মনপবন — পর্ব ০১

লেখক: তোয়া নিধী দোয়েল · বিভাগ: অণুগল্প · পর্ব ০১

সওদাগর বাড়ির, গেটের সামনে এসে থামে একটি রিকশা। সময়টা সন্ধ্যা নামার কিছু আগ মূহুর্ত। পশ্চিম আকাশে সোনার রবি অস্ত গিয়েছে। পরিবেশে ধীরে ধীরে আগমন ঘটছে অন্ধকারের!

রিকশা থেকে নামে, আকাশী রঙের থ্রি-পিছ পরা এক নারী। সাদা ওড়নার আঁচল মাথায় টানা। তবে, নামার সময় কিঞ্চিৎ বিপত্তি ঘটে! তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে, অসাবধানতাবশতঃ রিকশার হুডের সাথে মাথায় আঘাত পায়। এমনিতে-ই মনে রাগ, ক্ষোভ আর বিরক্ততে ছেয়ে আছে! তার ওপর হুট করে মাথায় চোট পাওয়াতে, বিরক্তির মাত্রা আকাশ ছোঁয়! মুখ দিয়ে বিরক্তি সূচক শব্দ করে।

রিকশাওয়ালা দ্রত মেয়েটির কাছে এসে জিজ্ঞাসা করে,

-আফামনি, দুক্কু পাইলেন?

মেয়েটা মাথায় এক পাশে হাত দিয়ে; চোখ মুখ খিঁচে দাঁড়ায়। রিকশাওয়ালার কথা শুনে ডানে-বামে মাথা নাড়ায়। যার অর্থ সে আঘাত পায়নি!

তারপর মাথা থেকে হাত নামিয়ে, পার্স থেকে টাকা বের করে ভাড়া পরিশোধ করে। রিকশাওয়ালা চলে যায় অজানা গন্তব্যে।

মেয়েটা হাতের পার্স এক হাতে নিয়ে; অন্য হাতে মাথার ওড়না টেনে নেয়। ঘুরে দাঁড়ায় সওদাগর বাড়ির উদ্দেশ্যে।

কয়েক পা হেঁটে গেটে টোকা দেয়। গেটের সামনে বসে থাকা দারোয়ান রফিক; গেটে থাকা ছিদ্র দিয়ে দেখে কে এসেছে। বাড়ির বড় বউয়ের মুখশ্রী দৃষ্টিগোচর হতেই; দ্রততরে গেট খুলে দেয়।

মেয়েটি ভেতরে ঢুকলে, রফিক মোল্লা চমৎকার করে হেসে সালাম দেয়। মেয়েটা ও মৃদু হেসে সালামের উত্তর নিয়ে, মূল বাড়ির দিকে পা বাড়ায়।

ডুপ্লেক্স বাড়িটির মূল দরজায় প্রবেশ করার আগে, রাস্তার বাম পাশে একটা ওয়াটার ফাইউন্টেন। যেথায় থেকে পানি নির্গত হচ্ছে। আর ডান পাশে কুচকুচে কালো রঙের একটা গাড়ি।

গাড়িটি দেখে মেয়েটার রাগের মাত্রা যেনো কিঞ্চিৎ পরিমাণ বেড়ে গেলো। পরপরই নিজেকে ধাতস্থ করে নিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে।

শীত-তাপ নিয়ন্ত্রিত ঘরটির মধ্যে; আয়নার সামনে বসে আছে এক প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ ও তাঁর দুই পুত্র। তাদের পরনে শুধু সাদা রঙের টাওয়েল। উপরি ভাগ খালি। বলা-বাহুল্য লোকটার ছানা-পোনা দুজনের বয়স তিন কি সাড়ে তিন বছর। যারা যমজ।

লোকটা তাঁর এক পুত্র কে কোলে বসিয়ে, হেয়ার ড্রায়ারের মাধ্যমে চুল শুকিয়ে দিচ্ছে। উপর ছানা পাশে বসে বাবার কর্ম-কাণ্ড দেখছে। তাদের দেখে ধারণা করা যায়, তাঁরা মাত্র গোসল সেরেছে।

তাদের থেকে কিঞ্চিৎ দূরে একটা মাইক্রোল্যাব স্পিকারে গান বাজছে। সেই গানের তালে-তালে মাথা দোলাচ্ছে লোকটা। বাচ্চা দু'জন গানের আগা-গোড়া না বুঝলে ও বাপের দেখা-দেখি দুলছে!

গটগট পায়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে ঊষসী। সে এই বাড়ির বড়-বউ। চার-পাঁচ দিন আগে বাপের বাড়ি গিয়েছিলো। আবার একাই ফিরে এসেছে। কোনো একটা কারণে রাগে তার শরীর জ্বলছে!

বাড়ির বৈঠক-খানায় বসে চা পান করছিলেন কালাম সওদাগর। ছেলের বউকে হন্ত-দন্ত হয়ে বাড়িতে প্রবেশ করতে দেখে ভ্রু কুঁচকায়। তবে তা দৃষ্টি-গোচর হয় না ঊষসীর। সে এক মনে হেঁটে দোতালায় উঠায় মগ্ন।

ঊষসীকে ঐ-ভাবে যেতে দেখে মনে দ্বিধা নিয়ে ডাকে,

- মামনি!

শ্বশুরের ডাক কানে যেতে পা -যুগল থেমে যায় ঊষসীর। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে ঘুরে সালাম দেয়। কালাম সওদাগর সালামের উত্তর নিয়ে জিজ্ঞাসা করে

-একা এসেছো? ঋত্বিক কই?

স্বামীর কথা উঠতেই রাগের মাত্রা তর-তর করে বাড়ে। তবে তা প্রকাশ করতে দেয় না। সে মিথ্যে হাসি ফুটিয়ে বলে,

-জি আব্বু, একাই এসেছি। জানিনা আপনার ছেলে কই।

এইটুকু বলে সে প্রস্থান করে। কালাম সাহেব আর কিছু বলে না। বৌমা-র যাওয়ার দিকে ভাবুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। হয়তো দু'জনের জানে মধ্যে কিছু হয়েছে!

ঋত্বিক তাঁর এক ছেলে ঋণয়ের চুল শুকিয়ে দিয়ে; অপর ছেলে ঋশানকে ও কোলে তুলে নেয়। গানের লিরিক্স এর সাথে সাথে তিন বাপ-ব্যাটা দুলে দুলে নাচ্ছে। তাদের দেখে বোঝা যাচ্ছে তাঁরা ভীষণ ফুর্তিতে আছে। ঋত্বিক ঋশান ও ঋণয়ের এক সাথে কোলে নিয়ে লিরিক্স এর তালে তালে তাল মিলিয়ে গাইতে লাগলো‚

‘Peechhe Kuaa, Aage Mere Khaai

Tu Hi Bata Jaaun Main Kahaan

Mujhko Duaa Kiski Lagi Bhai

Aake Padhara Hoon Jo Yahaan

Ille Fikar, Aaja Idhar

Beat Pe Laga Le Tu Thumka’

ছানা-পোনা দুইজন সঠিক লিরিক্স বলতে না পারলেও; বাপের তালে তাল মেলানোর জন্য নিজেদের মত করে কি যেনো বলতে লাগলো! ঋত্বিক দুই ছেলে কে নামিয়ে দিয়ে ছেলেদের সমান সমান হয়ে হাঁটু ভেঙে বসলো। তারপর গানের তালে তালে হাত উপরে দিয়ে, শরীরের উপরিভাগ দুলিয়ে নাচতে লাগলো। আর ছেলেরা ঘুরে-ঘুরে, লাফিয়ে-লাফিয়ে নাচতে আরম্ভ করে। ঋত্বিক গেয়ে উঠে‚

‘One Two Three Four Get On The Dance Floor

One Two Three Four Get On The Dance Floor

Booty Shake, Booty Shake

Dappan Koothu Hard Core

Shoulder Hichak Michak

Body Hichak Michak

Gimme, Gimme, Gimme

Gimme, Gimme, Gimme Some More’

ঋণয় ঋশান লাফাতে-লাফাতে তোতলিয়ে শুধু বলে,

‘ওয়ান, তু, তিরি, ফ্লোর

ওয়ান, তু, তিরি, ফ্লোর’

তিন বাপ-ব্যাটা ভীষণ ফুর্তি করে নেচে যাচ্ছে।

রুমের সামনে এসে থমকে দাঁড়ায় ঊষসী। দরজা ভিড়ানো। ভেতর থেকে গানের বাজার আওয়াজ আসছে। সাথে হৈ-হুল্লোড়ের আওয়াজ ও আসছে। ও কপালে ভাজ ফেলে ভিড়ানো দরজা খুলে।

ভেতরের দৃশ্য দেখে মুখ হাঁ হয়ে যায়। ড্রেসিং টেবিলের সামনে বাদরের মত নাচ্ছে; সাদা টাওয়েল পড়া এক বড় বাদর ও তাঁর দুই ছানা। রুমের অবস্থা নাজেহাল! ফ্লোরে ছড়ানো বিভিন্ন চিপসের প্যাকেট, কোল্ড ড্রিংস, চকলেটের প্যাকেট,বার্গারের বক্স!

সাথে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে লেগো সেট, সুপারহিরো ফিগারস, একশন ফিগারস, রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি, হেলিকপ্টার, বাবল গান, ক্যারাম বোর্ড, পাজাল, টুল বক্স ইত্যাদি।

বিছানার এক পাশে উল্টো হয়ে পড়ে আছে মোটর-সাইকেল (বাচ্চাদের)। শার্ট-প্যান্ট, গেঞ্জি সব এলো মেলো হয়ে আছে বিছানায়। ঊষসী রুমের অবস্থা থেকে রাগে ফোসে উঠে। রুমটাকে বস্তি বানিয়ে ফেলেছে! সে যে এত দিন ধরে বাসায় নেই, তাতে এই বাপ-বেটার কিছুই যায় আসে না! ও রাগান্বিত কণ্ঠে বলে উঠে,

-এই এই... এই সব কী করছেন?

সহধর্মিণীর কণ্ঠ কর্ণগোচর হতে-ই নাচ থামিয়ে দেয় ঋত্বিক। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় দরজার দিকে। নীল রঙের থ্রি-পিছ পরে চোখ দিয়ে আগুন ঝড়ছে যাঁর। সে দুই ছেলে কে ধরে তাদের নাচ ও বন্ধ করায়। তার পর উঠে দাঁড়ায়। কোমরে হাত দিয়ে পরনের টাওয়েল একটু উপরে তোলে। তার পর বুকে হাত গুঁজে দাঁড়ায়। দুই ছেলে ও ঘাড় বাঁকিয়ে একবার বাপ কে দেখে, বাপের মত বুকে হাত গুঁজে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। তবে ঋণের টাওয়েলের প্যাঁচ খুলে যেতে নেয়। ও কোনো মতে টাওয়েল ধরে ছোট করে ডাকে,

-আব্বু, থুলে গ্যালো...!

ঋত্বিক ছেলের দিকে তাকিয়ে দ্রুত বসে ছেলের টাওয়েল আবার প্যাঁচিয়ে বেঁধে দেয়।

-আরে আমার রাজপুত্র! ডোন্ট ওরি।

এই বলে আবার উঠে দাঁড়ায়। তিন বাপ-বেটার কর্ম- কাণ্ড দেখে ঝাঁঝালো কণ্ঠে ঊষসী আবার বলে,

-এই সব কী হচ্ছে এখানে? রুম টার এই অবস্থা কেন? বস্তি বানিয়ে ফেলেছেন।

ঋত্বিক আয়নাতে চুল ঠিক করে বলে,

-আরে, ম্যাডাম। আপনি এখানে? কী মনে করে হঠাৎ, বাপের বাড়ি থেকে এত দ্রুত চলে এলেন? দেখতে এসেছেন আপনাকে ছাড়া আমরা তিন বাপ-বেটা কেমন আছি?

ঋত্বিকের কথায় আরও কয়েক দফা চেতে যায় ঊষসী। চোখ গরম করে তাকিয়ে থাকে। ঋত্বিক ছেলেদের উদ্দেশ্যে বলে,

-বয়ে'স, এটা তোমাদের খালামণি। আমাদের সাথে দেখা করতে এসেছে। খালামণি কে হাই বলো।

দুই ছেলে বাপের কথায়, ঊষসীর দিকে তাকিয়ে হাত নাড়িয়ে বলে,

-হাই, খাম্নি!

-হাই, খাম্নি!

নিজের ছেলেদের মুখে খালামণি ডাক শুনে ঠোঁট হাঁ হয়ে যায় ঊষসীর। এই সব কি শিখেছে ওরা! চার-পাঁচ দিন বাড়ি থেকে চলে গেছে বলে এই সব শিখবে! ও ঋত্বিকের দিকে তাকিয়ে কটমট করতে করতে বলে,

-এই সব ওদের কী শিখিয়েছেন আপনি? এই সব কোন ধরনের ভাষা?

ঋত্বিক দুই ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে,

-পিতৃভাষা! এই সব পিতৃভাষা! সবাই তো মাতৃভাষা শেখে৷ আমার ছেলেরা পিতৃভাষা শিখবে। তোমাদের মায়েদের জন্য; আমাদের বাপ দের স্থান অনেক পিছিয়ে গেছে। তোমাদের কথার জন্য, আমরা বাপরা কথা বলার ওয়ে পাইনা। তাই আমার ছেলেদের পিতৃভাষা শিখিয়ে; পিতৃভাষা আইন চালু করবো। এতে সব বাবারা নিজেদের হারানো অধিকার ফিরে পাবে।

এরপর ছেলেদের দিকে তাকিয়ে বলে,

-কী বয়েস, আব্বুর নাম উজ্জ্বল করতে পারবে তো?

ঊষসী তেরে এসে বলে,

-এক দম আলতু-ফালতু কথা বলবেন না। আমি বাসায় নেই আর (আশে-পাশে তাকিয়ে) এই সব কি করেছন? রুমটাকে বস্তি বানিয়ে ফেলেছেন। আর ছেলেদের এই সব কী বলছেন?

ঋত্বিক ঘাড় বাঁকিয়ে বলে,

-তো, আপনাকে এত তাড়াতাড়ি বাপের বাড়ি থেকে আসতে বলেছে কে? আমি আর আমার ছানারা তো ভেবেছি এক-দুই বছর থাকবেন! আর আমরা একটু আমোদ-ফুর্তি করবো। আর আপনি আমাদের বিশ্বাস ভেঙে এত দ্রুত চলে এলেন? এইটা মোটেও আশা করি নি। আপনি এত বড় বিশ্বাসঘাতক!

তারপর ছেলেদের উদ্দেশ্যে বলে,

-বয়েস, কাম। আমাদের বেরোতে হবে।

ঋত্বিকের কথায় চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে থাকে ঊষসী। মনে মনে একটু অবাক ও হয়। ও চলে যাওয়াতে বাপ-বেটার তাহলে ভীষণ ভালোই লেগেছে। ঋত্বিক ছেলেদের আদেশ করে আলমারির দিকে চলে যায়। বাচ্চারা ও বাধ্য ছেলের মত বাবার পিছু-পিছু হাঁটতে থাকে। এত দিন পর ছেলেদের দেখতে পেয়ে বুকের ভেতর ছট-ফট কতে থাকে ঊষসীর। কোলে নিয়ে আদর করতে মন ব্যাকুল হয়ে যায়। ও ছেলেদের উদ্দেশ্যে অস্থির কণ্ঠে ডেকে উঠে,

-বাবা। আমার সোনারা। এই দিকে আসো।

মায়ের ডাক শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় ঋণয় ঋশান। ঊষসীর চোখ ছলছল করে উঠে। হাত বাড়াতেই ছেলেরা বাবার উদ্দেশ্যে বলে,

-আব্বু, আম্মা তি তোলে যাবো?

ঋত্বিক কাবাড থেকে নিজের ও ছেলেদের পোশাক বের কর‍তে করতে বলে,

-এক দম না, আব্বু। এই দিকে চলে আসো।

ছেলেদুইটা বাবার আদেশ পেয়ে ঘুড়ে ঋত্বিকের দিকে চলে যায়। ঊষসী অগ্নি দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে। যাওয়ার পথে আবার ঋশানের টাওয়েলের প্যাঁচ খুলে যায়। ও ঋত্বিক কে ডেকে উঠে,

-আব্বু...!

ঋত্বিক পোশাক বের করে ছেলের দিকে এগিয়ে আসে। টাওয়েলে প্যাঁচ দিতে দিতে বলে,

-ইস্! বার বার খুলে যায় কেনো?

ঊষসী চ্যাঁচিয়ে উঠে,

-আমার ছেলেদের আমাকে দিয়ে দিন। আমি ওদের নিয়ে চলে যাবো।

ঋত্বিক ভ্রু কুঁচকে বলে,

-মামার বাড়ির ওয়ারিশ পাওনি। চাইবার মাত্র হাতে তুলে দিবো। ইটস মাই প্রোপার্টি!

-ছেলে দুইটা কিন্তু, আপনার একা-র না।

-আমার একা-র না মানে? কোনো সন্দেহ আছে?

ঊষসী এক পা এগিয়ে এসে বলে,

-আমি না থাকলে ছেলে দুইটা পেতেন কই?

ঋত্বিক অবজ্ঞার স্বরে বলে,

-পৃথিবীতে কি মেয়ের আকাল পড়ছে? তুমি না থাকলে যেনো হতোই না!

ঊষসী ভ্রু কুঁচকে বলে,

-ওরা হওয়ার আগে তো কত ঢং করতেন। সব সময় আমার পিছু পিছু ঘুর ঘুর করতেন। আর আজ পাঁচ দিন ধরে আমি বাড়ি নেই; তাতে আপনার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই!

ঋত্বিক ডানে বামে মাথা নাড়িয়ে বলে,

-নির্বাচন শেষ। প্রচার ও শেষ! বুঝতে পেরেছো?

ঊষসীর কিছু বলতে গেলে, ওকে থামিয়ে দিয়ে; বাইরে থেকে একিটা ঝাড়ু এনে ঊষসীর হাতে তুলে দেয়। ওর দিকে ঝুঁকে বলে,

-আমাকে ও আমার ছেলেদের রেখে, এত দিন বাপের বাড়ি থাকার অপরাধে ; মিঃ সওদাগর মিসেস সওদাগরকে, তাঁর এবং তাঁর ছানাপোনাদের জন্য আ্যসিস্ট্যান্ট হিসেবে নিযুক্ত করলো।

আশা করি আপনি খুব ভালো-ভাবে অগোছালো রুমটাকে পরিষ্কার করবেন। আমাদের বাপ-বেটাদের বের হতে হবে। বায়!

ঊষসীর হাতে ঝাড়ু গুঁজে দিয়ে; বের করা পোশাক নিয়ে দুই ছেলের কাছে আসে। দুইটা ফর্মাল ব্ল্যাক শার্ট দুই ছেলেকে পড়িয়ে দেয়। সাথে ব্ল্যাক প্যান্ট। ছেলেদের সাথে ম্যাচ করে নিজেও ফর্মাল ব্ল্যাক শার্ট পড়ে। তার পর তিন জন আয়নার সামনে দাঁড়ায়। ঋত্বিক আয়নায় দেখতে দেখতে শার্টের কফ ভাজ করতে থাকে। আর আড়চোখে সহধর্মিণীর রাগ দেখতে থাকে।

ওর দেখা-দেখি ছেলেরাও তাদের ছোট ছোট হাত উঠিয়ে কফ ভাজ করার চেষ্টা করে। ঋত্বিক বাঁকা হেসে ছেলেদের কফ ভাজ করে দেয়। তার পর জেল দিয়ে চুল ঠিক করে, ড্রয়ার থেকে তিনিটা পোলারাইজড ব্ল্যাক সানক্লাস বের করে। বাকি দুইটা তুলোনামূলক ছোট। দুইটা দুই ছেলের হাতে দিয়ে, নিজে একটা হাতে তুলে নেয়। তার পর আয়নার দিকে তাকিয়ে বলে,

-বয়ে'স, রেডি।

ছেলেরা উপরে নিচে মাথা নাড়ায়। ঋত্বিক ওয়ান, টু, থ্রি বলে তিনজনে এক সাথে আয়নার দিকে তাকিয়ে সানক্লাস চোখে পড়ে। তারপর ঋত্বিক ইশরা করে পকেটে হাত দিতে। ছেলেরা নিজেদের প্যান্টের পকেট খুঁজে তাতে হাঁত গুঁজে।

দূরে ঝাড়ু হাতে অগ্নি দৃষ্টি নিয়ে তিন বাপ-বেটার ভাব দেখছে ঊষসী। বাপ-বেটাদের রেডি হওয়া শেষ হলে তিন জনে বাইরে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়। দুই ছেলে আগে বের হয়। ঊষসীর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়, ঋত্বিক সানগ্লাস তর্জনী আঙুলের দ্বারা একটু নিচু করে ঊষসীকে চোখ মারে। ঊষসী দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। ঋত্বিক রুম থেকে বেরিয়ে ঊষসীকে চেতানোর জন্য ছেলেদের উদ্দেশ্যে বলে,

-বয়েস, কোনো আম্মু পছন্দ হলে আমাকে বলো। তোমাদের এনে দিবো।

ঋত্বিকের কথা কানে পৌঁছাতে ঊষসী ঝাড়ু ফেলে ছুটে বাইরে আসে। ততক্ষণে ঋত্বিক ঋশান ঋণয় নিচে নেমে গেছে। ঊষসী দাঁতে-দাঁত চেপে শুধু দাঁড়িয়ে থাকে।

রাত প্রায় অনেক টা। বেল্কনিতে বসে আছে ঊষসী। মৃদু-মন্দ বাতাস বইছে। আকাশে অর্ধ-চন্দ্র মেঘের আড়ালে লুকিয়ে পড়ছে।

তিন বাপ-বেটা এখনো ফিরিনি। কই গেছে কে জানে। তা জানার আগ্রহ নেই ঊষসীর। স্বামীর সাথে বিবাদ সৃষ্টি হওয়াতে বাপের বাড়ি গিয়েছিলো। ভেবে ছিলো স্বামী মান ভাঙিয়ে নিয়ে আসবে। কিন্তু না! সে তো কোনো ভ্রুক্ষেপ-ই করলো না।

গাড়ির হর্নের শব্দে ধ্যান ভাঙে ঊষসীর। গেট দিয়ে কালো গাড়িটা বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেছে। বোধহয় রাজ সাহেবরা ফিরলো। ঊষসী সেই দিকে এক পলক তাকিয়ে অন্য দিকে দৃষ্টি নেয়।

কিছুক্ষণ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর; ঊষসীর সামনে গোলাপের একটা তোড়া ধরে কেউ! যেখানে অনেক গুলো লাল টকটকে গোলাপ। ঊষসী ঘাড় ঘুরায় আগন্তুককে দেখার জন্য। ঋত্বিক এর মুখশ্রী দৃষ্টিগোচরে হতে সরে যেতে নেয়। তবে তার আগেই শক্ত বাহুডরে আবদ্ধ হয়ে যায়। ঋত্বিক ওকে পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। গোলাপের তোড়া সামনে রেখে ওর ঘাড়ে থুতনি ঠেকায়। ঊষসী ছোটার চেষ্টা করে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে উঠে,

-এক দম নাটক করতে আসবেন না, এখন। ছাড়ুন।

ঋত্বিক মোহময় কণ্ঠে বলে,

-ঝগড়া সব দিনে হবে। রাতের বেলা হাসবেন্ড-ওয়াইফ ঝগড়া কর‍ল এ ঘোর পাপ হয়।

এই বলে হাতের বাঁধন আরও শক্ত করে। ঊষসী দাঁতে-দাঁত চেপে বলে,

-নাটক করতে খুব ভালো ভাবেই শিখেছেন? তাইনা? রাগ করে চলে গেলাম, কই একটা বার তো আনতে গেলেন না। কল দিলেন না। এখন আবার ঢং করতে এসেছেন?

-আজ তো যেতাম-ই। তোমাকে বেঁধে নিয়ে আসতাম। কিন্তু, তুমি তো নিজে থেকে চলে এলে। এতে কি দোষ আমার।

-সরুন।

-সরি, বউ। আর হবে না।

-আমি আপনার কোনো কথা শুনতে চাই না।

-এমন করো না বউ। বোঝার চেষ্টা করো, পাঁচ- পাঁচটা দিন তুমি আমার থেকে দূরে ছিলে। জানো কতটা বিরহে ছিলাম আমি? এখন আর দূরত্ব ভালো লাগছে না। তোমার যা বক্তব্য আছে, যত রাগ আছে সকালে দেখিও। আমি তো বলেছিই ঝগড়া সব দিনে হবে। রাতে ঝগড়া করতে নেই।

-সরুন।

ঋত্বিক ফুলের তোড়া এক পাশে রেখে ঊষসীকে নিজের দিকে ঘোরায়। ঋত্বিক ঊষসীর দুই গালে হাত দিয়ে কপালে গভীর চুম্বন এঁকে দেয়। ও চোখের পাতা বন্ধ করে ফেলে। ঋত্বিক গাল ছেড়ে বুকের সাথে মিশিয়ে নেয় ওকে। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে,

-তোমাকে রাগাতে আমার ভীষণ ভালো লাগে, ম্যাডাম। আমি শুধু চাই, সেটা আমার কাছ থেকে, আমাকে একটু জড়িয়ে ধরে দেখাও।

-হ্যাঁ, তাই তো এত দিন থেকে আসলাম; তাতে আপনার কিছু যায় আসি-নি।

ঋত্বিক ঊষসী কে ছেড়ে, নিজের দুই কান ধরে বলে,

-ভালোবাসি, ভালোবাসি আর ভালোবাসি! আর রাগ করে থেকে ও না। সব দোষ আমার। আমার ভুল সব। আর কখনো এই রকম হবে না। এই বারের মত মাফ করে দিন ম্যাডাম।

একটু থেমে আবার বলে,

-রাগ করো ঠিক আছে, তবে এই ভাবে দূরে ঠেলে দিও না। তোমার রাগের মধ্যে ও যে ভালোবাসা লুকানো আছে, সেটা আমি দেখে ফেলেছি। তাই তো আমাকে ছেড়ে থাকতে না পেরে নিজে থেকে চলে এসেছো। তো, এবার একটু মুচকি হাসো।

-মোটেও না। যান, নিজের ছেলেদের নিয়ে ঘুরে আসুন। আমোদ-ফুর্তি করুন। আমি না থাকলে তো আপনার ভালো।

ঋত্বিক কান ছেড়ে অর্ধাঙ্গিনীকে আবার আলিঙ্গন করে বলে,

-তোমার রাগ, অভিমানে দু'টোই আমার কাছে অমূল্য। কারণ, সেটা প্রমাণ করে তুমি আমাকে কত ভালোবাসো। রাগ অভিমান আছে বলেই পৃথিবীতে ভালবাসার তীব্রতা এত!

-খুব কথা শিখেছেন দেখছি। ছেলেরা কই?

-আজ ওরা ওরদের দাদুর কাছে ঘুমামে। ওইখানে দিয়ে এসেছি। কারণ, আমার আমার একটা রাজকন্যা চাই!

ঊষসী ঋত্বিকের বুক থেকে মাথা তুলে বলে,

-এক দম না। দুইটা হয়েছে এতেই আপনি আমাকে পাত্তা দিতে চান না। আরেকটা হলে আমার খোঁজ-ই রাখবেন না।

ঋত্বিক মুচকি হেসে গোলাপের তোড়া থেকে একটা গোলাপ ছিঁড়ে ঊষসীর কানে খুঁজে দেয়। দ্বিতীয় বারের মত কপালে চুম্বন করে বলে,

-তোমার অভিমানে ফেটে পড়ে সন্ধ্যা।

তোমার একটুখানি ছোঁয়ায়, ভরে যায় অন্তর্লোকের কন্দ সত্তা।

তুমি চোখ তুলে তাকালে থমকে যায় জীবন,

তুমি যে আমার নিঃশব্দ প্রেম- মনপবন!

কথা শেষ হতে দুজন-দুজন কে গভীর আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে নেয়। যত ঝগড়া-বিবাদই হোক, ভালবাসা শেষ হবার নয়। রাগ অভিমান তো ভালোবাসার গভীতাকে আরও তীব্র করে মাত্র!

__________________সমাপ্ত_____________

®দোয়েল

১০মে, ২০২৫

শনিবার।

#মনপবন

#অণুগল্প

#তোয়া_নিধী_দোয়েল

[হুট করে মাথায় এলো! টপ করে লিখে ফেললাম!

প্রিয় পাঠক, ভালো লাগলে গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। তাহলে চলমান গল্প শেষ হলে, এইটা শুরু করার চেষ্টা করবো। ধন্যবাদ🤍]