চলে যাওয়া বসন্ত — পর্ব ০১
লেখক: তোয়া নিধী দোয়েল · বিভাগ: অণুগল্প · পর্ব ০১
গ্রীষ্মের দুপুরে সূর্যের প্রচণ্ড কিরণে; সমগ্র প্রকৃতি যেন রুক্ষমূর্তি ধারণ করে। গ্রীষ্মের এই খররৌদ্রে প্রকৃতির সতেজ রূপ নির্জীব হয়ে যায়। চারদিক পুড়ে খাঁ খাঁ করতে থাকে। ও-দূর ফাটা মাঠের বুক থেকে বেরিয়ে আসছে তপ্ত সুবাস।
বারান্দায় বেঞ্চ এর উপরে শুয়ে আছে, এক প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ। ক্ষনে ক্ষনে ডান পা বাম পায়ের উপর দিয়ে নাড়াচ্ছে। কপালে এক হাত রেখে, বাড়িতে থাকা গাছ গুলোকে পর্যবেক্ষণ করছে। যারা নতমুখে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের দেখে মনে হচ্ছে, সূর্যের আদেশ আছে তাদের উপর। তার এই তীব্র দহন তাদের সহ্য করতে হবে।
বাড়ির পশ্চিম পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটা ছোট নদী। সেথায় ক্লান্ত এক পাখি পানি পান করছে। বাড়ির সামনে একটি প্রশস্ত রাস্তা। যা সোজা গুঞ্জের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। রাস্তায় তেমন জন মানব নেই। এক ফেরিওয়ালার হাঁক-ডাক শোনা যাচ্ছে। সে তার মৌখিক ফিরিস্তির মাধ্যমে ক্রেতার আগ্রহ চেষ্টা সৃষ্টি করছে। মাথার উপর টিনের চালে; থেকে থেকে ভেসে আসছে কবুতরের গুম গুম আওয়াজ।
তারপর দীর্ঘক্ষণ কোনো শব্দ নেই। উতপ্ত এই দুপরের পরিবেশ ধীরে ধীরে নৈঃশব্দে নিমজ্জিত হয়। প্রকৃতির এই নির্জনতা; পুরুষটির মনের নির্জনতা আরও কয়েক গুন বাড়িয়ে দেয়। বাড়িতে থাকা জলপাই গাছ থেকে মাঝে মাঝে পাতা খসে পড়ছে। পাতা খসার দৃশ্য দেখে, স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠে কিছু নিদারুণ বিষাক্ত স্মৃতি! নিদারুণ বিষাক্ত স্মৃতি!?
হ্যাঁ! স্মৃতি গুলা ভীষণ সুন্দর ছিলো এক সময়। কিন্তু, এখন তারা বিষে পরিণত হয়েছে। আসো, তোমাদের সেই নিদারুণ বিষাক্ত স্মৃতির গল্প শোনাই।
কিছুদিন আগে মায়ের গলা জড়িয়ে আহ্লাদী কণ্ঠে বলে ছিলাম,
-মা, আমি একজন কে ভীষণ ভালোবাসি। ও -ও আমাকে ভীষণ ভালোবাসে। যদি এই বার চাকরিটা হয়ে যায় তবে, ওকে বিয়ে করবো।
মা স্মিত হেসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে ছিলো,
-ওমা! তাই নাকি। তা মেয়েটা কে শুনি?
আমি মাকে ছেড়ে, মায়ের কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে বর্ণনা করছিলাম; সেই অপ্সরীর কথা! সে অদ্ভুত রকমের সুন্দর! পানপাতার মতো মুখশ্রীতে, ছোট ছোট তিল। তাই তো তার নাম দিয়েছি তিলবতী! মাথার কেশগুচ্ছ যেনো মেঘের মতো মসৃণ আর মহনীয়। সে যেনো আলো আর শান্তির মিশ্রণ। তার সামীপ্যে আমার অন্ধকারে কেটে যায়। অশান্ত মন শান্ত হয়ে যায়!
তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম,
আমার তিলবতীর সাথে তার সাক্ষাৎ করিয়ে দেবো। তোমার পরে কেউ যদি আমাকে ভালোবাসে, তাহলে ও। ‘মা আমি কিন্তু ওকেই বিয়ে করবো।’
মা মৃদু হেসে প্রত্যুত্তরে বলেছিলো,
ঠিক আছে। আল্লাহ চাইলে হবে। তুই এখন ঘুমা তো। অনেক রাত হয়েছে। কাল তো আবার তোর চাকরির ফল দিবে। আল্লাহ নিশ্চয়ই ভালো কিছু করবে।
অতঃপর ভোর হলো। সূর্যের কিরণ ক্রমাগত তীব্র ভাবে ছড়িয়ে পড়তে থাকে ধরনীর বুকে৷ দীর্ঘ প্রতিক্ষা নিয়ে চেয়ারে বসে আছি ফোন হাতে নিয়ে। কখন এসএমএস আসবে। কখন অপেক্ষার অবসান হবে। যদি সত্যি এ বার চাকরিটা পেয়ে যাই; তাহলে মাকে রানী বানাতে আর কোনো বাধা থাকবে না। বাধা থাকবে না তিলবতীকে পেতে। প্রাণ ভরে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করতে থাকলাম। পাশে মা ও বসে ছিলো। সে ও সৃষ্টিকর্তার কাছে অনবরত বলে চলেছেন; আমাদের দিকে যেনো তাকায়।
আরও দীর্ঘক্ষণ পর ফোনে একটা ই-মেইল ঢুকলো। আমার বুকের পাঁজর টনটন করে উঠলো। হাত কাঁপতে থাকলো। কাঁপা হাতে ই-মেইল টা খুললাম। মা আমার দিকে ভীষণ উচ্ছ্বাস নিয়ে চাকিয়ে আছে। আমি কি বলবো শোনার জন্য।
ই-মেইলে চোখ বুলিয়ে আমার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেলো। হৃদয়ে কাঁপুনি ও থেমে গেলো। সারা শরীর অবশ হওয়ার উপক্রম হলো। মা আমার হাত ধরে অনবরত বলে চলেছে
কিরে কি হলো? কিছু বলছিস না কেনো? চাকরিটা কি হয়েছে?
আমি শান্ত ভাবে মায়ের দিকে চোখ তুলে তাকালাম। চোখের তারা চিকচিক করছে মা তা স্পষ্ট টের পেলো। এক বুক হতাশ নিয়ে ডানে-বামে মাথা নাড়ালাম। কাঁপা কণ্ঠে বললাম ‘নাহ্।’
ছুটে চলে গেলাম নিজের ঘরে। বাবা না ফেরার দেশে পাড়ি জমানোর পর, মা কত কষ্ট করেছে আমার জন্য। কত কষ্ট করে আমাকে লেখা-পড়া শিখিয়েছে। গেরস্ত বাড়ির বউ হয়ে ও অন্যের বাড়ি দাসীর মত কাজ করেছে। শুধু মাত্র আমাকে মানুষ করবে বলে। আমার পেটে দু-মুটো ভাত তুলে দিবে বলে। কত কটূ কথা সহ্য করেছে। কত অপমান,লাঞ্ছনা কত কি!
এত কিছু দেখে মাকে কথা দিছিলাম, আমি বড় হয়ে অনেক বড় চাকরি করে মায়ের দুঃখ ঘুচিয়ে দেবো। কিন্তু, হায়! আজ ভাগ্য সঙ্গ দিলো না। আমি পারলাম না মায়ের পাশে দাঁড়াতে। পারলাম না মাকে রাজরানী করতে। মা কে কথা দিছিলাম, আমি মায়ের দুঃখ ঘুচিয়ে দিবো। মা'কে আবার তার রানীর আসন ফিরিয়ে দেবো। কিন্তু, তা আর হলো না।
সেই দিন আর বের হলাম না ঘর থেকে। মা অনেকবার ডেকেছে। তবু ও ভালো লাগে নি। কোন মুখ নিয়ে মায়ের সামনে দাঁড়াবো? তাই ভেবে আর বের হলাম না।
পরের দিন খুব ভোরে আরেকটা এসএমএস আসলো ফোনে। যেখানে লেখা ছিলো আমার সেই তিলবতী নাকি পবিত্র বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হতে যাচ্ছে। যে টুকু ঘুরে দাঁড়ানোর আশা ছিলো সে টুকু ও নিভে গেলো। শান্ত পাথরের মত স্থির হয়ে গেলো আমার চলমান জীবন। ভাবনারা সব উড়ে গেলো দূর আকাশে। না পারলাম মা'কে রানীর আসনে বসাতে; আর না পারলাম মনের মানুষ টাকে ধরে রাখতে। এই হচ্ছে, একটা বেকার ছেলের বিষাক্ত কিছু স্মৃতি।
মায়ের ডাকে ভাবনার জগৎ থেকে বের হয় ছেলেটি। বাটি ভর্তি কিছু পেঁপে কেটে নিয়ে এসেছে। যে মূহুর্ত থেকে শুনেছে আমি আমার প্রিয় মানুষটিকে হারিয়েছি, সে চলে গেছে আমাকে ছেড়ে, সেই মূহুর্ত থেকে দশটা মিনিটের জন্য আমার পাশ থেকে সরে নি। শান্তনা দিয়ে গেছে। সাহস দিয়ে গেছে। ভরসা দিয়ে গেছে। বলেছে তুই চিন্তা করিস না বাবা, আল্লাহ যা করে ভালোর জন্য করে। আমি আরও দু বাড়ি কাজ নিয়েছি। আরেকবার চেষ্টা কর। চাকিরটা এবার ঠিক হবে। আমাদের দুর্দিন কেটে যাবে। নিরাশ হইস না। সৃষ্টি কর্তা বান্দার পরিক্ষা নেওয়ার জন্য বিপদে ফেলে। এক দম নিরাশ হইস না। মা আছে তো।
মা'কে কি ভাবে বোঝাবো, সে আছে বলেই আমি মরে গিয়ে ও বেঁচে আছি। সে আছে বলেই বিফল হয়ে ও আবার সফল হওয়ার স্বপ্ন বুনি।
_______সমাপ্ত_________
®️নিধী
১৪ এপ্রিল,২০২৫
সোমবার।
[অনেক আগে লিখেছিলাম। ডায়েরিতে লেখা ছিলো। আরেকটু কারেকশন করে পোস্ট করলাম।]