হৃদয়ের সঙ্গোপনে — পর্ব ১৩

লেখক: তোয়া নিধী দোয়েল · বিভাগ: রোমান্টিক · পর্ব ১৩ · ৪৬ পর্বের মধ্যে ১৩

-ভাবিইইইজান......

রেজুয়ান রান্নাঘরে আসে বড় করে ডাকে তুর্কিকে। তুর্কি ডাক শুনে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। এই লোক এখানে আবার কি চায়! মোহনা বলে

-এখানে কি চাই তর?

রেজুয়ান বাটিতে থাকা কিসমিস নিয়ে খেতে খেতে মোহনার ঝুঁটি করা চুল টেনে বলে,

-তোর কাছে প্রশ্ন করছি ভ্যাবলি? তুই উত্তর দেস কেন?

-আ আ আ আ মা........। ও মা....

-এই নটকা টা এত মা মা করা পারে। যা এখান থেকে।

-তুই আমারে আবার মারলি। দাঁড়া আমি মায়ের কাছে বিচার দিয়া আসি।

-হো যা।

-ও মা......।

মোহোনা চলে যায়। সূচনা চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বলে

-তুই ওরে মারলি কেন?

-আয়, তোরে ও একটা কিল দেই।

-সর যা এখান থেকে।

-তুই টিকটক করা বাদ দিয়ে এখানে কি করছ? নতুন একটা গান বের হয়ছে যা ভিডিও বানা গা।

-তোর কাছে শুইনা বানামু ভিডিও?

-তাইলে চুপ থাক৷ কথা কইলে মাইর খাবি রেজুয়ান তুর্কির উদ্দেশ্যে বলে

-কি করছেন ভাবিজান? আমি সাহায্য করবো?

তুর্কি দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে বলে,

-আমি পারবো।

-জীবনে রান্না করেছেন? ভালো মতো সাহায্য করতে আসলাম ভালো লাগলো না।

তুর্কি রেজুয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে

-আপনাকে বলেছি সাহায্য করার জন্য? আর আমাকে কি আপনার অকর্মা মনে হয়?

-এতে মনে হওয়ার কি আছে? আপনি তো শুধু অকর্মা না। সাথে লুলা ও। যে ভাত বেরে খায় না সে আসেছে রান্না করতে।

তুর্কি দৃষ্টি সরিয়ে মুখ ভেঙায়। ছেলেটাকে ওর দু চোখে দেখতে ইচ্ছা করে না। কি ভাবে ঠকালো। যদি কোনো দিন বাগে পায় পিটিয়ে ছাল উঠিয়ে নিবে।

-এই বেঙ্গির ছাও তর ফোন বাজে। তাড়াতাড়ি যা। দেখ আমাগো দুলাভাই কল দিছে নাকি।

সূচনা মনে দ্বিধা নিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে

-সত্যি ফোন বাজে নাকি চাপা ছাড়াতাছস?

-তুই গিয়ে দেখে আয়।

সূচনা চলে যেতেই ভেতরে আসে মুজাহিদ। রেজুয়ান বলে,

-এই যে লুলা ভাবিজান সরেন। রান্নাটা করে দিচ্ছি।

তুর্কি রেজুয়ানের দিকে তাকাতেই চোখ পরে মুজাহিদদের উপর। এই বাড়ির কাউকে ও তেমন চেনে না। কাল আসার কারণে পরিচয় তেমন হয় নি। মুজাহিদ তুর্কির কাছে এসে বলে

-কি করছো মা?

তুর্কি মৃদু হেসে জবাব দেয়

-কিছু না আংকেল। আপনার কি কিছু লাগবে?

রেজুয়ান চোখ মুখ কুঁচকে বলে

-উনাকে দেখে আংকেল মনে হলো? এইটা তোমার শ্বশুর। আব্বাজান ডাকো।

-আমি জানতাম না তো তাই আংকেল ডেকেছি।

মুজাহিদ রেজুয়ানের উদ্দেশ্যে বলে,

-তুই বাইরে যা। তোকে যে কাজ দেওয়া হয়েছে সেটা কর। এখানে মাতব্বরি করতে বলে নি।

-বা-রে আমি আবার কি করলাম? ভাবিজান বাপরে আংকেল ডাকলো তাই শিখিয়ে দিলাম।

-শিখানো হয়ে থাকলে যা এখন।

রেজুয়ান তুর্কির দিকে তাকিয়ে বলে

-শিখছেন ভাবিজান নাকি আরেকবার বলবো?

মুজাহিদ এখান উপস্থিত থাকার কারনে তুর্কি রেজুয়ানকে তেমন কিছু বললো না। মনে মনে শুধু ফোসে উঠলো। একে তো ঠকিয়েছে। আবার এখানে নাটক শুরু করেছে। মনের কথা মনে রেখে জবাব দিলো

- না আর বলতে হবে না।

-বাহ্! মেয়ে তো খুব চটপটা। একবার শিখাতেই শিখে গেলো। আল্লাহ তোমারে সুখী করুক। জামাই নিয়া সুখী হও।

তুর্কি দাঁত শক্ত করে তাকায়। এই টুকু কথা শেখার জন্য এত কিছু বলার কি আছে। মুজাহিদ চোখ গরম করে তাকিয়ে বলে,

-তোর আজে বাজে কথা শেষ হয়ে থাকলে বাইরে যা। না হলে আমি গেলাম।

-আরে চেতো কেন বাপের ভাই। এই জন্যই তো তোমর কপালে মেয়া জুটে না।

-তুই......

মুজাহিদ রেজুয়ানকে ধরতে গেলে ছুটে বের হয়ে যায় ও। মুজাহিদ তুর্কির দিকে ঘুরে বলে,

-ওর কথায় কিছু মনে করো না মা। ও একটু এমনই।

এই কথায় তুর্কি মৃদু হাসে। কিন্তু, মনে মনে খুব রাগ আছে। ওই ছেলেকে একবার ধরতে পারলে মজা বোঝাবে। মুজাহিদ আবার বলে

-তা কি রান্না করছো মা?

তুর্কি চুলার দিকে তাকিয়ে বলে

-ওই.... তো...ওই আন্টি বলেছেন পায়েস রান্না করতে সেটাই রান্না করার চেষ্টা করছি।

মুজাহিদ এগিয়ে এসে বলে,

- চেষ্টা করছো মানে? আগে কখনো চেষ্টা করো নি।

তুর্কি ডানে বামে ঘাড় নাড়ায়।

-নাহ্।

তাহলে আদনানের অনুমান ঠিকই হয়েছিলো মেয়েটা সত্যি রান্না জানে না। মুজাহিদ তুর্কির দিকে একটা মোড়া এগিয়ে দিয়ে বলে,

-এই খানে বসো মা। আর দেখো তোমার এই বাপ কি ভাবে পায়েস রান্না করে। আজ দুই বাপ বেটি মিলে রান্না করবো

তুর্কি অবাক হয়ে তাকায়। বিষ্ময় নিয়ে প্রশ্ন করে

-আপনি...আপনি রান্না পারেন?

-আবার জিগায়। ম্যাচে থাকতে কত রান্না করেছি। সব রান্নাই পারি।

দরজা থেকে রেজুয়ান মুখ বাড়িয়ে বলে

- সব মিথ্যা কথা। বিয়ের পর বউ-রে রান্না করে খাওয়াতে হবে তাই শিখছে। তা না হলে আবার বউ পিটাইবো তো।

তুর্কির দিকে তাকিয়ে বলে,

-ভাবিজান, কোনো ভালো মেয়ে পাইলে দেখাইয়েন তো। আমার পালিত বাপটাকে বিয়ে দিবো।

মুজাহিদ চুলার পাশে থাকা খুন্তি নিয়ে ছুটে আসে। রেজুয়ান সেটা দেখে এক দৌড়ে বেরিয়ে যায়। এই ছেলেটার জন্য মান সম্মান আর থাকবে না। তুর্কি ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে

-পালিত বাপ মানে?

মুজাহিদ তুর্কির দিকে তাকিয়ে বলে,

-ওর কথা মাথায় নিও না মা। আমি ওর চাচা। এইটা কেউ বলবে? সব সময় আমার পেছনে পরে থাকে। তুমি বাদ দেও। বসো এখানে।

-না না আমি আপনাকে সাহায্য করছি। বলুন কি কি লাগবে আমি এনে দিচ্ছি।

-না আমার কিছু লাগলে আমি নিয়ে নেবো। তুমি দূরে গিয়ে বসো। আগে কখনো আগুনের ধারে আসো নাই, তো তাই দূরে থাকো। আর আমি কি ভাবে রান্না করি সেটা দেখো।

তুর্কি ঠোঁটের হাসি প্রসস্থ করে৷ এই বাড়িতে ওই বুড়ো লোক আর উনার বজ্জাত ভাই ছাড়া সবাই ভালো। মুজাহিদ দুধের পাতিল চুলায় দিয়ে আগুন জ্বালায়।

-ভাবি মা, কাজে ব্যস্ত তা না হলে তোমাকে শিখিয়ে দিতো। আমাদের বাড়িতে এইটা নিয়ম নতুন বউ আসলে তার হাত মিষ্টি কিছু রান্না করা।

রান্নাঘরের সামনে চেয়ার পেতে বসে রয়েছে রেজুয়ান। আর পাশে থাকা প্লেটের সারি গুনিছে। পেছন থেকে রচনা এসে রেজুয়ানের চুল টেনে ধরে,

-ফাজিল তুই ভালো হবি না? বোনটাকে কেনো মারছস?

- উ উ উ, খালাচাচি ছাড়ো ব্যথা পাচ্ছি তো।

রচনা আরো জোরে ধরে বলে,

-কিসের খালাচাচি? যেকোনো একটা ডাকা যায় না?

-কেন একটা ডাকবো? আমার মা-র বোন তুমি। আর আমার বাপের ভাইয়ের বউ। তাহলে খালাচাচি-ই তো ডাকবো।

হুমাইরার ছোট বোন রচনা। এক বাড়িতে দুই বোনের বিয়ে হয়েছে। এই কথা যে দিন থেকে রেজুয়ান জেনেছে সেই দিন থেকে রচনা কে খালাচাচি বলে ডাকে।

-তুই কি ভালো হবি না?

-একটা বিয়ে করাই দেও তাইলে ভালো হয়ে যাবো।

রচনা চুল ছেড়ে দেয়।

- চাচির কাছে সোজাসুজি বিয়ের কথা বলতে লজ্জা লাগে না

-তোমার জামাই আমার মা-র কাছে তোমার কথা বলার সময় লজ্জা পাই নাই। তাইলে আমি লজ্জা পাবো কেন?

রচনা রেজুয়ানের ঘাড়ে আরেকটা চড় মারে। এই ছেলে যে অসভ্য তা নিয়ে তার কোনো সন্দেহ নেই।

-আরেকবার শুধু বোনের পেছনে লাগলে দেখিছ কি করি।

-তোমার মেয়ারে আমি গাঞ্জাখুরের সাথে বিয়ে দিমু। যাতে উঠতে বসেতে শুধু পিটানি দেয়।

-তবে রে ফাজিল...।

রান্নাঘর থেকে পায়েসের সু-ঘ্রাণ আসছে। কিচ্ছুক্ষণ আগে আলামিন এসেছিলো। মুমিনুল আলামিন মুজাহিদ আর রেজুয়ান এই চারজনের গরু কিনিতে যাওয়ার কথা ছিলো। তাই খোঁজ করছিলো। সে জানে রেজুয়ান যেখানে থাকবে সেই খানে মুজাহিদ থাকবে। ছোট বেলায় এই ছেলেকে ভাই কে দিয়ে দিলে মন্দ হত না। রেজুয়ান বলেছে ওরা যেতে পারবে না। ওদের ইম্পর্টেন্ট কাজ আছে।

রেজুয়ান চেয়ার থেকে উঠে রান্নাঘরের দরজা দিয়ে মাথা ঢুকায়। মুজাহিদ পায়েস বাড়ছে। তুর্কি পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ও বলেছিলো ও বাড়বে। গরম জিনিস যদি হাতে পরে তাই মুজাহিদ নিজেই বাড়ছে। ছেলে হয়ে এত সুন্দর রান্না জানে তুর্কি অবাক হয়ে গেছে।

-আল্লাহ্! এত সুন্দর রান্না জানেন আপনি?

মুজাহিদ উত্তরে হাসে।

-আমার বাবা ও পারে। বাবা তো বাইরে থাকে তাই নিজের রান্না নিজেই করেন।

-আর তার মেয়ে হয়ে আপনি এই রকম অকর্মা হয়ছেন ছি ছি!

রেজুয়ানের কণ্ঠ শুনে চোখ গরম করে তাকায় তুর্কি।

-এখানে কি চাই আপনার?

-চোখ গরম কইরেন না ভাবিজান। তাইলে সবার কাছে বলে দেবো আপনি এইটা রান্না করেন নাই।

তুর্কি একটু ভয় পায়। সত্যি তো ও এই কথা এক বার ও ভাবে নাই। যদি কেউ জানে তাহলে কি বকবে। বাড়ি ভর্তি মেহমান। ও মুজাহিদদের দিকে তাকিয়ে কণ্ঠ স্বর নিচু করে বলে

-চাচ্চু, কাউকে বলবেন না প্লিজ। তাহলে সবাই...

-আরে ভয় পেয়ে ও না মা। কেউ জানবে না।

-যদি উনি বলে দেন..

-ওর অত সাহস আছে নাকি। বললে ওই বাঁশ খাবে। চিন্তা করো না।

-ও মা....

রেজুয়ান মা ডাকিতেই তুর্কি মুজাহিদ কে ডেকে উঠে

-চাচ্চু....

-আরে ডাকতে দেও। কিছু হলে ওর কপালেই শনি আছে।

রাতে বাড়ির লোকদের সাথে দূর থেকে আসা আত্মীরা ও এক সাথে খাবারের টেবিলে বসেছে। হুমাইরা বার বার নিচ থেকে হাক ছেরে মুজাহিদ আর রেজুয়ানকে ডাকছে। একটা ডাক না শোনার কারণে হুমাইরা সূচনার উদ্দেশ্যে বলে,

-ওদের একটু ডেকে আনতে।

সূচনা বলে

-তোমার ছোট ছেলের সাথে কথা বলতে আমার ভালো না।

-যা মা এমন করিছ না।

মোহোনা বলে,

-আরে ভাইজান আসে নাই তো। জানই তো ভাইজান না আসলে চাচ্চু আর গাঞ্জুটি খায় না।

তুর্কি হুমাইরার সাথে সাথে সাহায্য করছে। যদিও হুমাইরা অনেক বার মানা করেছেন। রচনা এসে বলে,

-ভাবি আপায় কিন্তু, ফোনটা এখনো ধরলো না।

-কোহেলির টায় দিয়ে দেখ তাইলে।

কোহেলি নাম শুনে অবাক হয় তুর্কি। ওই শাকচুন্নি ম্যাডাম আবার এখানে কি করবে। পরক্ষণেই ভাবে হয়তো কোহেলি নামে আরো কেউ আছে। ওই শাকচুন্নির নাম একা না পৃথিবীতে।

সবার খাওয়া শেষ হলে হুমাইরা পায়েস দেন আলামিনের প্লেটে পায়েস দিতেই সে বলে উঠে

-পায়েস দিয়েছে কে?

হুমাইরা ভ্রু কুঁচকে বলে,

-কে আবার দিবে? বাড়িতে রান্না হয়েছে

একবার মুখে নিয়েই আলামিন বলে

-আল্লাহ্! আজ এত টাকার দুধের দই পাতা হলো আবার পায়েস ও রান্না করেছো?

মুমিনুল বলে,

-খা চুপ চাপ৷ নতুন বউ বাড়িতে এসেছে তাই তাঁর হাতে মিষ্টি জিনিস রান্না হয়েছে।

-তাই বলে....

-তুমি কি চুপ থাকবা? টাকা পয়সা জমি-জমা নিয়ে কি কবরে যাবা?

রেগে বলেন হুমাইরা। আলামিন আর কোনো কথা বলে না। চুপ চাপ খাওয়া শেষ করে। এত টাকা নষ্ট করার কোনো মানে নেই!

জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে তুর্কি। ফোনটা যে কোথায় ফেললো কে জানে। মানুষের জন্য ও বাইরে বের হতে পারে নি। মায়ের সাথে আজ কথা ও হলো না। ওই অসভ্য লোককে আজ শুধু পেয়ে নিক। সামান্য এক টুকরো কাগজের জন্য এই ভাবে ফোন টা ফেলে দিলো! কিচ্ছুক্ষণ ভাবার পর মনে হলো মোহনা অথবা সূচনার ফোন দিয়ে মায়ের সাথে কথা বলা যাক। ও ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।

মোহনা ঘুমাচ্ছে। আর সূচনা শাড়ি পড়ে নাচ্ছে। তুর্কি ঘরের দরজায় নক করে বললো,

-মোহনা সূচনা আপু আসবো?

-হ্যাঁ, ভাবি এসো।

তুর্কি ভেতরে ঢুকে বলে,

-কী করছো?

-এই তো ভিডিও বানাই। আসো আমার সাথে একটা ভিডিও বানাও। টিকটকে আমার নিরানব্বই জন ফলোয়ার। আরেকটা হলে একশ সম্পূর্ণ হবে৷ কিন্তু কিছুতেই হচ্ছেই না। তোমার একাউন্ট থাকলে একটা ফলো দিয়ে দিও।

-না না আপু আমি ভিডিও বানাবো না। তুমি যেহেতু ভিডিও বানাছো তার মানে তুমি সূচনা আপু তাই তো?

সূচনা মাথা ঝাঁকায়। ওদের চেনা বড় কঠিন মোহনা সূচনা একদম এক। রেজুয়ানের কাছ থেকে যত টুকু শোনে সূচনা এক জন টিকটকার। তাই মনে হলো এইটা সূচনা।

-আপু, একটা হেল্প লাগতো।

-হ্যাঁ, বলো।

-তোমার ফোন টা একটু দেও না। আম্মুর সাথে কথা বলবো। আমার ফোনে চার্জ নেই তাই।

- দাঁড়াও।

তুর্কি জুবাইরার নাম্বার ডায়াল করে। দুইবার বাজার পর জুবাইরা কল রিসিভ করে সালাম দেয়।

-মা আমি....

-আমি কে?

-মা আমি তোমার মেয়ে। আমার ফোনে চার্জ নেই তাই অন্য একজনের ফোন দিয়ে কল দিয়েছি।

-আরে মাস্টারের বউ! কি অবস্থা আপনার? আমার জামাই বাবা কেমন আছে? শশুড় বাড়ির সবাই কেমন আছে?

তুর্কি আহত হয়। ওর ধারণা ঠিক মা সত্যি জানতো ওই বুড়ো লোকের সাথে যে ওর বিয়ে। তাই তো সবার আগে ওই লোকের খবর জানতে চাইলো

-মা...মা তুমি সব জানতে

-হ্যাঁ, জানবো না কেনো। আমার এক মাত্র মেয়ের জামাই কে হবে তা জানবো না?

-মা তুমি জানো আমাকে মাঝ সমুদ্রে ফেলে দিয়েছো।

-তোর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। তুই এত কথা বাদ দিয়ে তর শ্বাশুড়ী-র কাছে ফোন টা দে তো। আপার সাথে কথাই হলো না।

-মা আমি যে তোমার থেকে দূরে আছি সেটা তে তোমার কিছু যায় আসে না?

-না। তুই দে।

তুর্কি আহত মন নিয়ে ঘর থেকে বের হয়। মা হয়ে বেইমানি করলো! বাড়ি ভর্তি মেহেমান। তুর্কি মাথায় ঘোমটা টেনে নিচে নামে। হুমাইরা রান্না ঘরেই থাকবে হয়তো। সত্যি তাই। হুমাইরা বাটিতে কারো জন্য পায়েস বাড়ছিলো। তুর্কি গিয়ে বলে

- আন্টি..

হুমাইরা চোখ তুলে তাকিয়ে বলে,

-আল্লাহ্! আমার মেয়ে আমাকে আন্টি বলে ডাকে কেনো? মাকে কেউ আন্টি বলে।

তুর্কি স্মিত হেসে বলে,

- দুঃখিত মা। আম্মু আপনার সাথে কথা বলবে।

- ও দেও। দেও। আর এই পায়েসের বাটি টা আদনান কে দিয়ে আসো। ছেলেটার পায়েস ভীষণ পছন্দ। তখন খেতে পারে নি।

তারপর তুর্কির কাছ থেকে ফোন নিয়ে কথা বলা শুরু করে

-আসসালামু-আলাইকুম আপা। কেমন আছেন?

আদনানের কথা উঠতে তুর্কির মেজাজ চড়ে উঠে। এই অসভ্য লোকের জন্যই তো এত কিছু। পায়েসের বাটির দিকে রাগ নিয়ে তাকিয়ে থাকে। এই বাটি নাকি আবার ওই অসভ্য বুড়ো লোকের জন্য নিয়ে যেতে হবে। বাটি হাতে তুলেতেই মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি হানা দেয়। সকালে ওর ফোন ফালিয়ে দেওয়ার মজা এখন বোঝাবে। মনে প্রতিশোধের আগুন জ্বলতে থাকে।

আদনান স্টাডি টেবিলের সামনে বসে কিছু একটা লেখছিলো। তুর্কি পায়েসের বাটি আদনানের পাশে রাখে। আদানান পায়েসের বাটি একবার দেখে। বাটির উপরি ভাগ কিসমিসে এক দম ঢাকা। কিসমিস ওর খুব পছন্দ।

তারপর তুর্কির দিকে তাকায়। এ মেয়ের হলো কি ওর জন্য পায়েস নিয়ে এসেছে! আদনান কিছু বলার আগেই তুর্কি বলে,

-মোটে ও সকালের ঘটনা ভুলে যাইনি। আম্মু বললো তাই নিয়ে এলাম। ভাব্বেন না আপনার সেবা করার জন্য নিয়ে এসেছি।

-তুমি কথা কম বলতে পারো না?

-আপনার সাথে আমার কথা বলতে ইচ্ছাই করে না। তাও ভদ্রতারে খাতিরে বলি।

আদনান দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। এই মেয়ের সাথে কথা বলা মানে সময় নষ্ট। তুর্কি মাথা নিচু করে বলে,

-পায়েসটা কিন্তু আমি রান্না করেছি। খেয়ে অবশ্যই রিভিউ দিবেন। ওকে। গুড বাই।

আদনান আড় চোখে তুর্কিকে দেখে। তুর্কি মুখ ভেঙিয়ে চলে যায়। আদনান লাস্ট লাইন লিখে পরের পেজ বের করে। ট্রে থেকে চামচ উঠিয়ে পায়েসের বাটি থেকে এক চামচ উঠিয়ে মুখে পুরে। পায়েস মুখে তোলা মাত্রই ওর পেটের সব কিছু পাকিয়ে বমি চলে আসে। এত বিষাদ! আদনান দ্রুত ওয়াস রুমে গিয়ে ফেলে দিয়ে কুলি করে। আল্লাহ্! এইটা পায়েস নাকি নুন ঝালের স্পেশাল রেসিপি! এত নুন! এত ঝাল!

আরেকটু হলে ওর পেটের সব কিছু বেরিয়ে আসতো। পায়েস তো মুজাহিদদের বানানো কথা তাহলে সে কি বানাই নি? এই পায়েস তো সবাই খাবে। আল্লাহ্! ওর বউয়ের মান-সম্মান সব চলে যাবে। ও দ্রুত ওয়াসরুম থেকে বের হয়। মুজাহিদ রেজুয়ানকে ধরতে হবে। শালার গুলা কই ছিলো জানতে হবে। এত বার করে বলা সত্ত্বেও কাজটা কেনো করে নি।

মুজাহিদদের ঘরে বসে দাবা খেলছে মুজাহিদ আর রেজুয়ান। আদনান পায়েসের বাটি সাথে করে মুজাহিদদের ঘরে আসে। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। রেজুয়ান আদনানের দিকে তাকিয়ে বলে,

-কী রে! বউ রেখে আমাদের এখানে কী? আমাগো মত সিংগেলরে জ্বালাতে আইছস?

মুজাহিদ রেজুয়ানের দিকে ব্যঙ্গ করে হেসে বলে,

-তুই নিজেরে সিংগেল বলে দাবি করিছ না। টিস্যুর মত গার্লফ্রেন্ড চেঞ্জ করা মানুষ যদি নিজেরে সিংগেল বলে তাহলে সব সিংগেল মানুষ কচু গাছের সাথে ফাঁসি দিয়ে মরবো।

আদনান মুজাহিদ আর রেজুয়ানের উদ্দেশ্যে বলে,

- পায়েস রান্না করা বাদ দিয়ে দুইজনে কই ছিলেন?

মুজাহিদ রেজুয়ান নিজেদের মধ্যে চাওয়া-চাওয়ি করে। রেজুয়ান উত্তর দেয়,

-তোর কি মনে হয় এত মজার পায়েস তোর লুলামার্কা বউ রান্না করতে পারবো?

-হুম একটু বেশি মজাই হয়ে গেছে। নেন আপনারা ও টেস্ট করেন।

মুজাহিদ বলে,

-আমরা খাইছি। তুই খা।

-আরেকবার নেও বাপের ভাই।

এই বলে এক চামচ পায়েস উঠিয়ে মুজাহিদের মুখে দেয়। মুজাহিদের মুখ নোনতা ঝালে ভরে উঠে। সে ছুটে ফালিয়ে দিয়ে আসে। রেজুয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে

-তুই এইটা কী নিয়ে আইছস?

-কেন তুমি না রান্না করছো, তাহলে এখন খেতে পারও না কেন?

-আমি এইটা জীবনে ও রান্না করি নাই। রেজুয়ান খেয়েছে। বাড়ির সবাই খেয়েছে। অনেক ভালো হয়েছে। সবাই বলছে।

রেজুয়ান উঠে দাঁড়ায়। ও জানে এতে নিশ্চয়ই কোনো ঘাপলা আছে। আর এ ও জানে এখন ওকে ও এইটা খাওয়ানো হবে। ও উঠতেই মুজাহিদ জাপটে ধরে। আদনানের উদ্দেশ্যে বলে,

-ওরে খাওয়াস না কেন?

-আরে বাপের ভাই ছাড়ো। হয়ছে কী তাই বল আগে।

-আরে তুই আগে খা।

-না আগে বল।

-আগে খা তুই। আমরা বিষ খাইলে ও এক সাথে খাই। তাই এইটা আগে খা।

রেজুয়ান খেয়ে একই অবস্থা। আদনান বাটি রেখে দুইজনের ঘাড় এক সাথে চেপে ধরে। বেচারা রেজুয়ান মুখের বিষাক্ত খাবার টা ফালাতে ও পারছে না। আদনান বলে

-সত্যি কথা বলো, তোমরা কই ছিলে। এই পায়েস কোনো দিন ও তুমি রান্না কর নি। বার বার বললাম আমার বউ রান্না পারে না। ওকে হেল্প কর আর তোরা?

-আরে ভাইয়ের ছেলে আমি সত্যি রান্না করছি। বিশ্বাস না হলে রেজুয়ানের কাছে শোন।

আদনান রেজুয়ানের দিকে তাকায়। রেজুয়ান মুখ ফুলিয়ে মাথা নাড়ায়।

-তাহলে এইটা এত বিষ হলো কীভাবে?

-আরে আমি সত্যি জানিনা। তোর বিশ্বাস না হলে, তর বউয়ের কাছে শুনে আয়।

-আরে পায়েস টা আমার বউই আমাকে দিছে।

রেজুয়ান আদনানের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে আগে দৌড়ে মুখের খাবার ফালিয়ে আসে।

-কর আরো বিয়া। দেখ গা তোর বউই কিছু মিশাইছে। সকালে বলছিলিনা ঝগড়া লাগছে দেখ-গা প্রতিশোধ নিছে।

আদনান কপালে ভাঁজ ফেলে রেজুয়ানের কথা মনোযোগসহ কারে ভাবে। সত্যি তো! তাইতো পায়েস খাওয়ানোর জন্য মেয়েটা এত বাহানা করছিলো। যার জন্য চুরি করলাম সেই বললো চোর! আদনানের স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দেখে রেজুয়ান মুজাহিদ হো হো করে হেসে উঠে। রেজুয়ান মুজাহিদের ঘার জরিয়ে ধরে বলে

-বুঝলি তো আজ কেনো আমি প্রেম করি বিয়ে করি না। প্রেম হচ্ছে টেম্পুরারি। কোনো প্যারা নাই। ঝগড়া লাগবো ব্লক করে দিমু। আরেকটা পটামু। আর বউ হচ্ছে পারমানেন্ট। আজ ঝগড়া করছস তাই মরিচ লবণ খাওয়াইছে। কাল ঝগড়া করলে বিষ খাওয়াবে।

-বাপের ভাই, চলো একটু সেলিব্রেট করি ব্যাপারটা।

-হো চল। আমাদের রাখে রাখে বিয়ে করার স্বাদ বুঝুক।

মুজাহিদ আর রেজুয়ান আদনানের চারি পাশে ঘুরে ঘুরে নাচতে থাকে,

-আমি ফাইসা গেছি

আমি ফাইসা গেছি

আমি ফাইসা গেছি মাইনকার চিপায়....

চলবে...

#নোটঃ বিশাল বড় পর্ব।ভুলত্রুটি মাফ করবেন।