুনায়েদ দ্রুত পায়ে কব*রস্থানটি পার হয়। এরপর ক্ষেতের পথ ধরে আরও সাত মিনিট হেঁটে সে অন্য একটি ছোট কব*রস্থানের সামনে এসে দাঁড়ায়। জায়গাটা আগেরটির মতোই শান্ত, তবে এর নীরবতা জুনায়েদের মনে অন্যরকম অনুভূতি দেয়। কব*রস্থানটি পেরিয়ে পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথে সে তার নিজের বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে যায়। বাড়ির কাছাকাছি আসতেই তার মনে হয়, ফুপির উদ্বেগের কোনো ভিত্তি নেই। টিটিসি'র পরিবেশ, সেখানকার মানুষের আন্তরিকতা, আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা সবকিছু জুনায়েদের কাছে দারুণ লাগে।
জুনায়েদ রাতে শুয়ে আছে। চোখ বন্ধ দেখার মতো ভাব বী*ভৎ*স করতে শুরু করেছে। তার মনে আসছে, "ওইদিন সকালে যখন আমি টিটিসি'তে ভর্তি হতে যাই তখন তো শুধুমাত্র আম্মুকেই বলে গেছিলাম। অথচ ফুপি কিভাবে জানলো যে আমি টিটিসি'তে ভর্তি হয়েছি?" এই পরস্পরবিরোধী তথ্যগুলোকে ব্যাখ্যা করতে করতে, ভীষনভাবেই শুয়ে শুয়ে জুনায়েদ ভাবতে শুরু করে। পরক্ষণেই জুনায়েদ আবারও ভাবতে শুরু করে, "আব্বু আর আম্মুর মুখে শুনেছিলাম, ফুপির সাথে জ্বি*ন আছে। সে নাকী জ্বি*ন পোষে। এক কথায় তাকে নাকী সবাই কবিরাজ নামে চিনতো। ফুফার দ্বিমতের কারণেই নাকী ফুপি কবিরাজি ছেড়ে দেন, কিন্তু এখনো নাকী তার সাথে জ্বি*ন আছে। হয়তো এই জ্বি*নের সাহায্যেই জানতে পেরেছেন।" এসব ভাবতে ভাবতে জুনায়েদ কখন ঘুমিয়ে পড়ে নিজেও টের পায় না।